ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন

খাশোগি হত্যা: বহাল তবিয়তে কাহতানি

  যুগান্তর ডেস্ক ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৪:৫২ | অনলাইন সংস্করণ

খাশোগি হত্যা: স্বপ্রভাবে বহাল আছেন কাহতানি
ফাইল ছবি

সাংবাদিক জামাল খাশোগিকে হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে বরখাস্ত হওয়া সৌদ আল কাহতানি অনানুষ্ঠানিকভাবে রাজকীয় উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন।

তবে তাকে বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে সৌদিকে পর্দার অন্তরালে অব্যাহত চাপ দিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।

ওয়াশিংটন ও সৌদি কর্মকর্তাদের বরাতে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এ খবর দিয়েছে।

কাহতানির বিরুদ্ধে চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিতে মার্কিন চাপ উপেক্ষা করেই আসছে সৌদি আরব। এর আগে তিনি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ডানহাত হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।

মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, স্বপদ থেকে বরখাস্ত হওয়ার পরেও যে কাহতানির প্রভাব এখানো অব্যাহত, খাশোগি হত্যাকাণ্ডের পর সৌদি আরবের অপর্যাপ্ত পদক্ষেপই তা বলে দিচ্ছে।

গত ২ অক্টোবর ইস্তানবুলে সৌদি কনস্যুলেটে ঢোকার পর ওয়াশিংটন পোস্টের কলামনিস্ট জামাল খাশোগিকে হত্যা করা হয়েছে। এরপর তার শরীর কেটে টুকরো টুকরো করা হয় বলে তুরস্কের তদন্তে জানা গেছে।

মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, সৌদ আল কাহতানি তার কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে খুব একটা যে চাপে আছেন, তা আমার কাছে মনে হচ্ছে না।

খাশোগি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে কাহতানিসহ আরও কয়েক সৌদি নাগরিকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ওয়াশিংটন। এই নিষেধাজ্ঞার পর তারা আমেরিকানদের সঙ্গে কোনো লেনদেন করতে পারবেন না।

হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে কাহতানির প্রত্যার্পণ চেয়েছে তুরস্ক। খাশোগি হত্যাকাণ্ডের আগে ৪০ বছর বয়সী কাহতানির সৌদি আরবের ঘরোয়া ও পররাষ্ট্রবিষয়ক কর্মকাণ্ডে ব্যাপক প্রভাব ছিল।

সৌদি কর্মকর্তারা বলেন, যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি গণমাধ্যমকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন।

সামাজিক মাধ্যম পর্যবেক্ষণ ও সমালোচকদের ভয়ভীতি প্রদর্শনে তিন হাজার লোককে নিয়োগ দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু খাশোগি হত্যাকাণ্ডে তার জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়ার পর বাদশাহ সালমান তাকে বরখাস্ত করেন।

কিন্তু এরপরেও কাহতানি একটুও দমে না গিয়ে সৌদি আরবের কার্যত শাসক এমবিএস নামে পরিচিত যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের অলিখিত উপদেষ্টা হিসেবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তার প্রভাবে সামান্যও কমে যায়নি।

এক সৌদি কর্মকর্তা বলেন, পরামর্শের জন্য এখনো এমবিএস তার কাছে ধর্না দেন। ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের কাছে কাহতানিকে নিজের উপদেষ্টা হিসেবেই উল্লেখ করেন তিনি।

কিন্তু অলিখিত রাজকীয় আদালতের একজন উপদেষ্টা হিসেবে কাহতানি তার দায়িত্ব পালন অব্যাহত রেখে যাচ্ছেন।

এখনো তিনি স্থানীয় সাংবাদিকদের জন্য নির্দেশনা জারি করেন এবং যুবরাজের বৈঠকের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

গত সপ্তাহে খাশোগি হত্যাকে বড় ধরনের ভুল হিসেবে আখ্যায়িত করেন সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল আল জুবায়ের।

নিহত খাশোগিকে নিয়ে বই লিখেছেন তার বাগদত্তা খাদিজা। ছবি: এএফপি

তিনি বলেন, আইনি প্রক্রিয়াকে নিজের মতো চলতে দিন। যখন বিচার কাজ শেষ হবে, তখন এ নিয়ে মূল্যায়ন করবেন। কিন্তু বিচার শেষ হওয়ার আগে তা মূল্যায়ন করার দরকার নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্কের গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে মোহাম্মদ বিন সালমানের সমালোচনা এড়িয়ে চলছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছে, খাশোগিকে টার্গেট বানিয়েছিলেন এমবিএস এবং এ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযানকে তিনি অনুমোদন দিয়েছিলেন। সম্ভবত যুবরাজ তাকে হত্যার নির্দেশও দেন।

তবে এ হত্যাকাণ্ডে যুবরাজের জড়িত থাকার কথা বারবার অস্বীকার করে আসছে সৌদি আরব।

খাশোগি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছেন সৌদি সরকারি কৌঁসুলি। এখন পর্যন্ত ১১ ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। তবে কাহতানির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ দেয়া হয়নি। তদন্তাধীন থাকা ১০ ব্যক্তির মধ্যে তিনি রয়েছেন।

এ ঘটনা সংশ্লিষ্ট সৌদি রাজপরিবারের এক সদস্য বলেন, যে করেই হোক যুবরাজ তাকে বাঁচাতে চাচ্ছেন। কারণ রাজকীয় আদালতের মেরুদণ্ড হচ্ছেন কাহতানি। এছাড়া তাকে স্পর্শ করা হবে না বলে যুবরাজ নিশ্চয়তা দিয়েছেন। এমনকি খাশোগির ঘটনা শেষ হলে তিনি স্বপদে ফিরতে পারবেন বলে আশ্বাস দেয়া হয়েছিল।

তিনি বলেন, এমবিএস যে করেই হোক কাহতানিকে ছাড়তে চাননি। তাকে যখন তার বাবা বাদশাহ সালমান বরখাস্ত করেন তখন খুব ক্ষেপে গিয়েছিলেন যুবরাজ।

এক সৌদি কর্মকর্তা বলেন, সৌদি আরবের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা থাকলেও কাহতানিকে আবুধাবিতে দেখা গেছে। লোকজনের অভিযোগ ও তাকে নিষিদ্ধ করার আগ পর্যন্ত অন্তত দুইবার তিনি রাজকীয় আদালতে গিয়েছিলেন।

ওয়াশিংটনে সৌদি রাষ্ট্রদূত ও যুবরাজ মোহাম্মদের ভাই খালিদ বিন সালমান যুক্তরাষ্ট্রকে বলেন, কাহতানির কাছ থেকে তার মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়নি। কারণ এতে তারা কোনো সমস্যা দেখছেন না।

মার্কিন কর্মকর্তারা বলেন, ভিন্নমতাবলম্বীদের ভীতিপ্রদর্শনে একসময় কাহতানি যে গণমাধ্যম কেন্দ্র ব্যবহার করতেন, তা বন্ধ করতে মার্কিন চাপের প্রতিবাদ জানিয়েছে সৌদি।

কাহতানির লাগাম টেনে ধরতে সৌদি আরবকে চাপ দেয়ার কথা জানিয়ে মার্কিন কর্মকর্তারা বলেন, রিয়াদ এ বিষয়ে তাদের কাছে পরিষ্কার করেছে যে সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিচার হবে।

যুবরাজ সালমান খাশোগি হত্যার কিছু দায় গ্রহণ করেছেন বলেও মত দিয়েছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, এমবিএস যদি নিজের নেতৃত্বের প্রভাব বজায় রাখতে চান, তবে এ হত্যাকাণ্ড অমার্জনীয় এবং এমনটা আর কখনো ঘটবে না বলে একটি বিবৃতি দেয়া উচিত তার। এছাড়া এ হত্যাকাণ্ডের দায় নিজের বলেই গ্রহণ করতে হবে তাকে।

‘এতে লোকজন নতুন করে ভাবতে পারবে। কিন্তু বাস্তবে এমনটি কখনো ঘটতে যাচ্ছে না,’ বললেন তিনি।

খাশোগি হত্যাকাণ্ডের দায়ে পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ডের সুপারিশ করা হয়েছে। সৌদি আইন অনুসারে কৌঁসুলিরা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের নাম প্রকাশ করতে পারেন না।

তবে সৌদি আরবের দুই কর্মকর্তা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলেন, ওই পাঁচ ব্যক্তি হচ্ছেন- গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক উপপ্রধান আহমেদ আল আসিরি, সৌদি রয়েল গার্ডের সাবেক সদস্য মাহের মুতরেব, সালাহ আল তুবাইগি, মুস্তাফা মাদানি ও থার গালিব আল হারবি।

তুরস্কের কর্তৃপক্ষ বলেন, অভিযানের পরিকল্পনাকারী হিসেবে ছিলেন আল আসিরি, আর নিরাপত্তা ক্যামেরাকে ধোঁকা দিতে খাশোগির পোশাক পরেছিলেন মাদানি। এছাড়া বাকি তিনজনকে এ হত্যা মিশনে পাঠিয়েছিল সৌদি।

কাহতানিকে বিচারের মুখে দাঁড় করাতে মার্কিন চাপ একসময় কমে যাবে বলে প্রত্যাশা সৌদি কর্মকর্তাদের। দেশটির এক কর্মকর্তা বলেন, সৌদি সরকার জানে যুক্তরাষ্ট্র কাহতানির বিচার দেখতে চায়। কিন্তু তারা মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্রকে শান্ত করতে মৃত্যুদণ্ডের সুপারিশপ্রাপ্ত এই পাঁচ আসামিই যথেষ্ট।

কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, খাশোগি হত্যাকাণ্ডে কারো ফাঁসি কার্যকর হবে বলে তারা মনে করছেন না। এ নিয়ে তারা সন্দিহান। এছাড়া আইনি প্রক্রিয়া যথেষ্ট দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে না বলে তারা সৌদি আরবে জানিয়েছেন।

ঘটনাপ্রবাহ : সাংবাদিক জামাল খাসোগি নিখোঁজ

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×