হামলা থেকে বাঁচতে ভারত ছেড়ে পালাচ্ছেন কাশ্মীরিরা

প্রকাশ : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১২:০৯ | অনলাইন সংস্করণ

  যুগান্তর ডেস্ক

ছবি: এএফপি

একটি ছোট্ট কক্ষে একটানা দুই রাত আরও ৩০ শিক্ষার্থীর সঙ্গে কাটিয়ে দিলেন জুনাইদ আইয়ুব রাদার। বাইরে সংঘবদ্ধ একদল লোক তাদের রক্ত চেয়ে অবিরাম স্লোগান দিচ্ছে। অবশেষে এই যুবকসহ কক্ষের সবাই পালিয়ে বাঁচতে সক্ষম হলেন কাশ্মীর হামলার ঘটনায় বিক্ষুব্ধ ভারতীয়দের আক্রোশ থেকে। 

ভারতজুড়ে এমন দৃশ্য এখন অহরহ। ভূস্বর্গ বলে পরিচিত হিমালয় অঞ্চলটিতে সাম্প্রতিক হামলার পর বিভিন্ন রাজ্যে বাস করা কাশ্মীরিরা প্রতিশোধ থেকে বাঁচতে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। ওই হামলায় একটি আধাসামরিক বাহিনীর ৪৪ জওয়ান নিহত হন।-খবর এএফপির।

জুনাইদ বলেন, দেরাদুনের কাশ্মীরি লোকজন ভাড়া থাকেন এমন হোটেল, অ্যাপার্টমেন্টের বাইরে ক্ষুব্ধ লোকজন জড়ো হন। তারা আমাদের প্রতারক ও সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে গুলি করে হত্যা করার স্লোগান দেন।

বার্তা সংস্থা এএফপিকে তিনি বলেন, পালিয়ে কাশ্মীরের শ্রীনগরে চলে আসতে আমাদের চারদিন সময় লেগেছে। পুলিশ ও মুসলমান ব্যবসায়ীরা আমাদের পালাতে সহায়তা করেছে। 

বছর দুয়েক ধরে তিনি দেরাদুনে বসবাস করে আসছিলেন। তিনি বলেন, একটি কক্ষে আমরা ৩০ জন জড়ো হয়েছিলাম। সবাই পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় ছিলাম।

নিরাপদে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করার আগ পর্যন্ত ব্যবসায়ীরা নিজেদের বাড়িতে আমাদের আশ্রয় দেন। প্রতি বছর নিজ রাজ্যের বাইরে ১১ হাজার কাশ্মীরি শিক্ষার্থী ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছেন।

কিন্তু পুলওয়ামার ঘটনার পর সহিংস হামলার শিকার হওয়ার আতঙ্কে তারা দলে দলে নিজ রাজ্য কাশ্মীরে চলে যাচ্ছেন।

গত তিন দশক ধরে কাশ্মীরে বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র বিদ্রোহ চলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে কাশ্মীরিদের বেধড়ক মারধর ও ভর্ৎসনা করা হচ্ছে। 

সংবাদভিত্তিক বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠী ও পুরোহিতরা প্রতিশোধ নিতে ভারতীয়দের উসকে দিচ্ছেন।

পুলওয়ামায় হামলার প্রতিশোধ নিতে চলতি সপ্তাহে ৪০ কাশ্মীরি নাগরিককে হত্যা করার আহ্বান জানিয়েছেন নয়াদিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক। এ ছাড়া কাশ্মীর থেকে আসা কোনো শিক্ষার্থীকে ভর্তি করা হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছেন তার দুই সহকর্মী।

কাশ্মীরের ব্যবসায়ী ও উৎপাদক ফেডারেশনের প্রধান মোহাম্মদ ইয়াসিন খান বলেন, আতঙ্ক ও ভীতিকর পরিস্থিতির কারণে বিভিন্ন রাজ্য থেকে পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী ও শতাধিক ব্যবসায়ী কাশ্মীরে ফেরত চলে এসেছেন। কেউ কেউ পথে আছেন।

তিনি বলেন, আক্রান্তের শিকার হওয়া লোকজন সাহায্য চেয়ে আমাদের কাছে ফোন করছেন।

হামলা নিয়ে সামাজিকমাধ্যমে অসতর্ক মন্তব্য করার অভিযোগ তুলে ভারতীয় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহু কাশ্মীরি শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। কেউ কেউ রাষ্ট্রদ্রোহী মামলার শিকার হয়ে কারাগারে ঢুকেছেন।

কাশ্মীরিদের রক্ষায় দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নির্দেশনা জারি করলেও রাজনৈতিক নেতারা কাশ্মীরবিরোধী সহিংসতাকে উসকে দিচ্ছেন।

মেঘালয় রাজ্যের গভর্নর তাথাগদা রয় টুইটার পোস্টে বলেন, আপনারা কাশ্মীর ভ্রমণে যাবেন না। কাশ্মীরের সব কিছু বর্জন করুন।

ভারতনিয়ন্ত্রিত রাজ্যটিতে পাঁচ লাখের বেশি সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। মূলত প্রতিবেশী পাকিস্তানও রাজ্যটির দাবি করছে।

কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ নিতে দুই দেশের মধ্যে এ পর্যন্ত তিনটি যুদ্ধ হয়েছে। এ ছাড়া স্বাধীনতা ও পাকিস্তানের সঙ্গে একীভূত হওয়ার পৃথক দাবিতে সশস্ত্র বিদ্রোহীরাও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।

গত সপ্তাহের আত্মঘাতী হামলার দায় স্বীকার করেছে পাকিস্তানভিত্তিক জইশ-ই-মোহাম্মদ। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের সমর্থন দেয়ার ভারতীয় অভিযোগ দীর্ঘদিনের।