তুরস্কের বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ ও শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতি
jugantor
তুরস্কের বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ ও শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতি

  সরোয়ার আলম, আঙ্কারা, তুরস্ক থেকে  

০৯ জানুয়ারি ২০২১, ২১:৩৭:৫৬  |  অনলাইন সংস্করণ

বিক্ষোভে উত্তাল তুরস্কের অন্যতম বিদ্যাপীঠ বোয়াযইচি বিশ্ববিদ্যালয় ।

গত কয়েকদিন ধরে তুরস্কের অন্যতম বিদ্যাপীঠ বোয়াযইচি বিশ্ববিদ্যালয় বিক্ষোভে উত্তাল। নবনিযুক্ত রেক্টর প্রফেসর ড. মেলিহ বুলুর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

বিক্ষোভে সমর্থন জানিয়েছে প্রধান বিরোধী দল সিএইচপি। সাধারণ একটি ছাত্র বিক্ষোভ হিসেবে শুরু হলেও এটি রূপ নিতে পারে এরদোগান পতনের আন্দোলনে। অন্তত বিরোধী দলগুলোর এমনই আশা।

বোয়াযইচি বিশ্ববিদ্যালয় কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

বসফরাস বা বোয়াযইচি বিশ্ববিদ্যালয়, তুরস্কের সবচেয়ে বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে অন্যতম। আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে এদেশের প্রধান তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে একটি। ইস্তান্বুলের বিখ্যাত বসফরাস প্রণালির পাশ ঘিরে পাহাড়ের ওপরে সবুজে ঘেরা প্রায় দুই বর্গ কিলোমিটার জায়গার ওপরে অবস্থিত এটি।

একদিকে ওসমানীদের বীরত্বের প্রতীক রুমেলি হিসার দুর্গ অন্যদিকে বসফরাসের ওপড়ে নির্মিত ঝুলন্ত ব্রিজ। ইস্তান্বুলের ইউরোপ অংশে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানটি কয়েকশ বছর ধরে মানুষ গড়ার কাজে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে। তুরস্কের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আহমেদ দাভুতগলু তাদের মধ্যেই একজন। প্রতি বছর দেশ বিদেশ থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী এখানে ভর্তি হওয়ার জন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়।

১৮৩৯ সালে খ্রিস্টান ধর্ম প্রচারক সাইরাস হ্যামলিন তার মিশনারি কাজের অংশ হিসেবে সুদূর আমেরিকা থেকে পাড়ি জমান তৎকালীন উসমানীয় সম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপলে (বর্তমানের ইস্তান্বুলে)। তিনি ছিলেন আমেরিকান হোম মিশনারি সোসাইটি নামে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রটেস্টান মিশনারি গ্রুপের সদস্য।

ইস্তান্বুলে এসে তিনি সেখানে বালকদের জন্য একটি ধর্মীয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (মিশনারি)গড়ে তুলেন। সাথে সাথে দরিদ্র আর্মেনীয়দের সাহায্য করার মাধ্যমে তার মিশনারি কাজ শুরু করেন। একই সাথে ছোট খাট ব্যবসাও করেন। পরবর্তীতে তার ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান তুরস্কে ১৩ টি প্রটেস্টান আর্মেনীয় গির্জা তৈরিতে আর্থিক সহযোগিতা করে।

আমেরিকার ব্যবসায়ী ক্রিস্টোফার রবার্ট ১৮২৯ সালে আমেরিকান হোম মিশনারি সোসাইটি নামে যুক্তরাষ্ট্রের প্রটেস্টান মিশনারি গ্রুপের সাথে পরিচিত হন। পরবর্তীতে তৎকালীন ওসমানী সম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপলে (বর্তমানের ইস্তান্বুলে) পরিচয় হয় আরেক ব্যবাসায়ি এবং (মিশনারি) ধর্ম প্রচারক সাইরাস হ্যামলিনের সাথে। হ্যামলিন তার ধর্ম প্রচারের কাজে ১৮৩৯ সালে ইস্তান্বুলে আসেন।


এই হ্যামলিন মিশনারি সোসাইটি নামে যুক্তরাষ্ট্রের প্রটেস্টান মিশনারি গ্রুপের।

১৮৫৬ সালে ক্রিমিয়ার যুদ্ধের সময়ে ইস্তান্বুলে বসে হ্যামিলনের দেখা হয় আমেরিকার ব্যবসায়ী ক্রিস্টোফার রবার্টের সাথে। রবার্টকে তিনি উসমানীয় সম্রাজ্যের রাজধানীতে একটি মিশনারি স্কুল প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করেন এবং তাকে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠায় অর্থদানে রাজি করান। সে সময় উসমানী সালতানাতে অধিষ্ঠিত ছিলেন সুলতান আব্দুল মেজিদ। তখন ফরাসি বিপ্লবের ধাঁচ তার মসনদেও এসে লেগেছিল। বাধ্য হয়েছিলেন তার সালতানাতে পশ্চিমাদের এবং বিধর্মীদের জন্য অনেক সুযোগ সুবিধা সম্বলিত সংস্কার নিয়ে আসতে ।

যাইহোক, মার্কিনী এই দুই মিশনারি তাদের স্কুলের জন্য ১৮৬০ সালে সুলতান আব্দুল মেজিদ-এর দরবারে তদবির করা শুরু করেন। এক বছর পরে আব্দুল মেজিদ মারা গেলে পরবর্তী সুলতান আব্দুল আজিজের দরবারে তদবির শুরু হয়। প্রায় তিন বছর তদবির করার পরে ১৮৬৩ সালে স্কুল করার অনুমতি মিলে।

প্রতিষ্ঠা হয় রবার্ট কলেজ। এটিই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে মার্কিনীদের প্রতিষ্ঠিত প্রথম কোন আমেরিকান উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

রবার্ট কলেজ, তুরস্ক

ছোট্ট একটি কাঠের ঘরে ৪ জন ছাত্র নিয়ে পুরোপুরি ইংরেজি ভাষায় পাঠদান দিয়ে যাত্রা শুরু করে রবার্ট কলেজ। ১৮৭১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় প্রথম পাকা ভবন। প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল উসমানীয় সাম্রাজ্যের খ্রিস্টান সংখ্যালঘুদের পাশাপাশি কনস্টান্টিনোপলে বসবাসকারী বিদেশীদেরকে উচ্চতর শিক্ষা প্রদান। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত প্রায় ১০৮ বছর ধরে এই কলেজটি পরিচালিত হয়েছে খ্রিস্টান মিশনারিদের দ্বারা।

১৯৭১ সালে রবার্ট কলেজকে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা হয়। নাম দেওয়া হয় বোয়াজইচি বা বসফরাস বিশ্ববিদ্যালয়।

তারপর অনেক বছর কেটে গেছে। অনেক জল গড়িয়েছে বোয়াজইচির পাশের বসফরাস প্রণালি দিয়ে।

এখন সেই বিখ্যাত বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থীরা নতুন দায়িত্ব পাওয়া রেক্টরের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছে। শিক্ষার্থীদের এই বিক্ষোভে লেগেছে রাজনীতির ছোঁয়া। এখানে বিশ্ববিদ্যালয় গুলোয় রাজনীতি নিষিদ্ধ। কিন্তু বোয়াজইচি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিক্ষোভে তুরস্কের প্রধান বিরোধী দল সিএইচপি একাত্মতা ঘোষণা করেছে। বিক্ষভকে বৃহৎ আন্দোলনে রূপ দিতে রাজনৈতিক দলটি ছাত্রদের সব ধরনের সহযোগীতা দেওয়ার কথা বলেছে। তাদের এই সমর্থন স্মরণ করিয়ে দেয় ২০১৩ সালে ইস্তান্বুলের গেযি পার্কে কয়েকটা গাছ কাটা নিয়ে শুরু হওয়া বিক্ষোভ। যা শুরুতে পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ হিসবে শুরু হলেও বিরোধী রাজনৈতিক দলের সমর্থে সেই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পরে দেশব্যাপী। রূপ নেয় এরদয়ান বিরোধী আন্দোলনে।মাসের পর মাস চলে সরকার পতনের আন্দোলন।

কেন এই বিক্ষোভ?

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গত সপ্তাহে নিয়োগ প্রাপ্ত নতুন রেক্টরের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছে। কিন্তু কেন? তার নিয়োগে কি দুর্নীতি হয়েছে? তার বিরুদ্ধে কি টাকা আত্মসাতের, দুর্নীতির, স্বজনপ্রীতির, ধর্ষণের, যৌন হয়রানির অভিযোগ আছে? না এগুলোর একটিও নেই। তার দোষ মাত্র একটি। তিনি বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের সদস্য ছিলেন। একসময় এরদোয়ানের একে পার্টি থেকে সংসদ নির্বাচনে নমিনেশন পাওয়ার জন্য প্রার্থিতা ঘোষণা করেছিলেন। যদিও পরে নমিনেশন পাননি। কিন্তু এই রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তিনি এখন ব্যাপক আলোচিত-সমালোচিত।

বিক্ষোভরত ছাত্রছাত্রীদের দাবি, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টিকে রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে পরিচালনা করবেন। সরকার সমর্থিত শিক্ষকদের নিয়োগ দিবেন। সরকারি ঘরনার শিক্ষকরা বেশি সুযোগ-সুবিধা পাবেন, ইত্যাদি। অর্থাৎ তিনি শিক্ষাদানের চেয়ে রাজনৈতিক মূল্যবোধকে বেশি মূল্যায়ন করবেন।

তিনি আসনে বসার পর কী করবেন তা এখনই বলা মুশকিল। হয়তো উপরের বিষয়গুলোর সবকটিই করবেন, হয়ত ওইগুলোর মধ্য থেকে কয়েকটি করবেন। কিন্তু ওইগুলোর কোনোটিই না করে একেবারে ফেরেশতা হয়ে থাকবেন, তা বলা যাবে না। তার কার্যক্রম দেখার জন্য হয়ত আরও কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হবে, যদি ততদিনে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য না হন। কিন্তু বিক্ষোভ এখনও চলছে। বিরোধী দল ছাড়াও এই আন্দোলনের সমর্থনে অন্য অনেক শহরেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মিছিল করছে।

তাদের দাবি, বিদ্যাপীঠগুলোকে রাজনীতিমুক্ত রাখার। খুবই যুক্তিযুক্ত একটি দাবি। কিন্তু আসলে তুরস্কের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি কখনও রাজনীতিমুক্ত ছিল?

তুরস্কের শিক্ষাঙ্গনগুলো কেমন?

তুরস্কের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যখন হিজাব পরার ওপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে আসা হয়েছিল। মেডিকেল, আইন, প্রকৌশলী বিভাগসহ বিভিন্ন ফ্যাকাল্টি থেকে হাজার হাজার মেয়েকে শুধু হিজাব পরার কারণে বহিষ্কার করা হয়েছিল। তাদের ভবিষ্যতকে অন্ধকার করে দেয়া হয়েছিল। তখন কি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, এর রেক্টর ও শিক্ষকরা রাজনীতি-নিরপেক্ষ হয়ে ওই ছাত্রীদের পক্ষে কথা বলেছিলেন? না, বলেননি। বরং ছাত্রীদের বিপক্ষে গিয়ে তখনকার রাজনৈতিক শক্তি এবং ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে একই বুলি আওরিয়ে ছিলেন।

গণতান্ত্রিকভাবে, জনগণের ভোটে নির্বাচিত রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোগান ক্ষমতায় আসার পরে কত শিক্ষক যে ক্লাসে তাকে সরাসরি গালি দিয়েছে তার কি ইয়াত্তা আছে? ২০০৭ সালে যখন ইস্তান্বুল বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতায় পড়ছিলাম তখন সব চেয়ে বড় বড় প্রফেসররা ক্লাস শুরু করতেন এরদোয়ানকে গালি দেওয়ার মাধ্যমে আর শেষ করতেন তার দলের গোষ্ঠী উদ্ধার করে।

কত রেক্টর এবং শিক্ষক যে চাকরি ছেড়ে প্রধান বিরোধী দলের সংসদ সদস্য, দলীয় প্রধানের উপদেষ্টা হয়েছেন তার কি হিসেব আছে? তাদের মধ্য থেকে কতজন আবার চাকরিতে ফিরে এসেছেন তার খবর কে রাখে?

বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশের ওপর বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের আক্রমণ। ছবি: সংগৃহীত

আমার দেখা তুরস্ক

২০০৭ সালে আঙ্কারায় এসেছিলাম কয়েকদিনের জন্য। এখানে বিখ্যাত তানদোয়ান মাঠের পাশেই একটা ছাত্রদের বাসায় উঠেছিলাম। একদিন রোববার বাসার সামনের রাস্তা দিয়ে দেখি বিশাল মিছিল যাচ্ছে। মিছিলটি ছিল আব্দুল্লাহ গুলকে একে পার্টির পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসাবে ঘোষণার বিরুদ্ধে। প্রধান বিরোধী দলের মিছিল। বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে মিছিল যাচ্ছিল “ডেমোক্রেসি মিটিং”-এ যোগ দিতে। একটি স্লোগান ছিল এমন-‘তুরস্ক সেক্যুলার রাষ্ট্র, সেক্যুলারই থাকবে’।

আঙ্কারায় অবস্থিত মিডল ইস্ট টেকনিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টরের পক্ষ থেকে সব শিক্ষার্থীকে এসএমএসের মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হয় যে এই রাজনৈতিক জনসভায় যোগ দেওয়া বাধ্যতামূলক।

২০০৮ সাল, তুরস্কের সব রাজনৈতিক দল মিলে সংবিধানে পরিবর্তন নিয়ে আসে। আর সেই সাথে হিজাব পরার ওপরে আরোপিত নিষেধাজ্ঞাও উঠে যায়। উচ্চশিক্ষা কাউন্সিল থেকে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে হিজাব পরা ছাত্রীদের প্রবেশের অনুমতি দিয়ে চিঠি পাঠানো হয়। আমাদের ক্লাসে দুটি মেয়ে ছিল যারা বাইরে হিজাব পরত কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকার সময়ে হিজাব খুলে মাথায় পরচুল পরে প্রবেশ করত। নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার খবর পেয়ে পরের দিন ওরা হিজাব পরে ক্লাসে আসে। গার্ডরা কেউ বাধাও দেয়নি। ক্লাসেও ঢুকেছে। একজন ম্যাডাম ক্লাসে ঢুকলেন। ওদের দুইজনকে হিজাব পরা দেখে তো রেগে আগুন! জানতে চাইলেন ওরা কারা? কেন তার ক্লাসে এসেছে? মেয়ে দুটি বুঝানোর চেষ্টা করল যে ওরা এই ক্লাসেরই ছাত্রী। হিজাবের উপরে নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ায় ওরা হিজাব পরে এসেছে।

তিনি বললেন, আমি মানি না ওই নিয়ম। তোমাদের সরকার করছে। আমার কী? এটা আমার ক্লাস, এখানে আমার আইন চলবে। তোমরা বেরিয়ে যাও। হিজাব পরে কোনদিন আমার ক্লাসে আসবে না।

কয়েকজন ছাত্র তাদের পক্ষ নিয়ে শিক্ষিকাকে বোঝানোর চেষ্টা করল। তিনি আরও ক্ষেপে গেলেন। বের করে দিলেন ওদের ক্লাস থেকে। দুটি মেয়ের জীবনের প্রথম স্কার্ফ পড়ে ক্লাস করার আনন্দ এভাবেই কান্নায় পরিণত হয়েছিল সেদিন।

তুর্কি বিশ্ববিদ্যালয়েরশিক্ষকদের মনোভাব কেমন?

২০১৩ সাল মাস্টার্সের ক্লাসে আমরা ৫-৬ ছাত্র এক শিক্ষকের সঙ্গে গোলটেবিলে বসে চা খাচ্ছি আর তুরস্কের রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করছিলাম। সবাই সরকারের সমালোচনা করছে তো করছেই।

স্যার আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার মন্তব্য কী?

আমি বললাম, স্যার আমি বিদেশি আপনাদের রাজনীতিতে আমার মন্তব্য করার কিছু নেই।

তিনি জোরাজুরি করলেন। বললেন, তুমি আমাদের সমাজটাকে বাইরে থেকে দেখছ তোমার মন্তব্য আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বললাম, বর্তমান সরকারের অনেক দোষ থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের জীবন যাত্রার উন্নয়ন, রাস্তাঘাট এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রশংসার দাবিদার।

স্যারের তো চোখ কপালে! বললেন, ‘সরোয়ার, তুমি এই ফ্যাকাল্টিতে অনার্স করেছ, এখন মাস্টার্স করছো; কিন্তু তুমি যে এত বড় এরদোগানপন্থী এতদিন তা ধরতেই পারিনি’!

এমন ভাব করলেন যেন আমি বিশাল এক পাপ করে ফেলেছি! আর আমি বুঝলাম না আমার ওইটুকু কথায় এরদোগানপন্থী কী ছিল?

তুরস্ক একেমন দেশ?

তুরস্ক এমন একটি দেশ যেখানে আপনি সরকারের, বিশেষ করে ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে আপনি নিরপেক্ষ। তাদের বিরুদ্ধে কথা বললে আপনি সমাদৃত বক্তা। তাদের বিরুদ্ধে লেখালেখি করলে আপনি চমৎকার বিশ্লেষক।

সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দলের সদস্য হলে আপনার জন্য সব ধরনের সাংবিধানিক পদ বৈধ। কিন্তু আপনার গায়ে যদি একটু ধর্মীয় মূল্যবোধের আঁচর লাগে, যদি একটু সরকারি দলের পক্ষে কথা বলেন, তাদের মত ভাবেন তাহলে আপনি যত যোগ্যই হোন না কেন আপনাকে বিতর্কিত করে পানি ঘোলা করবেই।

লেখক: সরোয়ার আলম, চিফ রিপোর্টার এবং আঞ্চলিক প্রধান, আনাদলু এজেন্সি, তুরস্ক

তুরস্কের বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ ও শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতি

 সরোয়ার আলম, আঙ্কারা, তুরস্ক থেকে 
০৯ জানুয়ারি ২০২১, ০৯:৩৭ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
বিক্ষোভে উত্তাল তুরস্কের অন্যতম বিদ্যাপীঠ বোয়াযইচি বিশ্ববিদ্যালয় ।
বিক্ষোভে উত্তাল তুরস্কের অন্যতম বিদ্যাপীঠ বোয়াযইচি বিশ্ববিদ্যালয়। ফাইল ছবি

গত কয়েকদিন ধরে তুরস্কের অন্যতম বিদ্যাপীঠ বোয়াযইচি বিশ্ববিদ্যালয় বিক্ষোভে উত্তাল। নবনিযুক্ত রেক্টর প্রফেসর ড. মেলিহ বুলুর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

বিক্ষোভে সমর্থন জানিয়েছে প্রধান বিরোধী দল সিএইচপি।  সাধারণ একটি ছাত্র বিক্ষোভ হিসেবে শুরু হলেও এটি রূপ নিতে পারে এরদোগান পতনের আন্দোলনে। অন্তত বিরোধী দলগুলোর এমনই আশা।   

বোয়াযইচি বিশ্ববিদ্যালয় কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

বসফরাস বা বোয়াযইচি বিশ্ববিদ্যালয়, তুরস্কের সবচেয়ে বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে অন্যতম।  আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে এদেশের প্রধান তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে একটি।  ইস্তান্বুলের বিখ্যাত বসফরাস প্রণালির পাশ ঘিরে পাহাড়ের ওপরে সবুজে ঘেরা প্রায় দুই বর্গ কিলোমিটার জায়গার ওপরে অবস্থিত এটি। 

একদিকে ওসমানীদের বীরত্বের প্রতীক রুমেলি হিসার দুর্গ অন্যদিকে বসফরাসের ওপড়ে নির্মিত ঝুলন্ত ব্রিজ।  ইস্তান্বুলের ইউরোপ অংশে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানটি কয়েকশ বছর ধরে মানুষ গড়ার কাজে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে। তুরস্কের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আহমেদ দাভুতগলু তাদের মধ্যেই একজন। প্রতি বছর দেশ বিদেশ থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী এখানে ভর্তি হওয়ার জন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়।

১৮৩৯ সালে খ্রিস্টান ধর্ম প্রচারক সাইরাস হ্যামলিন তার মিশনারি কাজের অংশ হিসেবে সুদূর আমেরিকা থেকে পাড়ি জমান তৎকালীন উসমানীয় সম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপলে  (বর্তমানের ইস্তান্বুলে)। তিনি ছিলেন আমেরিকান হোম মিশনারি সোসাইটি নামে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রটেস্টান মিশনারি গ্রুপের সদস্য।

ইস্তান্বুলে এসে তিনি সেখানে বালকদের জন্য একটি ধর্মীয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (মিশনারি)গড়ে তুলেন। সাথে সাথে দরিদ্র আর্মেনীয়দের সাহায্য করার মাধ্যমে তার মিশনারি কাজ শুরু করেন। একই সাথে ছোট খাট ব্যবসাও করেন। পরবর্তীতে তার ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান তুরস্কে ১৩ টি প্রটেস্টান আর্মেনীয় গির্জা তৈরিতে আর্থিক সহযোগিতা করে। 

আমেরিকার ব্যবসায়ী ক্রিস্টোফার রবার্ট ১৮২৯ সালে আমেরিকান হোম মিশনারি সোসাইটি নামে যুক্তরাষ্ট্রের প্রটেস্টান মিশনারি গ্রুপের সাথে পরিচিত হন।  পরবর্তীতে তৎকালীন ওসমানী সম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপলে  (বর্তমানের ইস্তান্বুলে) পরিচয় হয় আরেক ব্যবাসায়ি এবং (মিশনারি) ধর্ম প্রচারক  সাইরাস হ্যামলিনের সাথে। হ্যামলিন তার ধর্ম প্রচারের কাজে ১৮৩৯ সালে ইস্তান্বুলে আসেন।


এই হ্যামলিন মিশনারি সোসাইটি নামে যুক্তরাষ্ট্রের প্রটেস্টান মিশনারি গ্রুপের।
 
১৮৫৬ সালে ক্রিমিয়ার যুদ্ধের সময়ে ইস্তান্বুলে বসে হ্যামিলনের দেখা হয় আমেরিকার ব্যবসায়ী ক্রিস্টোফার রবার্টের সাথে।  রবার্টকে তিনি উসমানীয় সম্রাজ্যের রাজধানীতে একটি মিশনারি স্কুল প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করেন এবং তাকে একটি  স্কুল প্রতিষ্ঠায় অর্থদানে রাজি করান। সে সময় উসমানী সালতানাতে অধিষ্ঠিত ছিলেন সুলতান আব্দুল মেজিদ। তখন ফরাসি বিপ্লবের ধাঁচ তার মসনদেও এসে লেগেছিল। বাধ্য হয়েছিলেন তার সালতানাতে পশ্চিমাদের  এবং বিধর্মীদের জন্য অনেক সুযোগ সুবিধা সম্বলিত সংস্কার নিয়ে আসতে ।

যাইহোক, মার্কিনী এই দুই মিশনারি তাদের স্কুলের জন্য ১৮৬০ সালে সুলতান আব্দুল মেজিদ-এর দরবারে তদবির করা শুরু করেন। এক বছর পরে আব্দুল মেজিদ মারা গেলে পরবর্তী সুলতান আব্দুল আজিজের দরবারে তদবির শুরু হয়। প্রায় তিন বছর তদবির করার পরে ১৮৬৩ সালে স্কুল করার অনুমতি মিলে। 

প্রতিষ্ঠা হয় রবার্ট কলেজ। এটিই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে মার্কিনীদের প্রতিষ্ঠিত প্রথম কোন আমেরিকান উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

রবার্ট কলেজ, তুরস্ক

ছোট্ট একটি কাঠের ঘরে ৪ জন ছাত্র নিয়ে পুরোপুরি ইংরেজি ভাষায় পাঠদান দিয়ে যাত্রা শুরু করে রবার্ট কলেজ। ১৮৭১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় প্রথম পাকা ভবন।  প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল উসমানীয় সাম্রাজ্যের খ্রিস্টান সংখ্যালঘুদের পাশাপাশি কনস্টান্টিনোপলে বসবাসকারী বিদেশীদেরকে উচ্চতর শিক্ষা প্রদান। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত প্রায় ১০৮ বছর ধরে এই কলেজটি পরিচালিত হয়েছে খ্রিস্টান মিশনারিদের দ্বারা। 

১৯৭১ সালে রবার্ট কলেজকে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা হয়। নাম দেওয়া হয় বোয়াজইচি বা বসফরাস বিশ্ববিদ্যালয়। 

তারপর অনেক বছর কেটে গেছে। অনেক জল গড়িয়েছে বোয়াজইচির পাশের বসফরাস প্রণালি দিয়ে।

এখন সেই বিখ্যাত বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থীরা নতুন দায়িত্ব পাওয়া রেক্টরের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছে। শিক্ষার্থীদের এই বিক্ষোভে লেগেছে রাজনীতির ছোঁয়া। এখানে বিশ্ববিদ্যালয় গুলোয় রাজনীতি নিষিদ্ধ। কিন্তু বোয়াজইচি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিক্ষোভে তুরস্কের প্রধান বিরোধী দল সিএইচপি একাত্মতা ঘোষণা করেছে। বিক্ষভকে বৃহৎ আন্দোলনে রূপ দিতে  রাজনৈতিক দলটি ছাত্রদের সব ধরনের সহযোগীতা দেওয়ার কথা বলেছে।  তাদের এই সমর্থন স্মরণ করিয়ে দেয় ২০১৩ সালে ইস্তান্বুলের গেযি পার্কে কয়েকটা গাছ কাটা নিয়ে শুরু হওয়া বিক্ষোভ। যা শুরুতে পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ হিসবে শুরু হলেও বিরোধী রাজনৈতিক দলের সমর্থে সেই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পরে দেশব্যাপী। রূপ নেয় এরদয়ান বিরোধী আন্দোলনে।মাসের পর মাস চলে সরকার পতনের আন্দোলন। 

কেন এই বিক্ষোভ? 
 
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গত সপ্তাহে নিয়োগ প্রাপ্ত নতুন রেক্টরের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছে। কিন্তু কেন? তার নিয়োগে কি দুর্নীতি হয়েছে? তার বিরুদ্ধে কি টাকা আত্মসাতের, দুর্নীতির, স্বজনপ্রীতির, ধর্ষণের, যৌন হয়রানির অভিযোগ আছে? না এগুলোর একটিও নেই। তার দোষ মাত্র একটি। তিনি বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের সদস্য ছিলেন। একসময় এরদোয়ানের একে পার্টি থেকে সংসদ নির্বাচনে নমিনেশন পাওয়ার জন্য প্রার্থিতা ঘোষণা করেছিলেন। যদিও পরে নমিনেশন পাননি। কিন্তু এই রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তিনি এখন ব্যাপক আলোচিত-সমালোচিত।

বিক্ষোভরত ছাত্রছাত্রীদের দাবি, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টিকে রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে পরিচালনা করবেন।  সরকার সমর্থিত শিক্ষকদের নিয়োগ দিবেন।  সরকারি ঘরনার শিক্ষকরা বেশি সুযোগ-সুবিধা পাবেন, ইত্যাদি।  অর্থাৎ তিনি শিক্ষাদানের চেয়ে রাজনৈতিক মূল্যবোধকে বেশি মূল্যায়ন করবেন। 

তিনি আসনে বসার পর কী করবেন তা এখনই বলা মুশকিল।  হয়তো উপরের বিষয়গুলোর সবকটিই করবেন, হয়ত ওইগুলোর মধ্য থেকে কয়েকটি করবেন। কিন্তু ওইগুলোর কোনোটিই না করে একেবারে ফেরেশতা হয়ে থাকবেন, তা বলা যাবে না।  তার কার্যক্রম দেখার জন্য হয়ত আরও কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হবে, যদি ততদিনে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য না হন।  কিন্তু বিক্ষোভ এখনও চলছে। বিরোধী দল ছাড়াও এই আন্দোলনের সমর্থনে অন্য অনেক শহরেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মিছিল করছে। 

তাদের দাবি, বিদ্যাপীঠগুলোকে রাজনীতিমুক্ত রাখার। খুবই যুক্তিযুক্ত একটি দাবি।  কিন্তু আসলে তুরস্কের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি কখনও রাজনীতিমুক্ত ছিল? 

তুরস্কের শিক্ষাঙ্গনগুলো কেমন?

তুরস্কের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যখন হিজাব পরার ওপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে আসা হয়েছিল।  মেডিকেল, আইন, প্রকৌশলী বিভাগসহ বিভিন্ন ফ্যাকাল্টি থেকে হাজার হাজার মেয়েকে শুধু হিজাব পরার কারণে বহিষ্কার করা হয়েছিল।  তাদের ভবিষ্যতকে অন্ধকার করে দেয়া হয়েছিল। তখন কি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, এর রেক্টর ও শিক্ষকরা রাজনীতি-নিরপেক্ষ হয়ে ওই ছাত্রীদের পক্ষে কথা বলেছিলেন? না, বলেননি। বরং ছাত্রীদের বিপক্ষে গিয়ে তখনকার রাজনৈতিক শক্তি এবং  ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে একই বুলি আওরিয়ে ছিলেন।

গণতান্ত্রিকভাবে, জনগণের ভোটে নির্বাচিত রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোগান ক্ষমতায় আসার পরে কত শিক্ষক যে ক্লাসে তাকে সরাসরি গালি দিয়েছে তার কি ইয়াত্তা আছে? ২০০৭ সালে যখন ইস্তান্বুল বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতায় পড়ছিলাম তখন সব চেয়ে বড় বড় প্রফেসররা ক্লাস শুরু করতেন এরদোয়ানকে গালি দেওয়ার মাধ্যমে আর শেষ করতেন তার দলের গোষ্ঠী উদ্ধার করে। 

কত রেক্টর এবং শিক্ষক যে চাকরি ছেড়ে প্রধান বিরোধী দলের সংসদ সদস্য, দলীয় প্রধানের উপদেষ্টা হয়েছেন তার কি হিসেব আছে? তাদের মধ্য থেকে কতজন আবার চাকরিতে ফিরে এসেছেন তার খবর কে রাখে?