বিএসইসি ও বিমা কর্তৃপক্ষ আইন
বিরোধী দলের আপত্তি সত্ত্বেও সংশোধনী বিল পাশ
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিরোধী দলের আপত্তি সত্ত্বেও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (সংশোধন) বিল এবং বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) বিল জাতীয় সংসদে পাশ হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিল দুটি পাশ হয়। সংশোধনী অনুযায়ী, এ দুই সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যান, সদস্য বা কমিশনার নিয়োগে বয়সসীমা তুলে দেওয়া হয়েছে। বিল দুটি পাশ হওয়ার পর সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে বিতর্ক হয়। বিশেষ ব্যক্তিদের নিয়োগের সুযোগ করে দিতে এ দুটি সংস্থার আইনে সংশোধনী আনা হয়েছে বলে অভিযোগ করে বিরোধী দল। এ সময় ‘দলীয় বিবেচনায়’ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে অভিযোগ তুলে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের অপসারণের দাবি তোলা হয়।
বিল দুটি পাশের জন্য আলাদাভাবে সংসদে তোলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। স্বতন্ত্র সংসদ-সদস্য রুমিন ফারহানা ছাড়া অন্য কেউ বিল দুটির জনমত যাচাই-বাছাই কমিটিতে প্রেরণের প্রস্তাব দেননি। ফলে রুমিন ফারহানা ছাড়া কোনো সদস্য বিলের ওপর আলোচনার সুযোগ পাননি। কিন্তু বিরোধী দলের একাধিক সদস্য বিলের ওপর আলোচনার জন্য হাত তোলেন। আলোচনায় রুমিন ফারহানা বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম একটি স্তম্ভ বা পিলার হচ্ছে বিমা খাত। যদি নির্মোহভাবে আমরা আলোচনা করি তাহলে বিমা খাতের অবস্থা বলতে হয় খুব বেশি ভালো নয়।
জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, তিনি সম্পূর্ণভাবে একমত বাংলাদেশে বিমা শিল্প খুবই কঠিন অবস্থা পার করছে। অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি এবং সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় অনেক ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির জন্ম হয়েছে। যারা আইনকানুনের তোয়াক্কা করে না।
এ পর্যায়ে বিরোধী দলের একাধিক সদস্য কথা বলার সুযোগ চান। স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, এ পর্যায়ে কথা বলার সুযোগ নেই। তবে তিনি বিরোধী দলের নেতা ডা. শফিকুর রহমানকে সুযোগ দেন। বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, আসলে বেশির ভাগ সদস্য আমরা এখানে নতুন এসেছি। আমরা বিধি আস্তে আস্তে রপ্ত করছি। তিনি বলেন, এই বিলটা কোনো সময়সীমার মধ্যে বন্দি নয়। সময়ের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এখানে বিধিটা মানাই তো উচিত ছিল। আমরা তো তিন দিন আগে, এক দিন আগেও মেটেরিয়ালস পেলাম না। জাস্ট এখন ডেস্কে এসে পেয়েছি। আমি অনুরোধ করব আমাদের কথা বলার এই অধিকার খর্ব করবেন না। বিল দুটোই স্থগিত করে আমাদের এ অধিকার আপনার মাধ্যমে সংরক্ষণ হোক।
তখন স্পিকার বলেন, বিধি অনুযায়ী গতকাল বিলের রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে। সময় মার্জনার এখতিয়ার স্পিকারের আছে। তখন স্পিকার বিলটি পাশের প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যান। বিলটি পাশ হয়।
তবে বিল দুটি পাশ হওয়ার পর পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে এনসিপির সংসদ-সদস্য আখতার হোসেন বয়স বাড়ানোর প্রসঙ্গ টেনে উদ্বেগ জানান। তিনি বলেন, সরকারি দল সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় তারা চাইলে আইন পাশ করতে পারে। তবে যে দুটি বিল পাশ হলো, তার বিষয়বস্তু নিয়ে যথেষ্ট ব্যাখ্যা হয়নি। আইনে দুটির ক্ষেত্রে বয়সের যে বাধ্যবাধকতা ছিল, সেই বাধ্যবাধকতাগুলো উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে।
বিল পাশের সময় অর্থমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে আখতার হোসেন বলেন, সরকার বলছে যোগ্য ও দক্ষ লোক আনার জন্য বয়সসীমা তোলা হচ্ছে। তবে প্রশ্ন হলো, এটি কোনো নীতির ভিত্তিতে হচ্ছে, নাকি নির্দিষ্ট কাউকে সামনে রেখে করা হচ্ছে। তিনি বলেন, যেভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকে একটা নিয়োগ হয়েছে, সেভাবে যদি কোনো বিশেষ ব্যক্তিদের মাথায় রেখে বয়সের বাধ্যবাধকতা উঠিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে এখানে দক্ষ ও যোগ্য লোকের যে কথা বলা হচ্ছে সেই জায়গাটাতে বৈপরীত্য তৈরি করবে।
জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিল দুটি কেন আনা হয়েছে, তা তিনি আগেই পরিষ্কার করেছেন। ১৯৯৩ সালে আইনটি করার সময়ে গড় বয়স ও কর্মক্ষমতার বাস্তবতা ভিন্ন ছিল। আপনার এই বিলটা যখন ৯৩-তে হলো, সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের তখন গড় বয়স ছিল ৫৭ বছর... এখন গড় বয়স হচ্ছে ৭২ বছর। আপনি কি এই লোকগুলোকে কর্মকাণ্ডের বাইরে রাখতে চান? বিশ্বের প্রায় প্রত্যেকটি দেশে যেখানে সাকসেসফুলি সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন অপারেট করছে, তাদের এখানে কোনো বয়সসীমা নেই। তারা সফলভাবে এগুলো পরিচালনা করছে।
এরপর বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, এখানে বিরোধী দলের অধিকার খর্ব হয়েছে। সরকারের সাম্প্রতিক বিভিন্ন পদক্ষেপ জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি প্রশ্ন তোলেন, যোগ্যতার নামে বাছাই এভাবেই চললে দেশ কীভাবে এগোবে।
জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিল পাশ হওয়ার পর এ ধরনের আলোচনা কার্যপ্রণালির বিধির বাইরে, তবু প্রশ্ন ওঠায় তিনি উত্তর দিচ্ছেন। তিনি দাবি করেন, বিএনপি সরকারগুলোর সময় বাংলাদেশ ব্যাংক ও সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে সব নিয়োগই ছিল ‘নন পলিটিক্যাল অ্যাপয়েন্টমেন্ট’। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, আর্থিক সেক্টরে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে নিয়োগ দেওয়া হবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের অপসারণ দাবি : আলোচনার একপর্যায়ে বিরোধী দলের উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এমন সিদ্ধান্ত (রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ না দেওয়ার) থাকলে তারা সেটিকে স্বাগত জানান। তবে বর্তমান বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরের রাজনৈতিক পরিচয় আছে বলে তার জানা আছে এবং এ নিয়ে তৈরি হওয়া তথ্যগত বিভ্রান্তি দূর হওয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, গভর্নর বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ছিলেন বলে যদি সত্যি হয়, তাহলে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত নীতির আলোকে তার জায়গায় নতুন গভর্নর নিয়োগ দেওয়া উচিত। স্পিকার তখন অর্থমন্ত্রীকে প্রশ্ন করেন, নির্বাচন পরিচালনা কমিটিতে থাকলে সেটি দলীয় পরিচয় কি না। জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, দলকে সমর্থন করা মানে দলের লোক না। বাংলাদেশে নির্বাচনি কার্যক্রম বড় পরিসরের কাজ, সেখানে সমর্থক অনেকেই অংশ নেন, কিন্তু তাতে তারা দলীয় সদস্য হয়ে যান না।
সংশোধনী যা আছে : বিল দুটি পাশের মাধ্যমে বিএসইসি চেয়ারম্যান ও কমিশনার পদে এবং বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও সদস্য পদে সর্বোচ্চ বয়স সীমা তুলে দেওয়া হয়েছে। এতদিন আইনে ছিল, কোনো ব্যক্তির বয়স ৬৫ বছর পূর্ণ হলে তিনি বিএসইসির চেয়ারম্যান বা কমিশনার পদে নিযুক্ত হওয়ার উপযুক্ত বিবেচিত হন না বা পদে বহাল থাকতে পারেন না। বিলে এই বিধানটি বাদ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ আইনে বলা ছিল, কোনো ব্যক্তির ৬৭ বছর পূর্ণ হলে তিনি বিমা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বা সদস্য হতে পারবেন না। সংসদে পাশ হওয়া বিলে বিধানটি বাদ দেওয়া হয়েছে।
