ইসলামবিদ্বেষের উর্বর ভূমি অস্ট্রেলিয়া

  অ্যাডাম টেইলর ও রিক নোয়াক ১৬ মার্চ ২০১৯, ১৪:৩১ | অনলাইন সংস্করণ

ইসলামবিদ্বেষের উর্বর ভূমি অস্ট্রেলিয়া
ক্রাইস্টচার্চের আল নুর মসজিদে কাছে দাঁড়ানো এক নিরাপত্তাকর্মী। ছবি: এএফপি

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের মসজিদে জোড়া বন্দুক হামলাকারী শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসী ব্রেনটন টেরেন্ট যে অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক দেশটির প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন তা নিশ্চিত করেছেন।

হামলার নিন্দা জানিয়ে শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, হামলাকারী একজন ডানপন্থী সন্ত্রাসী। তিনি অস্ট্রেলিয়ায় জন্মগ্রহণ করেছেন।

স্কট মরিসন বলেন, একজন চরমপন্থী, ডানপন্থী ও সহিংস সন্ত্রাসীর হামলার ঘটনায় আমি সম্পূর্ণ প্রতিবাদ ও নিন্দা জানাচ্ছি।

নিউজিল্যান্ডের কর্তৃপক্ষ হামলাকারীকে আটক করেছেন। তার বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।

হামলার আগে টুইটারে প্রকাশ করা একটি ইশতেহারে হামলাকারী যুবক নিজেকে একজন সাধারণ শ্বেতাঙ্গ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

২৮ বছর বয়সী ওই যুবক অস্ট্রেলিয়ার নিন্মবিত্ত শ্রমজীবী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

অস্ট্রেলিয়ার গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, নিউজ সাউথ ওয়েলস শহরের গ্রাফটনে একজন ব্যক্তিগত প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করতেন ঘাতক ব্রেনটন টেরেন্ট। ২০০৯ সালে একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এর দুই বছর পর অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপ সফরে বের হন তিনি।

তবে উগ্র ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে তিনি সরাসরি যুক্ত কিনা-তা এখনো পরিষ্কার হওয়া যায়নি। তবে এসব গোষ্ঠীগুলো অস্ট্রেলিয়ায় সক্রিয় রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, দেশটির মূলধারার সংবাদমাধ্যমে মুসলিম বিদ্বেষী প্রচার স্বাভাবিকীকরণ হয়ে গেছে। আর এসব সংবাদ মাধ্যমের অধিকাংশের মালিক মিডিয়া মুঘল রুপার্ট মারডক।

এসব প্রকাশনা অস্ট্রেলিয়ায় মুসলিম বিদ্বেষের সংস্কৃতি উসকে দিচ্ছে। মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের লেবানিজ-অস্ট্রেলীয় পণ্ডিত ঘাসসান হেইজ বলেন, এতে নিজেদের প্রাণঘাতী আবেগী কল্পনা বাস্তবায়ন বৈধতা পেয়েছে বলে মনে করেন উগ্রপন্থীরা।

কিন্তু অস্ট্রেলিয়া উগ্র ডানপন্থী মৌলবাদের উর্বর ক্ষেত্র হওয়া সত্ত্বেও ক্রাইস্টচার্চে মসজিদের ঘাতক যেসব তত্ত্ব উল্লেখ করেছেন এবং যাদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছেন, তাতে এমন আভাসই পাওয়া যাচ্ছে যে প্রথাগত উগ্র ডান জাতীয়তাবাদ থেকে এ হামলার অনুপ্রেরণা আসেনি, এটা নতুন ধরনের আন্তর্জাতিক, ইন্টারনেট থেকে উৎসাহিত উগ্রপন্থা।

ব্রিটেনের বাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উগ্রপন্থা বিশেষজ্ঞ ওরেলিয়ান মনডন বলেন, ঘটনা বলে দিচ্ছে যে হামলাকারী খুবই সতর্কভাবে নিউজিল্যান্ডকে হামলার জন্য বাছাই করেছেন।

অস্ট্রেলিয়ায় উগ্র ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর একটা ইতিহাস আছে। তারা সাধারণত অভিবাসী ও সংখ্যালঘুদের লক্ষ্যবস্তু করেন। বিশ শতকের শুরু থেকে ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত নয়, এমন অভিবাসীদের বাদ দিয়েই অস্ট্রেলিয়া বেশ কিছু নীতি প্রণয়ন করেছে।

এসব পদক্ষেপ সামগ্রিতভাবে শ্বেতাঙ্গ অস্ট্রেলিয়া নীতি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ১৯৭৩ সালেই যা কেবল পরিত্যক্ত ঘোষিত হয়েছিল।

নব্বই দশকের মাঝামাঝিতে পলিন হ্যানসনের ওয়ান ন্যাশনের মতো উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো এশীয় ও অভিবাসীবিরোধী মনোভাব তৈরিতে সক্ষম হয়। যা দেশটির জাতীয় রাজনীতিতে ছোট্ট করে হলেও জায়গা পেয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ওয়ান নেশন এবং অন্যান্য ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলো নতুর রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা পেয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়া থেকে আসা মুসলিম অভিবাসীদের কেন্দ্রভূত করেই তারা এ সম্পর্ক গড়তে পেরেছে।

যদিও অস্ট্রেলীয় উদ্বেগ থেকেই এসব গোষ্ঠীর প্রতি আলোকপাত করা হয়েছে। কিন্তু শুক্রবারে ক্রাইস্টচার্চে হামলার আগে ঘাতক যুবক যে ইশতেহার প্রকাশ করেন, তাতে স্পষ্ট আভাস রয়েছে যে তিনি হামলা চালাতেই নিউজিল্যান্ডে পাড়ি জমিয়েছিলেন।

কাজেই একটা বিষয় পরিষ্কার যে, বিশ্বের কোনো দূরবর্তী বিচ্ছিন্ন অঞ্চলেও মুসলমানরা নিরাপদ না।

ইশতেহার ও হামলার ভিডিওতে কেবল ছোট্ট করে অস্ট্রেলিয়ার কথা বলা হয়েছে। এছাড়াও ফ্রান্স, নরওয়ে, সার্বিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশের ডানপন্থী আন্দোলন ও ঘটনাবলীরও উল্লেখ রয়েছে।

এছাড়া অনলাইনে উগ্র ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর মাঝে জনপ্রিয় রসিকতা তো রয়েছেই।

মনডন বলেন, এসব দৃষ্টান্ত অস্ট্রেলীয় উগ্রপন্থার নতুন প্রজন্মের পরিচায়ক। এ ধরনের আন্তর্জাতিক উগ্রপন্থা সত্যিকার অর্থে ইন্টারনেটভিত্তিক।

তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রে আপনি যা দেখতে পাচ্ছেন, এরা হলেন সেসব ঘটনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত। অস্ট্রেলিয়ার উগ্রপন্থার আগের গোষ্ঠীগুলোর চেয়ে তারা আরও বেশি সহিংস এবং পার্লামেন্টারি খেলায় তাদের কোনো আগ্রহ নেই।

ক্রাইস্টাচার্চে এলোপাতাড়ি গুলি করে এতগুলো লোককে হত্যা করা হলেও তা নিয়ে এ পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করেনি হ্যানসনের ওয়ান ন্যাশন দল।

যাই হোক, কুইন্সল্যান্ডের স্বতন্ত্র সিনেটর ফ্রেসার অ্যানিং এক বার্তায় বলেন, মুসলমানরা আজকে সম্ভবত হামলার শিকার। কিন্তু সচরাচর তারা অপরাধী।

বিবৃতিতে তিনি আরও বলেন, নিউজিল্যান্ডের আজকের রক্তপাতের মূল কারণ অভিবাসী কর্মসূচি। এতে গোঁড়া মুসলমানরা তাদের প্রথম পছন্দের জায়গা নিউজিল্যান্ডে পারি জমাতে পারছেন।

মুসলমানদের ওপর দোষ চাপানো হ্যানসন ও অ্যানিংয়ের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ করেন অস্ট্রেলিয়ার প্রথম মুসলিম নারী সিনেটর মেহরিন ফারুকী। তিনি বলেন, ইসলামবিদ্বেষ ও বর্ণবাদী ঘৃণার এটাই হচ্ছে ফলাফল।

প্রতিবেদনটি মার্কিন দৈনিক ওয়াশিংটন পোস্ট থেকে অনূদিত

ঘটনাপ্রবাহ : নিউজিল্যান্ডে মসজিদে এলোপাতাড়ি গুলি

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×