তুরস্কের স্থানীয় নির্বাচন

নানা সমীকরণে চাপের মুখে এরদোগান

প্রকাশ : ০১ ডিসেম্বর ২০১৮, ২১:৫৩ | অনলাইন সংস্করণ

  সারওয়ার আলম

প্রেসিডেন্ট এরদোগান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইলদিরিম
ক্ষমতাসীন দল গত জুন মাসের সংসদীয় এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মাত্র পাঁচ মাসের মাথায়ই তুরস্কে নতুন করে বইতে শুরু করছে নির্বাচনী হাওয়া। 
 
আগামী বছর মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত হবে স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ) নির্বাচন। এ নিয়ে ইতিমধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়ে গেছে। চলছে নির্বাচনী ঐক্য প্রক্রিয়া। 
 
এ বছর জুনের নির্বাচনে রেকর্ড সংখ্যক শতকরা ৫২ ভাগ ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন ক্ষমতাসীন ন্যায়বিচার ও উন্নয়ন দল (আক পার্টি) প্রধান রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোগান। তখন সংসদীয় নির্বাচনে এরদোগানের দল শতকরা ৪২ ভাগ ভোট পেয়ে সংসদে সবচেয়ে বেশি আসন পেলেও ১৫ বছর ধরে যে একক সংখাগরিষ্ঠতা ছিল তা হাতছাড়া করে। ওই নির্বাচনেই স্পষ্ট হয়েছিল যে এরদোগানের সমর্থন বাড়লেও তার দলের প্রতি মানুষের সমর্থন কমছে।

 

 
নির্বাচনের পর বিতর্কিতরা বাদ

 

 
নির্বাচনের পরে তিনি তার দলবিমুখ ভোটারদের আবার দলের দিকে টানতে অনেক পদক্ষেপ নেন। বিতর্কিত মেয়রদেরকে সরিয়ে দেন, অনেককে জোর করে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন। সরকারের বিতর্কিত কিছু প্রকল্প থেকে সরে এসে পরিবেশবান্ধব অনেক কাজে হাত দেন। তখন সমর্থন কিছুটা বাড়ছিল বৈকি। কিন্তু বাদসাধে আগস্টের মুদ্রার দরপতন যা দেশটিকে দাঁড় করে দিয়েছিল কঠিন এক অর্থনৈতিক সমস্যার মুখোমুখি।

স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে এরদোগানের নানা সমীকরণ

 
এরদোগানের গত ১৬ বছরের শাসনামলে এবারই সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সমস্যার মুখে পড়ে দেশ। তবে এই সঙ্কট যতটা দীর্ঘায়িত আর যতটা খারাপ হবে বলে সবাই ধারণা করছিল তার চেয়ে দ্রুত কাটিয়ে উঠছে। কিন্তু এই মুদ্রার দরপতন তুরস্কের অর্থনীতিকে যে ধাক্কা দিয়েছে তার প্রভাব হয়তো আরও ২-৩ বছর চলবে। কিছু কিছু দ্রব্যমূলের দাম ইতিমধ্যে বেড়ে প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি চলে এসেছে। 

 

 
আগামী বছরের শুরুতে হয়তো আরও বাড়বে। এরদোগানের সাম্প্রতিক বিবৃতি আর রাজনৈতিক পদক্ষেপই স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, স্থানীয় নির্বাচনের আগে তার ক্ষমতাসীন দল ভীষণ চাপের মধ্যে আছে। এবং তিনি নির্বাচনে জয়লাভের জন্য আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কিছু কিছু এলাকায় জোটবদ্ধ হয়ে লড়বেন।
 

 

কট্টর জাতীয়তাবাদী পার্টি এমএইচপির সঙ্গে এরদোগানের আক পার্টির ঐক্যের বিষয়টা অক্টোবরের শেষ দিকে জনসম্মুখে চলে আসে। তখন কিন্তু এরদোগান ঐক্যের বিষয়টিকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেন। 

 

 
২৩ অক্টোবর এক বক্তৃতায় তিনি এমএইচপি লিডার ডেভলেত বাহচেলির প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘যে যার পথে চলবে। আমরা স্থানীয় ক্ষমতাসীন দল হিসেবে সব আসনে নিজেদের প্রার্থী নিয়েই নির্বাচন করব। কোনো ঐক্যে যাব না।’

 

এই বক্তব্যের পরে দলের মধ্যে অনেক জল্পনা-কল্পনা চলছিল আগামী নির্বাচন নিয়ে। এই মাসের শুরুর দিকে তফসিল ঘোষণার পর মনোনয়ন ফরম বিক্রি শুরু হয়, কিন্তু আশানুরূপ সাড়া না পাওয়ায় মনোনয়ন ফরম জমা দেয়ার তারিখ এক সপ্তাহ বাড়িয়ে দেয়া হয়। তারপরও তুরস্কের সর্ববৃহৎ দলটি যোগ্য প্রার্থী খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছে।

 

 

আর তার এই বক্তব্যের পর প্রধান বিরোধী দল ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী সিএইচপি সংসদের আসন সংখ্যার দিক থেকে তৃতীয় ও পঞ্চম দলগুলোকে নিয়ে ঐক্যের প্রক্রিয়া প্রায় সম্পন্ন করে ফেলেছে। 

 
ভোটার সমীকরণ এখন এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ক্ষমতাসীন পার্টির দুর্গ বলে পরিচিত ইস্তাম্বুল, আঙ্কারা এবং কোনিয়া সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদগুলো হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। তাইতো এরদোগান গত সপ্তাহে ঘটা করেই ঘোষণা দিলেন যে, তিনি এমএইচপি পার্টির লিডারের সঙ্গে ঐক্যের ব্যাপারে আলোচনায় বসবেন।
 
আলোচনায় উভয় দল বড় শহরগুলোর মেয়রের নির্বাচনের ক্ষেত্রে একে অপরকে সমর্থন দেবে এবং এক দল মেয়র প্রার্থী দিলে অন্য দল সেই শহরে প্রার্থী না দিয়ে বরং ওই প্রাথীকে সমর্থন দেবে বলে একমত পোষণ করে।
 
এমএইচপি ইস্তাম্বুল, আঙ্কারা এবং ইজমির শহরে কোনো মেয়র প্রার্থী দেবে না বরং আক পার্টির প্রার্থীকে সমর্থন দেবে।
 
এরদোগান গত কয়েক দিন ধরে তার দলের প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেন। কিন্তু এখনো পর্যন্ত ইস্তাম্বুলের জন্য কোনো প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেননি।
 

 

ইস্তাম্বুলের মেয়র হবেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী!
 

 

যতটুকু জানা গেছে, তাতে স্পষ্টই ধারণা করা যায় তিনি ইস্তাম্বুলের মেয়র প্রার্থী হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বর্তমান পার্লামেন্ট স্পিকার বিনালি ইলদিরিমকে মনোনয়ন দেবেন।
 
অন্য বড় শহরগুলোতেও এ ধরনের হেভিওয়েট প্রার্থী না দিলে তার দল স্মরণকালের ভয়াবহ ভরাডুবির মুখোমুখি হতে পারে। ইতিমধ্যে ক্ষমতাসীন দল রাজধানী শহর আঙ্কারার মেয়র প্রাথী হিসেবে সাবেক নগরায়ণমন্ত্রী মেহমেত ওজহাসেকি আর বিরোধী দলের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত দক্ষিণপূর্বাঞ্চলীয় ইজমির শহরে সাবেক অর্থমন্ত্রী নিহত জেইবেকচির নাম ঘোষণা করেছে।
 

 

কী করবেন এরদোগান?

 

 
এরদোগান অনেক তুখোড় রাজনীতিবিদ। তিনি জানেন, রাজনীতি কীভাবে করতে হয়। জনগণকে কীভাবে নিজের দিকে টানতে হয়। ভোটে কীভাবে জিততে হয়। তাই তিনি সব নির্বাচনের আগেই অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং সমীক্ষা চালান আর সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেন।

 

 

প্রার্থী নির্বাচন, নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়ন, নির্বাচনী স্লোগান এবং নির্বাচনী গানসহ সবকিছু নিয়ে এমনভাবে ভোট নামেন যেন নির্বাচনের আগেই তার সমর্থকদের মধ্যে একটা পজিটিভ আমেজ তৈরি করেন।

আর বিরোধীদের মধ্যে হারার ভয় তৈরি করেন। তিনি এতই বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ এবং দক্ষ রাষ্ট্র পরিচালক যে গত ১৬ বছরে ১৪ বার নির্বাচন করে প্রতিবারই দলকে বিজয়ী করেছেন। তবে জনগণের ভোটে তুরস্কের বর্তমান এই অর্থনৈতিক সমস্যার কতটা প্রতিফলন হয় তা দেখতে মার্চ মাসের ৩১ তারিখ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।