Logo
Logo
×
   

দৃষ্টিপাত

ব্রেইন স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক ও কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট

Icon

ডা. সাঈদ এনাম

প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৪৫ পিএম

ব্রেইন স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক ও কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট

প্রতীকী ছবি

স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক আর কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট এই তিনটি শব্দই যেন হঠাৎ আসা জরুরি বিপদের সংকেত। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এদের কাজের জায়গা ও আচরণ সম্পূর্ণ আলাদা। কোথাও মস্তিষ্কের রক্তনালীর মাধ্যমে প্রবাহিত রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়, কোথাও হৃদপিণ্ডে রক্ত সরবরাহকারী রক্তনালী বন্ধ হয়ে যায়, আবার কোথাও হঠাৎ থেমে যায় হৃদপিণ্ডের বৈদ্যুতিক কার্যক্রম ও কার্যকর পাম্পিং। পার্থক্যটি জানা মানে শুধু জ্ঞান অর্জন নয়, জরুরি মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করা।

১. ব্রেইন স্ট্রোক: যখন মস্তিষ্কের রক্তপ্রবাহে বিপর্যয়

ভাবুন, মস্তিষ্কের কোনো এলাকায় হঠাৎ রক্ত সরবরাহকারী রক্তনালী বন্ধ হয়ে গেল, অথবা রক্তনালী ফেটে গিয়ে সেখানে রক্তক্ষরণ শুরু হলো। একেই বলে স্ট্রোক/ ব্রেইন স্ট্রোক /সেরিব্রো-ভাসকুলার এক্সিডেন্ট (CVA)। রক্তনালী বন্ধ হয়ে গেলে তাকে ইস্কেমিক স্ট্রোক, আর রক্তনালী ফেটে রক্তক্ষরণ হলে হেমোরেজিক স্ট্রোক বলা হয়।

উভয় ক্ষেত্রেই মস্তিষ্কের যে অংশে ওই রক্তনালী রক্ত সরবরাহ করছিল, সেই অংশের কোষ অক্সিজেনের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে।

লক্ষণ হলো: হঠাৎ মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া, এক হাত বা পা দুর্বল বা অবশ হয়ে যাওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া কিংবা কথা বুঝতে অসুবিধা হওয়া। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। রোগী অনেক সময় সচেতনই থাকেন; কিন্তু শরীরের কোনো অংশ যেন হঠাৎ তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। 

শুধু শারীরিক নয়, কখনো কখনো স্ট্রোকের ফলে আক্রান্ত রোগীর মধ্যে মানসিক রোগের উপসর্গও দেখতে পাওয়া যায় হঠাৎ অতিরিক্ত বিষণ্ণতা, অস্থিরতা, বিভ্রান্তি কিংবা আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন চোখে পড়তে পারে। কারণ মস্তিষ্কের আক্রান্ত অংশটিই আমাদের আবেগ, চিন্তা ও আচরণের কেন্দ্র।

স্ট্রোকে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তাই দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানোই সবচেয়ে জরুরি।

২. হার্ট অ্যাটাক: যখন হৃদপিণ্ডের নিজেকে রক্ত সরবরাহকারী রক্তনালীতে বাধা

এবার হৃদপিণ্ডের দিকে তাকাই। হৃৎপিণ্ড সকল অঙ্গকে রক্ত সরবরাহ করে সচল রাখে। কিন্তু তার নিজে সচল থাকার জন্যেও অনবরত রক্তের প্রয়োজন। হার্ট অ্যাটাক হলো হৃদপিণ্ডের নিজে সচল থাকার রক্ত সরবরাহকারী করোনারি ধমনীর রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা। এর ফলে হৃদপিন্ডের নিজের আক্রান্ত অংশে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছায় না, ফলে সেই অংশের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কসন (Myocardial Infarction -MI)।

গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো, হার্ট অ্যাটাকের রোগী সাধারণত সচেতন থাকতে পারেন; তার পালস (pulse) ও শ্বাসও থাকতে পারে। লক্ষণ হতে পারে: বুকের মাঝখানে চাপ, ভারী কিছু চেপে থাকার মতো অস্বস্তি বা ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, ঘাম, বমি বমি ভাব কিংবা ব্যথা হাত, পিঠ, কাঁধ বা চোয়ালে ছড়িয়ে পড়া।

৩. কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট: যখন হৃদপিণ্ডের কার্যকর বৈদ্যুতিক পাম্পিং সিস্টেম হঠাৎ থেমে যায়

কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট একটি ভিন্ন এবং অত্যন্ত জরুরি অবস্থা। আমাদের হৃদপিণ্ডকে সচল রাখার জন্য একটি বিশেষ বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা রয়েছে। এই বৈদ্যুতিক ব্যবস্থায় মারাত্মক গোলযোগ হলে হৃদপিণ্ডের কার্যকর পাম্পিং হঠাৎ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ফলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে রক্ত পৌঁছানো বন্ধ হয়ে যায়।

বিষয়টি একটি চলমান পানির মোটরের সঙ্গে তুলনা করা যায়। মোটরটি চলতে বিদ্যুৎ প্রয়োজন। বিদ্যুৎ চলে গেলে মোটর যেমন পানি পাম্প করা বন্ধ করে দেয়, তেমনি কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হলে হৃদপিণ্ডও কার্যকরভাবে রক্ত পাম্প করতে পারে না। ফলে মস্তিষ্কসহ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোতে রক্ত ও অক্সিজেন পৌঁছানো বন্ধ হয়ে যায়।

এতে সাধারণত রোগী আচমকা অচেতন হয়ে পড়েন, স্বাভাবিক শ্বাস থাকে না বা শুধু অস্বাভাবিক গাসপিং (gasping) হতে পারে। আধুনিক নির্দেশনা অনুযায়ী, রোগী অচেতন ও স্বাভাবিকভাবে শ্বাস না নিলেই কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট ধরে নিয়ে তাৎক্ষণিক CPR শুরু করা উচিত, কারণ পালস খুঁজতে সময় নষ্ট করা উচিত নয়। পাশাপাশি, উপযুক্ত ক্ষেত্রে ডি-ফিব্রিলেটর (Defibrillation) জীবন বাঁচানোর প্রধান ব্যবস্থা।

যখন প্রতিটি মুহুর্তই জীবন

তিন ক্ষেত্রেই একটি সত্য অমোঘ সময় নষ্ট করা মানে মূল্যবান জীবন নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ানো। স্ট্রোকে মনে রাখবেন FAST: Face, Arm, Speech, Time।

হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিন। 

আর কেউ অচেতন এবং স্বাভাবিকভাবে শ্বাস না নিলে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট সন্দেহ করে দ্রুত জরুরি সহায়তা ডাকুন এবং প্রশিক্ষণ থাকলে CPR শুরু করুন।

ভয় নয়, সচেতনতাই প্রথম প্রতিরক্ষা। আজ এই তিনটির পার্থক্য মনে রাখুন, কারণ জরুরি মুহূর্তে আপনার একটি সঠিক সিদ্ধান্তই হয়তো কারও জীবন বাঁচাতে পারে।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক (সাইকিয়াট্রি), সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ।

ইন্টারন্যাশনাল ফেলো: আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক এসোসিয়েশন

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .