Logo
Logo
×
   

দৃষ্টিপাত

নজরুল যদি আজকের বাংলাদেশে ‘বিদ্রোহী’ হতেন

Icon

মাহ্ফুজ সরকার

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬, ০৩:০৬ পিএম

নজরুল যদি আজকের বাংলাদেশে ‘বিদ্রোহী’ হতেন

ফাইল ছবি

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম যদি আজকের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে বলতেন—

 “গাহি সাম্যের গান—মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান”,

 অথবা—

 “মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান”,

 কিংবা—

 “বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর,

 অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর”—

 তাহলে তার বর্তমান ভক্তকুলের অনেকেই হয়তো তাকে এত সহজে গ্রহণ করতেন না।

বরং তাকে দেওয়া হতো নানা ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক ট্যাগ। শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই নয়, জাতীয় গণমাধ্যমেও হয়তো কেউ কেউ বলতেন—নজরুল তথাকথিত ‘শত্রু রাষ্ট্রের এজেন্ট’; অসাম্প্রদায়িকতা একটি রাজনৈতিক ফাঁদ; নারী-পুরুষের সমান মর্যাদার ধারণা পশ্চিমা ষড়যন্ত্র; অথবা তিনি অতিরিক্ত ‘সুশীল’।

আজকের বাংলাদেশে ‘সুশীল’ শব্দটিকেও অনেক সময় প্রায় গালিতে পরিণত করা হয়েছে। নম্রতা, সহনশীলতা কিংবা ভিন্নমতকে সম্মান করার মতো মানবিক গুণগুলোকেও সন্দেহের চোখে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। ফলে প্রশ্ন হলো—আমরা যে নজরুলকে ভালোবাসি, আমরা কি সত্যিই তার চিন্তাকে ভালোবাসি, নাকি শুধু তার নামটিকে ভালোবাসি?

নজরুল ছিলেন একসঙ্গে প্রেমের কবি, বিদ্রোহের কবি, সাম্যের কবি এবং সৌন্দর্যের কবি। তিনি শুধু একটি পরিচয়ের মধ্যে নিজেকে বন্দী করেননি। তিনি প্রেমিকার কাছে যেমন নিবেদন রেখেছেন, কল্পনার জগতে যেমন লিখেছেন—

 “শাওনো রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে”,

 তেমনি অন্যদিকে উচ্চারণ করেছেন—

 “বল বীর—

 চির উন্নত মম শির!”

এই বহুমাত্রিকতাই ছিল নজরুলের শক্তি। তিনি প্রেম করেছেন, বিদ্রোহ করেছেন; ধর্মের গান লিখেছেন, আবার ধর্মের নামে বিভেদের বিরুদ্ধেও দাঁড়িয়েছেন; নারীকে সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে দেখেছেন, আবার তার অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নেও কলম ধরেছেন।

কিন্তু সমস্যাটা এখানেই—আজকের বাংলাদেশে আমরা অনেক সময় একজন মানুষকে এত সহজে বহুমাত্রিক হতে দিই না।

আপনি যদি বিদ্রোহ করেন, আমরা আপনাকে বিদ্রোহী হিসেবে গ্রহণ করব—কিন্তু আমাদের বিরুদ্ধে কথা বললে? আপনি যদি নারীকে আন্দোলনে ডাকেন, আমরা তাকে সহযোদ্ধা হিসেবে স্বাগত জানাব—কিন্তু আন্দোলনের পরে তিনি যদি নিজের অধিকার ও অভিজ্ঞতার কথা বলেন, তখন তাকে আর শুনতে চাইব না। কারণ তখন রাজনীতি বদলে যায়, ভোটের হিসাব বদলে যায়, ক্ষমতার সমীকরণ বদলে যায়।

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিগুলোর একটি সম্ভবত এখানেই। আন্দোলনের সময় নারীর অংশগ্রহণকে স্বাগত জানানো হয়, কিন্তু আন্দোলনের পর তার কণ্ঠকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা শুরু হয়। যারা একসময় একই মিছিলে ছিলেন, একই বিপদের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন, তারাই পরে নারীর কথা বলার অধিকারকে ‘অতিরিক্ত’ মনে করতে পারেন।

নজরুল আজ বেঁচে থাকলে হয়তো তিনিও এই সংকটের মুখোমুখি হতেন।

তিনি যখন শ্যামাসংগীত লিখতেন, একদল তাকে নিয়ে প্রশ্ন তুলত। যখন ইসলামী গান বা গজল লিখতেন, অন্য একটি পক্ষ তাকে নিজেদের বলে দাবি করত। আবার তিনি যখন হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যের কথা বলতেন, তখন উভয় পক্ষের চরমপন্থীরাই তার ওপর সন্দেহ করত। তিনি কাউকে সন্তুষ্ট করার জন্য লিখতেন না। তিনি ছিলেন বনের পাখির মতো—যে নিজের স্বরে গান গায়।

সম্ভবত আজকের বাংলাদেশে তার এই স্বাধীন কণ্ঠই সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ত।

আজ যারা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মালিকানা দাবি করেন, তারাই অনেক সময় ঠিক করে দিতে চান—কার মত কীভাবে প্রকাশ করা উচিত। আপনি স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারেন, কিন্তু তাদের মতো করে কথা বলতে হবে। আপনি প্রতিবাদ করতে পারেন, কিন্তু তাদের পছন্দের বিষয় নিয়ে। আপনি নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলতে পারেন, কিন্তু তাদের রাজনৈতিক স্বার্থের বাইরে নয়। আপনি ধর্ম নিয়ে কথা বলতে পারেন, কিন্তু প্রশ্ন করতে পারবেন না। আপনি জাতীয়তাবাদ নিয়ে কথা বলতে পারেন, কিন্তু নির্ধারিত বয়ানের বাইরে যেতে পারবেন না।

এ যেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নয়; বরং নিয়ন্ত্রিত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা।

দার্শনিক হান্না আরেন্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন—রাজনীতি তখনই জীবন্ত থাকে, যখন মানুষ একে অপরের সঙ্গে কথা বলার ক্ষমতা ধরে রাখে। সেই কথোপকথন ভেঙে গেলে গণতন্ত্রও দুর্বল হয়ে পড়ে। নজরুলের সাহিত্য আমাদের ঠিক সেই কথোপকথনের সংস্কৃতিই শেখায়।

তিনি ভিন্নতাকে মুছে ফেলতে চাননি। তিনি ভিন্নতার মধ্যেই সহাবস্থানের পথ খুঁজেছেন।

কিন্তু আজকের বাংলাদেশে ভিন্নতার কথা বলার জায়গা কোথায়?

আমরা সবাই যেন নিজেদের মতো একটি বাংলাদেশ তৈরি করতে চাই। কেউ ধর্মের বাংলাদেশ, কেউ জাতীয়তাবাদের বাংলাদেশ, কেউ রাজনৈতিক দলের বাংলাদেশ, কেউ সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর বাংলাদেশ। কিন্তু নজরুলের বাংলাদেশ ছিল মানুষের বাংলাদেশ।

তিনি পরিচয়ের দেয়াল ভাঙতে চেয়েছিলেন। আজ আমরা আবার নতুন নতুন দেয়াল তুলছি।

সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ সম্ভবত এখানেই—যারা সামাজিক বৈষম্য ও সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণের নানা ধারণা প্রচার করেন, তারাও আজ নজরুলপ্রেমী। নারীর প্রশ্নে, ধর্মের প্রশ্নে, সাম্যের প্রশ্নে যাদের বিরুদ্ধে নজরুল তার সময়ে কলম ধরেছিলেন, তাদের অনেকেই আজ তার স্মরণে ফুল দেন, বক্তৃতা করেন, গান করেন।

কী অদ্ভুত! নজরুলকে আমরা উদযাপন করি, কিন্তু নজরুলের প্রশ্নগুলোকে এড়িয়ে যাই।

আমরা তার জন্মদিন পালন করি, মৃত্যুবার্ষিকী পালন করি, তার ছবি টাঙাই, তার কবিতা আবৃত্তি করি—কিন্তু তার মতো একজন কবি আজ আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে একই কথা বললে, আমরা কি তাকে গ্রহণ করতাম?

এটাই আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্ন।

বর্তমান সময়ের আরেকটি সমস্যা হলো, আমরা বিদ্রোহকে ক্রমশ রাগের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলছি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউকে গালি দেওয়া, অপমান করা, চরিত্রহনন করা কিংবা ঘৃণা ছড়ানোকে অনেক সময় ‘বিদ্রোহী’ বা ‘স্পষ্টভাষী’ হওয়ার লক্ষণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

কিন্তু নজরুলের বিদ্রোহ এমন ছিল না।

তার ভাষা ছিল তীব্র, কিন্তু তাতে নান্দনিকতা ছিল। তার প্রতিবাদে আগুন ছিল, কিন্তু সেই আগুন মানুষকে পুড়িয়ে দেওয়ার জন্য নয়; অন্ধকার সরিয়ে আলোর পথ দেখানোর জন্য।

তিনি বিদ্রোহ করেছেন, কিন্তু সৌন্দর্য হারাননি।

আজ আমাদের এই শিক্ষা খুব প্রয়োজন।

কারণ একটি সমাজ শুধু রাগ দিয়ে বদলায় না। ঘৃণা দিয়ে বিপ্লব হয়তো শুরু করা যায়, কিন্তু মানবিক সমাজ গড়ে তোলা যায় না। সত্যিকারের পরিবর্তনের জন্য দরকার নৈতিকতা, সহানুভূতি, সৌন্দর্যবোধ এবং ভিন্নমতকে সহ্য করার ক্ষমতা।

নজরুলের বিদ্রোহ তাই কেবল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ নয়। এটি মানুষের ভেতরের ভয়, কুসংস্কার, বৈষম্য ও সংকীর্ণতার বিরুদ্ধেও বিদ্রোহ।

এই অদ্ভুত অন্ধকার সময়ে আমাদের তাই নজরুলকে আরও বেশি প্রয়োজন। কেবল সরকারি অনুষ্ঠানের নজরুল নয়। শুধু রাজনৈতিক বক্তৃতায় ব্যবহৃত নজরুলও নয়। আমাদের প্রয়োজন সত্যিকারের নজরুলকে।

সেই নজরুলকে, যিনি যুদ্ধের মঞ্চেও নিজের পরিচয়ে দাঁড়ান। যিনি লড়াইয়ের আগে ও পরে একই সুরে মানবতার কথা বলেন। যিনি ধর্মের গান লিখেও সাম্প্রদায়িক নন। যিনি বিদ্রোহ করেও সৌন্দর্য হারান না। যিনি প্রেম নিয়ে লিখেও দুর্বল নন। যিনি নারীকে ভালোবেসে তার অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নেও আপস করেন না।

আজকের বাংলাদেশে আমরা অনেকেই বিদ্রোহ করতে চাই, কিন্তু মানবিক হতে চাই না। পরিবর্তন চাই, কিন্তু নিজেদের বদলাতে চাই না। স্বাধীনতা চাই, কিন্তু অন্যের স্বাধীনতা মেনে নিতে পারি না। সাম্যের কথা বলি, কিন্তু নিজের সুবিধার জায়গায় বৈষম্যকে অস্বীকার করি।

আজ নজরুলকে স্মরণ করার সবচেয়ে ভালো উপায় হয়তো তার কবিতা আবৃত্তি করা নয়। তার গান গাওয়া নয়। বরং তার মতো করে প্রশ্ন করতে শেখা। নিজের প্রিয় মতের বিরুদ্ধেও প্রশ্ন করা। অন্যের ভিন্নমতকে শত্রু মনে না করা। ধর্ম, নারী, জাতি ও পরিচয়ের সংকীর্ণ দেয়ালের ওপরে মানুষকে দেখতে শেখা।

কারণ নজরুলের সবচেয়ে বড় পরিচয় সম্ভবত এটাই—তিনি ছিলেন মানুষের কবি। আর আজকের বাংলাদেশে, মানুষকে মানুষের মতো করে দেখার এই শিক্ষা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন।

মাহ্ফুজ সরকার: শিক্ষক ও লেখক

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম