সোলাইমানির শেষ ইচ্ছা পূরণে যার পাশে সমাহিত হলেন

  অনলাইন ডেস্ক ৩০ জানুয়ারি ২০২০, ২২:১৭:৪৭ | অনলাইন সংস্করণ

কাশেম সোলাইমানি ও ইউসুফ এলাহি। ছবি: সংগৃহীত

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আইআরজিসির কুদস ফোর্সের প্রধান জেনারেল কাসেম সোলাইমানির শেষ দুটি ইচ্ছা পূরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি ছিল এক তরুণ যোদ্ধার পাশে তাকে সমাহিত করা। যার নাম মোহাম্মাদ হোসেন ইউসুফ এলাহি। সোলাইমানি মার্কিন হামলায় নিহত হওয়ার পরপরই খবর আসে, নিজের জন্মশহর কেরমানে এক শহীদের কবরের পাশে দাফন করতে বলে গেছেন তিনি।

ইরানের বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরা সাধারণত পবিত্র মাশহাদে ইমাম রেজা (আ.) ও কোমে হজরত মাসুমার (সা.আ.) মাজার প্রাঙ্গণে নিজেকে দাফন করতে ওসিয়ত করে যান। এছাড়া অনেকেই রাজধানী তেহরানে ইমাম খোমেনির (রহ.) মাজারের অদূরে বিখ্যাত বেহেশতে জাহরা কবরস্থান অথবা নিজের প্রিয়তম ব্যক্তিদের কবরের পাশে সমাহিত হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এদিক থেকে কাসেম সোলাইমানির ওসিয়ত অনেকটাই ব্যতিক্রমী।


এ বিষয়টি নিয়ে কৌতূহল বশত রেডিও তেহরানের সিনিয়র সাংবাদিক ড. সোহেল আহম্মেদ অনুসন্ধান চালান। কে সেই ব্যক্তি যার পাশে সমাহিত হতে ওসিয়ত (ইচ্ছা প্রকাশ) করে গেছেন বিশ্বসেরা জেনারেল কাসেম সোলাইমানি। মোহাম্মাদ হোসেন ইউসুফ এলাহি সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে এমন কিছু তথ্য পেলাম যা বর্তমান সমাজের অনেকের কাছেই পুরোপুরি অবিশ্বাস্য। এসব তথ্য একেবারেই আধ্যাত্মিক।

ওসিয়ত অনুযায়ী জেনারেল সোলাইমানিকে যেখানে কবর দেওয়া হয়েছে সেই এলাকাটি রাজধানী তেহরান থেকে প্রায় ৮শ’ কিলোমিটার দূরে। শহরের নাম কেরমান। এটি ইরানের দক্ষিণ-পূর্বের প্রদেশ কেরমানের কেন্দ্রীয় শহর। শহরের অদূরে শহীদদের জন্য গড়ে ওঠা ওই কবরস্থানের সদস্য সংখ্যা কিছু দিন আগেও ছিল এক হাজার ১১ জন। কাসেম সোলাইমানি যুক্ত হওয়ায় এ সংখ্যা এক হাজার ১২ জনে উন্নীত হয়েছে। এদেরই একজন হলেন জেনারেল সোলাইমানির প্রিয়পাত্র মোহাম্মাদ হোসেন ইউসুফ এলাহি। তিনি জাতীয়ভাবে খুব বেশি পরিচিত নন। তবে তার সম্পর্কে বই ও নিবন্ধ রয়েছে।

মেহদি ফারাহানির লেখা ‘নাখলে সুখতে’ বইয়ে শহীদ ইউসুফ এলাহি সম্পর্কে কয়েকজনের স্মৃতিচারণ স্থান পেয়েছে যা আমাকে আবেগ-আপ্লুত করেছে। ফার্সি নাম ‘নাখলে সুখতে’ অর্থ হচ্ছে পুড়ে যাওয়া খেজুর গাছ। লেখক সম্ভবত রূপক অর্থে এই নাম ব্যবহার করেছেন।

১৯৮৬ সালে ইরাক-ইরান যুদ্ধ চলাকালে প্রায় ২৫ বছর বয়সে ইউসুফ এলাহি রাসায়নিক হামলায় আহত হয়ে তেহরানের একটি হাসপাতালে মারা যান। ইরাক সীমান্তে কাসেম সোলাইমানির নেতৃত্বে দীর্ঘ দিন যুদ্ধ করেছেন তিনি। একদিন তাদের ঘাঁটিতেই রাসায়নিক হামলা করে বসে ইরাকি বাহিনী। নিষিদ্ধ রাসায়নিক গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে তারা বাঙ্কার থেকে বের হতে বাধ্য হন। ইউসুফ এলাহি সবাইকে বাঙ্কার থেকে বাইরে পাঠিয়ে নিজে সবার শেষে বের হন। এরপর ইউসুফ এলাহিকে মারাত্মক অসুস্থ অবস্থায় তেহরানের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

ইরাক সীমান্তে ইরানি সামরিক ঘাঁটিতে সহযোদ্ধাদের সবাই এই তরুণকে আরেফ ও পরহেজগার হিসেবে চিনতেন। সহযোদ্ধাদের বর্ণনা থেকে তার কিছু আধ্যাত্মিক ক্ষমতার কথা জানা যায়। এছাড়া জেনারেল সোলাইমানি নিজে ইউসুফ এলাহি সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছেন, ‘তখন যুদ্ধ চলছিল। এলাহিকে নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে যাচ্ছিলাম। হাঁটতে হাঁটতে বললাম গত কয়েকটি অভিযানের একটিতেও সন্তোষজনক সাফল্য পাইনি আমরা, সামনে যে অভিযান এটাতো আরও কঠিন ও জটিল অভিযান। এটাতে সফল হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

এলাহি এ কথা শোনে বললেন, ঘটনাক্রমে এই অভিযানেই আমরা সফল হব। কোথা থেকে সে এত নিশ্চিত সে কথা জানতে চাইলে ইতস্তত করে বলল, আমি নিশ্চিত হতে পেরেছি। আমি খবর পেয়েছি।’ আধ্যাত্মিক শক্তির মাধ্যমে আগামবার্তা এর আগেও এলাহি অনেক সহযোদ্ধাকে দিয়েছেন। এ কারণে তার কথায় বিশ্বাস করেন সোলাইমানি এবং শেষ পর্যন্ত সেই অভিযানে তারা সফল হন।

‘নাখলে সুখতে’ বইয়ে ইউসুফ এলাহির সহযোদ্ধারা জানিয়েছেন, প্রতিদিনের অন্যান্য নামাজের পাশাপাশি নিয়মিত তাহাজ্জুদের নামাজে মগ্ন হতেন ইউসুফ এলাহি।

এই শহীদ সম্পর্কে তার এক ভাই বলেছেন, ‘তেহরানের লাব্বাফি নেজাদ হাসপাতালে তখন ইউসুফ এলাহি চিকিৎসাধীন। কেরমান থেকে রওনা হয়ে তেহরানে পৌঁছেছি। হাসপাতালের ভেতরে ঢুকতেই এক যুবক এগিয়ে এসে বলল আপনি কি ইউসুফ এলাহির ভাই। বললাম-জ্বি। বলল আমার সঙ্গে আসুন। ইউসুফ এলাহি আপনাকে নিতে আমাকে পাঠিয়েছেন। আমি ও আমার আরেক ভাই অবাক হয়ে তার সঙ্গে গেলাম। রুমে ঢুকে ইউসুফ এলাহিকে জিজ্ঞেস করলাম-তুমি কিভাবে জানলে আমরা আসছি। সে জবাবে বলল- আপনারা যখন কেরমান থেকে গাড়িতে উঠেছেন তখন থেকেই আমি আপনাদেরকে দেখতে পাচ্ছিলাম। আমরা ঠিক কয়টায় রওনা হয়েছি, কোন রঙের গাড়ি দিয়ে এসেছি তার সবই বলে দিতে পারল ইউসুফ এলাহি।’

ইউসুফ এলাহির এক সহযোদ্ধা জানিয়েছেন, ‘একবার তাদের ব্রিগেডের দুই সেনা সীমান্তবর্তী নদীতে শত্রুর ওপর নজর রাখতে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে যায়। খোঁজাখুঁজির পরও তাদের পাওয়া যাচ্ছিল না। আমরা এই খবর ইউসুফ এলাহিকে জানাই। এলাহি কমান্ডার কাসেম সোলাইমানিকে অবহিত করেন। কমান্ডার সোলাইমানি দ্রুত খবরটি ঘাঁটির সবাইকে জানাতে বলেন।
সোলাইমানি বলেছিলেন, হয়ত ইরাকি সেনারা তাদের দুইজনকে আটক করেছে। এর ফলে আমাদের পরবর্তী অভিযানের খবর তারা জেনে যাবে। সবাইকে বিষয়টি সম্পর্কে সতর্ক করতে হবে। ইউসুফ এলাহি কমান্ডারের অনুমতি চেয়ে বলল, আজ রাতটা যাক। আমি সকালেই জানাতে পারব ওদের ভাগ্যে কী ঘটেছে। কমান্ডার অনুমতি দিলেন। সকালে ইউসুফ এলাহি জানাল-ওরা বন্দি হয়নি, ওরা দু’জনই শহীদ হয়ে গেছে। ওদের দু’জনের একজনের নাম ছিল আকবার মুসায়িপুর, অপর জনের নাম হোসেন সাদেকি। বলল-আমি ওদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা ধরা পড়েনি, শহীদ হয়ে গেছে। এরপর জানাল নদীর তীরে ওদের মরদেহ পাওয়া যাবে। আমরা নদীর ধারে অপেক্ষা করতে থাকলাম। প্রথমে আকবার মুসায়িপুর ও পরে হোসেন সাদেকির মরদেহ আমরা খোঁজে পাই এবং নিয়ে আসি।'

এমন আরও অনেক ঘটনাই তার সহযোদ্ধারা বর্ণনা করেছেন যা থেকে এটা স্পষ্ট, ইউসুফ এলাহি ছিলেন একজন বড় মাপের আরেফ। ইউসুফ এলাহি এবাদত-বন্দেগি ও সৎকর্মের মাধ্যমে এত উচ্চ মর্যাদায় পৌঁছেছিলেন যে, স্বপ্নে আগাম বার্তা পেয়ে যেতেন। ইউসুফ এলাহির সরাসরি কমান্ডার হিসেবে এসব তথ্য সবার চেয়ে বেশি জানতেন কাসেম সোলাইমানি। এমন আধ্যাত্মিক ব্যক্তিকে স্বচক্ষে দেখাও অনেক বড় সৌভাগ্যের বিষয়। এ কারণেই হয়ত এমন আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বের চিরদিনের প্রতিবেশী হওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি সোলাইমানি। তিনি স্ত্রীকে লেখা চিঠিতে বলে যান, তার (ইউসুফ এলাহি) পাশে কবর পাওয়ার ইচ্ছা আমার।'

প্রায় ১১ মাস আগেও ওই কবরস্থানে গিয়েছিলেন সোলাইমানি। সে সময় জেনারেল সোলাইমানির সঙ্গে কেরমান প্রদেশের শহীদ ফাউন্ডেশনের সাবেক প্রধান মোহাম্মাদ রেজা হাসানি সাদির দেখা হয়। ওই কবরস্থানে দাঁড়িয়ে তিনি সোলাইমানির কাছে জানতে চান, শুনেছি আপনি ইউসুফ এলাহির পাশে যাতে কবর দেওয়ার সুযোগ পান সেজন্য আবেদন করেছেন তাই না? জবাবে জেনারেল বলেছিলেন, হ্যাঁ। তবে ওর একেবারে পাশের জায়গাটা খালি না থাকলে ওর কবরের আশেপাশে হলেও চলবে।

তবে ইউসুফ এলাহির একেবারে পাশে কবর পাওয়ার ইচ্ছাটা পূরণ হয়েছে কাসেম সোলাইমানির। তারা পাশাপাশিই শুয়ে আছেন সেখানে। কাসেম সোলাইমানির আরও একটি ইচ্ছা পূরণ করা হয়েছে সেখানে। তিনি স্ত্রীকে বলে গিয়েছিলেন, তার কবরের ওপর যেন কোনো পদবী বা খেতাব লেখা না হয়, কবর যেন হয় একেবারেই সাদাসিধা। বিপ্লব-উত্তর ইরানে সর্বোচ্চ পদক ‌‌‌‌‘জুলফিকার’ অর্জনকারী একমাত্র জেনারেলের কবরের ওপর স্থাপিত পাথরটি তাই এখনও একেবারেই খালি, সেখানে কিছুই লেখা হয়নি। যারা জিয়ারতে যাচ্ছেন তারা প্রথমে চলে যাচ্ছেন ইউসুফ এলাহির কবরে। কারণ সবাই জানে ইউসুফ এলাহির কবরে গেলেই পাওয়া যাবে কাসেম সোলাইমানির সন্ধান।

আজীবন প্রচার-বিমুখ সোলাইমানি মৃত্যুর পরও যেন নিজেকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করলেন। এক সময়ের অধীনস্থ যোদ্ধা শহীদ ইউসুফ এলাহির পরিচয়েই যেন পরিচিত হতে চাইলেন।

প্রসঙ্গত, গত ৩ জানুয়ারি ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে মার্কিন বাহিনী দ্বারা হত্যাকাণ্ডের শিকার হন জেনারেল কাসেম সোলাইমানি। তিনি শুধু ইরানের নয়, পুরো আরব বিশ্বের বীর হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ক্যারিশম্যাটিক কমান্ডার হিসেবে সারা পৃথিবীতে পরিচিতি পেয়েছিলেন। তার বুদ্ধি-সাহস, নেতৃত্বের গুণাবলী ও যুদ্ধক্ষেত্রের বিচক্ষণতার গল্প ছিলো মানুষের মুখে মুখে।

পৃথিবীর ‘এক নম্বর’ জেনারেল হিসেবে বিবেচিত সোলাইমানির নাম ছিলো বিশ্বের সবচেয়ে দক্ষ গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ও মোসাদের হিট লিস্টের ‘এক নম্বরে’।

কাশেম সোলাইমানি মূলত সিরিয়া ও ইরাক যুদ্ধে তার বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য দেশ-বিদেশে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। সেসময় তিনি ‘সারুল্লাহ’ গ্রুপের নেতৃত্ব দেন। ওই যুদ্ধে তার অবদানের প্রশংসা করেছিলেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ।

তেহরানের আঞ্চলিক শত্রু সৌদি আরব ও ইসরাইলের মাথাব্যথার কারণ ছিলেন কাশেম সোলাইমানি। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় তার বীরত্বপূর্ণ অবদান সবার নজরে আসে। গত ২০ বছরে বহুবার যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও আরবের বিভিন্ন সংগঠন তাকে হত্যার চেষ্টা চালায়। তবে, প্রতিবারই তিনি প্রাণে বেঁচে যান। তবে শেষ বারের মতো মার্কিন চক্রান্তে পড়ে যান বিশ্বসেরা এ জেনারেল।

ঘটনাপ্রবাহ : ইরানি শীর্ষ জেনারেল কাসেম সোলাইমানি নিহত

আরও

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত