কেমন আছেন মিয়ানমারের মুসলমানরা?

  অনলাইন ডেস্ক ২৩ আগস্ট ২০১৯, ১২:৫১ | অনলাইন সংস্করণ

রোহিঙ্গা এক মা ও তার শিশুরা
রোহিঙ্গা এক মা ও তার শিশুরা। ফাইল ছবি

এক দশক ধরে মিয়ানমারে মুসলিমদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালিয়ে আসছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালে ধর্ষণ, হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক রোহিঙ্গা মুসলিম পরিবার পালিয়ে আসে।

পরবর্তী সময়ে বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমার থেকে আরও বহু পরিবার বিভিন্ন অজুহাতে পালিয়ে আসতে থাকে।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে দেশটিতে মুসলিমদের ওপর নৃশংস নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে- ইয়াঙ্গুনের তিনজন নিপীড়িত মুসলমান বিবিসির সংবাদদাতা নিক বিকের কাছে তাদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন।

অং নাইং সো, ফটোসাংবাদিক

২০১৬ সালের দিকে হঠাৎ করেই সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করা শুরু হলো আমাকে। ফেসবুকে আমার ছবি ছড়িয়ে পড়ল। একদল উগ্র জাতীয়তাবাদী বৌদ্ধ এ কাজ শুরু করে।

ঘটনা হচ্ছে- সন্ত্রাসীদের কোনো একটি ভিডিওচিত্রে একজনের চেহারার সঙ্গে আমার মিল ছিল। সেই ভিডিওর একটি স্ক্রিনশট নিয়ে আমার মুখের ছবির সঙ্গে তা পাশাপাশি রেখে সেই ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয়া হলো।

তার পর থেকে মুসলমান ফটোসাংবাদিক অং নাইং সো অনলাইনে লক্ষ্যবস্তু হয়ে গেলেন। সামাজিকমাধ্যমে মানুষ কিছু না বুঝেই, না জেনেই আমার বিরুদ্ধে ঘৃণা উগরে দিতে শুরু করলেন।

যখন ভিন্ন একটি ঘটনায় পুলিশ তাকে আটক করে, তখন পরিস্থিতি আস্তে আস্তে আরও খারাপ হয়ে উঠল।

টানা ১১ দিন ধরে আমাকে জেরা করা হয়। তার পর পুলিশ ২০১৬ সালে ফেসবুকে পোস্ট করা সন্ত্রাসী ভিডিও দেখিয়ে বলে আমিই নাকি সে।

এই ঘৃণার কারণ আমি ঠিক বুঝতে পারি না। সরকারি কর্মকর্তাদের মনে যেন মুসলিমদের ভেতর চরম এক ঘৃণা জমে রয়েছে। তারা যেন মুসলিমদের সহ্যই করতে পারে না।

টিন অং মিন্ট, ইয়াঙ্গুনে মুসলিম অধিকারকর্মী প্রতিদিন আপনি সামাজিকমাধ্যমে মুসলিমদের নিয়ে মনগড়া সব খবর দেখতে পাবেন। ফটোশপে বানিয়ে ছবি পোস্ট করতে দেখবেন। কিন্তু এগুলোর বিরুদ্ধে কিছু করার কোনো উদ্যোগ কারও মধ্যেই নেই।

এ ধরনের কোনো একটি বিষয় পোস্ট করা হলেই তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আমি তখন বুঝতে পারি, এ নিয়ে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়তে পারে।

প্রধানত সে কারণে টিন অং মিন্ট ফেসবুকে একটি পর্যবেক্ষণ গ্রুপে নাম লিখিয়েছেন। এ গ্রুপের সদস্য সংখ্যা প্রায় তিন হাজার। সোশ্যাল মিডিয়াতে মুসলিম বিদ্বেষী বিভিন্ন পোস্টের দিকে এরা নজর রাখেন।

আমরা নিজেদের এ দেশের নাগরিক মনে করলেও তারা আমাদের ভিন্ন কিছু ভাবে। এ রকম বৈষম্য চলতে থাকলে মুসলমানরা আরও বেশি করে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।

বিবিসির নিক বিক বলছেন, সত্যি কথা বলতে কী- রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর যে নির্যাতন, যে অপরাধ হয়েছে, তা নিয়ে মিয়ানমারের সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধদের বিন্দুমাত্র কোনো মাথাব্যথা নেই। আর তাতেই মুসলমান এবং অন্য সংখ্যালঘুরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।

খিন সান্ডার, মানবাধিকারকর্মী, ইয়াঙ্গুন

আপনি যদি চাকরির জন্য আবেদন করেন, আর আপনি যদি মুসলিম হন, তা হলে ওই চাকরি হয়তো আপনি পাবেন না। পরিচয়পত্র বা নাগরিক কার্ড নবায়ন করা এখন মুসলমানদের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

খিন সান্ডার নিজেও এ নিয়ে ভোগান্তির শিকার হয়েছেন।

পরিচয়পত্র নবায়ন করতে গিয়ে আমার দুবছর লেগেছে। অথচ বৌদ্ধরা দুসপ্তাহ বা বড়জোর ২৮ দিনের ভেতরে তা পেয়ে যায়।

বাংলাদেশে বর্তমানে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়ে আছেন। তাদের বেশিরভাগই মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর বর্বর অভিযান থেকে জীবন বাঁচাতে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।

বাংলাদেশ কয়েক দফায় ৫৫ হাজার রোহিঙ্গার তালিকা মিয়ানমারের কাছে হস্তান্তর করে। তাদের মধ্য থেকে মিয়ানমার তিন হাজার ৪৫০ জনকে যাচাই করে ফেরত নেয়ার জন্য তালিকা পাঠায়।

বাংলাদেশ সরকারের ত্রাণ, পুনর্বাসন ও প্রত্যাবাসন কমিশন এবং ইউএনএইচসিআরের গঠিত কমিটি তালিকাভুক্তদের সাক্ষাৎকার নেয়া শুরু করে। এতে কেউ মিয়ানমারে ফিরতে রাজি না হওয়ায় সংকটটি নতুন মাত্রা লাভ করে।

এর আগে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে তাদের ফিরিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে বাংলাদেশ-মিয়ানমার প্রত্যাবাসন চুক্তি সম্পন্ন হয়। একই বছরের ৬ জুন নেপিদোতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে মিয়ানমার ও জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর মধ্যেও সমঝোতা চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী, গত বছরের ১৫ নভেম্বর প্রত্যাবাসনের তারিখ নির্ধারণ হয়। তবে আবারও হামলার মুখে পড়ার শঙ্কায় তারা নিজ দেশে ফিরতে অস্বীকৃতি জানালে ব্যর্থ হয় ওই উদ্যোগ।

দু’বছর আগে নিপীড়নের মুখে পালিয়ে কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের কেউ মিয়ানমারে ফিরে যেতে রাজি না হওয়াকে ‘দুঃখজনক’ বলেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন।

একদফা পেছানোর পর বৃহস্পতিবার থেকে প্রত্যাবাসন শুরুর কথা থাকলেও দুপুর পর্যন্ত কেউ রাজি হয়নি। এরপর বিকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সামনে এ প্রতিক্রিয়া জানান।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার চেয়েছে বৃহস্পতিবার থেকেই প্রত্যাবাসন শুরু হোক। কিন্তু রোহিঙ্গারা যে যেতে চাচ্ছে না, এটা দুঃখজনক। এটা আমরা প্রত্যাশা করি না। তবে বৃহস্পতিবার প্রত্যাবাসন শুরু হয়নি বলার জন্য বিকাল ৪টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে বলে মোমেন জানান। প্রত্যাবাসন শুরু না হলে কী হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এরপরও আমরা প্রক্রিয়াটা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করব। আমরা জোর করে কিছু করব না। আমরা প্রস্তুত, আমাদের কোনো গাফিলতি নেই। আস্থার যে ঘাটতি আছে সেটা দূর করতে মিয়ানমারকেই কাজ করতে হবে। আমরা আশায় বুক বেঁধে আছি।

প্রত্যাবাসনের কার্যক্রম দেখতে মিয়ানমার ও চীনের প্রতিনিধিরা কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে রয়েছেন বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। মিয়ানমার ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে শরণার্থী শিবিরের রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া সংবলিত প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন ও লিফলেট বিলির প্রসঙ্গে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, কারা প্ল্যাকার্ড বা লিফলেট করে দিচ্ছে, তাদের আমরা চিহ্নিত করছি। তারা বিভিন্ন ডিমান্ড করছে। তাদের ডিমান্ডের কাছে আমরা জিম্মি হতে পারি না।

রোহিঙ্গারা বলছে, মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর আগে তাদের নাগরিকত্ব, জমিজমা ও ভিটেমাটির দখল, নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এক বছর আগের পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ার পর দুই সরকারের উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের পাঠানো তালিকা থেকে ৩ হাজার ৪৫০ জনকে রাখাইনের অধিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের ফেরত নিতে রাজি হওয়ার কথা গত সপ্তাহে জানায় মিয়ানমার।

এরপর গত তিন দিন ধরে ইউএনএইচসিআরকে নিয়ে বাংলাদেশের শরণার্থী কমিশনারের কার্যালয় ফেরার বিষয়ে মনোভাব জানতে রোহিঙ্গাদের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। প্রত্যাবাসনের জন্য নির্বাচিত শরণার্থীরা কক্সবাজারের ২৪, ২৬ ও ২৭ নম্বর শিবিরে আছে। প্রথম দু’দিনে ২৩৫ পরিবারের সাক্ষাৎকার নেয়ার পর বৃহস্পতিবারও সাক্ষাৎকার চলছিল। শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. আবুল কালাম জানান, বেলা ১টা পর্যন্ত যাদের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে তাদের কেউ ফিরে যেতে রাজি হননি।

ঘটনাপ্রবাহ : রোহিঙ্গা বর্বরতা

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×