এনআরসিতে ব্যর্থ বিজেপি, মুসলিমদের নিয়ে নতুন পরিকল্পনা

  গৌতম দাস ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২২:৩৬ | অনলাইন সংস্করণ

আসাম
ছবি: সংগৃহীত

আসামের বৈধ ভারতীয় নাগরিকের যাচাই ও তাদের এক তালিকা তৈরির প্রক্রিয়ার (এনআরসি) সমাপ্ত হয়েছে,গত ৩১ আগস্ট সেই চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। এবারের ফাইনাল তালিকায় যারা নাম তুলতে পারেনি তাদের সংখ্যা নেমে এসেছে প্রায় ১৯ লাখে। যদিও ২০১৮ সালে প্রথমবার প্রকাশিত খসড়া তালিকায় এদের সংখ্যা ছিল ৪০-৪২ লাখের মতো।

গল্পের পাণ্ডলিপিতে যেমন দ্বন্দ্ব-উত্তেজনা ক্রমে ক্রমে এক ক্লাইমেক্সে পৌঁছায় আসামের এনআরসি তৈরিতে এমন ক্লাইমেক্স এ থেকে কম কিছু ছিল না। কে নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে সক্ষম হয় আর কে নয় এটা আসামের প্রায় সবার মধ্যেই বিরাট অনিশ্চয়তা ও উত্তেজনা তৈরি করেছিল।

আসামের এনআরসি তৈরিতে এর গল্পের উত্তেজনার চরম বা ক্লাইমেক্স সময়টা কখন তুলতে পেরেছিল সেটাও সুনির্দিষ্ট করে চেনা যায়। আর এরপর থেকে উত্তেজনা নামতে শুরু করে চলতে চলতে এখন এককথায় বলা যায় এটা একেবারেই ভাটির দিকে।

যদিও বাংলাদেশের পাবলিক পারসেপশন হল,এবার বুঝি বিজেপি ১৯ লাখ উদ্বাস্তু বাংলাদেশের ঘাড়ে চড়াবার ক্রমাগত চেষ্টা শুরু করবে। খুব সম্ভবত এই পারসেপশন ভুল প্রমাণিত হবে।

সিনেমা বা নাটকের কাহিনীর পাণ্ডুলিপি লেখার সময় সাধারণত একটা নিয়ম মেনে চলা হয়। সেটা হল,অন্তত প্রথম অর্ধ বা এরও কিছু বেশি সময় ধরে চলে দ্বন্দ্ব-নির্মাণ। মানে পাত্র-পাত্রীদের মধ্য কোনো দ্বন্দ্ব-সংঘাত দেখাতে ঐ গল্প লেখা হয়েছে,সেই দ্বন্দ্ব মূলত কী নিয়ে সেটাকে দর্শকের সামনে ভালোভাবে যথেষ্ট সময় দিয়ে বিস্তারিত উপস্থাপন করা।

আর এরপরে কাহিনীর অংশ হল,সেই দ্বন্দ্ব কিভাবে নিরসন হল তা দেখানো। প্রথম অংশে দ্বন্দ্ব যত ভালোভাবে তুলে ধরা হবে,আর তাতে দর্শক সংশ্লিষ্টবোধ করবে ততই দ্বন্দ্বের নিরসনে দর্শকের মনে তা দাগ কাটবে।

তাই যে কোনো পাণ্ডুলিপিতে দ্বন্দ্ব-সংঘাত কখন চরমে উঠেছিল তা চিনা খুব কঠিন নয়। আসামের এনআরসির ক্ষেত্রে এর দ্বন্দ্ব চরমে ওঠার কাল পার হয়ে গেছে।

আসামের এনআরসির শুরুটা বিজেপির হাতে তৈরি নয়। মানে বিজেপিই একমাত্র উগ্র জাতীয়তাবাদী নয়। এর শুরু করেছিল অসমীয়া উগ্র জাতীয়তাবাদ; যা দাঁড়িয়ে আছে আবার ১৯৮৫ সালের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর সঙ্গে এই উগ্র জাতীয়তাবাদীদের ‘১৯৮৫ একর্ড’ নামে এক চুক্তির ওপর।

অসমীয় উগ্র জাতীয়তাবাদীদের দাবি ছিল,অ-অসমীয়দের (বিশেষ করে কথিত বাংলাদেশের বাঙালি ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পরে যারা আসামে এসেছে তাদের)আসাম থেকে বের করে দিতে হবে। এখানে বাঙালি মানে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বাংলাদেশের বাঙালি বা অ-অসমীয় বাঙালি।

বিজেপি প্রথম আসামের রাজ্য নির্বাচনে কোয়ালিশনে জিতে আসে ২০১৬ সালে,এরপর থেকে তারা এবার ঐ দ্বন্দ্বটাকে হাজির করে হিন্দু-মুসলমান হিসেবে। তাই বিজেপির ভাষ্য কথিত বাংলাদেশি বাঙালি না,কথিত বাংলাদেশি মুসলমানদের বের করে দিতে হবে।

গত ২০১৩ সালে কোনো সরকার না,ভারতের সুপ্রিম কোর্ট নিজ তত্ত্বাবধানে আসামের এনআরসি তৈরির কাজ শুরু করেছিল,এক প্রধান আমলা (কো-অর্ডিনেটর) প্রতীক হাজেলার নেতৃত্বে যে সরাসরি আদালতের কাছেই কেবল জবাবদিহি করবে।

কিন্তু আসামের এনআরসি তৈরির কাজের শুরু থেকে যে প্রবল বাধা সব সময় কাজ করে গেছে তা হল,আসামের মানুষের উগ্র জাতীয়তাবাদী মনে গেঁড়ে বসা পারসেপশনের সঙ্গে লড়াই। কেন,কিসের লড়াই? উগ্র জাতীয়তাবাদ দিয়ে তাদের আগের সংগ্রাম পরিচালিত হয়েছিল বলে আসাম বা অহমীয়দের মনে গেথে বসা ধারণা হল তাদের সব দুঃখের কারণ হল ‘বহিরাগত বাঙালি’।

কিন্তু কোন সৎভাবে যাচাই করা প্রক্রিয়া-পরিসংখ্যান দিয়ে তাদের সেই অনুমান সত্য বলে আগে প্রমাণিত হতে হবে, এটা তারা কখনও বুঝতে চায় নি। শুধু তাই নয় এমনকি বাস্তব সত্য তাদের পারসেপশন থেকে ভিন্ন পাওয়া যেতে পারে সেটাও মেনে নিতে তৈরি থাকতেই হবে। কিন্তু সেটা না হয়ে ওর বদলে তাদের আকাঙ্খা হয়ে গেছে উলটা।

এই- যে এনআরসি প্রক্রিয়ার কাজ হবে যেন এটা তাদের মনের সেই আকাঙ্খা-অনুমানের পক্ষে রায় যোগাড় করা। ‘বাঙালিরা বহিরাগত’ এরই স্বপক্ষে প্রমাণ হিসাবে এনআরসির ফলাফলকে হাজির হতেই হবে। তাতে বাস্তব সত্য যাই থাক। কারণ আসামে ‘বাঙালিরা বহিরাগত’ এটা বিশ্বাস করাই হয়ে উঠেছিল অহমিয় দেশপ্রেমিকতার প্রমাণ।

ব্যাপারটা অনেকটা এমন যে, কাউকে মেরে ফেলতে চাই এটা আগেই ডিসাইডেড। তাই আদালত যেন যে কোন উপায়ে ওর ফাঁসির পক্ষে একটা রায় দেয় – সেজন্য ঝুলাঝুলি। এমন কী আদালত যদি ব্যর্থ হয় তাতে মনে করতে হবে যে আদালত পক্ষপাত করেছে।

এখানেও তাই হয়েছিল। আসামের এনআরসি এটা প্রতি পদে ‘কেউ বহিরাহত’ কিনা এর যাচাই প্রক্রিয়া থাকতে পারে নি কখনও। বরং হয়ে উঠেছিল পাবলিক প্রিযুডিস বা আগাম ধরে নেয়া যে ‘বাঙালিরা বহিরাগত’ – এরই পক্ষে রায় যোগাড়ের এক প্রক্রিয়া। এই চাপ ২০১৩ সাল থেকে পুরাটা সময় অব্যহত ছিল।

এর মধ্য ২০১৬ সালে বিজেপি রাজ্য সরকারে জয়ী হয়ে আসে, ফলে সেই চাপ এবার আরও শক্ত হয়। কিন্তু ২০১৮ সালের জুলাইয়ে প্রথম খসড়া নাগরিক তালিকা বের হলে এতে দেখা যায় প্রায় ৪০ লাখের মত লোক নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারে নি।

আর এরচেয়েও বড় বিপদ দেখা দেয় যে এর মধ্যে হিন্দু নাগরিকেরাই বেশি এমন কানাঘুষা শুরু হয়। যদিও অফিসিয়ালি কখনই হিন্দু-মুসলমানের সংখ্যা কত তা আলাদা করে বলা হয় নাই, কিন্তু আন -অফিসিয়ালি সবাই জানত।

ইতিমধ্যে চুড়ান্ত তালিকায় মুসলমানের সংখ্যা যাতে বেশি দেখানো যায় বিজেপি এনিয়ে অনেক পরিকল্পনা করতে থাকে। ওদিকে আদালতে অনেক তর্কবিতর্কের পর চুড়ান্ত নাগরিক তালিকা পেশ করার দিন সাব্যস্ত হয়েছিল ৩১ জুলাই ২০১৯।

তাই দু’মাস আগে থেকেই কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার একসঙ্গে আদালতে পিটিশন দেয় যে এনআরসিতে তালিকা নির্ভুল করা যায় নি। তাই বাংলাদেশ সীমান্ত বরাবর আসামের এলাকায় ২০% ডাটা আবার যাচাই,আর সারা আসামে ১০% ডাটা আবার যাচাই করতে হবে। এর জন্য অনুমতি ও সময় অনির্দিষ্টকাল বাড়িয়ে দিতে হবে। খুব সম্ভবত এটা ছিল বিজেপির এবার অনুমতি পেলে ডাটা ম্যানিপুলেশন করার সুযোগ ও অজুহাত।

কারণ ঐ পিটিশনে তারা বারবার যুক্তি দিচ্ছিল এবার আসামের বাইরে থেকে সরকারি আমলা এনে কাজটা করতে দিতে হবে। এছাড়া ইতিমধ্যে দেখা গিয়েছিল মুসলমান অধ্যুষিত আসামের জেলাগুলোতে ৯০% এর বেশি মুসলমান জনগোষ্ঠি নিজেদের নাগরিক প্রমাণ করে নাম তালিকায় তুলতে সক্ষম হয়েছিল।

আসামের রাজ্যে সংসদে তা দেখিয়েছিল সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী। কিন্তু সব পরিকল্পনায় পানি ঢেলে দেয় আদালত। শুনানিতে আদালত ঐ পিটিশন নাকচ করে দেয় এই যুক্তিতে যে এর আগে প্রধান আমলা প্রতীক হাজেলা আদালতে এক লিখিত রিপোর্টে জানিয়েছিল যে এর আগে ‘২৭% ডাটা আবার একবার দ্বিতীয় যাচাই’ করা হয়ে গেছে।

যে নাটকের পাণ্ডলিপির কথা বলে শুরু করেছিলাম যেখানে ক্লাইমেক্স মুহুর্ত তৈরি হয়। যারপর থেকে শুরু হয়ে যায় দ্বন্দ্ব নিরসন পর্ব এভাবে নাটকের সমাপ্তি – ঠিক সেরকম দ্বন্দ্ব-সংঘাতের চরম মুহুর্তের পর্যায়টা ছিল গত ২৩ জুলাই ২০১৯।

ঐ দিনের আগ পর্যন্ত ছিল আদালতে ‘২০% ডাটা আবার যাচাই’ এর দাবিতে কেন্দ্র-রাজ্যের যৌথ পিটিশনে চাপ তৈরি। আর ২৩ জুলাইয়ের শুনানির রায় ছিল ‘আবেদন নাকচ’। তবে আদালত চুড়ান্ত তালিকা প্রকাশের দিন মাত্র একমাস বাড়িয়ে ৩১ আগষ্ট করে দিয়েছিল।

আদালতের এই নাকচে ‘বহিরাগতরা বাঙালি’ অথবা ‘মুসলমান’ – এই প্রিযুডিস আগাম অ-প্রমাণিত পারসেপশন,মৃত হয়ে যায়। কারণ আর কোন ম্যানিপুলেশনের সুযোগও শেষ হয়ে যায়। তাই এই রায়ের পরদিন থেকে বলা যায় বিজেপি ও অহমিয় জাতীয়তাবাদের হার স্বীকারের পর্ব।

বিজেপি কৌশল নিয়েছিল সব ব্যার্থতার দায় আমলা প্রতীক হাজেরার ওপর চাপিয়ে দিবে। তাই আসাম-বিজেপির সভার প্রস্তাব নেয়া হয়েছিলও তাই। একইভাবে আসামের প্রায় সব আঞ্চলিক দল ও অহমিয়া জাতিবাদের চোখে প্রতীক হাজেরা হয়ে যান প্রধান ষড়যন্ত্রকারী বিশ্বাসঘাতক।

তবু বিজেপির মুখরক্ষার একটা শেষ চেষ্টা নেয়া ছিল অনেক আগেই,সেট ছিল ০৭ আগস্ট বাংলাদেশের সঙ্গে দুই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক। কিন্তু বাংলাদেশ সেখানে শক্ত অবস্থান নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলে,আসামের এনআরসি নিয়ে ঐ বৈঠকে কোন আনুষ্ঠানিক আলাপের চিহ্ন রাখাও সম্ভব হয় নি।

তবে ভারত আর চাপাচাপি না করে পিছিয়ে যায় অন্য আর এক কারণে। দুই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকের দু’দিন আগে ০৫ আগষ্ট মোদির কাশ্মীরকে ভারতের অঙ্গ করে নেয়া সম্পন্ন হয়েছিল। ফলে ভারতের প্রয়োজন পড়ে এমন বন্ধুর যারা ‘কাশ্মীর ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে অবস্থান নিবে।

তাই পরে ২০-২১ আগষ্ট ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়সঙ্করের বাংলাদেশ সফরের প্রস্তুতি থেকেই অনুমান করা হয় এনিয়ে একটা ডিল হয়েছে। তা হল,ভারত আর আসাম নিয়ে মুসলমান ফেরত নিতে কথা তুলবে না, বাংলাদেশকে আর জড়ানোর চেষ্ট করবে না। এরই কূটনৈতিক স্বীকারোক্তি দিবে যে আসামে অবৈধ অভিবাসী চিহ্নিতকরণের যে প্রক্রিয়া চলছে সেই ‘আসামের এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়’।

আমরা কাশ্মীরের প্রসঙ্গের দিকে আর যাব না। তাহলে এ পর্যন্ত সারনির্যাস হল, গত ২৩ আগস্ট ছিল আসাম এনআরসি নাটকের ক্লাইমেক্স। সেদিনের পর থেকে বাস্তবত বিজেপি এই ইস্যুতে হার স্বীকার করে নিয়েছে। কিন্তু নিশ্চয় তারা খোলাখুলি বলতে পারে না বা বলবে না যে তারা হেরে গেছে। ফলে এখন থেকে বিজেপি যা বলবে তা হল ড্যামেজ সামলানো বা মুখরক্ষামূলক কথাবার্তা।

যেমন,লক্ষ্যণীয় যে আসাম এনআরসি ইস্যুতে কেন্দ্রের কোন মন্ত্রী বা প্রতিনিধি কোন বক্তব্য দেন নি। মনে হচ্ছে ভারত কথা রেখেছে। যদিও মুল প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন মূলত বিজেপি হিমন্ত-বিশ্ব শর্মা। পুরো আসামের সব রাজনৈতিক পক্ষই বলছেন যে নাগরিক তালিকা পাওয়া গেল এটা ত্রুটিপুর্ণ। আর প্রতীক হাজেলা সব ব্যর্থতার জন্য দায়ী।

বিজেপির মতেও, ‘হাজেলার খেয়ালখুশিতে তৈরি তালিকা ভুল’। বিজেপির এই হেমন্ত-বিশ্ব শর্মা তিনি হলেন আসাম সরকারের অর্থমন্ত্রী। কিন্তু এটুকু দিয়ে তাকে চেনানো যাবে না। তিনি আসলে পুরো নর্থ-ইস্টের অমিত শাহ, সম্ভবত এভাবে বলা যায়। তাই তিনি এখন যা যা বলছেন তাই বিজেপির আসল ভাষ্য।

আসাম এনআরসি নাটকের ক্লাইমেক্স কখন উঠেছিল তা আগে বলেছি। এখন শেষ দৃশ্যে কী হবে তা আগেই বলে দিয়ে শুরু করি। প্রথমত ১ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়ে গেছে সব ধরণের উত্তেজনা একেবারে ঠান্ডা করে নামিয়ে ফেলার দিন। আর বিজেপির নেতৃত্বে তা ঘটবে।

আর শেষ হবে যেখানে

অন্য যেকোন দেশ থেকে আসা যেকোন হিন্দু ভারতে আশ্রয় নিয়ে নাগরিকত্ব চাইলে তাকে তা দেয়া হবে -এই নীতিতে গত সংসদে যে আইন পার্লামেন্টে পাশ হলেও রাজ্যসভায় পেশ করাই হয় নি,তা এবার অচিরেই দুই সংসদে পাশ করা হবে। আর তা দিয়ে এই প্রায় ১৯ লাখ যারা নাগরিক তালিকায় নাম তুলতে পারে নি এমনদের মধ্যে কেবল হিন্দুদেরকে নাগরিকত্ব দিয়ে দেয়া হবে।

আর ১৯ লাখের মধ্যে যারা মুসলমান তাদের নাগরিকত্ব হারিয়ে কেবল ভোট দেয়ার অধিকার বাদে আগের মতই আসামে বসবাস ও কাজ করতে দেয়া হবে। এই হল এর সার কথাটা।

কিন্তু এই কথাগুলো নিশ্চয় এমন সরাসরি ভাষায় আসবে না বা বিজেপি বলবে না। ধাপে ধাপে আসবে এবং ঘুরিয়ে বলবে এমন।

যেমন ১ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় সরকারের একটা বিবৃতি ছিল এমন-‘আসামের জাতীয় নাগরিকপঞ্জিতে (এনআরসি) যাদের নাম ওঠেনি,তাদের একজনকেও আটক করা হবে না। আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়া পর্যন্ত তারা সব ধরনের রাষ্ট্রীয় অধিকার ভোগ করতে পারবে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রবীশ কুমার এক বিবৃতিতে এ কথা জানিয়েছেন’। এছাড়া আসামের মুখ্যমন্ত্রীও জানিয়েছেন, সরকার নিজে আইনি প্রক্রিয়ায় যা সহায়তা লাগবে দিবে।

লক্ষ্যণীয় যে আগে ইতিমধ্যে যে কয়টা আদালতে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে তার সবই ভুক্তভোগীকে নিজ পয়সায় করতে হয়েছে। এমনকি নিজে পয়সায় বাসভাড়া করে সদলে এনআরসির অফিসে হাজিরা দিয়েছে। পথে একসিডেন্ট হয়েছে তাতে ক্ষুধা-তৃষ্ণায় আশ্রয়, চিকিৎসা নিয়ে হেস্তনেস্ত হতে হয়েছে তাদের।

কেন? কারণ বিজেপি যেহেতু এখন হিন্দুদের ভিন্ন পথে নাগরিকত্ব দিবে তবে আর তাদেরকে হেস্তনেস্ত করা কেন,বরং খাতির করে এদের ভোট নিশ্চিত করাই হবে বিজেপির জন্য সঠিক কাজ। এই কথাটাই হেমন্ত বিশ্ব শর্মা বলছেন, কিন্তু ভিন্ন শব্দে।

আনন্দবাজার লিখেছে, ‘অর্থমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মার অভিযোগ, ১৯৭১ সালের আগে যারা পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভিটেমাটি খুইয়ে এসেছিলেন, তাদের অনেকের নাম তালিকায় নেই। কারণ, এনআরসি কর্তৃপক্ষ উদ্বাস্তুর শংসাপত্রকে যোগ্য নথি বলে স্বীকার করেননি’।

পাশাপাশি,অনেক বিদেশি ভুয়ো ‘লেগাসি ডেটা’ জোগাড় করে নাম তুলেছেন। তার দাবি, ‘অসমকে বিদেশি-মুক্ত করার অন্য পদ্ধতি দিল্লি ও দিসপুর বার করছে। যারা শিব-কালী-দুর্গার পুজো করেন,তাদের চিন্তার কারণ নেই। নাগরিকত্ব মিলবেই’।

প্রথম উদ্ধৃত অংশে, দেখানো সহানুভুতি এই প্রথম, আগে কখনও দেখা যায় নি। আর দ্বিতীয় উদ্ধৃতিতে, ‘অন্য পদ্ধতি দিল্লি ও দিসপুর বার করছে’ – এর ‘অন্য পদ্ধতি’ বলতে হিন্দুদের জন্য নতুন নাগরিকত্ব আইনের কথা বুঝানো হয়েছে। যেখানে দিল্লি ও দিসপুর মানে মোদির সরকার ও আসাম রাজ্য সরকার।

এছাড়া ‘যারা শিব-কালী-দুর্গার পুজো করেন,’ বলতে হিন্দুদেরকে বলছেন ‘তাদের চিন্তার কারণ নেই। নাগরিকত্ব মিলবেই’।

গত ১ সেপ্টেম্বরের সকাল পর্যন্ত হিমন্তবিশ্ব শর্মা এসব কথা মিডিয়াকে বলেছেন। এরপর বেলা গড়ালে আর এক নতুন স্টেজ সাজিয়েছেন। সকালে অনেক মিডিয়ার সামনে কথা বললেও এরপর কেবল ভারতের নিউজ১৮ [NEWS18] বলে এক টিভি মিডিয়া আছে,কেবল সেখানে একান্তে কথা বলেছেন।

সেখানে, বাদ পড়া ১৯ লাখের মধ্যে যারা মুসলমান অথবা যারা নাগরিকত্ব আইনে নাগরিক হবেন না মূলত তাদের কথাই বলা হয়েছে। এদের সম্পর্কে হিমন্তবিশ্ব শর্মা বলছেন, এদের মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটবে না। তবে এবারই বাংলাদেশ উচ্চারণ করেছেন না পারতে বলার মত করে। বলছেন, ‘আমরা বাংলাদেশের কাছে বলব তাদের লোক ফেরত নিতে কিন্তু তা না নেয়া পর্যন্ত এদেরকে ভোটের অধিকার ছাড়া নাগরিক সুযোগ সুবিধাগুলো দিব’।

আসলে এটাই হিমন্তর মুসলমানদের সম্পর্কে মূল কথা। তিনি ভোটের অধিকার বাদে আগের মতই সব দিবেন।

একই রিপোর্টের শেষে তিনি এবার বাংলাদেশকে জড়ানোর বিষয়ে কয়েক ধাপ পিছয়ে গিয়ে বলছেন, ‘কোন মানুষের নাম প্রমাণিত নাগরিক তালিকায় না থাকা মানেই এটা না সে ফরেনার ও তাকে বাংলাদেশে পাঠাতে হবে’। খুবই তাৎপর্যপুর্ণ বক্তব্য। এর সোজা মানে ভোটের অধিকারবিহীন মুসলমানদের তিনি বাংলাদেশে পাঠানোর কথা বলছেন না। ভারতেই রেখে দিতে চাচ্ছেন।

এরপর বলছেন ওসব ব্যক্তির পরের স্টাটাস নিয়ে ‘আইনি লম্বা প্রক্রিয়া আছে। তা শেষ হবার আগে এই ব্যক্তিরা ভারতের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় [ভোট দান] অংশ নিতে পারবে না’।

এই লম্বা আইনি প্রক্রিয়ার কথা তুলে,তিনি ভোটদানের অধিকার ছাড়া এদের ভারতে থাকার সব সুবিধাই দিতে চান। এছাড়া এখানে দেখা যাচ্ছে প্রথমত ‘বাংলাদেশের কাছে বলবেন’ – এই বলার ক্ষেত্রে হিমন্তবিশ্ব কিন্তু কেউ নন। কারণ তিনি কেন্দ্র সরকারেই কেউ না। এ থেকে দাবি করা যায় এটা কেন্দ্রের আনুষ্ঠানিক অবস্থান নয়। যেন সেটাই নিশ্চিত রাখতে এই নিউজ১৮ পরে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গেও ফোনে কথা বলেছেন।

আমাদের মন্ত্রী বলেছেন, আগে ভারত থেকে আনুষ্ঠানিক কোন চিঠি আসুক এরপর এর জবাব দিবেন। অর্থাৎ মানে দাড়ালো কথা একটা হিমন্তবিশ্ব বললেন কিন্তু তা বাংলাদেশের কাছে আসেই নি।

এমনভাবে বললেন, কারণ তিনি বাংলাদেশকে বলার সঠিক লোক না। এটাই প্লান বি। অর্থাৎ জয়শঙ্কর যেটা বলে গেছেন,বাংলাদেশকে জড়াবেন না, সেটাই থাকল।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক

ঘটনাপ্রবাহ : আসামে বাঙালি সংকট

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×