সৌদি প্রতিরক্ষার ফাঁকফোকর

  যুগান্তর ডেস্ক ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৫:৫৪ | অনলাইন সংস্করণ

সৌদি প্রতিরক্ষার ফাঁকফোকর
সৌদি তেল স্থাপনায় হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্রের অবশিষ্টাংশ। ছবি: এএফপি

আকাশ প্রতিরক্ষা ও আগাম সতর্কব্যবস্থায় কোটি কোটি ডলার খরচ করেছে সৌদি আরব। কিন্তু শনিবার ক্রুজ মিসাইল ও ড্রোন সফলভাবেই দেশটির আকাশসীমায় ঢুকে হামলা চালাতে সক্ষম হয়েছে।

এতে বাকিকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল প্রক্রিয়াজাতকরণ স্থাপনায় উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে। দেশটির তেল উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছিল।-খবর সিএনএনের

সৌদি প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও পরিকল্পনায় মারাত্মক ভুল রয়েছে বলে এতে প্রমাণিত হয়েছে। ড্রোনের যুগে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জন্য বড় নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

হামলা ব্যবহৃত ক্রুজ মিসাইলে ১৯৭০ সালের পর রাশিয়ার পরিকল্পনায় নতুন যন্ত্রাংশ যুক্ত করে অত্যাধুনিক করে তোলা হয়েছে।

আর নতুন প্রযুক্তিতে ড্রোন এখন গরিব মানুষের ক্ষেপণাস্ত্র। অন্য কথায় বিশ্বের ৫ শতাংশ তেল সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে এমন এক অস্ত্র, যার দাম কোটি কোটি ডলার তো দূরের কথা লাখ ডলারও না।

এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, সৌদি ও মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা উৎক্ষেপণ স্থলকে শনাক্ত করতে পারেনি। এর একটা কারণ হতে পারে যে অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা স্থাপনা ইয়েমেনমুখী করে বসানো হয়েছে।

গত দুই বছর ধরে সেখান থেকে হুতি বিদ্রোহীরা নিয়মিতভাবেই ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে আসছে।

হামলার পর ইরানের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে নির্দেশ দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি সুনির্দিষ্টভাবে তেহরানকে দায়ী করেননি। কিন্তু তার প্রশাসনের অন্যরা ইরানকেই হামলায় দায়ী বলে উল্লেখ করছে। যদিও সেই অভিযোগ অস্বীকার করছে তেহরান।

হামলার তদন্তের সঙ্গে জড়িত সৌদি ও মার্কিন সূত্র জানায়, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা যাতে শনাক্ত করতে না পারে, সে জন্য খুবই কম উচ্চতা দিয়ে উড়ে এসেছে ক্রুজ মিসাইল।

এ ছাড়া সৌদি-মার্কিন রাডারব্যবস্থা যেদিকে জোরালো, সেই পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলকে ভালোভাবেই এড়িয়ে এসে হামলা চালাতে পেরেছে এই ক্ষেপণাস্ত্র।

গেল দুই বছরে ইয়েমেন থেকে আসা ঝাঁকে ঝাঁকে স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কার্যকরভাবেই মোকাবেলা করতে পেরেছেন সৌদিরা।

দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল তুরকি আল মালকি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, তারা ২৩০টির বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে পেরেছেন।

দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প ধরে রাখা কিংবা ছেড়ে দেয়া এখনকার কোনো সমস্যা নয়। মার্কিন নির্মিত প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের ছয়টি ব্যাটালিয়ন আছে সৌদি আরবের। এতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকাতেই এগুলো স্থাপন করা হয়েছে।

জেইনস ডিফেন্স উইকলির মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সম্পাদক জেরেমি বিন্নি বলেন, উপগ্রহ থেকে পাওয়া ছবির তথ্যানুসারে পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশকে সুরক্ষায় সেদিকেই প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপন করা হয়েছে। মাত্র একটি ইরানমুখী, বাকিগুলো ইয়েমেনের দিকে তাকিয়ে আছে।

সম্প্রতি বাকিকের পশ্চিমে নতুন একটি মোতায়েন করা হয়েছে। কিন্তু সেটিও ইয়েমেনের দিক মুখ করে আছে। কিন্তু উত্তর থেকে আসা যেকোনো ক্রুজ মিসাইল ক্ষণিকের জন্য রাডারে ধরা পড়তে পারতো। কিন্তু ধরা পড়েনি।

বিন্নি বলেন, এসব সমস্যার কথা ভেবে, ইরান এমন ধরনের ক্রুজ মিসাইল বানিয়েছে, যেটা এই ভিন্নমুখীতা থেকে সুবিধা নিতে পারে।

সৌদি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইতিমধ্যে ইয়েমেন থেকে আসা হুমকির মুখে রয়েছে। কিন্তু ইরানের নতুন এই অস্ত্র দেশটিতে হামলার আরও সুযোগ বের করে দিয়েছে।

২০১৭ সালের অক্টোবরে রুশ এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কেনার পরিকল্পনা করেছিল সৌদি আরব। প্যাট্রিয়টের চেয়ে যেটির পাল্লা অনেক বেশি।

মূলত দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র রোধের পরিকল্পনা থেকে এস-৪০০ নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু প্যান্টসার এস১ নামের রাশিয়ার একটি ছোট ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে।

প্যান্টসার এস১ স্বল্পপাল্লার ক্রুজ মিসাইল কিংবা ড্রোনও প্রতিরোধ করতে পারে। এটির ক্ষেপণাস্ত্র ও বন্দুক দুটিই রয়েছে। কিন্তু বিন্নির মতে, সিরিয়ায় এটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি।

স্বল্পপাল্লার হামলা মোকাবেলায় সৌদি আরবের কাছে জার্মানি থেকে আনা একটি ব্যবস্থা রয়েছে। যেটিকে স্কাইগার্ড নামে ডাকা হয়। বিমান বিধ্বংসী অস্ত্রযুক্ত রাডার ভ্যানও আছে এই স্কাইগার্ডের। কিন্তু এই ব্যবস্থাটির সমস্যা হচ্ছে, নিশানা খুব কাছের হতে হবে। না হলে প্রতিরোধ করতে পারে না।

বাকিকে অন্তত একটি স্কাইগার্ড মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানালেন বিন্নি।

ক্যালিফোর্নিয়ার মনিটারিতে মার্টিন সেন্টার ফর ননপ্রলিফারেশন স্টাডিজের জেমস মার্টিনের সহযোগী গবেষক মিশেল ডুইটসম্যান বলেন, রাডার যদি কার্যকর থাকে, তবে স্থল থেকে আসা যেকোনো ধরনের অবাঞ্ছিত প্রতিধ্বনিকে শনাক্ত করতে পারবে।

তিনি বলেন, যদি সেটি রাডারে ধরা পড়ে, তবে সতর্কতার সময় থাকে যৎসামান্য। কোনো ড্রোন হামলা চালানোর আগে স্কাইগার্ডে দুই মিনিট কিংবা তার চেয়ে কম সময়ের জন্য দেখা যাবে।

‘বাকিকে বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যা কেবল মানবচালিত বিমানের হামলা প্রতিরোধ করতে পারবে,’ বললেন ডুইটসম্যান।

যে ধরনের পাল্লায় অধিকাংশ রাডারব্যবস্থা ছোট ড্রোন কিংবা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করতে পারে, সেটি অবশ্যই একটি পূর্ণ-আকারের বিমান শনাক্ত করতে পারে এমন রাডারের চেয়ে কম পাল্লার হতে হবে।

লন্ডনের রয়েল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক জাস্টিন ব্রংক বলেন, স্কাইগার্ডের পাল্লা খুবই সীমিত। ব্যাটারি সুরক্ষা দিতে পারবে এমন এলাকার মধ্যেই এটির শনাক্ত ক্ষমতা সীমিত। একইসময়ে বেশ কয়েকটি হুমকি আসলে, তা মোকাবেলা করা স্কাইগার্ডের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে যখন তা বিভিন্ন দিক থেকে আসে।

সৌদিসহ অন্যদের জন্য যা দুঃস্বপ্নের দৃশ্যপট তৈরি করতে পারে। বিভিন্ন দিক থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে এ রকম ক্ষেপণাস্ত্র আসতে থাকলে রাডারব্যবস্থায় তা বিভ্রান্তি কিংবা জট তৈরি করতে পারে।

আবার বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সে ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েও যেতে পারে। খুব স্বাভাবিকভাবেই এটি করা সম্ভব।

সিএনএনকে ব্রোংক বলেন, এতে শেষ লাভটা হামলাকারীদেরই বেশি হয়। অতিরিক্ত হামলা মোকাবেলায় শত্রুদের চেয়ে অনেক বেশি খরচ করতে হতো সৌদি আরবকে। বলতে গেলে, এমন হামলা সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধে সৌদির কাছে কোনো উপায় নেই।

ফলে কিছু অবকাঠামো এতটাই সংকটাপন্ন যে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ঝুঁকিতে রয়েছে।

ড্রোন যুদ্ধের এই সময়ে ঝুঁকির প্যান্ডোরা বাক্সটি একেবারে খুলে গেছে। এ ক্ষেত্রে কোনো পরিষ্কার জবাব নেই। ড্রোন অপেক্ষাকৃত সস্তা। মাঝারি ধরনের বিস্ফোরক বহন করতে পারে। এখন তাদের সুনির্দিষ্ট হামলার ক্ষমতা ও ব্যাপ্তি বেড়ে গেছে।

সন্ত্রাসী ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোরও প্রিয় অস্ত্র ড্রোন। ২০১৬ সালের মসুল যুদ্ধে ইরাকি সাঁজোয়াযান ধ্বংসে কয়েক ডজন ড্রোন ব্যবহার করেছিল আইএস।

২০১৮ সালের জানুয়ারিতে সিরিয়ায় রুশ বিমানঘাঁটিতে হামলা চালাতে বিদ্রোহীরা ১৩টি ড্রোন পাঠিয়েছিল। আর প্রতিটিতে ১০টি করে ছোট ছোট বোমা ছিল। প্রতিটি বোমায় আধা কিলোগ্রামের বিস্ফোরক ছিল।

রাশিয়ার দাবি, বৈদ্যুতিক পাল্টা পদক্ষেপ ও প্যান্টসার ব্যবস্থা দিয়ে তা প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছিল।

আর ড্রোনের হুমকি মোকাবেলায় স্থলবাহিনীর সঙ্গে ভূমি থেকে আকাশে উৎক্ষেপণযোগ্য স্টিনজার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শত্রু ড্রোনের মোকাবেলায় ব্ল্যাক ডার্ট নামের একটি মহড়ারও আয়োজন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে লেসার থেকে বন্দুক এবং বৈদ্যুতিক প্রতিরোধ ব্যবস্থাও ব্যবহার করা হয়েছে।

বিন্নি আশা করছেন, কাজেই শনিবারের হামলা সৌদি আরবকে এখন ফের অস্ত্র বাজারে নিয়ে যাবে। যদিও এ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় অস্ত্র আমদানিকারক দেশ হচ্ছে তারা।

এর আগে সৌদি আরব দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবেলায় বেশি মনোযোগ দিয়েছিল। কাজেই এখন ক্রুজ মিসাইল কীভাবে মোকাবেলা করবে, সেদিকেই তাদের নজর দিতে হবে।

তিনি বলেন, সৌদিজুড়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো রয়েছে। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ঘিরে বৃত্তাকার পথে হামলা চালাতে দীর্ঘপাল্লার ক্রুজ মিসাইলের সক্ষমতা সৌদিকে বড় প্রতিকূলতায় ঠেলে দিয়েছে।

অত্যাধুনিক ব্যবস্থার চেয়েও ধীর, নিচু ও ছোট্ট ক্ষেপণাস্ত্র আধুনিক যুদ্ধাবস্থায় বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিতে পারে। আর সেটা কতটা ভয়াবহ হতে পারে, সৌদি সেটি সরাসরি দেখতে পেয়েছে।

ঘটনাপ্রবাহ : সৌদি তেল স্থাপনায় হামলা

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×