রক্তের লালসায় তারা যেন ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছিল

  যুগান্তর ডেস্ক ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৫:২২ | অনলাইন সংস্করণ

রক্তের লালসায় তারা যেন ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছিল
ছবি: এএফপি

উত্তরপূর্ব দিল্লির স্থানীয় একটি মসজিদ থেকে নামাজ আদায় করে ফিরছিলেন মোহাম্মদ জোবায়ের। তখন একটি বিশাল ভিড়ের সামনে পড়েন যান। ঝামেলা এড়াতে তিনি আন্ডারপাসের দিকে মুখ করে এগিয়ে যান।

কিন্তু ভুলটা হয়েছে সেখানেই। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই একদল তরুণ তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। বাঁশের লাঠি ও লোহার রড দিয়ে তাকে এলোপাতাড়ি পেটাতে থাকেন। বেদম পিটুনিতে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তার মাথা থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হয়। সারা শরীর রক্তে ভিজে যায়। সাদা পাঞ্জাবি রক্তে লাল হয়ে যায়।

আঘাত এতটাই প্রচণ্ড ছিলেন যে, ধরে নিয়েছিলেন তিনি মারা যাচ্ছেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে এমন তথ্য জানা গেছে।

রাজধানীর অন্য প্রান্তে নিজের এক আত্মীয়ের বাড়িতে বসে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনার বিবরণ দেন জোবায়ের। সোমবার মাঝদুপুরে এই হামলা হয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের আলোকচিত্রীর ক্যামেরায় সেই দৃশ্য ধরা পড়ে।

দিল্লির যে এলাকায় এই সহিংসতা হয়েছে, তার কাছেই হিন্দু ও মুসলমান বিক্ষোভকারীরা পরস্পরের প্রতি ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও লাঠিসোটা নিয়ে হামলা চালান।

কিন্তু জোবায়েরের ওপর যেখানে হামলা হয়েছে, সেখানে কিছুই ঘটেনি। পুরো এলাকা ছিল শান্ত ও নীরব। কোনো উসকানি ছাড়াই হিন্দুত্ববাদী স্লোগান দিয়ে নিরস্ত্র একটা মানুষের ওপর তারা ঝাঁপিয়ে পড়েন। আর এটা ঘটেছে কেবল তিনি মুসলমান হওয়ার কারণেই।

এতে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার লাগাম ধরা যে কতটা কঠিন হয়ে পড়েছে, সেই আভাসই মিলছে।

রয়টার্সকে জোবায়ের বলেন, তারা আমাকে একা পেয়ে বসেছিল। আমার মাথায় টুপি, দাড়ি ও পরনে সালওয়ার-কামিজ ছিল। আমি মুসলমান, চেহারা দেখেই তারা বুঝতে পেরেছে।

‘তারা স্লোগান দিচ্ছিল, আর আমাকে পেটাচ্ছিল। এটা কী ধরনের মানবতা!’

হিন্দুত্ববাদীরা মোহাম্মদ জোবায়েরের ওপর চড়াও হলে এভাবেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। তারা মাথা থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হয়। ছবি: রয়টার্সের

বিজেপির মুখপাত্র তাজিন্দর পাল সিং বাগ্গা বলেন, জুবায়েরের ওপর হামলা কেন, তারা দল কোনো সহিংসতায় সমর্থন করছে না। মূলত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সফরের সময় ভারতের ভাবমর্যাদা ক্ষুণ্ণ করতেই বিরোধী দল এই সহিংসতা উসকে দিয়েছে।

তিনি বলেন, এটা শতভাগ পূর্বপরিকল্পিত। এই সহিংসতার সঙ্গে তার দলের কোনো সম্পর্ক নেই।

কিন্তু এই বিক্ষোভ পূর্বপরিকল্পিত কিনা; স্বতন্ত্রভাবে সেটা প্রমাণ করতে পারেনি রয়টার্স।

বিজেপি মুখপাত্র বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করতে যাচ্ছে সরকার। আমি মনে করি, ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সব ঠিক হয়ে যাবে।

তবে এই হামলা নিয়ে দিল্লি পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি হিন্দুত্ববাদী কর্মসূচিকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে অগ্রসর হচ্ছেন। এতে তার উগ্র সমর্থকরা উৎসাহিত হয়েছেন। পরমাণু শক্তিধর দেশটির আশি শতাংশই হিন্দু ধর্মাবলম্বী।

মোদির হিন্দুত্ববাদী অ্যাজেন্ডায় অস্তিত্বের সংকটে পড়েছেন ভারতের ১৮ কোটি মুসলমান। দেশটি এখন হিন্দু-মুসলমানে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এখন তারা পরস্পরের মুখোমুখি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মেরুকরণে ভারতের ইতিহাসের অতীতের অন্ধকারময় অধ্যায়ের কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ যুগেন্দ্র যাদব বলেন, দিল্লির একটি ছোট্ট এলাকায় এই সহিংসতা হয়েছে। কিন্তু এটা ১৯৮৪ সালের শিখ দাঙ্গাকে সামনে নিয়ে এসেছে।

তখনকার প্রধানমন্ত্রী ইন্দ্রিরা গান্ধীকে হত্যার পর শিখদের ওপর এভাবে হামলার ঘটনার কথাই তিনি স্মরণ করিয়ে দেন। দিল্লিসহ বিভিন্ন শহরে কয়েক হাজার শিখকে হত্যা করা হয়েছে। তদন্তকারীরা যেটাকে সুসংগঠিত সহিংসতা হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

হামলার পর জোবায়ের অচেতন হয়ে পড়লে দাঙ্গাকারীদের পাথর নিক্ষেপ করে তাড়িয়ে দিয়ে তাকে উদ্ধার করেন স্থানীয় মুসলমানরা। ৩৭ বছর বয়সী এই ভারতীয় বলেন, হাসপাতালে চিকিৎসার পর তিনি ছাড়া পান। আমি বেঁচে ফিরতে পারবো, এমনটা কল্পনাই করিনি। কেবল আমার আল্লাহকে স্মরণ করছিলাম।

এদিকে নরেন্দ্র মোদীর ‘শান্তি ও ভ্রাতৃত্বের’ আহ্বান সত্ত্বেও থামেনি দিল্লির দাঙ্গা, উত্তরপূর্ব দিল্লির পরিস্থিতি আগের মতোই উত্তেজনায় টান টান হয়ে আছে।

টানা চার দিন ধরে দাঙ্গার পর বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৩৪ জনে দাঁড়িয়েছে এবং আহতের সংখ্যা দুইশ ছাড়িয়ে গেছে বলে এনডিটিভি জানিয়েছে।

এ দিন গগন বিহার-জোহরিপুর এলাকার একটি ড্রেন থেকে দুটি লাশ পাওয়ার পর মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩৪ জনে দাঁড়ায়।

ঘটনাপ্রবাহ : ভারতে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল বিতর্ক

আরও
আরও পড়ুন

'কোভিড-১৯' সর্বশেষ আপডেট

# আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ৪৮ ১৫
বিশ্ব ৬,২২,১৫৭১,৩৭,৩৬৪২৮,৭৯৯
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

 
×