সুপারবাগের মহামারিতে বিপর্যয় নামছে ফিলিস্তিনে

  যুগান্তর ডেস্ক ০১ জানুয়ারি ২০১৯, ১১:১৬ | অনলাইন সংস্করণ

সুপারবাগের মহামারিতে বিপর্যয় নামছে ফিলিস্তিনে
গাজার একটি হাসপাতালের চিত্র। দখলদার ইসরাইলের অবরোধের কারণে যেখানে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বিপর্যয় নেমেছে। ছবি: গার্ডিয়ান

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা ও পশ্চিম তীরের চিকিৎসকরা বলছেন, তারা এক ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী সুপারবাগের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। এতে সংঘাত কবলিত এ অঞ্চলটিতে সমস্যা দিনে দিনে বাড়ছে। এমনকি এই সুপারবাগ ফিলিস্তিনের সীমান্ত পেরিয়ে বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

সুপারবাগ হচ্ছে এমন এক ধরনের ব্যাকটেরিয়াজটিত অসুস্থতা, যা অ্যান্টিবায়োটিকেও রোধ করতে পারে না।

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ব্যুরো জানায়, সুপারবাগের জন্য গাজাকে বলা হয় সবচেয়ে উর্বর ভূমি। বছরের পর বছর ধরে অবরুদ্ধ থাকায় উপত্যকাটির স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বিপর্যয় নেমে এসেছে। এছাড়াও সেখানে অ্যান্টিবায়োটিকের সরবরাহও একেবারে কম।

পূর্ব জেরুজালেমের অগাস্তা ভিক্টোরিয়া হাসপাতালের রোগ সংক্রমণ বিষয়ক সেবিকা দিনা নাসের বলেন, এটা পুরোপুরি বিশ্ব স্বাস্থ্য নিরাপত্তার বিষয়। কারণ বহু ওষুধ-প্রতিরোধী জীবাণু কোনো সীমান্ত বোঝে না। সীমান্ত ছাড়িয়েও তা বহুদূর ছড়িয়ে পড়তে পারে।

দিনা নাসের গাজা উপত্যকায়ও কাজ করেছেন। তিনি বলেন, বিশ্ব সম্প্রদায়ের উচিত বিষয়টিতে নজর দেয়া। যদি তারা গাজার রাজনীতিতে আগ্রহী নাও হন, তবুও তাদের উচিত এ বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে কাজ করা।

গাজার চিকিৎসকরা বলছেন, যদিও তারা এই ওষুধ প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার বিস্তার কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, তা জানেন, তবুও সেখানে অনবরত অ্যান্টিবায়োটিকের ঘাটতি বলে দিচ্ছে, সবসময় তারা ব্যাকটেরিয়া নিয়ন্ত্রণের নিয়ম অনুসরণ করতে পারেন না।

পানি সংকটে চিকিৎসকদের হাত ধোয়ার সুযোগ সব সময় থাকে না। এছাড়া দস্তানা, গাউনস ও ক্লোরিন ট্যাবলেটের ঘাটতি রয়েছে। অথচ এসব তাদের জীবাণুমুক্ত থাকতে সাহায্য করে।

অধিকাংশ সময় রোগীরা অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স শেষ করতে পারেন না। কখনো কখনো সঠিক ওষুধটির অভাব থাকায় তাদেরকে মিশ্র ব্যবস্থাপত্রের পরামর্শ দেয়া হয়।

অবরুদ্ধ গাজায় কয়েক প্রজন্ম ধরে পানি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট চলছে। এতে চিকিৎসকরা সব সময় মৌলিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে পারেন না। কাজেই খুব সহজেই ওষুধ প্রতিরোধী রোগের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে।

গত এক দশক ধরে গাজা উপত্যকাটি অবরুদ্ধ করে রেখেছে দখলদার ইসরাইল। সেখানে ভ্রমণ ও বাণিজ্য- দুটোই পুরোপুরি বন্ধ। অন্যান্য সংঘাত কবলিত এলাকাগুলোর চেয়ে গাজা মোটামুটি বিচ্ছিন্ন। কাজেই সুপারবাগ ছড়িয়ে পড়ার উর্বর ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে উপত্যকাটি।

মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, এক দশকের বেশি সময় আগে ইরাক থেকে ওষুধ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার বিস্তার ঘটেছে। তখন অ্যাসিনেটোব্যাকটার প্রতিরোধীর প্রত্যাবর্তনসহ আহত ব্যক্তিদের মধ্যে এমন ব্যাকটেরিয়ার প্রবলতা দেখা দিয়েছিল।

তবে চিকিৎসার কথা বিবেচনা করলে গাজা একেবারে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন না। কিছু সংখ্যক রোগীকে ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো যায়। এছাড়া জর্ডান, মিসর ও লেবাননেও রোগী পাঠিয়ে চিকিৎসা নেয়ার ব্যবস্থা করা সম্ভব।

এতে সুস্থ ব্যক্তির মধ্যেও এ ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে পড়তে পারে। কোনো ধরনের লক্ষণ ছাড়াই তারা এটি বহন করে যেতে পারেন।

বিভিন্ন সাহায্যকর্মীরা গাজার ভেতরে ও বাইরে ভ্রমণ করেন। তাদের মাধ্যমে এ রোগের বিস্তার অন্য দেশেও ঘটতে পারে।

এমনকি কোনো মানুষের শরীরে বাহিত না হয়েও এ রোগের বিস্তারের আশঙ্কা রয়েছে।

বৈরুত মেডিকেল সেন্টারের আমেরিকান ইউনিভার্সিটির সংঘাত কবলিত অঞ্চলের চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ ডা. গাসসান আবু সিত্তাহ বলেন, এই ব্যাকটেরিয়া সব সময় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।

তিনি বলেন, গাজা থেকে অপরিশোধিত নর্দমা থেকে বহু ওষুধ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া জলাশয়ে গিয়ে মিশতে পারে। আর গাজার জলাশয়ের সঙ্গে মিসর ও ইসরাইলের সংযুক্তি রয়েছে।

ডা. গাসসান আবু সিত্তাহ বলেন, স্কটল্যান্ডের এক গবেষণাপত্রে দেখা গেছে, পরীযায়ী পাখিদের আবর্জনায়ও বহু ওষুধ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া বহন করতে পারে। কাজেই এ থেকে যে কেউ নিষ্কৃতি পেতে পারেন বলে যে ধারণা রয়েছে, তা সম্পূর্ণ অদ্ভূত।

চলতি বছরে গাজায় ইসরাইলের দখল করে নেয়া পৈত্রিক আবাস ভূমিতে ফেরার অধিকার দাবিতে বিক্ষোভ শুরু হলে এই ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ সমস্যা নিয়ে কম আলোচনা হয়েছে।

কারণ বিশ্ব গণমাধ্যমে এসময় কেবল সহিংসতার খবরই বেশি প্রচার করেছে। গত বছরের ৩০ মার্চ শুরু হওয়া প্রতি শুক্রবারের বিক্ষোভে এ পর্যন্ত দুই শতাধিক নিহত হয়েছেন।

অর্থপেডিক সার্জন ডা. মাহমুদ মাত্তার বলেন, ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে অন্তত দুই হাজার ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন। আহতদের গুলিবিদ্ধ পায়ে বেশ কয়েকবার করে অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। কাজেই তাদের পুনর্বাসনে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে।

আর অধিকাংশ রোগীর শরীরে সুপারবাগ সংক্রমণ ঘটেছে। কাজেই চিকিৎসকরা চাইলেও খুব সহজে আহতরা সুস্থ হয়ে উঠতে পারছেন না। এতে তাদের শরীর সঠিকভাবে পুনর্গঠিত হচ্ছে না। নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি হাসপাতালে থাকতে হচ্ছে। তাদের অঙ্গচ্ছেদের ঝুঁকিও বাড়ছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে প্রথম অ্যান্টিবায়োটিক হিসেবে পেনিসিলিন আসে। এরপর থেকে অ্যান্টিবায়োটিক কোটি মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে। অসংখ্য মানুষকে প্রতিবন্ধিত্ব থেকে রক্ষা করেছে।

বিশেষ করে যুদ্ধে যারা আহত হয়েছিলেন, অ্যান্টিবায়োটিকের কারণে তাদের অঙ্গচ্ছেদের মতো সিদ্ধান্ত নিতে হয়নি চিকিৎসকদের।

কিন্তু ১৯৮০ এর দশক থেকে নতুন ধরনের কোনো অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার করা হয়নি। এদিকে বিশ্বজুড়ে সুপারবাগের সংক্রমণ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। আধুনিক যুগের কিছু সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলকে পেনিসিলিন আবিষ্কারের আগের যুগের সঙ্গে তুলনা করেন বিশেষজ্ঞরা।

আবু সিত্তাহ বলেন, ইসরাইলি বাহিনীর গুলিতে আহতদের প্রতিবন্ধিত্বের কথা বিবেচনা করে আমরা বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছি।

সব ধরনের সুপারবাগকে মানষের স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে তালিকায় সবার আগে রেখেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

ঘটনাপ্রবাহ : ফিলিস্তিনিদের ঘরে ফেরার বিক্ষোভ

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×