Logo
Logo
×
   

দৃষ্টিপাত

শিক্ষার্থীর বিকাশে বিদ্যালয় ও পরিবারের অংশীদারিত্ব কেন জরুরি

ড. মো. কুদরত-ই-জাহান

ড. মো. কুদরত-ই-জাহান

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৪৩ পিএম

শিক্ষার্থীর বিকাশে বিদ্যালয় ও পরিবারের অংশীদারিত্ব কেন জরুরি

প্রতীকী ছবি

আমাদের অধিকাংশ শিশুই কেন বিদ্যালয়ে যেতে ভয় পায়? কেন বিদ্যালয় অনেকের কাছে আনন্দের নয়, বরং পরীক্ষার চাপ ও ভয়ের আরেকটি নাম? কেন প্রাথমিক শিক্ষার মৌলিক ভিত্তি দুর্বল থেকে যায়? কেন বিদ্যালয় থেকে বের হওয়া অনেক শিক্ষার্থীর নিজের কোনো শেখার গল্প, কোনো সৃজনশীল অভিজ্ঞতা কিংবা প্রতিষ্ঠানের প্রতি আবেগ তৈরি হয় না?

প্রশ্নগুলো কেবল শিক্ষা ব্যবস্থার নয়; এগুলো আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পর্কিত।

আমরা প্রায়ই শিক্ষার মান নিয়ে আলোচনা করি, কিন্তু একটি বিষয় ভুলে যাই—একজন শিশুর শিক্ষা শুধু বিদ্যালয়ে নয়, পরিবারেও শুরু হয়। বিদ্যালয় ও পরিবার যখন আলাদা পথে চলে, তখন শিশুর শেখার প্রক্রিয়াও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অথচ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বলছে, শিক্ষার্থীর সার্বিক বিকাশ নিশ্চিত করতে বিদ্যালয় ও পরিবারের অংশীদারিত্বের কোনো বিকল্প নেই।

পরিবারই শিশুর প্রথম বিদ্যালয়

একটি শিশু পৃথিবীতে আসার পর প্রথম যে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পরিচিত হয়, সেটি তার পরিবার। সেখানেই সে কথা বলতে শেখে, ভালোবাসা, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা ও মূল্যবোধের প্রথম পাঠ গ্রহণ করে। এরপর বিদ্যালয় সেই শিক্ষাকে আরও সুসংগঠিত, পরিকল্পিত ও বিস্তৃত করে। অর্থাৎ পরিবার ও বিদ্যালয় পরস্পরের বিকল্প নয়; বরং একে অপরের পরিপূরক। একটি শিশুর সার্বিক বিকাশ তখনই সম্ভব, যখন এই দুটি প্রতিষ্ঠান একই লক্ষ্য ও মূল্যবোধ নিয়ে একসঙ্গে কাজ করে।

কিন্তু আধুনিক সমাজব্যবস্থায় এই স্বাভাবিক সম্পর্ক ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। যৌথ পরিবারের পরিবর্তে একক পরিবারের বিস্তার, বাবা-মায়ের কর্মব্যস্ততা, প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাপন এবং পারিবারিক যোগাযোগের সংকোচনের ফলে অনেক শিশু আবেগগত ও সামাজিকভাবে একা হয়ে পড়ছে। দাদা-দাদি বা নানা-নানির গল্প, পারিবারিক আলাপ, একসঙ্গে খাওয়া কিংবা পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে জীবনের ছোট ছোট শিক্ষা পাওয়ার সুযোগ আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। ফলে শিশুদের ভাষাগত দক্ষতা, সামাজিক আচরণ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, আত্মবিশ্বাস, সহমর্মিতা এবং দলগতভাবে চলার মতো মৌলিক জীবনদক্ষতার বিকাশও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

পরিবার ও বিদ্যালয়ের সেতুবন্ধন 

বর্তমান সমাজের এই বাস্তবতায় বিদ্যালয়ের ভূমিকা আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ আজকের দিনে বিদ্যালয় শুধু পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞান দেওয়ার স্থান নয়; অনেক ক্ষেত্রে এটি শিশুর দ্বিতীয় পরিবার। তাই বিদ্যালয়কে এমন একটি নিরাপদ, আনন্দময় ও মানবিক পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে শিক্ষার্থীরা শুধু পড়াশোনা নয়, বরং পারস্পরিক সহযোগিতা, মূল্যবোধ, সামাজিক আচরণ, আত্মবিশ্বাস এবং জীবনদক্ষতার চর্চারও সুযোগ পাবে। আর এটি তখনই সম্ভব, যখন বিদ্যালয় ও পরিবার পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং শিক্ষার্থীর বিকাশের অভিন্ন অংশীদার হিসেবে কাজ করবে।

এই লক্ষ্য অর্জনে বিদ্যালয় ও পরিবারের কার্যকর অংশীদারিত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যখন শিক্ষক ও অভিভাবক নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন, শিক্ষার্থীর অগ্রগতি নিয়ে যৌথ পরিকল্পনা করেন এবং সমস্যা সমাধানে একসঙ্গে কাজ করেন, তখন শিক্ষার্থীর অ্যাকাডেমিক ফলাফল যেমন উন্নত হয়, তেমনি তার মানসিক সুস্থতা, নৈতিক বিকাশ ও সামাজিক দক্ষতাও বৃদ্ধি পায়।

এ কারণেই বিশ্বের বহু দেশে School–Family Partnership, Parent–Teacher Association (PTA) এবং Parent–Teacher Conference শিক্ষা ব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ।

ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, সুইডেন ও ডেনমার্কসহ উত্তর ইউরোপের দেশগুলো বিদ্যালয়–পরিবার অংশীদারিত্বকে শিক্ষা নীতির মৌলিক ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছে। একইভাবে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরেও অভিভাবকদের শিক্ষা প্রক্রিয়ার সক্রিয় অংশীদার হিসেবে দেখা হয়।

সেখানে বিদ্যালয় শুধু পরীক্ষার ফল জানানোর মাধ্যমেই তাদের দায়িত্ব শেষ করে না। প্রতিষ্ঠান শিশুর শেখা, আচরণ, মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক দক্ষতা এবং ব্যক্তিগত বিকাশ নিয়েও পরিবারকে নিয়মিত সম্পৃক্ত রাখে।

গল্প বলার মধ্যেই ফিরতে পারে শেখার আনন্দ

বিদ্যালয় ও পরিবারের অংশীদারিত্বকে আরও কার্যকর করার জন্য একটি সহজ কিন্তু অত্যন্ত ফলপ্রসূ উদ্যোগ হতে পারে—প্রতিটি বিদ্যালয়ে শিশুদের জন্য নিয়মিত গল্প বলার (Storytelling) কার্যক্রম চালু করা। বর্তমান সময়ে শিশুরা আগের মতো দাদা-দাদি, নানা-নানির কাছ থেকে গল্প শোনার সুযোগ খুব কম পায়। ফলে ভাষা, কল্পনাশক্তি, মূল্যবোধ ও পারিবারিক বন্ধনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন তাদের জীবন থেকে ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। বিদ্যালয় চাইলে সেই শূন্যতার একটি অংশ পূরণ করতে পারে।

গল্প বলা শুধু বিনোদন নয়; এটি ভাষা, চিন্তাশক্তি, স্মৃতিশক্তি, সৃজনশীলতা এবং সামাজিক দক্ষতা বিকাশের একটি পরীক্ষিত শিক্ষাপদ্ধতি। গল্প বলতে গিয়ে শিশু নতুন শব্দ শেখে, বাক্য গঠন অনুশীলন করে এবং নিজের ভাবনা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে শেখে। গল্পের চরিত্র, ঘটনা ও ধারাবাহিকতা মনে রাখতে গিয়ে তার স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগের বিকাশ ঘটে। একই সঙ্গে কারণ–ফলাফল বিশ্লেষণ করতে করতে সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি ও সমস্যা সমাধানের সক্ষমতাও বাড়ে। সহপাঠীদের সামনে গল্প বলার অভ্যাস শিশুকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে এবং জনসমক্ষে কথা বলার দক্ষতা গড়ে তোলে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গল্পের মাধ্যমে সততা, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ, সহযোগিতা এবং অন্যের অনুভূতি বোঝার মতো মানবিক মূল্যবোধ শিশুর কাছে সহজ ও আনন্দময়ভাবে পৌঁছে দেওয়া যায়। একে অপরের গল্প শোনা, মতামত দেওয়া এবং অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করার মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষে একটি পারিবারিক আবহ তৈরি হয়। এতে শিক্ষার্থীরা সহপাঠীকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং সহযোগী হিসেবে দেখতে শেখে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত পরীক্ষাকেন্দ্রিক ও প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষা সংস্কৃতির মানসিক চাপও অনেকটা কমানো সম্ভব।

উন্নত বিশ্বের বহু দেশে Storytelling-কে ভাষা শিক্ষা, যোগাযোগ দক্ষতা, সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার একটি কার্যকর শিক্ষাকৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তাই বাংলাদেশেও প্রতিটি বিদ্যালয়ে নতুন কোনো বিষয় সংযোজন না করে বিদ্যমান সময়সূচির মধ্যেই সপ্তাহে একটি গল্প বলার ক্লাস অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। এতে অভিভাবকদেরও সম্পৃক্ত করা সম্ভব। শিশুরা বাড়িতে পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে গল্প শুনে, পারিবারিক স্মৃতি সংগ্রহ করে কিংবা নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে গল্প তৈরি করে বিদ্যালয়ে উপস্থাপন করতে পারে। এর মাধ্যমে বিদ্যালয় ও পরিবারের মধ্যে শেখার একটি স্বাভাবিক সেতুবন্ধন গড়ে উঠবে।

একটি গল্প বলার ক্লাস হয়তো একাই পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে বদলে দেবে না। কিন্তু এটি শেখাকে আনন্দময়, মানবিক ও অংশগ্রহণমূলক করে তুলতে পারে। বিদ্যালয়ে পারিবারিক পরিবেশ সৃষ্টি হবে, স্কুলভীতি কমবে, শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়কে আপন মনে করবে, ভাষা ও যোগাযোগ দক্ষতা উন্নত হবে, আত্মবিশ্বাস বাড়বে এবং তাদের মৌলিক শিক্ষার ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, প্রতিটি শিক্ষার্থীর নিজের শেখার একটি গল্প তৈরি হবে। আর সেই গল্পই একদিন তাকে শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা নয়, বরং জ্ঞান, দক্ষতা ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সহায়তা করবে।

লেখক: উপাচার্য, বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .