রাখাইনে নতুন পাঁচ গণকবরের সন্ধান

রোহিঙ্গাদের পিছু ধাওয়া করে হত্যায় মেতে ওঠে সেনারা

  যুগান্তর ডেস্ক    ০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১৫:৪৬ | অনলাইন সংস্করণ

রোহিঙ্গা শরণার্থী

অ্যাসিডে ঝলসানো কিংবা বুলেট দিয়ে বিকৃত করে দেয়া হয়েছে মুখমণ্ডল। শরীরের অর্ধেকটা গণকবরের ভেতরে মাটিচাপা দেয়া। প্রথম দেখায় অতিপরিচিত কারও মরদেহটি চিনতে পারার কথা নয়। কিন্তু শার্টের রঙ দেখে নুর কাদের অবশেষে চিনতে পারলেন, কবরের লাশটি তার বন্ধুর।

কাদেরসহ আরও চৌদ্দজন গু-দার-পিয়ান গ্রামে চিনলনের জন্য খেলোয়াড় বাছাই করছিলেন। ফুটবলের মতো খেলা চিনলন মিয়ানমারে বেশ জনপ্রিয়। তারা যখন নিজেদের জন্য খেলোয়াড় বাছাই করছিলেন, তখন শুরু হয় গোলাগুলি। টিনের চালে ভারী বৃষ্টিপাতের মতো গুলির আওয়াজ শুনে তারা এলোপাতাড়ি ছুটে পালাতে চেষ্টা করেন।

কিন্তু মিয়ানমার সেনাবাহিনী যখন গুলি বন্ধ করে, তখন কাদির ও তার দুই সহযোগী ছাড়া আর কেউ জীবিত ছিলেন না। এর কয়েক দিন পর দুটি গণকবরে নুর কাদির তার চিনলন দলের বাকিদের সন্ধান পান।

নতুন করে এমন পাঁচটি গণকবরের খোঁজ পাওয়া গেছে রাখাইনে। বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের দুই ডজনেরও বেশি লোকের সঙ্গে কথা বলে এই গণকবরের খবর প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েট প্রেস (এপি)।

রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে হত্যার কাহিনী শুনে ঘটনা ঘটার সময় লিখে রেখে এপি এসব গণহত্যার খবর নিশ্চিত করেছে। মিয়ানমার সরকার সবসময় দাবি করে আসছে, রোহিঙ্গাদের ওপর এমন কোনো গণহত্যা সংঘটিত হয়নি। তবে ইন দিন গ্রামে একটি গণকবরে ১০ ‘সন্ত্রাসীকে’ সমাহিত করার কথা তারা স্বীকার করেছে।

কিন্তু অ্যাসোসিয়েট প্রেসের প্রতিবেদনে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, মিয়ানমার সেনাবাহিনী উগ্র বৌদ্ধদের সহায়তায় সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গাদের ওপর পরিকল্পিত গণহত্যা চালিয়েছে। এমন আরও অনেক গণকবরের ভেতরে আরও অনেক মানুষকে কবর দেয়া হয়েছে। যাদের ব্যাপারে সঠিক তথ্য এখনও জানা সম্ভব হয়নি।

চব্বিশ বছর বয়সী কাদির রাখাইনে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহের কাজ করতেন। তিনি বলেন, একটা লাশের ওপর আরেকটি লাশ এমনভাবে ফেলে রাখা হয়েছে যে, আমি তালগোল পাকিয়ে ফেলেছি। তাদের সবাইকে আমি চিনতে পারিনি। চেহারা বিকৃত করে ফেলা হয়েছে। তাদের কথা ভেবে আমি নিজেকে খুব অসহায় বোধ করছি।

নতুন আবিষ্কৃত এসব গণকবর যুগ যুগ ধরে নিপীড়নের শিকার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর চালানো মিয়ানমার সরকারের গণহত্যার সর্বশেষ সাক্ষ্য বহন করছে। তবে এ বিষয়ে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর গণমাধ্যম কর্মকর্তাদের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করা হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

মিয়ানমার সরকার গু-দার-পিয়ান গ্রামে প্রবেশের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে। কাজেই কতজন লোক নিহত হয়েছেন, সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোনো ধারণা নেয়া যাচ্ছে না। এপির উপগ্রহ থেকে নেয়া ছবিতে দেখা গেছে, মিয়ানমার সেনাবাহিনী একটি গ্রাম সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। ভস্মীভূত বসতবাড়ি থেকে ছাই সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

কক্সবাজারের আশ্রয় শিবিরে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ একটি তালিকায় ৭৫ জন নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে কথা বলে, গণকবরে মরদেহ ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা লাশ দেখে গ্রামবাসীরা ৪০০ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন।

প্রাণ নিয়ে যাদের বাংলাদেশে পালিয়ে আসার সৌভাগ্য হয়েছে, তাদের অনেকে বুলেটের আঘাতে জখম হয়েছেন। বুলেটে আহতদের মধ্যে তিন বছরের শিশু ও তার দাদিও রয়েছেন।

অ্যাসোসিয়েট প্রেস গ্রামের প্রতিটি মানুষের সঙ্গে কথা বলে গু-দার-পিয়ানের প্রধান সড়কের পাশে তিনটি গণকবরের বিষয়ে নিশ্চিত হয়। সেনাসদস্যরা পিছু ধাওয়া করে রোহিঙ্গাদের হত্যা করেছে।

এ দুটি ছাড়াও একটি পাহাড়ের পাদদেশে সমাধিক্ষেত্রে পাশে আরও দুটি গণকবরের খোঁজ পায় অ্যাসোসিয়েট প্রেস। এ দুটি সমাধিক্ষেত্রের কাছাকাছি একটি স্কুল রয়েছে, যেখানে এখন শতাধিক সেনাসদস্য অবস্থান নিয়েছে।

ঘটনাপ্রবাহ : রোহিঙ্গা বর্বরতা

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter