ধন্য হলো বঙ্গভবন: একজন সাধারণ মানুষের অসাধারণ হয়ে ওঠার গল্প
আহসান হাবিব বরুন
প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬, ১০:৫৬ এএম
মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আমাদের রাজনীতির মানচিত্রে যখন ক্ষমতার মোহ, ধন-সম্পদের লোভ এবং অহংকারের প্রতিযোগিতা এক নিত্যনৈমিত্তিক দৃশ্যপট, ঠিক তখনই একজন মানুষের জীবনযাত্রার দিকে তাকালে থমকে যেতে হয়। তিনি রাজনীতিতে সততা, নৈতিকতা, শিষ্টাচার এবং সৌজন্যতাবোধের এক বিরল ও প্রদীপ্ত প্রতীক। বর্তমান যুগের ভোগবাদী ও তোষামোদনির্ভর রাজনৈতিক কালচারে দাঁড়িয়েও যিনি জীবনসংগ্রাম ও রাজনৈতিক দর্শনে ধরে রেখেছেন অনুপম সাধারণত্ব। এই অতি সাধারণ জীবনযাপনই তাকে পরিণত করেছে এক অনন্য অসাধারণ ব্যক্তিত্বে—তিনি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বর্তমান তিনি বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি।
একজন মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক ধৈর্য, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, পারিবারিক ইতিহাস ও ব্যক্তিগত সংযম নিয়ে আলোকপাত করা নিছক একজন ব্যক্তির বন্দনা নয়। এটি বস্তুত আমাদের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির মৌলিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলার এক মহৎ সুযোগ। ক্ষমতা কি মানুষকে বড় করে, নাকি মানুষ তার ভেতরের সুউচ্চ নৈতিকতা ও ব্যক্তিত্ব দিয়ে ক্ষমতার পদটিকে সম্মানিত করে? মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ পথপরিক্রমা এই অবিনশ্বর জিজ্ঞাসারই এক জীবন্ত উত্তর।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি, উত্তরবঙ্গের ইতিহাসসমৃদ্ধ জেলা ঠাকুরগাঁওয়ের কালীবাড়ি এলাকায়। তার রক্তে ও পরিবারে রাজনীতি, রাষ্ট্রপরিচালনা ও জনসেবার উত্তরাধিকার ছিল স্পষ্ট। তার পিতা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন একজন প্রখ্যাত আইনজীবী, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের দুবারের নির্বাচিত সদস্য এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী। তার চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন প্রখ্যাত আইনবিদ, সাবেক স্পিকার ও ক্যাবিনেট মন্ত্রী; আর অপর চাচা উইং কমান্ডার এস আর মির্জা মুজিবনগর সরকারের সাথে সরাসরি যুক্ত থেকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গড়েছেন।
সমৃদ্ধ পারিবারিক ঐতিহ্য তাকে রাজনৈতিক সচেতনতা ও সুযোগ দিলেও রাজপথের নেতৃত্ব তাকে প্লেটে করে উপহার দেয়নি। নিজের পথটি তাকে খোদাই করে নিতে হয়েছে নিজেরই ত্যাগ ও মেধা দিয়ে। ঠাকুরগাঁওয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ চুকিয়ে তিনি ঢাকা কলেজে উচ্চমাধ্যমিক এবং পরবর্তীতে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড-খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ষাটের দশকের উত্তাল স্বাধিকার আন্দোলন ও ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের অগ্নিগর্ভ দিনগুলোতে তিনি ছাত্ররাজনীতিতে সরাসরি যুক্ত হন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ও এসএম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি সমাজ সংস্কার ও প্রগতিশীল ভাবধারায় বিশ্বাসী ছিলেন। তার রাজনীতির প্রথম প্রহরটি তৈরি হয়েছিল মেধা, সামাজিক সাম্য ও প্রগতির চিন্তাজগতের মধ্যে।
শিক্ষাজীবন শেষে তিনি ক্ষমতার সংক্ষিপ্ত পথে হাঁটেননি; বেছে নিয়েছিলেন শিক্ষকতার মতো মহান ও নিভৃত ব্রত। ঢাকা কলেজসহ বিভিন্ন সরকারি কলেজে অর্থনীতির প্রভাষক হিসেবে তরুণ শিক্ষার্থীদের চিন্তার জগৎ গড়ে তোলার দায়িত্ব নেন। পরবর্তী সময়ে তিনি সরকারি প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত হন এবং ১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব সামলান।
রাজনীতিতে পূর্ণাঙ্গভাবে প্রবেশের আগে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ভেতর থেকে দেখা, প্রশাসনিক নিয়মকানুন বোঝা এবং শিক্ষক হিসেবে অর্থনীতি ও সমাজচিন্তাকে পর্যালোচনা করার এই অমূল্য অভিজ্ঞতা পরবর্তীতে তার রাজনৈতিক বক্তব্য ও কৌশলকে প্রজ্ঞাবান, সংযত ও যুক্তিনির্ভর করে তোলে। সবচেয়ে বড় কথা, ১৯৮৬ সালে যখন তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে নামার সিদ্ধান্ত নেন, তখন সরকারি চাকরি আঁকড়ে ধরে রাখাকে তিনি নৈতিক ও আইনগতভাবে অন্যায় বলে মনে করেছিলেন। ফলে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েই তিনি রাজনীতির মাঠে নেমে পড়েন। নীতি-নৈতিকতার প্রশ্নে এই ক্ষুদ্র অথচ দৃঢ় সিদ্ধান্তটিই প্রমাণ করে তিনি ঠিক কেমন আত্মপ্রত্যয়ী ও দৃঢ়চেতা।
১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান পদে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে তিনি নিজের সরাসরি জনপ্রতিনিধিত্বের সূচনা করেন। জাতীয় রাজনীতির শীর্ষ আসীন হওয়ার আগে স্থানীয় মানুষের একদম কাছাকাছি থেকে তাদের দুঃখ-দুর্দশার সাথী হওয়া তাকে তৃণমূলের স্পন্দন বুঝতে সাহায্য করেছিল। পরবর্তীতে ১৯৯২ সালে তিনি ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি হন এবং ধাপে ধাপে জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন।
২০০১ সালে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি সরকারের কৃষি এবং পরবর্তীতে বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব অত্যন্ত দক্ষতা ও নিষ্কলঙ্কভাবে পরিচালনা করেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও তিনি নির্বাচিত হন এবং পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই আসন থেকে বিজয়ী হয়ে সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেন।
তবে ফখরুলের রাজনৈতিক জীবন শুধুই জয়ের গল্পে মোড়া নয়—তিনি ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে পরাজিতও হয়েছিলেন। এই জয়-পরাজয়ের স্বাভাবিক গতিধারাই তার ব্যক্তিত্বকে আরও বেশি মানবিক ও খাঁটি করে তোলে। কারণ স্বৈরতান্ত্রিক বা অস্বাভাবিক রাজনীতি বাদে প্রকৃত গণতন্ত্রে পরাজয়ও এক মহাসত্য। জয়ের আনন্দ উদযাপনের চেয়ে পরাজিত হয়ে রাজপথ না ছেড়ে দ্বিগুণ উদ্যমে সংগঠনের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার মধ্যে নেতৃত্বের আসল পরীক্ষা হয়, যা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অক্ষরে অক্ষরে প্রমাণ করেছেন।
২০০৯ সালে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এবং ২০১১ সালে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০১৬ সালের জাতীয় কাউন্সিলে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির মহাসচিব নির্বাচিত হন। ২০২৬ সালে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি টানা দীর্ঘ সময় এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন, যা দলটির ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও দীর্ঘতম অধ্যায়।
বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় বিএনপি পার করেছে তার ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ঝড়-ঝাপটা। চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাস, তারেক রহমানের নির্বাসিত অবস্থা, হাজার হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা, হামলা ও কারাবরণ—এমতাবস্থায় দলের সাংগঠনিক ঐক্য ধরে রাখা এবং রাজপথে প্রতিবাদের ভাষা বজায় রাখার গুরুদায়িত্ব একহাতে সামলেছেন মির্জা ফখরুল। তিনি নিজেও বহুবার কারারুদ্ধ হয়েছেন, রাজপথে রক্তচক্ষুর মুখোমুখি হয়েছেন। ২০২৩ সালের অক্টোবরের সংকটে গ্রেফতার হয়ে টানা দীর্ঘ মেয়াদের কারাবাস তার রাজনৈতিক ত্যাগের পরিধিকে আরও প্রসারিত করে। চরম উত্তেজনাকর রাজনৈতিক পর্বেও তিনি কখনো ভাষার শালীনতা হারাননি, উগ্র রূপ নেননি; বরং তার সংযত ও মার্জিত বাচনভঙ্গি তাকে দলের গণ্ডি ছাড়িয়ে সর্বজনশ্রদ্ধেয় প্রতিচ্ছবি এনে দিয়েছে। চরম বৈধতার মাঝেও প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক শিবিরের কাছেও তার নৈতিকতা ও ভদ্রতা প্রশংসিত হয়েছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনের নানা সমীকরণের বাইরেও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে ব্যক্তিগত একাধিক সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা আমার স্মৃতিতে চিরভাস্বর। পল্টনের বিএনপি কার্যালয় কিংবা গুলশানের চেয়ারপারসনের দপ্তরে তার সঙ্গে মুখোমুখি বসে কথা বলা, চা-বিস্কুট খাওয়ার মুহূর্তগুলোর চেয়েও যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি অভিভূত করেছে—তা হলো উনার গভীর ও অকৃত্রিম সৌজন্যবোধ।
আমি যতবারই উনার কক্ষে প্রবেশ করেছি, উনি বয়সের জ্যেষ্ঠতা কিংবা রাজনৈতিক উচ্চতার তোয়াক্কা না করে কখনো চেয়ারে বসে আমার সঙ্গে হাত মেলাননি। আমি দরজায় দাঁড়াতেই তিনি চেয়ার থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে উঠে দাঁড়িয়ে আমায় স্বাগত জানিয়েছেন, হাত মিলিয়েছেন। আবার আলোচনা শেষে বিদায় নেওয়ার সময়ও ঠিক একই স্বভাবজাত মৃদু হাসিমুখ নিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বিদায় জানিয়েছেন। বড় পদের অহংকার কীভাবে ছোট ছোট সৌজন্যের কাছে ধূমিত হয়ে যায়, তা ফখরুল সাহেবের সঙ্গে না মিশলে অনুধাবন করা কঠিন। আমি বাসায় ফিরে এই মহানুভবতার কথা পরিবারের কাছে গর্ব করে বলেছি, আমার স্কুলপড়ুয়া সন্তানকে শিখিয়েছি—মানুষ যত বড়ই হোক, বিনয়ই তার আসল পোশাক। আমার সন্তানও আমার মুখে গল্পটি শুনে মির্জা ফখরুলের প্রতি গভীর অনুরাগী হয়ে ওঠে।
বিশেষভাবে মনে পড়ে ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসের সেই থমথমে দিনগুলোর কথা। তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকারের প্রশাসনিক গোয়েন্দা নজরদারি যখন তুঙ্গে, যখন গুলশান অফিসে যাতায়াত করা মানেই যে কোনো মুহূর্তে স্টিম রোলারের শিকার হওয়া, তখন গুলশান অফিস ও তার চারপাশে ছিল শুনসান নীরবতা। সেই চরম ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতেও আমি উনার সঙ্গে দেখা করি। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আমার কলাম ও লেখালেখির নথিপত্র উনাকে হস্তান্তর করি। পাশাপাশি জাসাসের উপজেলা পর্যায়ের আহ্বায়ক ও পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহীর দায়িত্বে থাকার অপরাধে তৎকালীন আওয়ামী সরকার কর্তৃক আমাকে বিটিভি থেকে বেআইনিভাবে চাকরিচ্যুত করা ও পরবর্তীতে আমার পত্রিকার মিডিয়া তালিকাভুক্তি বাতিল করার অমানবিক অত্যাচারের কথা উনাকে জানাই। উনি এক অদ্ভুত প্রশান্তি ও গভীর মনোযোগ নিয়ে আমার প্রতিটি কথা শুনেছিলেন। সেই নির্মমতার কথা তার কাছে ব্যক্ত করেছিলাম। তিনি যে গভীর সহানুভূতি, ধৈর্য এবং সম্মানের সঙ্গে আমার কথা শুনেছিলেন, তা আমার মতো একজন নগণ্য সাংবাদিক,কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকের জন্য ছিল পরম প্রাপ্তি।
আজকের রাজনীতির ট্র্যাজিক সত্য হলো—ক্ষমতার ছোঁয়া পেলেই রাজনীতিবিদের পোশাক, চলন ও অর্থনৈতিক অবস্থান রাতারাতি বদলে যায়। কিন্তু দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে প্রতিমন্ত্রী, এমপি ও একটি অন্যতম শীর্ষ দলের প্রধান মহাসচিবের দায়িত্ব সামলানোর পরও মির্জা ফখরুল নিজেকে সেই বিষাক্ত ভোগবাদ থেকে পুরোপুরি মুক্ত রাখতে পেরেছেন।
রাজধানী ঢাকায় তার কোনো নিজস্ব প্লট নেই, কোনো আলিশান ফ্ল্যাট বা বহুতল ভবন নেই। স্থানীয় সরকার মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি যে ব্যক্তিগত গাড়িটিতে চড়তেন, সেটি ছিল সর্বোচ্চ সাত থেকে আট লাখ টাকা মূল্যের সাধারণ একটি পুরোনো টয়োটা এক্স করোল্লা। সাধারণ সাদা ধবধবে পাজামা-পাঞ্জাবি, পায়ে সাধারণ জুতো আর মুখে চেনা মৃদু হাসি—এই সরলতাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় অলংকার। কোনো নির্দিষ্ট সম্পত্তির হিসাব পেতে সরকারি হলফনামাই শেষ কথা, কিন্তু কোনো ব্যক্তি যদি ক্ষমতা হাতে থাকার পরও নিজেকে বিলাসিতার প্রদর্শনী থেকে দূরে রাখতে পারেন—তবে রাজনীতির ময়দানে তিনি এমনিতেই রূপকথার নায়ক হয়ে ওঠেন।
বিএনপির আন্দোলন ও দীর্ঘ চড়াই-উতরাইয়ের রাজনীতিতে মহাসচিব হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও বর্তমান শীর্ষ নেতৃত্বের রাজনৈতিক রসায়ন ছিল ভীষণ মজবুত। একটি সুবিশাল ও নিপীড়িত বিরোধী দলকে সুসংগঠিত রাখা এবং শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতিটি নির্দেশকে সুচারুভাবে তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া সহজ কাজ ছিল না।
তারেক রহমানকে নিয়ে যখন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নানা বিভ্রান্তিমূলক অপপ্রচার ছড়ানো হতো, তখন আমি একাধিক কলামে বলেছিলাম যে—তারেক রহমান আদতে একটি আদর্শভিত্তিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন এবং তার এই সুদীর্ঘ পথচলায় প্রধান শক্তি হিসেবে পাশে রেখেছেন মির্জা ফখরুলের মতো সম্পূর্ণ সৎ ও পরিচ্ছন্ন ইমেজের মানুষকে। কারণ অসৎ বা বিভ্রান্ত মানসিকতার কোনো নেতৃত্ব কখনো ফখরুল ইসলামের মতো নিঃস্বার্থ ও আদর্শবান সংগঠককে দিনের পর দিন পাশে রাখতে পারতেন না। তাদের মধ্যকার সুদৃঢ় রাজনৈতিক আস্থাই প্রমাণ করে দলটি কত গভীরভাবে নীতিকে ধারণ করতে চেয়েছিল।
অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ ঘনিয়ে এলো, যা বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাস ও গণতান্ত্রিক যাত্রাপথে এক নতুন ও সোনালী মাইলফলক স্থাপন করল। সংসদ সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে দেশের ২৩তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে উৎসবমুখর ও টানটান উত্তেজনার আবহে নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শেষে প্রকাশ্যে ভোট গণনা করা হয়। গণনা প্রক্রিয়া শেষে ফলাফলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও নির্বাচনি কর্তা এএমএম নাসির উদ্দিন। মোট ৩৪৩টি বৈধ ভোটের মধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পেয়েছেন ২৫৫ ভোট, তার প্রতিদ্বন্দ্বী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম পেয়েছেন ৮৮ ভোট।
সংসদ সদস্যদের এই প্রত্যক্ষ সমর্থন ও বিপুল ভোটে বিজয়ের পর বঙ্গভবনের দ্বার আজ তার জন্য উন্মুক্ত হলো। রাষ্ট্রপতি পদটি কোনো নির্দিষ্ট দলের সম্পত্তি নয়; এটি পুরো ১৮ কোটি গণমানুষের সার্বভৌম আস্থার প্রতীক। অতীত রাজনীতির করাল গ্রাসে রাষ্ট্রপতির বাসভবন কিংবা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদ নিয়ে জনমনে নানা বিতর্ক ও হতাশার মেঘ জমেছিল। দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে পুরো দেশকে ধারণ করার মতো ব্যক্তিত্বের অভাব যেখানে দৃশ্যমান ছিল, সেখানে সংসদ সদস্যদের আস্থায় ধন্য হয়ে মির্জা ফখরুলের প্রবেশে বঙ্গভবন আজ সত্যিই ধন্য হলো।
যে মানুষটি নিজের জীবনের বিনিময়ে অটল নীতি আঁকড়ে ধরে রেখেছিলেন, যিনি সাধারণ এক অতিথির সম্মানেও চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে সৌজন্য দেখাতেন—তিনি যখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক অভিভাবক হিসেবে অধিষ্ঠিত হলেন, তখন প্রতিটি সাধারণ নাগরিক সেখানে নিজের সম্মান ও নিরাপত্তার প্রতিফলন দেখতে পাবেন বলেই আমার দৃঢ়হ বিশ্বাস। বঙ্গভবন এখন থেকে কেবল একটি ঐতিহাসিক অট্টালিকা হয়ে থাকবে না; বরং তা রূপ নেবে সততা, শিষ্টাচার, সংবিধান রক্ষা ও নাগরিক অধিকারের এক নবজাত ও ধ্রুব সংকেতে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জীবনপাঠ কেবল বিএনপির একটি একক অধ্যায় নয়; এটি একজন প্রাজ্ঞ অর্থনীতিবিদ, একজন আদর্শ শিক্ষক, একজন নিবেদিতপ্রাণ তৃণমূল প্রতিনিধি এবং রাষ্ট্রচিন্তায় ঋদ্ধ এক আদর্শিকের গল্প। তিনি আমাদের রাজনৈতিক সমাজকে এক অমূল্য শিক্ষা দিয়েছেন—ক্ষমতা মানুষকে ক্ষণিকের জন্য বড় করতে পারে, কিন্তু চিরকালের জন্য বড় করে শুধু তার নিজের অমলিন চরিত্র।
রাজনৈতিক প্রতিপত্তির শীর্ষ চূড়ায় পৌঁছেও কীভাবে নিজেকে হারিয়ে না ফেলে মাটির কাছাকাছি থাকা যায়, তা ফখরুল ইসলামের জীবন না দেখলে অসম্পূর্ণ থেকে যেত। রাজনীতির আসল শক্তি গাড়ির গগনবিদারি সাইরেনে থাকে না, থাকে মানুষের শ্রদ্ধাপূর্ণ ভালোবাসায়। অর্থ বা বিত্তের পাহাড় নয়, মানুষের অকৃত্রিম আস্থাই যে একজন রাজনীতিবিদের প্রকৃত ব্যাংক ব্যালান্স—তা তিনি তার দীর্ঘ বর্ণাঢ্য জীবনে এবং সর্বশেষ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিপুল জনরায়ে বিজয়ী হয়ে প্রতি ছত্রে প্রমাণ করেছেন।
আগামীর বাংলাদেশ যদি একটি নতুন, অহংকারমুক্ত, দায়িত্বশীল ও মানবিক রাজনীতির সোপানে পা রাখতে চায়, তবে মির্জা ফখরুলের এই জীবনগাথাই হবে সবচেয়ে বড় পাথেয়। ইতিহাস যখনই সততা ও সাধারণত্বের চরম শক্তিকে মূল্যায়ন করবে, তখন একবাক্যে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণে আনবে সেই নামটি—যিনি ক্ষমতার তীব্র স্রোতে গা ভাসিয়ে অসাধারণ হওয়ার প্রতিযোগিতায় নামেননি, বরং জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত 'অতি সাধারণ' থাকার চরম ব্যাকুলতা দিয়েই ইতিহাসের পাতায় স্থায়ীভাবে 'অসাধারণ' হয়ে উঠেছেন।

আহসান হাবিব বরুন
লেখক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, দৈনিক আমার দিন।
ই-মেইল: [email protected]
