তুরস্কে কি নতুন গেম মঞ্চস্থ করতে চাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র?
jugantor
তুরস্কে কি নতুন গেম মঞ্চস্থ করতে চাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র?

  সরোয়ার আলম, আঙ্কারা, তুরস্ক থেকে  

২৪ অক্টোবর ২০২০, ১৬:৪৬:৩৪  |  অনলাইন সংস্করণ

২০১৬ সালে এরদোগান সরকারকে উৎখাতে ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান চালানো হয়। ফাইল ছবি

পশ্চিমারা, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশে নিজের প্রভাব বিস্তার করতে কখনও গণতন্ত্র, কখনও সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধ, কখনও সে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা আবার কখনওবা অর্থনৈতিক অগ্রগতির দোহাই দিয়ে সে দেশের সরকার পরিবর্তন করার পাঁয়তারা করে।

এরই ধারাবাহিকতায় কখনও বা ওই দেশগুলোতে নিজের পছন্দমত সরকার বসাতে সক্ষম হয়েছে। তাতে সক্ষম না হলে দেশেটির মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে ফায়দা লুটে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। এজন্য তার সেনাবাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, ব্যাবসায়ী প্রতিষ্ঠান, ত্রাণ সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়, দূতাবাসসহ কোন কিছুই ব্যবহার করতে দ্বিধাবোধ করে না।

এক পদ্ধতিতে সফল না হলে অন্য পদ্ধতি অবলম্বন করে। কিন্তু চেষ্টা চালিয়েই যায়।

পদ্ধতিগুলো কিছুটা এরকম-
আপনি যদি তার অপছন্দনীয় প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি হন তাহলে প্রথমে আপনাকে লোভ দেখাবে, প্রলোভন দিয়ে কব্জা করার চেষ্টা করবে। না হলে আপনাকে ভয় দেখাবে। তাতেও কাজ না হলে আপনাকে ব্লাকমেইল করার চেষ্টা করবে। তাতেও যদি কাজ না হয় আপনার বিরুদ্ধে অপপ্রচার শুরু করবে।

বিভিন্ন জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে আপনাকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করবে। মিডিয়া, সুশীল সমাজ, বিশেষজ্ঞ, রাজনৈতিক মহলকে আপনার বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিবে। আপনার প্রতিপক্ষকে বিভিন্ন অজুহাতে সাহায্য করবে।

দেশে অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে। গণরোষতৈরি করবে।দেশের মধ্যে সন্ত্রাসীদের মদদ দিবে। তাদের মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে সাহায্য করবে। সন্ত্রাসী আক্রমণের পরিবেশ তৈরি করে দেবে। আপনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অবরোধ আরোপ করবে। আর সর্বশেষ আপনার বিরুদ্ধে সামরিক আভ্যুত্থান ঘটাবে।

তুরস্ককে প্রথমে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদের প্রলোভন দেখানো হলো। তুরস্ক বছরের পর বছর ইউরোপের দ্বারে দ্বারে ঘুরে যখন বিরক্ত হয়ে ফিরে এলো, তখন শুরু হল আঙ্কারার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের চাপ প্রয়োগ।

প্রথমে জমিন তৈরি করল মানবাধিকার সংস্থাগুলো। সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এই সংস্থাগুলো মানবাধিকারের সুর তুলল। সেগুলো নিয়ে মিডিয়া হইচই শুরু করে দিলো। রাজনীতিবিদ, সুশীল সমাজ, বিশেষজ্ঞ মহল সুর মিলিয়ে গলা উঁচিয়ে একই গান গাইতে থাকল। মানবাধিকারের দোহাই দিয়ে তুরস্কের টুঁটি চেপে ধরতে চাইল। তাতেও যখন সফল হল না, দেশের ভিতরে গণরোষ তৈরির পাঁয়তারা করলো (২০১৩ সালের গেযি পার্ক আন্দোলন)।

পশ্চিমা বড় বড় গণমাধ্যম তুরস্কের ছোট ছোট আন্দোলনকে উসকে দিতে মরিয়া হয়ে উঠলো। দেশের ভিতরে সন্ত্রাসীদের উসকিয়ে দিয়ে অরাজকতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করলো। সন্ত্রাসী হামলায় তুরস্ক যখন দিশেহারা তখন তুরস্ককেই সন্ত্রাসবাদের অপবাদ দেওয়া হল। তাতেও যখন সফল হল না তখন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মরণকামড় দিলো।

সেই ২০১৩ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত, কত কিছুই না ঘটেছিল তুরস্কে! ভাবলে এখনও গা শিউরে উঠে। দুর্নীতির অভিযোগে সিভিল ক্যু, কয়েকটি গাছ কাঁটা নিয়ে কেন্দ্র করে সরকার পতনের আন্দোলন। সিরিয়ার শরণার্থীদের নিয়ে আঙ্কারার উপের অযৈক্তিক চাপ। মুহুর্মুহুর সন্ত্রাসী হামলা। এবং সর্বশেষ সামরিক অভ্যুত্থান।

সামরিক অভ্যুত্থানের কয়েক মাস আগে ২০১৬ সালের শুরুর দিকে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই কোন না কোন এলাকায় সন্ত্রাসী হামলা হত। তবে সবচেয়ে অবাক করার বিষয় ছিল। প্রতিটি সন্ত্রাসী হামলার দু-একদিন আগেই আঙ্কারার আমেরিকান দূতাবাস কোনো এক অদৃশ্য শক্তির কাছ থেকে হামলার খবর পেয়ে যেত। আর তার জনগণকে সম্ভাব্য সন্ত্রাসী আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য সাবধান করে দিত।

তুরস্কের গোয়েন্দা সংস্থা যেখানে এরকম কোনো সম্ভাব্য হামলার খবর আঁচ করতে পারেনি, সেখানে মার্কিন দূতাবাসের বিষয়টি আগেই জানতে পারাটা কেমন একটা খটকার জন্ম দেয় না?

মার্কিন দূতাবাস কীভাবে হামলার তথ্যআগেই জানে?

এর দু’টি উত্তর হতে পারে।
এক. হয়ত তাদের গোয়েন্দা বিভাগ অনেক বেশি শক্তিশালী। যদি তাই হয় তাহলে এতো মারাত্মক একটি বিষয় তুরস্কের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে শেয়ার করা তাদের দায়িত্ব। কিন্তু তারা সেটি করে না।

দুই. তারা সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোকে উসকে দেয়ার জন্য এধরনের আগাম ঘোষণা দেয়। সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোকে দাওয়াত দেয় সন্ত্রাসী হামলা চালানোর জন্য। হামলা হলে নিজেদেরকে সঠিক পরমান করতে পারে। আর হামলা না হলেও পানি তো ঘোলা হয়!

মার্কিন দূতাবাস সময়ে অসময়ে তুরস্কের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাতে অতি উৎসাহী থাকে। কখনও প্রকাশ্যে, কখনওবা শব্দের মারপ্যাঁচে তুরস্ককে হুমকি দিতে যথেষ্ট সোচ্চার।

তখনকার মার্কিন রাষ্ট্রদূত যখন তুরস্ক ছেড়ে যাওয়ার আগে সর্বশেষ সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘আমরা না থাকলে তুরস্কে আরও অনেক বেশি সন্ত্রাসী হামলা হত’।

তুরস্কের অনেক সংবাদমাধ্যমই তখন তার বক্তব্যটিকেএভাবে ব্যাখ্যা করেছিল-‘আমরা (যুক্তরাষ্ট্র) সন্ত্রাসীদেরকে বলে-কয়ে হামলার মাত্রাটা একটু কমিয়ে এনেছিলাম। আমরা তাদেরকে থামতে না বললে তারা আরও বেশি হামলা করত। আমরা তাদেরকে চিনি ও জানি, কিন্তু তোমাকে বলবো ন ‘।

তারপরে তো আসলো সেই বীভৎস রাত। সামরিক অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টা। সে রাতে তুরস্কের সরকার জনগণের সহয়তায় অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টাকে ব্যার্থ করে গণতন্ত্রের অনন্য দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করল। কিন্তু আমেরিকা এবং তার দোসররা আইনের শাসনের দোহাই দিয়ে সামরিক অভ্যুত্থানের নায়কদের পক্ষ নিলো। হায়রে গণতন্ত্রের ফেরিওয়ালারা !

মাঝখানে কেটে গেল কয়েকটি বছর। আমেরিকা তুরস্কের টুঁটি চেপে ধরতে তার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। কখনও তুরস্ক থেকে আমদানিকৃত পণ্যে গলাকাটা ভ্যাট বসিয়ে, কখনও অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে। আবার কখনও কূটনৈতিক শিষ্টাচারকে ধূলিসাৎ করে মহল্লার চাঁদাবাজদের মত সরাসরি হুমকি দিয়ে।

সেই পুরাতন খেলা মঞ্চস্থ করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র?

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ওয়াশিংটন আবারও সেই পুরাতন খেলাকে নতুন করে মঞ্চস্থ করতে চাচ্ছে। কিছুদিন আগেও তুরস্কে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেওয়া হয় যুক্তরাষ্ট্র থেকে।

মার্কিন মিডিয়া, সামরিক গবেষণা রিপোর্ট এবং প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রাট প্রার্থী জো বাইডেনের বক্তব্যে একই কথা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আসে বারবার।

‘তুরস্কের বিরোধী দল যথেষ্ট শক্তিশালী না, তাই তাদেরকে সহযোগিতা করা দরকার, এমনকি ভিন্ন পথে হলেও সরকার পরিবর্তন করা দরকার’ বলে জানানো হয় আমেরিকা থেকে। মানে সামরিক অভ্যুত্থানের ইঙ্গিত। সে আলোচনার রেশ না কাটতেই নতুন চাল খেলল আঙ্কারায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস।

হঠাৎ দূতাবাস থেকে এক বিবৃতিতে আমেরিকান নাগরিকদেরকে সতর্ক করে বলা হয় যে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে তারা জানতে পেরেছেন যে, ইস্তান্বুল বা তুরস্কের অন্য যে কোনো জায়গায় সন্ত্রাসী হামলা হতে পারে!

তুরস্কের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি যখন খুবই ভাল। সিরিয়ার সীমান্ত যখন গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে সুরক্ষিত। তুরস্কের নিরাপত্তা বাহিনী যখন সবচেয়ে সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে। সেনাবাহিনী যখন দেশে ও বিদেশে সুফল কুড়াচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে মার্কিন দূতাবাস থেকে এমন একটি সন্ত্রাসী হামলা হতে পারে বলে ঘোষণা আসলো! কেমন একটু বেখাপ্পা লাগছে না?

যদিও তুরস্কের গোয়েন্দা সংস্থা এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে এধরনের কোনো হামলার সম্ভবনা নাকচ করে দিয়েছে।

কোন পদ্ধতিতে যাবে যুক্তরাষ্ট?

তুরস্কের গোয়েন্দা সংস্থা এখন অনেক বেশি শক্তিশালী। দেশের বাইরেও অপারেশন পরিচালনা করতে সক্ষম। পুলিশ বাহিনী অনেক বেশি নিষ্কলঙ্ক ও আন্তরিক।

তুর্কি সেনাবাহিনী আরও বেশি সরকার অনুগত ও সুশৃঙ্খল। বিরোধী দল এখন যথেষ্ট শক্তিশালী না। প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোগান এখন আরও বেশি অভিজ্ঞ খেলুড়ে। এখন আর কি সেই পুরাতন কৌশল খেলা চলে?

তবে কেউ কারও চেয়ে কম যাবে না। আমেরিকা এক প্রচেষ্টায় সফল না হলে অন্যভাবে চেষ্টা করবে। ভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করবে। এতে কোন সন্দেহ নাই। আমেরিকার নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে এধরনের চাল আরও বাড়বে। তবে এরদোগানের নতুন তুরস্কের সঙ্গে কতটুকু পেরে উঠবে সেটাই দেখার বিষয়।

লেখক: সরোয়ার আলম, চিফ রিপোর্টার এবং আঞ্চলিক প্রধান, আনাদলু এজেন্সি

তুরস্কে কি নতুন গেম মঞ্চস্থ করতে চাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র?

 সরোয়ার আলম, আঙ্কারা, তুরস্ক থেকে 
২৪ অক্টোবর ২০২০, ০৪:৪৬ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
২০১৬ সালে এরদোগান সরকারকে উৎখাতে ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান চালানো হয়। ফাইল ছবি
২০১৬ সালে এরদোগান সরকারকে উৎখাতে ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান চালানো হয়। ফাইল ছবি

পশ্চিমারা, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশে নিজের প্রভাব বিস্তার করতে কখনও গণতন্ত্র, কখনও সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধ, কখনও সে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা আবার কখনওবা অর্থনৈতিক অগ্রগতির দোহাই দিয়ে সে দেশের সরকার পরিবর্তন করার পাঁয়তারা করে। 

এরই ধারাবাহিকতায় কখনও বা ওই দেশগুলোতে নিজের পছন্দমত সরকার বসাতে সক্ষম হয়েছে।  তাতে সক্ষম না হলে দেশেটির মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে ফায়দা লুটে নেওয়ার চেষ্টা করেছে।  এজন্য তার সেনাবাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, ব্যাবসায়ী প্রতিষ্ঠান, ত্রাণ সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়, দূতাবাসসহ কোন কিছুই ব্যবহার করতে দ্বিধাবোধ করে না। 

এক পদ্ধতিতে সফল না হলে অন্য পদ্ধতি অবলম্বন করে।  কিন্তু চেষ্টা চালিয়েই যায়। 

পদ্ধতিগুলো কিছুটা এরকম-
আপনি যদি তার অপছন্দনীয় প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি হন তাহলে প্রথমে আপনাকে লোভ দেখাবে, প্রলোভন দিয়ে কব্জা করার চেষ্টা করবে।  না হলে আপনাকে ভয় দেখাবে।  তাতেও কাজ না হলে আপনাকে ব্লাকমেইল করার চেষ্টা করবে।  তাতেও যদি কাজ না হয় আপনার বিরুদ্ধে অপপ্রচার শুরু করবে।  

বিভিন্ন জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে আপনাকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করবে। মিডিয়া, সুশীল সমাজ, বিশেষজ্ঞ, রাজনৈতিক মহলকে আপনার বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিবে। আপনার প্রতিপক্ষকে বিভিন্ন অজুহাতে সাহায্য করবে।

দেশে অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে। গণরোষ তৈরি করবে। দেশের মধ্যে সন্ত্রাসীদের মদদ দিবে। তাদের মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে সাহায্য করবে। সন্ত্রাসী আক্রমণের পরিবেশ তৈরি করে দেবে। আপনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অবরোধ আরোপ করবে। আর সর্বশেষ আপনার বিরুদ্ধে সামরিক আভ্যুত্থান ঘটাবে। 

তুরস্ককে প্রথমে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদের প্রলোভন দেখানো হলো। তুরস্ক বছরের পর বছর ইউরোপের দ্বারে দ্বারে ঘুরে যখন বিরক্ত হয়ে ফিরে এলো, তখন শুরু হল আঙ্কারার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের চাপ প্রয়োগ। 

প্রথমে জমিন তৈরি করল মানবাধিকার সংস্থাগুলো। সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এই সংস্থাগুলো মানবাধিকারের সুর তুলল। সেগুলো নিয়ে মিডিয়া হইচই শুরু করে দিলো।  রাজনীতিবিদ, সুশীল সমাজ, বিশেষজ্ঞ মহল সুর মিলিয়ে গলা উঁচিয়ে একই গান গাইতে থাকল। মানবাধিকারের দোহাই দিয়ে তুরস্কের টুঁটি চেপে ধরতে চাইল।  তাতেও যখন সফল হল না, দেশের ভিতরে গণরোষ তৈরির পাঁয়তারা করলো (২০১৩ সালের গেযি পার্ক আন্দোলন)। 

পশ্চিমা বড় বড় গণমাধ্যম তুরস্কের ছোট ছোট আন্দোলনকে উসকে দিতে মরিয়া হয়ে উঠলো।  দেশের ভিতরে সন্ত্রাসীদের উসকিয়ে দিয়ে অরাজকতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করলো।  সন্ত্রাসী হামলায় তুরস্ক যখন দিশেহারা তখন তুরস্ককেই সন্ত্রাসবাদের অপবাদ দেওয়া হল।  তাতেও যখন সফল হল না তখন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মরণকামড় দিলো। 

সেই ২০১৩ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত, কত কিছুই না ঘটেছিল তুরস্কে! ভাবলে এখনও গা শিউরে উঠে। দুর্নীতির অভিযোগে সিভিল ক্যু, কয়েকটি গাছ কাঁটা নিয়ে কেন্দ্র করে সরকার পতনের আন্দোলন। সিরিয়ার শরণার্থীদের নিয়ে আঙ্কারার উপের অযৈক্তিক চাপ। মুহুর্মুহুর সন্ত্রাসী হামলা। এবং সর্বশেষ সামরিক অভ্যুত্থান। 
 
সামরিক অভ্যুত্থানের কয়েক মাস আগে ২০১৬ সালের শুরুর দিকে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই কোন না কোন এলাকায় সন্ত্রাসী হামলা হত। তবে সবচেয়ে অবাক করার বিষয় ছিল।  প্রতিটি সন্ত্রাসী হামলার দু-একদিন আগেই আঙ্কারার আমেরিকান দূতাবাস কোনো এক অদৃশ্য শক্তির কাছ থেকে হামলার খবর পেয়ে যেত।  আর তার জনগণকে সম্ভাব্য সন্ত্রাসী আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য সাবধান করে দিত। 

তুরস্কের গোয়েন্দা সংস্থা যেখানে এরকম কোনো সম্ভাব্য হামলার খবর আঁচ করতে পারেনি, সেখানে মার্কিন দূতাবাসের বিষয়টি আগেই জানতে পারাটা কেমন একটা খটকার জন্ম দেয় না? 

মার্কিন দূতাবাস কীভাবে হামলার তথ্য আগেই জানে?

এর দু’টি উত্তর হতে পারে। 
এক. হয়ত তাদের গোয়েন্দা বিভাগ অনেক বেশি শক্তিশালী।  যদি তাই হয় তাহলে এতো মারাত্মক একটি বিষয় তুরস্কের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে শেয়ার করা তাদের দায়িত্ব।  কিন্তু তারা সেটি করে না। 
 
দুই. তারা সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোকে উসকে দেয়ার জন্য এধরনের আগাম ঘোষণা দেয়। সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোকে দাওয়াত দেয় সন্ত্রাসী হামলা চালানোর জন্য। হামলা হলে নিজেদেরকে সঠিক পরমান করতে পারে। আর হামলা না হলেও পানি তো ঘোলা হয়! 

মার্কিন দূতাবাস সময়ে অসময়ে তুরস্কের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাতে অতি উৎসাহী থাকে।  কখনও প্রকাশ্যে, কখনওবা শব্দের মারপ্যাঁচে তুরস্ককে হুমকি দিতে যথেষ্ট সোচ্চার। 

তখনকার মার্কিন রাষ্ট্রদূত যখন তুরস্ক ছেড়ে যাওয়ার আগে সর্বশেষ সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘আমরা না থাকলে তুরস্কে আরও অনেক বেশি সন্ত্রাসী হামলা হত’। 

তুরস্কের অনেক সংবাদমাধ্যমই তখন তার বক্তব্যটিকেএভাবে ব্যাখ্যা করেছিল-‘আমরা (যুক্তরাষ্ট্র) সন্ত্রাসীদেরকে বলে-কয়ে হামলার মাত্রাটা একটু কমিয়ে এনেছিলাম।  আমরা তাদেরকে থামতে না বললে তারা আরও বেশি হামলা করত।  আমরা তাদেরকে চিনি ও জানি, কিন্তু তোমাকে বলবো ন ‘। 

তারপরে তো আসলো সেই বীভৎস রাত।  সামরিক অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টা।  সে রাতে তুরস্কের সরকার জনগণের সহয়তায় অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টাকে ব্যার্থ করে গণতন্ত্রের অনন্য দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করল।  কিন্তু আমেরিকা এবং তার দোসররা আইনের শাসনের দোহাই দিয়ে সামরিক অভ্যুত্থানের নায়কদের পক্ষ নিলো।  হায়রে গণতন্ত্রের ফেরিওয়ালারা ! 

মাঝখানে কেটে গেল কয়েকটি বছর। আমেরিকা তুরস্কের টুঁটি চেপে ধরতে তার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।  কখনও তুরস্ক থেকে আমদানিকৃত পণ্যে গলাকাটা ভ্যাট বসিয়ে, কখনও অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে।  আবার কখনও কূটনৈতিক শিষ্টাচারকে ধূলিসাৎ করে মহল্লার চাঁদাবাজদের মত সরাসরি হুমকি দিয়ে।

সেই পুরাতন খেলা মঞ্চস্থ করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র?

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ওয়াশিংটন আবারও সেই পুরাতন খেলাকে নতুন করে মঞ্চস্থ করতে চাচ্ছে।  কিছুদিন আগেও তুরস্কে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেওয়া হয় যুক্তরাষ্ট্র থেকে।  

মার্কিন মিডিয়া, সামরিক গবেষণা রিপোর্ট এবং প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রাট প্রার্থী জো বাইডেনের বক্তব্যে একই কথা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আসে বারবার।  

‘তুরস্কের বিরোধী দল যথেষ্ট শক্তিশালী না, তাই তাদেরকে সহযোগিতা করা দরকার, এমনকি ভিন্ন পথে হলেও সরকার পরিবর্তন করা দরকার’ বলে জানানো হয় আমেরিকা থেকে।  মানে সামরিক অভ্যুত্থানের ইঙ্গিত।  সে আলোচনার রেশ না কাটতেই নতুন চাল খেলল আঙ্কারায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস। 

হঠাৎ দূতাবাস থেকে এক বিবৃতিতে আমেরিকান নাগরিকদেরকে সতর্ক করে বলা হয় যে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে তারা জানতে পেরেছেন যে, ইস্তান্বুল বা তুরস্কের অন্য যে কোনো জায়গায় সন্ত্রাসী হামলা হতে পারে! 

তুরস্কের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি যখন খুবই ভাল।  সিরিয়ার সীমান্ত যখন গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে সুরক্ষিত।  তুরস্কের নিরাপত্তা বাহিনী যখন সবচেয়ে সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে।  সেনাবাহিনী যখন দেশে ও বিদেশে সুফল কুড়াচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে মার্কিন দূতাবাস থেকে এমন একটি সন্ত্রাসী হামলা হতে পারে বলে ঘোষণা আসলো! কেমন একটু বেখাপ্পা লাগছে না?  

যদিও তুরস্কের গোয়েন্দা সংস্থা এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে এধরনের কোনো হামলার সম্ভবনা নাকচ করে দিয়েছে।  

কোন পদ্ধতিতে যাবে যুক্তরাষ্ট?

তুরস্কের গোয়েন্দা সংস্থা এখন অনেক বেশি শক্তিশালী।  দেশের বাইরেও অপারেশন পরিচালনা করতে সক্ষম। পুলিশ বাহিনী অনেক বেশি নিষ্কলঙ্ক ও আন্তরিক।

তুর্কি সেনাবাহিনী আরও বেশি সরকার অনুগত ও সুশৃঙ্খল।  বিরোধী দল এখন যথেষ্ট শক্তিশালী না। প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোগান এখন আরও বেশি অভিজ্ঞ খেলুড়ে।  এখন আর কি সেই পুরাতন কৌশল খেলা চলে? 

তবে কেউ কারও চেয়ে কম যাবে না।  আমেরিকা এক প্রচেষ্টায় সফল না হলে অন্যভাবে চেষ্টা করবে।  ভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করবে।  এতে কোন সন্দেহ নাই।  আমেরিকার নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে এধরনের চাল আরও বাড়বে।  তবে এরদোগানের নতুন তুরস্কের সঙ্গে কতটুকু পেরে উঠবে সেটাই দেখার বিষয়।

লেখক: সরোয়ার আলম, চিফ রিপোর্টার এবং আঞ্চলিক প্রধান, আনাদলু এজেন্সি

 

ঘটনাপ্রবাহ : বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্ক