Logo
Logo
×
   

দৃষ্টিপাত

ডিজিটাল উত্তরাধিকার নিয়ে এখনই ভাবার সময়

আনিসুর বুলবুল

আনিসুর বুলবুল

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬, ০৭:২০ পিএম

ডিজিটাল উত্তরাধিকার নিয়ে এখনই ভাবার সময়

একসময় মানুষের উত্তরাধিকার বলতে বোঝানো হতো বাড়ি, জমি, ব্যাংকের টাকা, গয়না কিংবা কিছু স্মৃতিচিহ্ন। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন আমাদের জীবনের একটি বড় অংশ রয়ে যায় ডিজিটাল জগতে। 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রোফাইল, ই-মেইল, ক্লাউডে সংরক্ষিত ছবি ও নথি, অনলাইন ব্যবসা, ওয়েবসাইট, এমনকি ভার্চুয়াল সম্পদও আজ একজন মানুষের পরিচয় ও জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অথচ মৃত্যুর পর এই বিপুল ডিজিটাল সম্পদের কী হবে, সে প্রশ্নটি নিয়ে আমাদের এখনো তেমন কোনো আলোচনা নেই।

আজ একজন মানুষের স্মৃতির বড় অংশ আর অ্যালবামের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। হাজার হাজার ছবি, ভিডিও, ব্যক্তিগত বার্তা, গুরুত্বপূর্ণ নথি, পারিবারিক স্মৃতি এবং কর্মজীবনের অসংখ্য তথ্য সংরক্ষিত থাকে বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে। কেউ ক্লাউডে বহু বছরের গবেষণা বা সৃজনশীল কাজ জমা রাখেন, কেউ পরিচালনা করেন অনলাইন ব্যবসা, আবার কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকেই আয় করেন। 

কিন্তু সেই মানুষটি হঠাৎ মারা গেলে এসবের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে যাবে, সে বিষয়ে অধিকাংশ পরিবারেরই কোনো প্রস্তুতি থাকে না।

এটি নিরাপত্তার বিষয়ও। একজন মানুষের মৃত্যুর পর অসংখ্য অনলাইন অ্যাকাউন্ট বছরের পর বছর ব্যবহারহীন অবস্থায় পড়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যরা পাসওয়ার্ড বা প্রবেশাধিকার সম্পর্কে কিছুই জানেন না। ফলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য স্থায়ীভাবে হারিয়ে যায়। অন্যদিকে পরিত্যক্ত অ্যাকাউন্ট সাইবার অপরাধীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। পরিচয় চুরি, প্রতারণা, ভুয়া তথ্য ছড়ানো কিংবা মৃত ব্যক্তির পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধ সংঘটনের ঝুঁকিও থেকে যায়।

বিষয়টির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অর্থনৈতিক মূল্য। বর্তমানে অনেক মানুষের কাছে অনলাইন বিনিয়োগ, ডোমেইন, ওয়েবসাইট, ইউটিউব চ্যানেল কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক ব্যবসা রয়েছে। মালিকের মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারীরা যদি এসব সম্পদে প্রবেশাধিকার না পান, তাহলে কোটি টাকার সম্পদও কার্যত অচল হয়ে যেতে পারে।

প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে ডিজিটাল উত্তরাধিকার আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কল্যাণে একজন মানুষের ছবি, ভিডিও, কণ্ঠ বা লেখার ভিত্তিতে নতুন কনটেন্ট তৈরি করা এখন সম্ভব। ফলে মৃত্যুর পর একজন মানুষের ডিজিটাল তথ্য কে ব্যবহার করবে, কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করবে এবং তার সীমা কোথায় হবে, তা ভবিষ্যতের একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও নৈতিক প্রশ্ন হয়ে উঠছে।

এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে ডিজিটাল উত্তরাধিকার নিয়ে আইন ও নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোও ব্যবহারকারীদের জীবিত অবস্থায় মৃত্যুর পর তাদের ডিজিটাল উপস্থিতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ দিচ্ছে।

ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে ব্যবহারকারীরা লিগ্যাসি কন্টাক্ট মনোনীত করতে পারেন, যিনি মৃত্যুর পর স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে সংরক্ষিত অ্যাকাউন্টের নির্দিষ্ট কিছু দায়িত্ব পালন করতে পারেন। 

গুগলের ইনঅ্যাক্টিভ অ্যাকাউন্ট ম্যানেজারের মাধ্যমে আগে থেকেই নির্ধারণ করা যায়, দীর্ঘদিন অ্যাকাউন্ট ব্যবহার না হলে নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে কোন তথ্য যাবে অথবা অ্যাকাউন্টটি স্থায়ীভাবে মুছে ফেলা হবে। অ্যাপলও নির্ধারিত উত্তরাধিকারীকে নির্দিষ্ট শর্তে ব্যবহারকারীর তথ্য ব্যবহারের সুযোগ দেয়।

এ পরিস্থিতিতে ব্যক্তিগত সচেতনতারও বিকল্প নেই। প্রত্যেকের উচিত নিজের গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল সম্পদের একটি তালিকা তৈরি করা। কোন কোন অনলাইন সেবা ব্যবহার করছেন, কোথায় গুরুত্বপূর্ণ নথি সংরক্ষিত আছে, মৃত্যুর পর প্রয়োজনে পরিবারের বিশ্বস্ত কেউ কীভাবে সেগুলোতে প্রবেশাধিকার পাবেন, সে বিষয়ে আগেভাগেই একটি পরিকল্পনা করে রাখা দরকার। অবশ্যই এসব তথ্য নিরাপদভাবে সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে জীবদ্দশায় ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন না হয়।

একই সঙ্গে রাষ্ট্র, আইনবিদ, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং নীতিনির্ধারকদেরও এ বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। ডিজিটাল উত্তরাধিকার নিয়ে স্পষ্ট নীতিমালা, জনসচেতনতা এবং প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কার এখন সময়ের দাবি। কারণ মানুষের জীবন যেমন বাস্তব জগতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তেমনি মৃত্যুর পরও তার ডিজিটাল উপস্থিতি এক মুহূর্তে বিলীন হয়ে যায় না।

আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন একজন মানুষের স্মৃতি, পরিচয়, সম্পর্ক এবং সম্পদের একটি বড় অংশ ডিজিটাল জগতে ছড়িয়ে রয়েছে। তাই মৃত্যুর প্রস্তুতির আলোচনায় যেমন উইল, সম্পত্তি ও উত্তরাধিকার স্থান পায়, তেমনি ডিজিটাল উত্তরাধিকারকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

ডিজিটাল মৃত্যু আর ডিজিটাল উত্তরাধিকার নিয়ে কথা বলা হয়তো অনেকের কাছে অস্বস্তিকর মনে হতে পারে। কিন্তু এটি বাস্তবতা। আমরা যারা ডিজিটাল দুনিয়ায় বাস করি, আমাদের এই বাস্তবতা মেনে নিতে হবে এবং প্রস্তুত থাকতে হবে। কারণ আমাদের মৃত্যুর পরও আমাদের স্মৃতি, পরিচয় ও সম্পদের একটি অংশ ডিজিটাল জগতেই থেকে যাবে।

লেখক: লেখক ও গণমাধ্যমকর্মী

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম