যেখানেই যেতেন নামাজের ইমামতি করতেন কোরআনে হাফেজ মুরসি

প্রকাশ : ১৯ জুন ২০১৯, ০১:৪৬ | অনলাইন সংস্করণ

  যুগান্তর ডেস্ক

সদ্য প্রয়াত মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি ইসা আল-আইয়াত। ছবি: সংগৃহীত

আদালতের এজলাসে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া মিসরের প্রথম গণতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মাদ মুরসির আকস্মিক মৃত্যুতে শোকাহত গোটা মুসলিম বিশ্ব।

মঙ্গলবার তুরস্কের ৮১ প্রদেশে মুরসির গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেসব জানাজায় অংশগ্রহণ করতে লাখো লাখো মানুষ জড়ো হয়েছেন মসজিদে। খবর ইয়েনি শাফাকের।

ইস্তাম্বুলের ফাতিহ মসজিদে অনুষ্ঠিত জানাজায় হাজার হাজার মুসল্লির সঙ্গে মুরসির একনিষ্ঠ সমর্থক তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান অংশগ্রহণ করেছেন।

এরদোগান মুরসিকে ‘শহীদ’ বলে উল্লেখ করেছেন। এরদোগান ছিলেন মুরসির একনিষ্ঠ সমর্থক। দুজনের মতাদর্শেও অভিন্নতা দেখা গেছে।  যোগত্যা ও বৈশিষ্ট্যেও তাদের মধ্যে মিল রয়েছে। মুরসি ছিলেন এরদোগানের মতোই একজন কোরআনে হাফেজ।

তিনি যেখানেই যেতেন নিজে নামাজের ইমামতি করতেন। গত রমজানে কারাগারে তার ইমামতিতেই খতম তারাবিহ পড়েছে কারাবন্দিরা।

সদ্যপ্রয়াত মুরসির রাজনৈতিক জীবন ও তার মিশরের প্রথম গণতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট হয়ে ওঠার পেছনের ইতিহাস নিয়ে কৌতূহলী হয়েছেন অনেকে।

পাঠকের উদ্দেশ্যে তা তুলে ধরা হলো-

১৯৫১ সালের ২০ আগস্ট উত্তর মিসরের আল-আদওয়াহ প্রদেশে জন্ম হয় মুরসির। তার পুরো নাম  মোহাম্মদ মুরসি ইসা আল-আইয়াত। ৭০ এর দশকে কায়রো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকৌশল বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি​লাভ করেন। নিজের শিক্ষাজীবন শেষ করে শিক্ষক হিসাবেই প্রথম কর্মজীবন শুরু করেন মুরসি।

কর্মজীবনে ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি, নর্থরিজে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। কিন্তু দেশের প্রতি টান অনুভব করতেই থাকেন মুরসি।

অবশেষে নাড়ির টানে ১৯৮৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অধ্যাপনা ছেড়ে মিসরের চলে আসে। দেশে ফিরেও ওই একই অধ্যাপনার পেশায় নিজেকে যুক্ত করেন। মিসরের জাগাজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন তিনি।

২০০০ সালে মিসরে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন মুরসি। সাংসদ হিসেবে ২০০৫ সাল পর্যন্ত মিশরের সংসদে বহাল ছিলেন মুরসি।

২০১১ সালে আরব বসন্তের সময়ে প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখার জন্য মুসলিম ব্রাদারহুডের একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি হিসাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন মুরসি।

২০১২সালে ব্রাদারহুডের বিকল্প প্রেসিডেন্ট মুরসির নাম ঘোষণা করা হয়। পরে মূল প্রার্থী বাদ পড়লে তিনি নির্বাচন করেন এবং ২০১২ সালের জুনে মিসরের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হন।

২০১৩ সালের জুলাই পর্যন্ত ১ বছর ক্ষমতায় থাকাকালে মুরসির বিরুদ্ধে মিসরকে ইসলামিকরণের অভিযোগ ওঠে। সে সময় তার ইসলামপন্থি সংবিধান প্রণয়নের চেষ্টা গ্রহণযোগ্য হয়নি ধর্মনিরপেক্ষ ও উদারপন্থীদের কাছে। তার দ্রুত অর্থনৈতিক সংস্কারের উদ্যোগও সমালোচিত হয়।

এ সময় মুরসি ইরানের সঙ্গে মিসরের সম্পর্ক জোরদার করতে উদ্যোগ নেন। নির্যাতিত ফিলিস্তিনিদের পাশে দাঁড়ান মুরসি। দখলদার ইসরাইল অবরুদ্ধ গাজাবাসীর জন্য মিশরের সীমান্ত খুলে দিয়ে জেরুজালেম ও আল আকসা মসজিদের ওপর ফিলিস্তিনিদের নিয়ন্ত্রণের পক্ষে অবস্থান নেন তিনি। বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ভালো চোখে দেখেনি। বৈশ্বিক রাজনীতির এক সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্রের বেড়াজালে আটকে পড়েন মুরসি।

এরই মধ্যে তার বিরুদ্ধে দেখা দেয় আভ্যন্তরিণ বিক্ষোভ। তার এক বছরের শাসনকালে হোসনি মোবারক আমলের যেসব উর্ধ্বতন সেনা অফিসারদের রাষ্ট্রের গুরত্বপূর্ণ পদ থেকে সরিয়ে দেন তিনি তারা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।

আরব বসন্তের সময় গণতন্ত্র বিরোধী বেশ কিছু সেনা কর্মকর্তাকে বিচারের মুখোমুখি করতে চেষ্টা করেছিলেন মুরসি। আর এসব কারণে সেনাবাহিনী মুরসির বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠে।

২০১৩ সালে মুরসির বিরুদ্ধে শুরু হয় ব্যাপক গণবিক্ষোভ। তাহরির স্কয়ারেই মুরসির বিরুদ্ধে জড়ো হয় মানুষ। এই সুযোগে সংবিধান স্থগিত মুরসিকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করে কারাগারে বন্দি করে দেশটির সেনাবাহিনী।

আর এসবের পেছনের মূল হোতা মুরসির হাত ধরেই দেশটির সেনাপ্রধান হওয়া আবদেল ফাত্তাহ সিসি। মুরসিকে কারাবন্দি করে মসনদ দখল করেন তিনি।

মুরসি ক্ষমতাচ্যুত হবার পর মিসরের কর্তৃপক্ষ তার সমর্থক এবং মুসলিম ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করে।

ক্ষমতায় থাকার সময় আদালত অবমাননা করেন বলে অভিযোগ আনা হয় মুরসির ওপর। এরপর ২০১৬ সালের জুন মাসে তথ্য পাচারের এ মামলায় তাকে দোষী সাব্যস্ত করেন নিম্ন আদালত।

মুরসি ও তার সহযোগী মুসলিম ব্রাদারহুডের কয়েকজন নেতা কাতারে রাষ্ট্রের গোপনীয় তথ্য পাচার করে জাতীয় নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছিলেন এমন অভিযোগে মুরসিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেয় আদালত।

সবশেষ সোমবার মাত্র ৬৭ বছর বয়সে আদালতেই প্রাণ হারান মুরসি।