সৌদি যুবরাজকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে অবিচল লড়াইয়ে যে নারী
jugantor
সৌদি যুবরাজকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে অবিচল লড়াইয়ে যে নারী

  যুগান্তর ডেস্ক  

২৬ জানুয়ারি ২০২০, ০১:০০:৪৬  |  অনলাইন সংস্করণ

সৌদি যুবরাজকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে অবিচল লড়াইয়ে যে নারী

বছর তিনেক আগে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের উত্থানের পর থেকে সৌদি আরবের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে এড়িয়ে গেছেন। এমনকি একজন সাংবাদিককে নির্মমভাবে হত্যা করা হলেও তারা পাত্তা দিতে চাননি।

কিন্তু সৌদির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ইস্পাত কঠিন সিদ্ধান্ত নিলেন এক নারী। সবার থেকে ব্যতিক্রমী এই নারী হলেন ফরাসি মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ অ্যাগনেস ক্যালামার্ড। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বিষয়ক একজন স্বাধীন বিশেষজ্ঞ হিসেবে জাতিসংঘের হয়ে কাজ করেছেন তিনি।

হোয়াটসঅ্যাপে নিজের অ্যাকাউন্ট দিয়ে মার্কিন ধনকুবের জেফ বেজোসের মোবাইল ফোন কীভাবে হ্যাক করলেন যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, সহকর্মী ডেভিড কেইকে নিয়ে সেই অভিযোগের বিস্তারিত প্রমাণ হাজির করেছেন তিনি।

এর মধ্য দিয়ে নতুন এক দিগন্ত খুলে দিলেন এই ফরাসি নারী। যেন নতুন এক বিপ্লব।

আমাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস মার্কিন দৈনিক ওয়াশিংটন পোস্টেরও মালিক। এই পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখছেন নিহত সৌদি সাংবাদিক জামাল খাসোগি।

এই কলামনিস্টের ওপর চালানো নির্যাতনের শেষ মুহূর্তের বিভৎস বিবরণ উঠে এসেছিল গত বছরে তার জোরালো তদন্তেই। নিহত হওয়ার আগে যখন তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, সেই সময়টিতে বেঁচে থাকতে তার আকুতি, প্লাস্টিকের শিটের খসখসানি, খাসোগির উচ্চারিত শেষ শব্দটি তার বিবরণে উঠে আসে।

ক্যালামার্ডের সিদ্ধান্ত ছিল, এটা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হত্যাকাণ্ড।

দাভোস ও সিলিকন ভ্যালিতে আলোচায় এখন প্রাধান্য বিস্তার করছে বেজোসের খবর। সবাই ধারনা করতে চেষ্টা করছেন, যুবরাজ নিজের হোয়াটসঅ্যাপ দিয়ে আর কাকে কাকে বার্তা পাঠাতে পারেন।

ক্যালামার্ড অভিযোগ করেন, নিজের কাজ করতে গিয়ে তিনি মৃত্যুর হুমকি পর্যন্ত পেয়েছেন। তবুও থেমে যাননি।

উজ্জ্বল নীল ফ্রেমের চশমা পরা এই গবেষক ভারী ফরাসি উচ্চারণে নিখুঁত ইংরেজিতে কথা বলেন। ফিলিপিন্সের প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তে তো তাকে একবার সরাসরি হুমকি দিয়ে বসেছিলেন।

দুতার্তে হুমকিতে বলেন, তার মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে হাজার হাজার বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে যদি সে তদন্ত করতে আসেন, তবে তার গালে থাপ্পর বসিয়ে দেব।

জাতিসংঘের বিশেষ দূত হওয়ার আগে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন প্রচারমূলক সংস্থায় কাজ করেন তিনি। অভিবাসন, শরণার্থীদের স্থানান্তর, গণমাধ্যমে হামলা ও যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে দায়িত্ব পালন করেন অ্যাগনেস ক্যালামার্ড।

মাল্টার নিহত সাংবাদিক ডাফন কারুয়ানা গালিজিয়ার ছেলে ম্যাথিও বলেন, অ্যাগনেস খুবই কার্যকর। তিনি জানেন মানবাধিকারের কাজও একটি কাজ। এটা একটা চাকরি। টুইটারে এর বিরোধিতা করে লোকজন যখন শোলগোল তোলতে চেষ্টা করেন, তখন তিনি মনে করেন, এটা ভালোভাবে করতে হবে।

এই সাংবাদিক সন্তান আরও বলেন, তিনি কোনো সমালোচনা করেন না। তিনি সাক্ষ্যপ্রমাণ নথিভুক্ত করেন। আসলে কী ঘটেছে, তা লিখিত রাখেন। পরবর্তী সময়ে তা জবাবদিহিতা তৈরি করে।

ম্যাথিও আরও বলেন, ক্যালামার্ড যা করছেন, তাতে আমার শ্রদ্ধা রয়েছে। কেবল একজন নারী, যিনি জবাবদিহিতার বাইরের লোকগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসেন। তাতে তার জন্য কোনো বরাদ্দ নেই, কোনো অফিস নেই। কোনো কিছুই নেই। সৌদি আরব তাকে কতটা ভয় করছে, একটু ঠাহর করলেই তা দেখতে পাবেন।

ডাফন কারুয়ানা গালিজিয়া নিহত হওয়ার পর এ ঘটনায় প্রথম স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ক্যালামার্ডসহ জাতিসংঘের তিন বিশেষ দূত। এই হত্যাকাণ্ডের কয়েক দিনের মধ্যে তদন্তকারী বিচারকের স্বাধীনতার গুরুত্বের প্রতি জোর দেন তারা।

চলতি সপ্তাহে গার্ডিয়ানকে ক্যালামার্ড বলেন, বেজোসের হ্যাকিং নিয়ে সব অভিযোগ প্রকাশ্যে নিয়ে আসতে চান তিনি। সৌদি আরবে কে কৌশলগত আগ্রহী হতে পারে; তা সামনে নিয়ে আসাই তার এই সংকল্পে প্রতিফলিত হয়েছে।

এরপর ম্যালওয়্যার প্রযুক্তিতে মারাত্মক বিপদ রয়েছে। এটা খুবই অত্যাধুনিক। এই প্রযুক্তি শনাক্ত করা এতটাই কঠিন যে শেষপর্যন্ত এতে সবাই অনিরাপদ।

জাতিসংঘের বাকস্বাধীনতা বিষয়ক বিশেষ দূত ডেভিড কেই বলেন, তুরস্কে খাসোগি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ক্যালামার্ড যখন তদন্ত শুরু করেন, তখন তিনি সন্দিহান ছিলেন: সফল হতে পারবেন কিনা।

২০১৮ সালের পুরো শরৎজুড়ে তারা কাজ করেছেন। স্বাধীন তদন্তের প্রতিশ্রুতির ভেতরে জাতিসংঘকে নিয়ে আসতে তারা প্রচার চালিয়েছেন। পত্রিকায় নিবন্ধ ও জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে চিঠি লিখেছেন।

ডেভিড কেই বলেন, তার এই সহকর্মী কিছু একটা করতে হবে; এমন সিদ্ধান্তে মারাত্মক অনড় ছিলেন। কাজেই আমাদের নিজেদের থেকেই একটা তদন্ত শুরু করতে হয়েছে। এরপর আমরা একসঙ্গে কাজ শুরু করি ও তুরস্কের অনুমতি নিই।

‌‘এটা যথার্থ কৌশল কিনা; তা নিয়ে প্রথমে সন্দেহ হলেও পরে দেখা গেছে, তার এই নারী সহকর্মী সঠিক পথেই রয়েছেন,’ বললেন ডেভিড কেই।

তার মতে, বাস্তবিকভাবে এগিয়ে যেতে একজন বিশেষজ্ঞের যে ভিশন থাকা দরকার, ক্যালামার্ডের তা আছে। কাজেই তিনি যেভাবে বিষয়টিকে সামনে এগিয়ে নিয়েছেন, তা কেবল শ্রদ্ধা করার মতোই না, এটা নায়কোচিত। তিনি নিজের সময় খরচ করেছেন, কখনো কখনো নিজের সম্পদও।

ক্যালামার্ডকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয়, কীসের প্রভাবে তার এই অঙ্গীকার, তিনি নিজের দাদা লিওন স্যাভিওয়েক্সের কাহিনীতে নিয়ে যান সবাইকে।

তারা দাদা ছিলেন ফরাসি প্রতিরোধ আন্দোলনের একজন সদস্য। মাত্র সতেরো বছর বয়সে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে লড়তে তিনি নিজের নাম লেখান। বিষাক্ত গ্যাসে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার ছোট্ট জীবনের বাকিটা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল তাতে।

১৯৪৪ সালের ১৫ আগস্ট নাৎসিরা তাকে হত্যা করেন। এর কয়েক দিন পরেই প্যারিস মুক্ত হয়ে যায়। সেই স্মৃতি স্মরণ করে ক্যালামার্ড বলেন, প্রতিটি গ্রীষ্মের এই দিনে আমার পরিবার একটি স্মরণানুষ্ঠানে অংশ নেয়। দেশের জন্য যারা লড়াই করেছেন, তাদের তখন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয়। শৈশবে এটা ছিল তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময়।

এই মানবাধিকারকর্মী আরও বলেন, মাত্র একবছর বয়সে তার মা এতিম হয়ে যান। পরে স্কুলশিক্ষক হয়ে সামাজিক ন্যায়বিচারের পক্ষে লড়েছেন।

নিজের এই ভয়ঙ্কর কাজগুলো সারতে গিয়ে মাথার ভেতর অনুভূত হওয়া অস্বস্তি কীভাবে সামাল দেন জানতে চাইলে ক্যালামার্ড নিজের নৈমিত্তিক কিছু অনুশলীনের কথা বলেন।

‘আমি আপনাকে বলতে পারি, আমি একটি স্বাস্থ্যকর জীবন যাপন করি। ক্রীড়া। সবল থাকতে। ভালোবাসা ও ভালোবাসা ফেরত দেয়া। সহানুভূতি ও অনুরাগ বোধ । নিজেকে কাজের প্রতি কেন্দ্রীভূত করে রাখা। কোনো কিছু করতে গিয়ে মনের ভেতর ভয়কে আশ্রয় না দেয়া। যে বিষয়ে কাজ করি, তাতেই মনোযোগ দিতে চেষ্টা করি।’

যেসব লোকদের জন্য কাজ করেন, তাদের স্মরণের কথাও বললেন এই নারী। যেমন, জামাল খাসোগি, বহু সৌদি– যারা বিদেশে নির্বাসিত। আমি জানি এটা কতটা বেদনাদায়ক। কারাগারে লোকজন নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছেন। তারা প্রতিবাদ করতে চাইলে আটক করা হয়। খাসোগির বাগদত্তা খাদিজা সেনজিজের কথাও বললেন তিনি।

সৌদি যুবরাজকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে অবিচল লড়াইয়ে যে নারী

 যুগান্তর ডেস্ক 
২৬ জানুয়ারি ২০২০, ০১:০০ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ
সৌদি যুবরাজকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে অবিচল লড়াইয়ে যে নারী
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও ফরাসি মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ অ্যাগনেস ক্যালামার্ড। ছবি: সংগৃহীত

বছর তিনেক আগে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের উত্থানের পর থেকে সৌদি আরবের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে এড়িয়ে গেছেন। এমনকি একজন সাংবাদিককে নির্মমভাবে হত্যা করা হলেও তারা পাত্তা দিতে চাননি। 

কিন্তু সৌদির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ইস্পাত কঠিন সিদ্ধান্ত নিলেন এক নারী। সবার থেকে ব্যতিক্রমী এই নারী হলেন ফরাসি মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ অ্যাগনেস ক্যালামার্ড। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বিষয়ক একজন স্বাধীন বিশেষজ্ঞ হিসেবে জাতিসংঘের হয়ে কাজ করেছেন তিনি।

হোয়াটসঅ্যাপে নিজের অ্যাকাউন্ট দিয়ে মার্কিন ধনকুবের জেফ বেজোসের মোবাইল ফোন কীভাবে হ্যাক করলেন যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, সহকর্মী ডেভিড কেইকে নিয়ে সেই অভিযোগের বিস্তারিত প্রমাণ হাজির করেছেন তিনি।

এর মধ্য দিয়ে নতুন এক দিগন্ত খুলে দিলেন এই ফরাসি নারী। যেন নতুন এক বিপ্লব।

আমাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস মার্কিন দৈনিক ওয়াশিংটন পোস্টেরও মালিক। এই পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখছেন নিহত সৌদি সাংবাদিক জামাল খাসোগি।

এই কলামনিস্টের ওপর চালানো নির্যাতনের শেষ মুহূর্তের বিভৎস বিবরণ উঠে এসেছিল গত বছরে তার জোরালো তদন্তেই। নিহত হওয়ার আগে যখন তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, সেই সময়টিতে বেঁচে থাকতে তার আকুতি, প্লাস্টিকের শিটের খসখসানি, খাসোগির উচ্চারিত শেষ শব্দটি তার বিবরণে উঠে আসে।

ক্যালামার্ডের সিদ্ধান্ত ছিল, এটা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হত্যাকাণ্ড।

দাভোস ও সিলিকন ভ্যালিতে আলোচায় এখন প্রাধান্য বিস্তার করছে বেজোসের খবর। সবাই ধারনা করতে চেষ্টা করছেন, যুবরাজ নিজের হোয়াটসঅ্যাপ দিয়ে আর কাকে কাকে বার্তা পাঠাতে পারেন।

ক্যালামার্ড অভিযোগ করেন, নিজের কাজ করতে গিয়ে তিনি মৃত্যুর হুমকি পর্যন্ত পেয়েছেন। তবুও থেমে যাননি।

উজ্জ্বল নীল ফ্রেমের চশমা পরা এই গবেষক ভারী ফরাসি উচ্চারণে নিখুঁত ইংরেজিতে কথা বলেন। ফিলিপিন্সের প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তে তো তাকে একবার সরাসরি হুমকি দিয়ে বসেছিলেন।

দুতার্তে হুমকিতে বলেন, তার মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে হাজার হাজার বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে যদি সে তদন্ত করতে আসেন, তবে তার গালে থাপ্পর বসিয়ে দেব।

জাতিসংঘের বিশেষ দূত হওয়ার আগে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন প্রচারমূলক সংস্থায় কাজ করেন তিনি। অভিবাসন, শরণার্থীদের স্থানান্তর, গণমাধ্যমে হামলা ও যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে দায়িত্ব পালন করেন অ্যাগনেস ক্যালামার্ড।

মাল্টার নিহত সাংবাদিক ডাফন কারুয়ানা গালিজিয়ার ছেলে ম্যাথিও বলেন, অ্যাগনেস খুবই কার্যকর। তিনি জানেন মানবাধিকারের কাজও একটি কাজ। এটা একটা চাকরি। টুইটারে এর বিরোধিতা করে লোকজন যখন শোলগোল তোলতে চেষ্টা করেন, তখন তিনি মনে করেন, এটা ভালোভাবে করতে হবে।

এই সাংবাদিক সন্তান আরও বলেন, তিনি কোনো সমালোচনা করেন না। তিনি সাক্ষ্যপ্রমাণ নথিভুক্ত করেন। আসলে কী ঘটেছে, তা লিখিত রাখেন। পরবর্তী সময়ে তা জবাবদিহিতা তৈরি করে।

ম্যাথিও আরও বলেন, ক্যালামার্ড যা করছেন, তাতে আমার শ্রদ্ধা রয়েছে। কেবল একজন নারী, যিনি জবাবদিহিতার বাইরের লোকগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসেন। তাতে তার জন্য কোনো বরাদ্দ নেই, কোনো অফিস নেই। কোনো কিছুই নেই। সৌদি আরব তাকে কতটা ভয় করছে, একটু ঠাহর করলেই তা দেখতে পাবেন।

ডাফন কারুয়ানা গালিজিয়া নিহত হওয়ার পর এ ঘটনায় প্রথম স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ক্যালামার্ডসহ জাতিসংঘের তিন বিশেষ দূত। এই হত্যাকাণ্ডের কয়েক দিনের মধ্যে তদন্তকারী বিচারকের স্বাধীনতার গুরুত্বের প্রতি জোর দেন তারা।

চলতি সপ্তাহে গার্ডিয়ানকে ক্যালামার্ড বলেন, বেজোসের হ্যাকিং নিয়ে সব অভিযোগ প্রকাশ্যে নিয়ে আসতে চান তিনি। সৌদি আরবে কে কৌশলগত আগ্রহী হতে পারে; তা সামনে নিয়ে আসাই তার এই সংকল্পে প্রতিফলিত হয়েছে।

এরপর ম্যালওয়্যার প্রযুক্তিতে মারাত্মক বিপদ রয়েছে। এটা খুবই অত্যাধুনিক। এই প্রযুক্তি শনাক্ত করা এতটাই কঠিন যে শেষপর্যন্ত এতে সবাই অনিরাপদ।

জাতিসংঘের বাকস্বাধীনতা বিষয়ক বিশেষ দূত ডেভিড কেই বলেন, তুরস্কে খাসোগি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ক্যালামার্ড যখন তদন্ত শুরু করেন, তখন তিনি সন্দিহান ছিলেন: সফল হতে পারবেন কিনা। 

২০১৮ সালের পুরো শরৎজুড়ে তারা কাজ করেছেন। স্বাধীন তদন্তের প্রতিশ্রুতির ভেতরে জাতিসংঘকে নিয়ে আসতে তারা প্রচার চালিয়েছেন। পত্রিকায় নিবন্ধ ও জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে চিঠি লিখেছেন।

ডেভিড কেই বলেন, তার এই সহকর্মী কিছু একটা করতে হবে; এমন সিদ্ধান্তে মারাত্মক অনড় ছিলেন। কাজেই আমাদের নিজেদের থেকেই একটা তদন্ত শুরু করতে হয়েছে। এরপর আমরা একসঙ্গে কাজ শুরু করি ও তুরস্কের অনুমতি নিই।

‌‘এটা যথার্থ কৌশল কিনা; তা নিয়ে প্রথমে সন্দেহ হলেও পরে দেখা গেছে, তার এই নারী সহকর্মী সঠিক পথেই রয়েছেন,’ বললেন ডেভিড কেই। 

তার মতে, বাস্তবিকভাবে এগিয়ে যেতে একজন বিশেষজ্ঞের যে ভিশন থাকা দরকার, ক্যালামার্ডের তা আছে। কাজেই তিনি যেভাবে বিষয়টিকে সামনে এগিয়ে নিয়েছেন, তা কেবল শ্রদ্ধা করার মতোই না, এটা নায়কোচিত। তিনি নিজের সময় খরচ করেছেন, কখনো কখনো নিজের সম্পদও।

ক্যালামার্ডকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয়, কীসের প্রভাবে তার এই অঙ্গীকার, তিনি নিজের দাদা লিওন স্যাভিওয়েক্সের কাহিনীতে নিয়ে যান সবাইকে। 

তারা দাদা ছিলেন ফরাসি প্রতিরোধ আন্দোলনের একজন সদস্য। মাত্র সতেরো বছর বয়সে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে লড়তে তিনি নিজের নাম লেখান। বিষাক্ত গ্যাসে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার ছোট্ট জীবনের বাকিটা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল তাতে।

১৯৪৪ সালের ১৫ আগস্ট নাৎসিরা তাকে হত্যা করেন। এর কয়েক দিন পরেই প্যারিস মুক্ত হয়ে যায়। সেই স্মৃতি স্মরণ করে ক্যালামার্ড বলেন, প্রতিটি গ্রীষ্মের এই দিনে আমার পরিবার একটি স্মরণানুষ্ঠানে অংশ নেয়। দেশের জন্য যারা লড়াই করেছেন, তাদের তখন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয়। শৈশবে এটা ছিল তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময়।

এই মানবাধিকারকর্মী আরও বলেন, মাত্র একবছর বয়সে তার মা এতিম হয়ে যান। পরে স্কুলশিক্ষক হয়ে সামাজিক ন্যায়বিচারের পক্ষে লড়েছেন।

নিজের এই ভয়ঙ্কর কাজগুলো সারতে গিয়ে মাথার ভেতর অনুভূত হওয়া অস্বস্তি কীভাবে সামাল দেন জানতে চাইলে ক্যালামার্ড নিজের নৈমিত্তিক কিছু অনুশলীনের কথা বলেন।

‘আমি আপনাকে বলতে পারি, আমি একটি স্বাস্থ্যকর জীবন যাপন করি। ক্রীড়া। সবল থাকতে। ভালোবাসা ও ভালোবাসা ফেরত দেয়া। সহানুভূতি ও অনুরাগ বোধ । নিজেকে কাজের প্রতি কেন্দ্রীভূত করে রাখা। কোনো কিছু করতে গিয়ে মনের ভেতর ভয়কে আশ্রয় না দেয়া। যে বিষয়ে কাজ করি, তাতেই মনোযোগ দিতে চেষ্টা করি।’

যেসব লোকদের জন্য কাজ করেন, তাদের স্মরণের কথাও বললেন এই নারী। যেমন, জামাল খাসোগি, বহু সৌদি– যারা বিদেশে নির্বাসিত। আমি জানি এটা কতটা বেদনাদায়ক। কারাগারে লোকজন নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছেন। তারা প্রতিবাদ করতে চাইলে আটক করা হয়। খাসোগির বাগদত্তা খাদিজা সেনজিজের কথাও বললেন তিনি।

 

ঘটনাপ্রবাহ : সাংবাদিক জামাল খাসোগি নিখোঁজ