রয়টার্স এক্সক্লুসিভ
নতুন করে মার্কিন হামলা হলে উপসাগরীয় দেশগুলোতে পালটা হামলা করবে ইরান
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৬, ১০:৫৫ এএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে ইরানে হামলা চালালে উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোতে পালটা হামলা চালানো হবে বলে সতর্ক করেছে তেহরান। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত পাঁচটি সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে রয়টার্স।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৮ জুলাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের জ্বালানি খাত ও অবকাঠামোয় হামলার হুমকি দেওয়ার পর উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে এই বার্তা উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে পৌঁছে দেয় ইরান।
দুটি ইরানি সূত্র, দুটি উপসাগরীয় সূত্র এবং এক জ্যেষ্ঠ আঞ্চলিক কূটনীতিক জানিয়েছেন, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সৌদি আরব, কাতার ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের পাশাপাশি পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের সঙ্গেও কথা বলেছেন।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আরাঘচি উপসাগরীয় দেশগুলোকে ট্রাম্পের ওপর প্রভাব খাটিয়ে নতুন হামলা থেকে বিরত রাখার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালালে উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনা এবং জ্বালানি অবকাঠামো ইরানের পালটা হামলার লক্ষ্যবস্তু হবে।
এক জ্যেষ্ঠ আঞ্চলিক কূটনীতিক বলেন, প্রতিটি আলোচনায় আরাঘচির বার্তা ছিল একই—ইরান প্রতিশোধ নিতে প্রস্তুত, তবে কূটনৈতিক সমাধানই বৃহত্তর সংঘাত ও ধ্বংস এড়ানোর সর্বোত্তম উপায়।
এক উপসাগরীয় সূত্রের ভাষ্য, ইরানের বার্তা ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের অবকাঠামোতে হামলা করে, তাহলে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে পালটা আঘাত হানবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের হুঁশিয়ারির মাধ্যমে ইরান আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে, যাতে তারা ওয়াশিংটনকে নতুন সামরিক অভিযান থেকে বিরত রাখে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এরপর সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলে সামরিক পদক্ষেপ স্থগিত রাখা, যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা এবং আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানান।
আরেক উপসাগরীয় সূত্র জানিয়েছে, ইরানের সতর্কবার্তা মূলত সব উপসাগরীয় দেশের জন্য হলেও এটি প্রধানত সৌদি আরব ও কাতারের মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরবসহ কয়েকটি উপসাগরীয় দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করেছে তেহরান।
এদিকে কাতার, ওমান ও সৌদি আরবও ওয়াশিংটনকে ইরানের সঙ্গে আলোচনা পুনরায় শুরু করার আহ্বান জানিয়েছে। এক ইরানি কর্মকর্তা বলেছেন, নতুন করে মার্কিন হামলা হলে পুরো অঞ্চল ‘আগুনের গোলকে’ পরিণত হতে পারে বলে ইরান সতর্ক করেছে।
গত ২ আগস্ট ট্রাম্প জানান, দ্রুত সমঝোতা সম্ভব হলে তিনি ইরানে হামলার পরিকল্পনা বাতিল করতে সম্মত হয়েছেন।
অন্যদিকে সৌদি আরব কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিলেও নিজেদের নিরাপত্তার প্রশ্নে কঠোর বার্তা দিয়েছে। একটি উপসাগরীয় সূত্র জানিয়েছে, সৌদি ভূখণ্ডে কোনো হামলা হলে তার জবাব সামরিকভাবেই দেওয়া হবে।
সৌদি রাজপরিবারঘনিষ্ঠ বিশ্লেষক আলী শিহাবি বলেন, রিয়াদের মূল্যায়ন হলো, আরও সামরিক উত্তেজনা কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না। তার মতে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের ওপর চাপ বজায় রাখার পাশাপাশি সীমিত ও পরিমিত সামরিক প্রতিক্রিয়া কূটনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি করতে পারে।
এক ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তেহরানের বার্তায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে—নতুন করে হামলা হলে শুধু জ্বালানি স্থাপনা নয়, শোধনাগার, বিদ্যুৎকেন্দ্র, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, পরিবহণ নেটওয়ার্ক এবং তেলক্ষেত্রও লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘শত্রুরা ইরানের অবকাঠামোকে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। ইরান ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার চেয়ে বড় ক্ষতি ফিরিয়ে দেবে।’
তিনি ২০১৯ সালে সৌদি আরবের আরামকোর আবকাইক ও খুরাইস স্থাপনায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন। ওই হামলায় দেশটির তেল উৎপাদনের অর্ধেকের বেশি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং উপসাগরীয় জ্বালানি অবকাঠামোর ঝুঁকি সামনে আসে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, তেহরানের দৃষ্টিতে এখন ট্রাম্পের সামনে দুটি কঠিন পথ খোলা রয়েছে। একদিকে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত করে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ঝুঁকিতে ফেলা, অন্যদিকে এমন একটি সমঝোতায় পৌঁছানো, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশিত পূর্ণ বিজয় নিশ্চিত করবে না।
এক জ্যেষ্ঠ আঞ্চলিক কূটনীতিকের মতে, সমঝোতার পথে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো—ওয়াশিংটন এমন একটি ফলাফল চায়, যা তারা যুদ্ধজয়ের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরতে পারে।
