নতুন বছরে নতুন প্রত্যাশা মালয়েশিয়া প্রবাসীদের
jugantor
নতুন বছরে নতুন প্রত্যাশা মালয়েশিয়া প্রবাসীদের

  আহমাদুল কবির, মালয়েশিয়া থেকে  

৩১ ডিসেম্বর ২০২০, ২১:২৭:৫৫  |  অনলাইন সংস্করণ

বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাসে টালমাটাল গোটা বিশ্ব। বিষাদে কেটে গেল পুরো একটি বছর। কোভিড-১৯ উত্তরণে বিশ্বজুড়ে চলছে প্রাণপণ চেষ্টা। প্রতিনিয়তই সংগ্রাম করে জীবনযুদ্ধে টিকে থাকতে হচ্ছে প্রবাসীদের।

বিপুল প্রত্যাশা ও জীবন সংগ্রামের চ্যালেঞ্জ নিয়েই নতুন বছরের যাত্রা শুরু হল মালয়েশিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি রেমিটেন্স যোদ্ধাদের।

জনগোষ্ঠীর বৃহত্তর একটি অংশ প্রবাসে জীবিকার কঠোর সংগ্রামে, সমস্যার ভারে ক্লান্ত। তারপরও কালপরিক্রমায় পুরনো বছরের গ্লানি মুছে বছরের নতুন আশায় স্বপ্ন দেখছেন তারা এবং দাবি জানিয়েছেন সামাজিক সুরক্ষার।

করোনাকালীন মালিক পরিবর্তন করার সুযোগ করে দিয়েছে হাইকমিশন এবং সফল হয়েছে। এ করোনাভাইরাস সংক্রমণের মাঝে কয়েক হাজার কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করেছে দূতাবাস।

বেতনহীন কর্মী যেন ছাঁটাই না করে। বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে করোনার মাঝে দেশে ফেরত গেলেও মালয়েশিয়া থেকে একজনকেও কাজ হারিয়ে দেশে যেতে হয়নি। এছাড়া দেশে ছুটিতে এসে আটকেপড়া প্রবাসীদের সবচেয়ে বড় বাধা হল করোনাভাইরাস পরিস্থিতি। বর্তমানে মালয়েশিয়ায় করোনা পরিস্থিতি খুবই নাজুক।

পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই তখন মালয়েশিয়া প্রবেশের কোনো সমস্যা হবে না বলছে হাইকমিশন। এছাড়া পরিবেশ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই নতুন বছরে নতুনকর্মী নিয়োগের দ্বার উন্মুক্ত হবে বলেও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এদিকে দেশটিতে বসবাসরত অবৈধ বিদেশি কর্মীদের বৈধকরণ প্রক্রিয়া নিয়ে বছরজুড়ে ছিল আলোচনা। শেষমেশ শর্তসাপেক্ষে ১৬ নভেম্বর থেকে শুরু হয়েছে অবৈধদের বৈধকরণ প্রক্রিয়া।

রি-ক্যালিব্রেশন নামের এই প্রক্রিয়ায় শ্রমিক বৈধকরণ নিবন্ধনে সরকার আগের মতো কোনো ভেন্ডর বা এজেন্ট নিয়োগ করেনি। এবার সরাসরি দেশটির শ্রম ও মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।

উল্লেখ্য, ২০১৬ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত অবৈধ অভিবাসী কর্মী রি-হায়ারিং (পুনঃনিয়োগ) প্রকল্প পরিচালিত হয়েছিল। ওই প্রকল্পে দালাল ও এজেন্টদের কাছে টাকা ও পাসপোর্ট দিয়ে বিভিন্ন দেশের লাখ লাখ অভিবাসীকর্মী প্রতারণা ও জালিয়াতির শিকার হয়েছিলেন।

এ প্রতারণার বিষয়টি দেশটির সরকার ও দূতাবাসে অবহিত করা হলেও সংশ্লিষ্ট প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয়নি। কারণ প্রতারক চক্র অভিবাসী কর্মীদের কাছ থেকে টাকা ও পাসপোর্ট হাতিয়ে নেয়ার সময় কোনো মানি রিসিট বা কোনো ডকুমেন্টস দেয়নি।

পাসপোর্ট নিয়ে প্রবাসীদের সংশয় কাটাতে এবং কর্মক্ষেত্রে সঠিক সময়ে যাতে ভিসা রিনিউ করতে পারেন সে লক্ষ্যে সব নীতিমালা অনুসরণ করে ছুটির দিনসহ দূতাবাস কর্মীরা অবিরাম দিন-রাত কাজ করে করোনার মধ্যেও প্রায় এক লাখ পাসপোর্ট বিতরণ করেছেন।

সূত্র জানায়, সিএমসিও এবং এসওপি নির্দেশনা মেনে প্রতিদিন ১৩শ’ পাসপোর্ট বিতরণ করা হচ্ছে এবং প্রতিদিন প্রায় ১৫শ’ নতুন পাসপোর্টের আবেদন গ্রহণ করা হচ্ছে। এছাড়া পাসপোর্ট সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যার সমাধান ও অন্যান্য সেবা নিয়মিত দেয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শনিবার ও রোববার মালয়েশিয়ায় সরকারি ছুটি। এই দুই দিন দূতাবাসের সব কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও প্রবাসীদের দ্রুত পাসপোর্ট সেবা নিশ্চিত করতে পাসপোর্ট সার্ভিস শাখার কর্মীরা নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। বৈধ হতে নতুন পাসপোর্টের আবেদন বৃদ্ধি পেয়েছে আগের চেয়ে কয়েকগুণ। প্রবাসী বাংলাদেশিদের হাতে দ্রুত পাসপোর্ট পৌঁছে দিতে পাসপোর্ট কার্যক্রম সময়োপযোগী করতে অ্যানালগ থেকে অনলাইনের মাধ্যমে ডিজিটালাইজেশন করা হয়েছে।

বিদেশি দূতাবাসের মধ্যে একমাত্র মালয়েশিয়ায় ডাকযোগে পাসপোর্টের আবেদন গ্রহণ চালু রেখেছে বাংলাদেশ হাইকমিশন। পাসপোর্ট বিতরণে অনলাইন বুকিং সিস্টেমসহ পাসপোর্ট সংক্রান্ত যেকোনো সমস্যা সমাধানের বিষয়টি সহজ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে পাসপোর্ট অ্যান্ড ভিসা শাখার প্রধান মো. মশিউর রহমান তালুকদার জানান, মালয়েশিয়া সরকার একটানা লকডাউন ঘোষণার পাশাপাশি কন্ডিশনাল মুভমেন্ট কন্ট্রোল অর্ডার (সিএমসিও), স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং সিস্টেম (এসওপি) জারি রেখেছে। এসব সরকারি বিধিমালা অনুসরণ করে পাসপোর্ট সার্ভিস স্বাভাবিক রাখা কঠিন চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, মালয়েশিয়া পোস্ট অফিসের সঙ্গে আমাদের আলোচনা হয়েছে, যাতে দূরে কর্মরত কর্মীদের কাছে সহজে পাসপোর্ট পৌঁছে দেয়া যায়।

বৈধকরণ নিয়ে রাষ্ট্রদূত জানান, রিক্যালিব্রেশন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ নিয়োগদাতা বা মালিকনির্ভর। না জেনে না বুঝে কারও সঙ্গে আর্থিক লেনদেন না করার পরামর্শ দেন তিনি। এছাড়া নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানিয়ে মালয়েশিয়ার আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার আহ্বান জানান হাইকমিশনার মো. গোলাম সারওয়ার।

এছাড়া নতুন বছরের শুরুতে নিয়োগকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়েরে ‘গোপন’ ফোন অ্যাপ চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বহু-ভাষিক অ্যাপটি প্রবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিদেশি কর্মীদের অধিকার লঙ্ঘনকারী অসাধু নিয়োগকারীদের, বিশেষত কোভিড-১৯ পদ্ধতি লঙ্ঘনকারীদের নজরে রাখতে সক্ষম হবে বলে জানিয়েছেন মানবসম্পদ মন্ত্রী দাতুক সেরি এম সারাভানান।

এছাড়া বিদেশি কর্মীর ভিসার মেয়াদ শেষে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার সময় সঞ্চিত বেতনের অংশ ফেরত দেয়া হবে। ফলে মালিকের কাছ থেকে পালিয়ে যাওয়ার প্রবণতাও কমে আসবে।

এফএমএমের সভাপতি দাতুক সোহা থিয়ান লাই বলছেন, শ্রমিকদের অর্থ সঞ্চয়, পালিয়ে যাওয়া থেকে সুরক্ষা, স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক বিনিময় হ্রাসের মতো কিছু ইতিবাচক ফলাফল হতে পারে। তবে আরও কিছু দিক বিবেচনা করা উচিত।
এক গবেষণায় দেখা যায়, অন্যান্য দেশের শ্রমিকের তুলনায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের পারিশ্রমিক খুবই কম; কিন্তু বাংলাদেশি শ্রমিকদের অভিবাসন ব্যয় সবচেয়ে বেশি এবং অনেক ক্ষেত্রে তারা বিভিন্নভাবে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।

মালয়েশিয়া প্রবাসী আজিজ উদ্দিন বলেন, একজন অভিবাসী ইচ্ছে করে অবৈধ হয় না। দালালচক্র ইচ্ছে করে তাকে অবৈধ করে। বৈধ করে দেয়ার নামে একজন শ্রমিকের কাছ থেকে পাসপোর্ট ও আট থেকে ১০ হাজার টাকা নিয়ে উধাও হয়ে যায়। তখন এই শ্রমিকের আর কিছু করার থাকে না।

একটি গবেষণায় জানা গেছে, প্রায় ৩৫.৪ শতাংশ শ্রমিক পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে ঋণ নেয়, ১৮.৭ শতাংশ টাকা ধারক থেকে ঋণ নেয়, স্থানীয় ব্যাংক থেকে ৭.২ শতাংশ, ভূমি বন্ধক রেখে ২.৬ শতাংশ এবং বিদেশি ব্যাংক থেকে ০.৩ শতাংশ ঋণ নেয়।

প্রবাসীরা বলছেন, সরকার শ্রম মাইগ্রেশন খরচ সস্তায় সীমাবদ্ধতার মধ্যে আনতে, নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে এবং অভিবাসন সমস্যা এবং পুনর্গঠন সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

একটি জরিপে দেখা গেছে,২০১৭ সালে দারিদ্র্যের হার ১৬.৫১ শতাংশ ছিল, ২০১৪ সালে এটি ১৯.৭০ শতাংশ ছিল, যা প্রতি বছর ১ শতাংশ হ্রাস পায়। কিন্তু দারিদ্র্যবিমোচনের ক্ষেত্রে বিদেশি অভিবাসীরা উভয় অভ্যন্তরীণ ও অস্থায়ী পরিবারের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে।

বিদেশি অভিবাসীদের মধ্যে দারিদ্র্যের হার ৯.৬০ শতাংশ, অভ্যন্তরীণ অভিবাসীদের মধ্যে এটি ২৮.০৮ শতাংশ এবং অ-অভিবাসীদের জন্য এটি ১৭.৫২ শতাংশ। তুলনামূলকভাবে ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত অভিবাসীদের মধ্যে দারিদ্র্যের হার ২৪ শতাংশ এবং অভ্যন্তরীণ অভিবাসীদের মধ্যে ১২.৬৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে; কিন্তু বিদেশি অভিবাসীদের ক্ষেত্রে এটি ৭.১১ শতাংশ কমিয়েছে।

বর্তমানে বিদেশি অভিবাসীদের গড় মাসিক আয় ৩২ হাজার ৮১৫ টাকা, যখন গড় মাইগ্রেশন খরচ প্রায় দুই লাখ ৭৬ হাজার টাকা। পুরুষ অভিবাসীদের গড় খরচ তিন লাখ ৪২ হাজার টাকা, মহিলা অভিবাসীদের জন্য এর গড় ৮৮ হাজার ৮৭৭ টাকা।

ইউপিএম ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক মো. আব্দুর রউফ বলেন, বাংলাদেশ থেকে বিদেশে মাইগ্রেশন খরচ বিশ্বের সর্বোচ্চ এবং বেতন পরিসীমা সর্বনিম্ন। অভিবাসন খরচ কমাতে পদক্ষেপ গ্রহণ না করা পর্যন্ত অভিবাসী পরিবারের সুবিধা হবে না। বাংলাদেশি অভিবাসীরা খুব কম টাকা উপার্জন করে এবং তাদের বেশিরভাগ উপার্জন পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয় বহন করতে ব্যয় করে। শুধু তাই নয়, দেশের অর্থনীতির চাকাকে তারা সচল রেখেছে। তাদের সুবিধা-অসুবিধা দেখভালের দায়িত্ব সরকারের ওপরই বর্তায়।

২০২১ সাল বৈধকর্মীদের জন্য হতে পারে অপার সম্ভাবনাময় একটি বছর। ২০২০ সালকে নিয়ে করা হিসাবের যোগ-বিয়োগের বাস্তব ফল যাই হোক তবে এটি সত্য যে, অবৈধদের জন্য মালয়েশিয়ায় বসবাসের সুযোগ দিনে দিনে শুধু সঙ্কোচিত হবে।

নতুন বছরে নতুন প্রত্যাশা মালয়েশিয়া প্রবাসীদের

 আহমাদুল কবির, মালয়েশিয়া থেকে 
৩১ ডিসেম্বর ২০২০, ০৯:২৭ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাসে টালমাটাল গোটা বিশ্ব। বিষাদে কেটে গেল পুরো একটি বছর। কোভিড-১৯ উত্তরণে বিশ্বজুড়ে চলছে প্রাণপণ চেষ্টা। প্রতিনিয়তই সংগ্রাম করে জীবনযুদ্ধে টিকে থাকতে হচ্ছে প্রবাসীদের। 

বিপুল প্রত্যাশা ও জীবন সংগ্রামের চ্যালেঞ্জ নিয়েই নতুন বছরের যাত্রা শুরু হল মালয়েশিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি রেমিটেন্স যোদ্ধাদের।

জনগোষ্ঠীর বৃহত্তর একটি অংশ প্রবাসে জীবিকার কঠোর সংগ্রামে, সমস্যার ভারে ক্লান্ত। তারপরও কালপরিক্রমায় পুরনো বছরের গ্লানি মুছে বছরের নতুন আশায় স্বপ্ন দেখছেন তারা এবং দাবি জানিয়েছেন সামাজিক সুরক্ষার।

করোনাকালীন মালিক পরিবর্তন করার সুযোগ করে দিয়েছে হাইকমিশন এবং সফল হয়েছে। এ করোনাভাইরাস সংক্রমণের মাঝে কয়েক হাজার কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করেছে দূতাবাস। 

বেতনহীন কর্মী যেন ছাঁটাই না করে। বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে করোনার মাঝে দেশে ফেরত গেলেও মালয়েশিয়া থেকে একজনকেও কাজ হারিয়ে দেশে যেতে হয়নি। এছাড়া দেশে ছুটিতে এসে আটকেপড়া প্রবাসীদের সবচেয়ে বড় বাধা হল করোনাভাইরাস পরিস্থিতি। বর্তমানে মালয়েশিয়ায় করোনা পরিস্থিতি খুবই নাজুক।

পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই তখন মালয়েশিয়া প্রবেশের কোনো সমস্যা হবে না বলছে হাইকমিশন। এছাড়া পরিবেশ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই নতুন বছরে নতুনকর্মী নিয়োগের দ্বার উন্মুক্ত হবে বলেও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এদিকে দেশটিতে বসবাসরত অবৈধ বিদেশি কর্মীদের বৈধকরণ প্রক্রিয়া নিয়ে বছরজুড়ে ছিল আলোচনা। শেষমেশ শর্তসাপেক্ষে ১৬ নভেম্বর থেকে শুরু হয়েছে অবৈধদের বৈধকরণ প্রক্রিয়া।

রি-ক্যালিব্রেশন নামের এই প্রক্রিয়ায় শ্রমিক বৈধকরণ নিবন্ধনে সরকার আগের মতো কোনো ভেন্ডর বা এজেন্ট নিয়োগ করেনি। এবার সরাসরি দেশটির শ্রম ও মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। 

উল্লেখ্য, ২০১৬ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত অবৈধ অভিবাসী কর্মী রি-হায়ারিং (পুনঃনিয়োগ) প্রকল্প পরিচালিত হয়েছিল। ওই প্রকল্পে দালাল ও এজেন্টদের কাছে টাকা ও পাসপোর্ট দিয়ে বিভিন্ন দেশের লাখ লাখ অভিবাসীকর্মী প্রতারণা ও জালিয়াতির শিকার হয়েছিলেন। 

এ প্রতারণার বিষয়টি দেশটির সরকার ও দূতাবাসে অবহিত করা হলেও সংশ্লিষ্ট প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয়নি। কারণ প্রতারক চক্র অভিবাসী কর্মীদের কাছ থেকে টাকা ও পাসপোর্ট হাতিয়ে নেয়ার সময় কোনো মানি রিসিট বা কোনো ডকুমেন্টস দেয়নি।

পাসপোর্ট নিয়ে প্রবাসীদের সংশয় কাটাতে এবং কর্মক্ষেত্রে সঠিক সময়ে যাতে ভিসা রিনিউ করতে পারেন সে লক্ষ্যে সব নীতিমালা অনুসরণ করে ছুটির দিনসহ দূতাবাস কর্মীরা অবিরাম দিন-রাত কাজ করে করোনার মধ্যেও প্রায় এক লাখ পাসপোর্ট বিতরণ করেছেন।

সূত্র জানায়, সিএমসিও এবং এসওপি নির্দেশনা মেনে প্রতিদিন ১৩শ’ পাসপোর্ট বিতরণ করা হচ্ছে এবং প্রতিদিন প্রায় ১৫শ’ নতুন পাসপোর্টের আবেদন গ্রহণ করা হচ্ছে। এছাড়া পাসপোর্ট সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যার সমাধান ও অন্যান্য সেবা নিয়মিত দেয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শনিবার ও রোববার মালয়েশিয়ায় সরকারি ছুটি। এই দুই দিন দূতাবাসের সব কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও প্রবাসীদের দ্রুত পাসপোর্ট সেবা নিশ্চিত করতে পাসপোর্ট সার্ভিস শাখার কর্মীরা নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। বৈধ হতে নতুন পাসপোর্টের আবেদন বৃদ্ধি পেয়েছে আগের চেয়ে কয়েকগুণ। প্রবাসী বাংলাদেশিদের হাতে দ্রুত পাসপোর্ট পৌঁছে দিতে পাসপোর্ট কার্যক্রম সময়োপযোগী করতে অ্যানালগ থেকে অনলাইনের মাধ্যমে ডিজিটালাইজেশন করা হয়েছে। 

বিদেশি দূতাবাসের মধ্যে একমাত্র মালয়েশিয়ায় ডাকযোগে পাসপোর্টের আবেদন গ্রহণ চালু রেখেছে বাংলাদেশ হাইকমিশন। পাসপোর্ট বিতরণে অনলাইন বুকিং সিস্টেমসহ পাসপোর্ট সংক্রান্ত যেকোনো সমস্যা সমাধানের বিষয়টি সহজ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে পাসপোর্ট অ্যান্ড ভিসা শাখার প্রধান মো. মশিউর রহমান তালুকদার জানান, মালয়েশিয়া সরকার একটানা লকডাউন ঘোষণার পাশাপাশি কন্ডিশনাল মুভমেন্ট কন্ট্রোল অর্ডার (সিএমসিও), স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং সিস্টেম (এসওপি) জারি রেখেছে। এসব সরকারি বিধিমালা অনুসরণ করে পাসপোর্ট সার্ভিস স্বাভাবিক রাখা কঠিন চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, মালয়েশিয়া পোস্ট অফিসের সঙ্গে আমাদের আলোচনা হয়েছে, যাতে দূরে কর্মরত কর্মীদের কাছে সহজে পাসপোর্ট পৌঁছে দেয়া যায়।

বৈধকরণ নিয়ে রাষ্ট্রদূত জানান, রিক্যালিব্রেশন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ নিয়োগদাতা বা মালিকনির্ভর। না জেনে না বুঝে কারও সঙ্গে আর্থিক লেনদেন না করার পরামর্শ দেন তিনি। এছাড়া নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানিয়ে মালয়েশিয়ার আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার আহ্বান জানান হাইকমিশনার মো. গোলাম সারওয়ার।

এছাড়া নতুন বছরের শুরুতে নিয়োগকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়েরে ‘গোপন’ ফোন অ্যাপ চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বহু-ভাষিক অ্যাপটি প্রবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিদেশি কর্মীদের অধিকার লঙ্ঘনকারী অসাধু নিয়োগকারীদের, বিশেষত কোভিড-১৯ পদ্ধতি লঙ্ঘনকারীদের নজরে রাখতে সক্ষম হবে বলে জানিয়েছেন মানবসম্পদ মন্ত্রী দাতুক সেরি এম সারাভানান।

এছাড়া বিদেশি কর্মীর ভিসার মেয়াদ শেষে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার সময় সঞ্চিত বেতনের অংশ ফেরত দেয়া হবে। ফলে মালিকের কাছ থেকে পালিয়ে যাওয়ার প্রবণতাও কমে আসবে।

এফএমএমের সভাপতি দাতুক সোহা থিয়ান লাই বলছেন, শ্রমিকদের অর্থ সঞ্চয়, পালিয়ে যাওয়া থেকে সুরক্ষা, স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক বিনিময় হ্রাসের মতো কিছু ইতিবাচক ফলাফল হতে পারে। তবে আরও কিছু দিক বিবেচনা করা উচিত।
এক গবেষণায় দেখা যায়, অন্যান্য দেশের শ্রমিকের তুলনায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের পারিশ্রমিক খুবই কম; কিন্তু বাংলাদেশি শ্রমিকদের অভিবাসন ব্যয় সবচেয়ে বেশি এবং অনেক ক্ষেত্রে তারা বিভিন্নভাবে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।

মালয়েশিয়া প্রবাসী আজিজ উদ্দিন বলেন, একজন অভিবাসী ইচ্ছে করে অবৈধ হয় না। দালালচক্র ইচ্ছে করে তাকে অবৈধ করে। বৈধ করে দেয়ার নামে একজন শ্রমিকের কাছ থেকে পাসপোর্ট ও আট থেকে ১০ হাজার টাকা নিয়ে উধাও হয়ে যায়। তখন এই শ্রমিকের আর কিছু করার থাকে না।
 
একটি গবেষণায় জানা গেছে, প্রায় ৩৫.৪ শতাংশ শ্রমিক পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে ঋণ নেয়, ১৮.৭ শতাংশ টাকা ধারক থেকে ঋণ নেয়, স্থানীয় ব্যাংক থেকে ৭.২ শতাংশ, ভূমি বন্ধক রেখে ২.৬ শতাংশ এবং বিদেশি ব্যাংক থেকে ০.৩ শতাংশ ঋণ নেয়।

প্রবাসীরা বলছেন, সরকার শ্রম মাইগ্রেশন খরচ সস্তায় সীমাবদ্ধতার মধ্যে আনতে, নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে এবং অভিবাসন সমস্যা এবং পুনর্গঠন সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

একটি জরিপে দেখা গেছে,২০১৭ সালে দারিদ্র্যের হার ১৬.৫১ শতাংশ ছিল, ২০১৪ সালে এটি ১৯.৭০ শতাংশ ছিল, যা প্রতি বছর ১ শতাংশ হ্রাস পায়। কিন্তু দারিদ্র্যবিমোচনের ক্ষেত্রে বিদেশি অভিবাসীরা উভয় অভ্যন্তরীণ ও অস্থায়ী পরিবারের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে।

বিদেশি অভিবাসীদের মধ্যে দারিদ্র্যের হার ৯.৬০ শতাংশ, অভ্যন্তরীণ অভিবাসীদের মধ্যে এটি ২৮.০৮ শতাংশ এবং অ-অভিবাসীদের জন্য এটি ১৭.৫২ শতাংশ। তুলনামূলকভাবে ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত অভিবাসীদের মধ্যে দারিদ্র্যের হার ২৪ শতাংশ এবং অভ্যন্তরীণ অভিবাসীদের মধ্যে ১২.৬৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে; কিন্তু বিদেশি অভিবাসীদের ক্ষেত্রে এটি ৭.১১ শতাংশ কমিয়েছে।

বর্তমানে বিদেশি অভিবাসীদের গড় মাসিক আয় ৩২ হাজার ৮১৫ টাকা, যখন গড় মাইগ্রেশন খরচ প্রায় দুই লাখ ৭৬ হাজার টাকা। পুরুষ অভিবাসীদের গড় খরচ তিন লাখ ৪২ হাজার টাকা, মহিলা অভিবাসীদের জন্য এর গড় ৮৮ হাজার ৮৭৭ টাকা। 

ইউপিএম ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক মো. আব্দুর রউফ বলেন, বাংলাদেশ থেকে বিদেশে মাইগ্রেশন খরচ বিশ্বের সর্বোচ্চ এবং বেতন পরিসীমা সর্বনিম্ন। অভিবাসন খরচ কমাতে পদক্ষেপ গ্রহণ না করা পর্যন্ত অভিবাসী পরিবারের সুবিধা হবে না। বাংলাদেশি অভিবাসীরা খুব কম টাকা উপার্জন করে এবং তাদের বেশিরভাগ উপার্জন পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয় বহন করতে ব্যয় করে। শুধু তাই নয়, দেশের অর্থনীতির চাকাকে তারা সচল রেখেছে। তাদের সুবিধা-অসুবিধা দেখভালের দায়িত্ব সরকারের ওপরই বর্তায়।

২০২১ সাল বৈধকর্মীদের জন্য হতে পারে অপার সম্ভাবনাময় একটি বছর। ২০২০ সালকে নিয়ে করা হিসাবের যোগ-বিয়োগের বাস্তব ফল যাই হোক তবে এটি সত্য যে, অবৈধদের জন্য মালয়েশিয়ায় বসবাসের সুযোগ দিনে দিনে শুধু সঙ্কোচিত হবে।