ক্ষমতায় থাকতে নতুন কৌশলে সৌদি যুবরাজ?

প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০১৮, ১৮:২২ | অনলাইন সংস্করণ

  পলাশ মাহমুদ

সাংবাদিক জামাল খাশোগি ইস্তাম্বুরে সৌদি দূতাবাসে গিয়েছিলেন ২ অক্টোবর। দূতাবাস থেকে তিনি আর ফিরে আসেননি। দূতাবাসের মধ্যেই তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে তুর্কি কর্তৃপক্ষ দাবি করলেও প্রথম দিকে বেমালুম অস্বীকার করে সৌদি কর্তৃপক্ষ।

জামাল খাশোগি সৌদি আরবের বর্তমান বাদশা সালমান ও যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের কঠোর সমালোচক। তিনি বছর খানেক আগেও সৌদি বাদশাহর একজন গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা ছিলেন। কিন্তু বর্তমান যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে যুবরাজ হিসেবে মনোনিত করার পর থেকেই জামাল খাশোগির সঙ্গে তুরত্ব তৈরি হয়। তবে রাজপরিবারের অনেক সদস্য রয়েছেন যাদের সঙ্গে জামাল খাশোগির সম্পর্ক রয়েছে।

কিন্তু মোহাম্মদ বিন সালমান যুবরাজের দায়িত্ব নেয়ার পর তিনি দেশটিতে একক ক্ষমতার অধিকারী হন এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারেন রাজপরিবারের এমন সব সদস্যকে নির্মূলের অভিযান শুরু করেন।

দূর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযানের নামে তিনি রাজপরিবারের অনেক প্রভাবশালী সদস্য, ব্যবসায়ী, সেনা কর্মকর্তা থেকে শুরু করে মানবাধিকার কর্মী ও ধর্মীয় নেতাদের পর্যন্ত গ্রেফতার ও নির্যাতনের পথ বেছে নেন। সালমানের এসব পদক্ষেপ তার ভবিষ্যত ক্ষমতা সুসংহত করার জন্যই বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

যুবরাজের এসব পদক্ষেপে পশ্চিমা বিশ্ব সমর্থন করতে থাকে; বলা যায় তাকে রীতিমতো উৎসাহিত করতে থাকে। পশ্চিমা বিশ্ব বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দের মানুষ মোহাম্মদ বিন সালমান। পশ্চিমাদের সার্বিক সমর্থনে যুবরাজ নিজেকে প্রবল ক্ষমতাশালী করে তুলেছেন।

কিন্তু হঠাৎ করে একটি ঝড় এসে তার ক্ষমতার বাগানে আঘাত হানবে তা বোধ হয় বুঝতেই পারেননি। সাংবাদিক জামাল খাশোগিকে হত্যা ও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ যুবরাজকে জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে নিপতিত করেছে।

জামাল খাশোগি হত্যার ঘটনায় এ পর্যন্ত যেসব তথ্য প্রকাশিত হয়েছে তাতে প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, যুবরাজ নিজেই এ হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা জানতেন এবং তার সম্মতি বা নির্দেশেই এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে।

প্রথম দিকে জামাল খাশোগিকে হত্যার ঘটনা সৌদি কর্তৃপক্ষ বেমালুম অস্বীকার করলেও শেষ পর্যন্ত তারা ঘটনার স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে যুবরাজ নিজের চেয়ার বাঁচাতে সুচতুরভাবে দীর্ঘ দিনের ঘনিষ্ঠ সেনাকর্মকর্তার ওপর দায় চাপিয়েছেন।

খাশোগি নিখোঁজ হওয়ার ১৭ দিন পরে যুবরাজ এক ছেলেমানুষি গল্প বানিয়ে বিশ্ববাসীর কাছে উপস্থাপন করেছে। তবে তার এই গল্প বিশ্ব জনমতের কাছে রীতিমতো হাসির খোরাক হয়েছে। 

সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, সাংবাদিক জামাল খাশোগিকে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটের মধ্যেই হত্যা করা হয়েছে। তবে তার হত্যার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়নি; বরং কনস্যুলেটে দেখা করতে যাওয়া কয়েকজনের সঙ্গে খাশোগির হাতাহাতি হয় বলে দাবি করে দেশটির প্রধান কৌঁসুলি।

কিন্তু সৌদি আরব এই ১৭ দিন বসে আমেরিকার ট্রাম্প সরকারের সঙ্গে পরিকল্পনা করে এটা এমনই এক ঠুকনো যুক্তি দাঁড় করল যা বিশ্বের কাছে কোনো গ্রহণযোগ্যতা তো পায়নি বরং সারা বিশ্বের কাছে হাসির পাত্রে পরিণত হয়েছে।

আর সৌদি আরবের কাছে এই হাস্যকর যুক্তি উপস্থাপন করা ছাড়া তেমন কিছুই করার ছিল বলে মনে হয় না। কারণ জামাল খাশোগির হত্যাকাণ্ড স্বীকার করা ছাড়া দ্বিতীয় কোনো পথ তাদের হাতে খোলা নেই।

কিন্তু এই হত্যাকাণ্ড যুবরাজের নির্দেশে বা অনুমোতিতে হয়েছে বা তা স্বীকার করার কোনো উপায় দেশটির হাতে নেই। কারণ এটি স্বীকার করা মানে যুবরাজকে একজন খুনি হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়া। এমন স্বীকৃতির পর প্রথম পদক্ষেপই হচ্ছে যুবরাজ নিজের চেয়ার থেকে সরানো।

তাই যুবরাজের চেয়ার বাঁচাতে হত্যাকাণ্ডের দায়ভার অন্যের ঘাঁড়ে চাপানো ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে হয়তো যাদের ওপর দায় চাপানো হয়েছে তারা নিজেরাও ঘটনার দায় পুরোটাই নিজেদের ঘাঁড়ে দিতে প্রস্তুত। কারণ যুবরাজের তারা অত্যান্ত ঘনিষ্ঠ এবং তারা এটা নিশ্চিত করেই জানে যে, শেষ পর্যন্ত তারা মুক্তি পাবে।

তাই হত্যাকাণ্ড নিয়ে সৌদি আরব ১৭ দিন ধরে যে গল্প লিখেছে তা যুবরাজকে ক্ষমতায় রাখতে একটি কৌশল ছাড়া আর কিছুই নয়।

তবে তুরস্ক যে তদন্ত কার্যক্রম চালাচ্ছে তার ফলাফল প্রকাশিত হবার পর হয়তো বিশ্ববাসী প্রকৃত ঘটনা জানতে পারবে। 
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলুও তদন্তের ফলাফল সারা বিশ্বের সামনে তুলে ধরা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন। প্রকৃত ঘটনা জানতে সে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।