প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা সাপের দ্বীপ!

  অনলাইন ডেস্ক ১৩ অক্টোবর ২০১৯, ২২:৫৯ | অনলাইন সংস্করণ

সাপ

গাছগাছালি আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা ব্রাজিলের একটি দ্বীপ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মানুষকে টানলেও সেখানে যাওয়া একেবারেই নিষেধ। আর গেলেও জীবিত ফিরে আসা অসম্ভব।

দ্বীপটির নাম ‘লা দ্যা কুইমাদা গ্রানদে’। নামটা যেমন অদ্ভুত, তেমনই রহস্যে মোড়া। দ্বীপটিকে নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে বিরাজ করে ভয় আর আতংক। আসলে এটি একটি সাপের দ্বীপ। এখানে কোনো মানুষ বসবাস করতে পারে না। এটি নানা জাতের সাপের রাজত্ব। অনেকে একে স্নেক আইল্যান্ডও বলে থাকে।

অনেকের ধারণা, এই দ্বীপে যে একবার যায় তার আর ফিরে আসার কোনো সম্ভাবনা থাকে না। এর পেছনে কারণ হলো- একবার এক জেলে সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন। পরে খিদে পাওয়ায় খাবারের খোঁজে দ্বীপ টিতে প্রবেশ করেন। পরদিনই তার রক্তাক্ত দেহ দ্বীপটিতে পাওয়া যায়।

এই ঘটনার পর থেকে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়। এবং ‘ওই দ্বীপে গেলে জীবন্ত কেউ ফেরে না’ এই ধারণাটা আরও চেপে বসে সবার মধ্যে।

ব্রাজিলের বৃহত্তম শহর সাও পাওলো থেকে প্রায় ৯৩ মাইল দূরে লা দ্যা কুইমাদা গ্রানদে দ্বীপটির অবস্থান। প্রায় ১১০ একর এলাকা জুড়ে দ্বীপটি বিস্তৃত।

ধারণা করা হয়, অনেক বছর আগে সাগরের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার কারণে দ্বীপটি ব্রাজিলের মূল শহর হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ফলে অনেক সাপ সেখানে আটকা পড়ে পড়ে।

পাথুরে মাটির এই দ্বীপে গাছগাছালিও আছে প্রচুর। আরও আছে পাহাড় আর স্থলের সমন্বয়। অতিথি পাখিদের বিশ্রামের জায়গাও এই দ্বীপ। তাই অনেক ধরনের পাখিও দেখা যায় এই দ্বীপে। তবে কোনো মানুষ বাস করে না এই দ্বীপে।

এখনও পর্যন্ত দ্বীপটিতে অন্য কোনো বিষাক্ত প্রাণীর খবরও মেলেনি। এ দ্বীপে আছে কেবল বিভিন্ন প্রজাতির বিষধর সাপ। সাপেদের দ্বীপ বলেই বেশি পরিচিত এই দ্বীপটি, যার কারণে সবাই দ্বীপটিকে স্নেক আইল্যান্ডও বলে থাকে।

তবে শুধু সাধারণ সাপ হলে হয়তো এতটা বিবেচনায় আসতো না এই দ্বীপ। একটি বিশেষ ধরনের সাপের জন্যে এই দ্বীপ নিয়ে সকলের মাঝে আতংক বিরাজ করে। সাপটির আসল নাম বথরোস ইনসুলারিস, তবে দ্য গোল্ডেন লেন্সহেড নামেই অধিক পরিচিত।

এই ধরনের সাপের চামড়ায় কিছুটা হলদেটে আভা আছে, যা সূর্যের কিরণে মোটামোটি সোনালি বর্ণ ধারণ করে। এর ফলে সাপগুলো দেখতে অনেকটা সোনালী রঙের মতো দেখায়।

এই সাপগুলো কিন্তু অসম্ভব বিষাক্ত। এ সাপের বিষ মাংসের সঙ্গে মিশে গিয়ে এক ঘণ্টার মধ্যে আক্রান্ত ব্যক্তিকে মেরে ফেলতে পারে। এই বিষের তেমন কোনো কার্যকরী প্রতিষেধকও নেই।

এই ধরনের সাপের প্রজাতি কেবলমাত্র এই দ্বীপেই পাওয়া যায়। সাপগুলো লম্বায় যে খুব একটা বড় হয় তা কিন্তু নয়, ৭০ সেন্টিমিটার থেকে বড়জোড় ১১৮ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। দ্বীপে আসা পাখিরা এদের প্রধান খাবার। কিন্তু শিকারের প্রাচুর্যতা মোটেও খুব বেশি নয়।

অনেক কসরত করেই সাপগুলোর শিকার করতে হয় সাপগুলোর। মূলত বিশ্রামের জন্যেই অতিথি পাখিদের এই দ্বীপে আগমন। বেশিরভাগ পাখি বসে গাছের ডালের উপর। শিকার ধরতেই হয়তো সাপেদের গাছে ওঠা শেখা।

সাও পাওলোর স্থানীয়দের মাঝে এই দ্বীপ নিয়ে এক ধরনের আতংক বিরাজ করে। পারতপক্ষে কেউ এই দ্বীপে যাওয়ার সাহস করে না। তবে জাহাজ চলাচলের সুবিধার জন্যে এই দ্বীপে একটি লাইট হাউজ নির্মাণ করার প্রয়োজন পড়ে ১৯০৯ সালের দিকে। এরপর থেকে কিছুদিন অন্তর ওখানে লাইট হাউসের বাতি পরিবর্তন করার জন্যে লোক পাঠানো হত।

সর্বশেষ এক দম্পতিকে লাইট হাউসের দেখাশোনা করার জন্যে পুরো পরিবারের থাকার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু জনশ্রুতি আছে যে সাপেদের কামড়ে পরিবারের সবাই মৃত্যুবরণ করে। এরপর সরকার লাইট হাউজে স্বয়ংক্রিয় বাতির ব্যবস্থা করে। সেই থেকে নৌবাহিনীর একটি দল পুরো প্রস্তুতি নিয়ে অর্থাৎ বিশেষ গ্যাস এবং ওষুধ নিয়ে লাইট হাউজের বাতি ও ব্যাটারি পরিবর্তন করতে যায়।

ব্রাজিলে নৌবাহিনীর আদেশানুসারে, ১৯২০ সাল থেকে এই জঙ্গলে সাধারণের প্রবেশ পুরোপুরিভাবে নিষিদ্ধ। মূলত জনগণের নিরাপত্তার জন্যেই এমন সিদ্ধান্ত। তবে গবেষণার কারণে বা বিশেষ কোনো বৈধ উদ্দেশ্যে নৌবাহিনীর কাছ থেকে অনুমতি সাপেক্ষে নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে যাওয়া যেতে পারে এই দ্বীপে।

কিন্তু সেটা মোটেও সহজসাধ্য নয়। কোনো সাধারণ নৌকা সেখানে যেতে রাজি হয় না। যেতে প্রায় ৫-৬ ঘন্টা সময় লাগে। তাই কেউ সাপের কামড় খেলে তার আর হাসপাতালে আসার সময়টুকুও পাওয়া সম্ভব নয়।

তবে ধীরে ধীরে কিছু ভিন্ন ধরনের তথ্য উঠে এসেছে বিভিন্ন গবেষণায়। সাপের বিষ নিয়ে গবেষণার জন্যে একটি বায়োফার্মাসিটিকেল গবেষণা কেন্দ্র কাজ করে যাচ্ছে অনেক বছর ধরে। সেই গবেষণা কেন্দ্রে কর্মরত মার্সেলো ডুয়ার্তে নামে একজন স্থানীয় বায়োলোজিস্ট গবেষণার কাজে ২০ বারের বেশি এই দ্বীপে গিয়েছেন।

ধারণা করা হয়ে থাকে, এখানে দুই হাজারের উপর গোল্ডেন লেন্সহেড রয়েছে এবং দিন দিন এই সংখ্যা বেড়েই চলেছে। কিন্তু মার্সেলোর মতে এখানে সাপের সংখ্যা দিন দিন কমেই চলেছে। বিগত ১৫ বছরে প্রায় ১৫ শতাংশ সাপ কমেছে।

এই জঙ্গলের বিষাক্ত সাপগুলো মূলত গবেষণার জন্যে ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে এবং শুধুমাত্র গবেষকরাই উপযুক্ত অনুমতি নিয়ে এই জঙ্গলে আসতে পারে। কিন্তু এই সাপের বিষের বেশ চাহিদা রয়েছে বিশ্ব বাজারে।

একজন চোরাচালানকারীর মতে, একেকটি গোল্ডেন স্নেক বিশ থেকে পঁচিশ হাজার ডলার পর্যন্ত বিক্রি হয়ে থাকে আন্তর্জাতিক বাজারে। মূলত চোরাচালানীদের জন্যেই সাপের সংখ্যা কমে চলেছে এই দ্বীপের।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×