Logo
Logo
×

আন্তর্জাতিক

আল জাজিরার বিশ্লেষণ

কয়েক দশকেও বেলুচিস্তানে শান্তি না ফেরার কারণ কী

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০১:৩১ পিএম

কয়েক দশকেও বেলুচিস্তানে শান্তি না ফেরার কারণ কী

দশকের পর দশক ধরে অশান্ত পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশ। ছবি: সংগৃহীত

পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত খনিজ সমৃদ্ধ প্রদেশ বেলুচিস্তান দেশটির বৃহত্তম ভূখণ্ড যা মোট আয়তনের ৪৪ শতাংশ। অথচ এটিই সবচেয়ে দরিদ্র ও দীর্ঘকাল ধরে চলা গৃহযুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু। 

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর থেকেই বেলুচিস্তানের সাথে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সম্পর্ক অম্লমধুর। ১৯৪৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানের অংশ হওয়ার পর থেকেই সেখানে বিদ্রোহের শুরু। যদিও কয়েক দশকে এই সংঘাতের মাত্রা ওঠা-নামা করেছে, তবে সম্প্রতি এর তীব্রতা নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। 

গত ৩১ জানুয়ারি বেলুচিস্তানের এক ডজন শহরে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর সমন্বিত হামলায় ৩০ জন বেসামরিক নাগরিক এবং ১৮ জন নিরাপত্তা কর্মী নিহত হন। এর জবাবে সামরিক অভিযানে ১৫০ জনেরও বেশি সশস্ত্র বিদ্রোহী নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকটের মূলে রয়েছে ব্রিটিশ শাসনামলের শেষ দিকে বেলুচিস্তানের অনিশ্চিত রাজনৈতিক ভূগোল। ১৯৪৮ সালে কালাতের খানের পাকিস্তানের সাথে অন্তর্ভুক্তির চুক্তিটি অনেক বেলুচ জাতীয়তাবাদী ‘জোরপূর্বক’ বলে মনে করেন, যা ভবিষ্যতের সশস্ত্র প্রতিরোধের ভিত্তি গড়ে দেয়। 

এরপর ১৯৫৮ সালে ‘ওয়ান ইউনিট’ স্কিমের মাধ্যমে প্রাদেশিক পরিচয় বিলুপ্ত করার প্রতিবাদে দ্বিতীয়বার এবং ১৯৭০-এর দশকে নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকার বরখাস্তের জেরে তৃতীয় ও সবচেয়ে বড় বিদ্রোহ শুরু হয়। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত চলা সেই যুদ্ধে প্রায় ৮০ হাজার পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল এবং হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল।

বর্তমান বিদ্রোহের পঞ্চম পর্যায়টি শুরু হয় ২০০০-এর দশকের শুরুতে। ২০০৬ সালে জনপ্রিয় উপজাতীয় নেতা নবাব আকবর বুগতির এক সামরিক অভিযানে মৃত্যু বেলুচ ক্ষোভকে বারুদ থেকে বিস্ফোরণে রূপান্তর করে। বর্তমানে এই আন্দোলনে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত তরুণ ও নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ দেখা যাচ্ছে। 

আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেন যে রাষ্ট্র তাদের গ্যাস ও খনিজ সম্পদ লুণ্ঠন করছে কিন্তু স্থানীয়দের ভাগ্যের উন্নয়ন হচ্ছে না। অন্যদিকে, হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিভিন্ন সংস্থা অভিযোগ করে আসছে যে নিরাপত্তা বাহিনী হাজার হাজার বেলুচকে ‘গুম’ করে ফেলেছে, যাদের অনেকেরই পরে নির্যাতিত মরদেহ পাওয়া গেছে। যদিও সরকার এই গুমের দায় অস্বীকার করে বলে, তারা মূলত সশস্ত্র বিদ্রোহে যোগ দিয়ে পাহাড়ে বা সীমান্তে আশ্রয় নিয়েছে।

বর্তমানে ৬২ বিলিয়ন ডলারের চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর এবং গোয়াদর বন্দর বেলুচিস্তানকে ভূ-রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। বিএলএ-এর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এখন চীনা নাগরিকদেরও লক্ষ্যবস্তু করছে। সরকার এই অস্থিরতার পেছনে ভারতের মদদ রয়েছে বলে দাবি করে, যার প্রমাণ হিসেবে তারা ২০১৬ সালে আটক কুলভূষণ যাদবের নাম উল্লেখ করে। 

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কেবল সামরিক শক্তি বা অন্য দেশের ওপর দায় চাপিয়ে শান্তি আসবে না। বেলুচিস্তানের বন্ধুর ভূখণ্ড এবং জনবিচ্ছিন্ন পাহাড়ি এলাকা বিদ্রোহীদের জন্য সুবিধাজনক। তাই রাষ্ট্রীয় ভয় বা বলপ্রয়োগের বদলে রাজনৈতিক সংলাপ, নিখোঁজ ব্যক্তিদের মুক্তি এবং সম্পদের সুষম বণ্টনই দীর্ঘস্থায়ী শান্তির একমাত্র পথ হতে পারে।


Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম