২২ বছর পর ছাত্রীর শ্লীলতাহানির মামলায় শিক্ষক কারাগারে
jugantor
২২ বছর পর ছাত্রীর শ্লীলতাহানির মামলায় শিক্ষক কারাগারে

  অনলাইন ডেস্ক  

২১ অক্টোবর ২০২০, ১২:৩১:৫৭  |  অনলাইন সংস্করণ

ভারতের দার্জিলিংয়ে ২২ বছর পর এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা করেন এক নারী আইনজীবী। তার ওই মামলায় অভিযুক্ত শিক্ষক এখন কারাগারে।

গৃহশিক্ষকের যৌন নির্যাতনের শিকার দার্জিলিংয়ের সেই কিশোরী এখন পেশাদার আইনজীবী। হংকংয়ে নামি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। খবর আনন্দবাজার পত্রিকার।

অনলাইনে অভিযোগ জানান গত বছর। আরও অনেক শিক্ষার্থী ওই শিক্ষকের লালসার শিকার। সেসব তথ্যপ্রমাণ জোগাড় করে শিলিগুড়ির একটি স্কুলের শিক্ষক অভিযুক্ত জীতেশ ওঝাকে সম্প্রতি গ্রেফতার করেছে দার্জিলিং পুলিশ।

তিনি বলেন, যৌন নির্যাতন পরবর্তী ট্রমা এবং তার বিরুদ্ধে ক্রমাগত লড়াই এখনও এই ২২ বছর পরও আমাকে জর্জরিত করে।

আমি তখন ১৪ বছরের কিশোরী। তখন প্রায় এক মাস ধরে যেভাবে পর পর আমার যৌন নির্যাতন ও শ্লীলতাহানি করা হয়েছিল, তার স্মৃতি এখনও প্রতিনিয়ত মনে পড়ে।

বাইরে থেকে সব কিছুই স্বাভাবিক মনে হয়। আপনারা হয়তো ভাববেন– আমি আত্মবিশ্বাসী। বাকপটু। সিনিয়র মার্কেট ক্যাপিটাল আইনজীবী হিসেবে ভারত, লন্ডন, হংকংয়ের সেরা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছি। কিন্তু তার পরও আমি জানি– কী ভয়ঙ্কর এক দৈত্যের মুখোমুখি হয়েছিলাম। এখনও তার সঙ্গে লড়াই করে যাচ্ছি।

সারাবিশ্ব ভাবছে, আপনি খুব ভালো আছেন। কিন্তু শুধু আপনিই জানেন, ভেতরে ভেতরে মনের সঙ্গে কী মারাত্মক যুদ্ধ করে যেতে হচ্ছে। আরও ভয়াবহ যে, সেই যুদ্ধের বিষয় নিয়ে আপনি কারও সঙ্গে কথাও বলতে পারছেন না।

এখন একজন ৩৭ বছর বয়সের মহিলা হিসেবে, একজন আইনজীবী ও শিক্ষিকা হিসেবে আমি সেই সময়ের স্মৃতি আওড়াতেও ভয় পাই। কাউকে বলতে ভয় পাই সেই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা। সেই পুরুষের কথা, যাকে বিশ্বাস করে বাবা-মা আমার দেখভালের দায়িত্ব, আমাকে পড়ানোর দায়িত্ব তার ওপর সঁপে দিয়েছিলেন।

পেছনে তাকালে দেখতে পাই, নব্বইয়ের দশকে দার্জিলিংয়ের শান্ত পাহাড়ি এলাকা। তখন ইন্টারনেট ছিল না। গুড-টাচ, ব্যাড-টাচের পার্থক্য বোঝার মতো তথ্য জোগাড় করাও সম্ভব ছিল না। তখন স্কুলেও এসব পাঠ দেয়া হতো না। বাবা-মায়ের সঙ্গেও এসব নিয়ে কথা হতো না তেমন। সরাসরি এসব বিষয়ে কথা বলাকে সমাজও ভালোভাবে নিত না তখন।

এখন মনে হয়, তখন বিষয়গুলো খোলামেলাভাবে আলোচনা করা গেলে আমি এবং আমার মতো আরও অনেকে রক্ষা পেত।

আশ্চর্যজনকভাবে যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে লজ্জা সবসময় নির্যাতিতার ওপরেই বর্তায়। ১৪ বছরের আমাকে দিয়ে আমি এখনও সেটি বুঝতে পারি। লজ্জার বোঝাটা আমাকেই বয়ে নিয়ে বেড়াতে হয়। তার বিন্দুমাত্র ভাগ নেয় না ওই লোকগুলো।

আমার শ্লীলতাহানি করা লোকটাও আমাকে খুব দ্রুত বুঝিয়ে দিয়েছিল, ওই লজ্জার পুরোটাই আমার। কারণ আমার মা-বাবার সম্মান রাখার দায়িত্ব আমারই। বলেছিল– আমার কথা কেউ বিশ্বাস করবে না। তখনও ভাবতাম। এখনও ভাবি, কেন সম্মান রক্ষার দায় শুধু মেয়েদেরই। কেন পুরুষরা প্রাপ্তবয়স্ক হলেও পরিবারের সম্ভ্রম রক্ষার দায় নেবে না? এখনও উত্তর খুঁজছি এ প্রশ্নের।

ওই লজ্জা আমাকে গিলে খেয়েছে। আমাকে কুঁকড়ে মেরেছে। ওটা এমন এক অভিজ্ঞতা, আগে কখনও যার মুখোমুখি হইনি। লজ্জা আর ভয় আমার সঙ্গী হয়ে উঠেছিল দিনরাত। অথচ সেটি হওয়ার কথা ছিল ওই লোকটার সঙ্গে। সেটিই দীর্ঘ সময়ের জন্য আমাকে চুপ করিয়ে রেখেছিল।

সময় যত এগিয়েছে, ভেবেছি সেই লজ্জা হয়তো লুকোতে পেরেছি। কিন্তু বুঝতে পারিনি, সেই যন্ত্রণা চেপে রেখে দিনের পর দিন যন্ত্রণাটা আরও বাড়িয়ে গেছি।

বছর গড়িয়েছে দশকে। কিন্তু যন্ত্রণা কমেনি। এখনও যখন এই দুঃস্বপ্ন তাড়া করে, মনে হয় এই তো সেদিনের ঘটনা।

আইনজীবী হলেও আমি একজন মহিলা। আমার ভেতরের ১৪ বছরের কিশোরী মেয়েটা এবং এখনকার মহিলা আইনজীবী আমাকে ক্রমাগত বুঝিয়ে গেছে– এই লজ্জা এখনও আমারই। নির্যাতনকারীর নয়। তাই বুঝে গিয়েছিলাম– এটি খুব ঝুঁকির। এত বছর ধরে চুপ থাকার যে শিক্ষা পেয়েছি, সেটিই চালিয়ে যাব। তার পর একসময় সব ভুলে যাব।

কিন্তু ২০১৯ সালে জানতে পারি, সেই শ্রীমান শিক্ষক এখনও শিলিগুড়ির এক অভিজাত স্কুলে পড়ান এবং শিশু-কিশোরীদের ওপর একইভাবে যৌন নির্যাতন চালান। তখনই মনে একটা বিরাট পরিবর্তন এলো।

মনে হলো– যৌন শিকারির হাত থেকে বেঁচে গেলেও জীবনভর যে যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছি, তা যেন অন্য কারও সঙ্গে না হয়। যে লোকটার জন্য আমি আমার এই কষ্ট বয়ে নিয়ে চলেছি, তা যেন অন্য কোনো মেয়ের ক্ষেত্রে না হয়।

২০১৯ পেরিয়ে এলো ২০২০। আমি আত্মবিশ্বাসী ছিলাম– পুলিশ যে তথ্যপ্রমাণ জোগাড় করতে পেরেছে, তা ওই লোকটাকে গ্রেফতারের পক্ষে যথেষ্ট। অক্টোবরের ৫ তারিখে খবর পেলাম, লোকটাকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে।

২৪ ঘণ্টার মধ্যে আরও অনেকে এগিয়ে এলো তাদের অভিজ্ঞতার কথা জানাতে। সেই সংখ্যা যত বেড়েছে, আমি তত সাহস পেয়েছি।

২২ বছর পর ছাত্রীর শ্লীলতাহানির মামলায় শিক্ষক কারাগারে

 অনলাইন ডেস্ক 
২১ অক্টোবর ২০২০, ১২:৩১ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

ভারতের দার্জিলিংয়ে ২২ বছর পর এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা করেন এক নারী আইনজীবী। তার ওই মামলায় অভিযুক্ত শিক্ষক এখন কারাগারে।
 
গৃহশিক্ষকের যৌন নির্যাতনের শিকার দার্জিলিংয়ের সেই কিশোরী এখন পেশাদার আইনজীবী। হংকংয়ে নামি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। খবর আনন্দবাজার পত্রিকার।

অনলাইনে অভিযোগ জানান গত বছর। আরও অনেক শিক্ষার্থী ওই শিক্ষকের লালসার শিকার। সেসব তথ্যপ্রমাণ জোগাড় করে শিলিগুড়ির একটি স্কুলের শিক্ষক অভিযুক্ত জীতেশ ওঝাকে সম্প্রতি গ্রেফতার করেছে দার্জিলিং পুলিশ।

তিনি বলেন, যৌন নির্যাতন পরবর্তী ট্রমা এবং তার বিরুদ্ধে ক্রমাগত লড়াই এখনও এই ২২ বছর পরও আমাকে জর্জরিত করে।

আমি তখন ১৪ বছরের কিশোরী। তখন প্রায় এক মাস ধরে যেভাবে পর পর আমার যৌন নির্যাতন ও শ্লীলতাহানি করা হয়েছিল, তার স্মৃতি এখনও প্রতিনিয়ত মনে পড়ে।

বাইরে থেকে সব কিছুই স্বাভাবিক মনে হয়। আপনারা হয়তো ভাববেন– আমি আত্মবিশ্বাসী। বাকপটু। সিনিয়র মার্কেট ক্যাপিটাল আইনজীবী হিসেবে ভারত, লন্ডন, হংকংয়ের সেরা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছি। কিন্তু তার পরও আমি জানি– কী ভয়ঙ্কর এক দৈত্যের মুখোমুখি হয়েছিলাম। এখনও তার সঙ্গে লড়াই করে যাচ্ছি।

সারাবিশ্ব ভাবছে, আপনি খুব ভালো আছেন। কিন্তু শুধু আপনিই জানেন, ভেতরে ভেতরে মনের সঙ্গে কী মারাত্মক যুদ্ধ করে যেতে হচ্ছে। আরও ভয়াবহ যে, সেই যুদ্ধের বিষয় নিয়ে আপনি কারও সঙ্গে কথাও বলতে পারছেন না।

এখন একজন ৩৭ বছর বয়সের মহিলা হিসেবে, একজন আইনজীবী ও শিক্ষিকা হিসেবে আমি সেই সময়ের স্মৃতি আওড়াতেও ভয় পাই। কাউকে বলতে ভয় পাই সেই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা। সেই পুরুষের কথা, যাকে বিশ্বাস করে বাবা-মা আমার দেখভালের দায়িত্ব, আমাকে পড়ানোর দায়িত্ব তার ওপর সঁপে দিয়েছিলেন।

পেছনে তাকালে দেখতে পাই, নব্বইয়ের দশকে দার্জিলিংয়ের শান্ত পাহাড়ি এলাকা। তখন ইন্টারনেট ছিল না। গুড-টাচ, ব্যাড-টাচের পার্থক্য বোঝার মতো তথ্য জোগাড় করাও সম্ভব ছিল না। তখন স্কুলেও এসব পাঠ দেয়া হতো না। বাবা-মায়ের সঙ্গেও এসব নিয়ে কথা হতো না তেমন। সরাসরি এসব বিষয়ে কথা বলাকে সমাজও ভালোভাবে নিত না তখন।

এখন মনে হয়, তখন বিষয়গুলো খোলামেলাভাবে আলোচনা করা গেলে আমি এবং আমার মতো আরও অনেকে রক্ষা পেত।

আশ্চর্যজনকভাবে যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে লজ্জা সবসময় নির্যাতিতার ওপরেই বর্তায়। ১৪ বছরের আমাকে দিয়ে আমি এখনও সেটি বুঝতে পারি। লজ্জার বোঝাটা আমাকেই বয়ে নিয়ে বেড়াতে হয়। তার বিন্দুমাত্র ভাগ নেয় না ওই লোকগুলো।

আমার শ্লীলতাহানি করা লোকটাও আমাকে খুব দ্রুত বুঝিয়ে দিয়েছিল, ওই লজ্জার পুরোটাই আমার। কারণ আমার মা-বাবার সম্মান রাখার দায়িত্ব আমারই। বলেছিল– আমার কথা কেউ বিশ্বাস করবে না। তখনও ভাবতাম। এখনও ভাবি, কেন সম্মান রক্ষার দায় শুধু মেয়েদেরই। কেন পুরুষরা প্রাপ্তবয়স্ক হলেও পরিবারের সম্ভ্রম রক্ষার দায় নেবে না? এখনও উত্তর খুঁজছি এ প্রশ্নের।

ওই লজ্জা আমাকে গিলে খেয়েছে। আমাকে কুঁকড়ে মেরেছে। ওটা এমন এক অভিজ্ঞতা, আগে কখনও যার মুখোমুখি হইনি। লজ্জা আর ভয় আমার সঙ্গী হয়ে উঠেছিল দিনরাত। অথচ সেটি হওয়ার কথা ছিল ওই লোকটার সঙ্গে। সেটিই দীর্ঘ সময়ের জন্য আমাকে চুপ করিয়ে রেখেছিল।

সময় যত এগিয়েছে, ভেবেছি সেই লজ্জা হয়তো লুকোতে পেরেছি। কিন্তু বুঝতে পারিনি, সেই যন্ত্রণা চেপে রেখে দিনের পর দিন যন্ত্রণাটা আরও বাড়িয়ে গেছি।

বছর গড়িয়েছে দশকে। কিন্তু যন্ত্রণা কমেনি। এখনও যখন এই দুঃস্বপ্ন তাড়া করে, মনে হয় এই তো সেদিনের ঘটনা।

আইনজীবী হলেও আমি একজন মহিলা। আমার ভেতরের ১৪ বছরের কিশোরী মেয়েটা এবং এখনকার মহিলা আইনজীবী আমাকে ক্রমাগত বুঝিয়ে গেছে– এই লজ্জা এখনও আমারই। নির্যাতনকারীর নয়। তাই বুঝে গিয়েছিলাম– এটি খুব ঝুঁকির। এত বছর ধরে চুপ থাকার যে শিক্ষা পেয়েছি, সেটিই চালিয়ে যাব। তার পর একসময় সব ভুলে যাব।

কিন্তু ২০১৯ সালে জানতে পারি, সেই শ্রীমান শিক্ষক এখনও শিলিগুড়ির এক অভিজাত স্কুলে পড়ান এবং শিশু-কিশোরীদের ওপর একইভাবে যৌন নির্যাতন চালান। তখনই মনে একটা বিরাট পরিবর্তন এলো।

মনে হলো– যৌন শিকারির হাত থেকে বেঁচে গেলেও জীবনভর যে যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছি, তা যেন অন্য কারও সঙ্গে না হয়। যে লোকটার জন্য আমি আমার এই কষ্ট বয়ে নিয়ে চলেছি, তা যেন অন্য কোনো মেয়ের ক্ষেত্রে না হয়।

২০১৯ পেরিয়ে এলো ২০২০। আমি আত্মবিশ্বাসী ছিলাম– পুলিশ যে তথ্যপ্রমাণ জোগাড় করতে পেরেছে, তা ওই লোকটাকে গ্রেফতারের পক্ষে যথেষ্ট। অক্টোবরের ৫ তারিখে খবর পেলাম, লোকটাকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে।

২৪ ঘণ্টার মধ্যে আরও অনেকে এগিয়ে এলো তাদের অভিজ্ঞতার কথা জানাতে। সেই সংখ্যা যত বেড়েছে, আমি তত সাহস পেয়েছি।