বলকান গণহত্যার স্মৃতি ধরেই ক্রাইস্টচার্চ মসজিদে হামলা

  যুগান্তর ডেস্ক ১৭ মার্চ ২০১৯, ১১:৪৯ | অনলাইন সংস্করণ

বলকান গণহত্যার স্মৃতি ধরেই ক্রাইস্টচার্চ মসজিদে হামলা
আল নুর মসজিদে হামলায় শোকার্তরা। ছবি: এএফপি

বন্দুকধারী শ্বেতাঙ্গ জঙ্গি যখন গণহত্যার জন্য নিউজিল্যান্ডের মসজিদে প্রবেশ করেন, তখন তার হেলম্যাটে রাখা লাইভ ক্যামেরার ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ডে সার্ব জাতীয়তাবাদী গান বাজছিল।

শুক্রবার জুমা পড়তে আসা মুসল্লিদের হত্যার সময় তিনি এ নারকীয় দৃশ্য সামাজিকমাধ্যম ফেসবুকে সরাসরি সম্প্রচার করেন।

শ্বেতাঙ্গ জঙ্গির অস্ত্রের গায়ে সার্ব জাতীয়তাবাদের ঐতিহাসিক ব্যক্তিদের নাম খোদাই করা ছিল। এতে বলকান সহিংসতা নিয়ে অপ্রত্যাশিত আগ্রহ তৈরি হয়েছে সর্বত্র। সে সময় যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলটিতে রক্তের বন্যা বয়ে গিয়েছিল।

দুটি মসজিদে ওই অস্ট্রেলীয় সন্ত্রাসী গুলি করে অর্ধশত লোককে হত্যার পর নিউজিল্যান্ডে বসনীয় রাষ্ট্রদূত স্থানীয় টেলিভিশনে গিয়ে হত্যার ব্যাকগ্রাউন্ড দৃশ্যে সংগীত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

মসজিদে ঢুকে এই শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসী যখন এক এক করে মুসল্লিদের হত্যা করছিলেন, তখন ভিডিওর অন্তরালে সার্ব জাতীয়তাবাদী সংগীত শোনা গেছে।

বসনীয় রাষ্ট্রদূত বলেন, এটি সার্বীয় জাতীয়তাবাদী সংগীত, যাতে যুদ্ধাপরাধী রাদোভান কারাদজিচের নাম উল্লেখ রয়েছে। তাকে সার্বসদের নেতৃত্ব দিতে আহ্বান করা হয়েছে।

১৯৯২-৯৫ সালের যুদ্ধে বসনীয় সার্বসদের নেতৃত্ব দেয়া রাদোভান যুদ্ধাপরাদের দায়ে বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। তাকে দেয়া ৪০ বছরের সাজার চূড়ান্ত রায় শুনতে চলতি সপ্তাহে তিনি জাতিসংঘের আদালতে গিয়েছিলেন।

স্রেব্রেনিকা মুসলমানদের ওপর গণহত্যা এবং বসনিয়ায় জাতিগত সংঘাতের সময় অন্যান্য অপরাধের দায়ে তাকে এ কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। এতে এক লাখের বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল।

বসনীয় কূটনীতিক জানিয়েছেন, ওই গানে বলা হয়েছে- তুর্কিদের অবশ্যই হত্যা করতে হবে। বসনীয় মুসলমানদের কথা উল্লেখ করে সার্ব জাতীয়তাবাদীরা এখনও নিয়মিতভাবে এমন কথা বলে যাচ্ছেন।

১৯৯০ দশকের যুদ্ধের মতোই ক্রাইস্টচার্চের হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় ২৮ বছর বয়সী অস্ট্রেলীয় সন্ত্রাসী এ গানটি বাজিয়েছিলেন। এমনকি উগ্র ডানপন্থীরা সম্প্রতি এ গানটি মিম বা ছবি ক্যাপশন আকারেও ইন্টারনেট জগতে ছড়িয়ে দেয়।

কিন্তু মসজিদে ট্যারেন্টের এই হত্যাযজ্ঞ বলকান ইতিহাসের শিকরের গভীরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হয়ে গেছে। এ ছাড়া বিশ্বজুড়ে ডানপন্থী উগ্ররা তার এই ঘৃণায় ভরা ইশতেহারকে প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছেন।

উসমানীয় সাম্রাজ্যের ঘোর

জঙ্গি ট্যারেন্টের অস্ত্রে যেসব ঐতিহাসিক ব্যক্তির নাম উল্লেখ ছিল, তাদের মধ্যে কয়েকজন সার্ব জাতীয়তাবাদী আইকন রয়েছেন।

সার্ব লোকগাঁথার একজন নাইট মিলোস অবিলিক ও চতুর্দশ শতকের সার্বীয় প্রিন্স স্টিফান লাজারসহ উসমানীয় খেলাফতের বিরুদ্ধে লড়াই করা যোদ্ধাদের নামও ছিল।

মন্টিনেগ্রিয়ান জেনারেল মার্কো মিলজেনোভের নামও রয়েছে বন্দুকে। এই বলকান সামরিক নেতা ১৯ শতকে উসমানীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন।

উসমানীয় শাসনামলে বলকানে মুসলিম ও খ্রিস্টান বিশ্বের মধ্যে প্রায়ই যুদ্ধের ঘটনা ঘটেছিল। অতি উগ্রজাতীয়তাবাদী সার্বদের মধ্যে সেই ইতিহাসের ছায়া এখনও রয়ে গেছে।

স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বলেন, ২০১৬ ও ২০১৭ সালে জঙ্গি ট্যারেন্ট সেখানে ভ্রমণে গিয়েছিলেন। ২০১৮ সালের নভেম্বরে মন্টেনিগ্রো, সার্বিয়া, বসনিয়া ও ক্রোয়েশিয়া হয়ে বুলগেরিয়ায় যান এই শ্বেতাঙ্গ জঙ্গি। তিনি তুরস্কও ভ্রমণে গিয়েছিলেন।

সার্ব জাতীয়তাবাদের অনুপ্রেরণা

বসনিয়ার সারাজেভোতে মুসলিম সম্প্রদায় জানিয়েছে, এটি সত্যিই ভয়ের কথা যে, বসনিয়ার যুদ্ধাপরাধকে মহিমান্বিত করে গাওয়া একটি সংগীত দিয়ে এই হত্যাকাণ্ড শুরু হয়েছে। এই শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসী একই উগ্র মতাদর্শ ও ঘৃণা থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছেন, যা ১৯৯০ দশকে ঘটেছিল।

কাজেই এ হামলাকারী যখন তার হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় বলকানকে টেনে এনেছেন, তখন তা কেবল কসোভোর সেই ভয়ার্ত স্মৃতিকেই স্মরণ করিয়ে দেয়।

সাবেক সার্বীয় প্রদেশের অধিকাংশ মুসলমান এবং নৃতাত্ত্বিক আলবেনীয়রা ১৯৯৮-৯৯ সালে গেরিলা যুদ্ধে জড়ে পড়েন। এ যুদ্ধে ১৩ হাজার আলবেনীয় নিহত হয়েছিলেন।

টুইটারে কসোভোর সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেট্রিক সেলিমি বলেন, এই অস্ট্রেলীয় সন্ত্রাসী সার্বীয় শিকড় গজানো শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী একটি বিশেষ দল থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছেন।

তিনি বলেন, কসোভো ও বসনিয়ায় সার্বীয় মতাদর্শীরা যে যুদ্ধ ও গণহত্যা চালিয়েছিলেন, তা বিশ্বব্যাপী উগ্রডানপন্থী খ্রিস্টানদের উৎসাহ হিসেবে কাজ করেছে।-খবর এএফপির।

ঘটনাপ্রবাহ : নিউজিল্যান্ডে মসজিদে এলোপাতাড়ি গুলি

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×