রুশ গোয়েন্দাদের ৪০ বছরের চেষ্টার ফসল ট্রাম্প
jugantor
রুশ গোয়েন্দাদের ৪০ বছরের চেষ্টার ফসল ট্রাম্প

  অনলাইন ডেস্ক  

৩১ জানুয়ারি ২০২১, ১৩:৪৯:৫২  |  অনলাইন সংস্করণ

রুশ গোয়েন্দাদের ৪০ বছরের চেষ্টার ফসল ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিজেদের সম্পদ হিসেবে ৪০ বছর ধরে গড়ে তুলেছেন রুশ গোয়েন্দারা। কেজিবি তার সঙ্গে এমন ভূমিকা পালন করেছে, যেন তারা ট্রাম্পের ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ।

কেজিবির সাবেক এক গোয়েন্দা গার্ডিয়ানকে এমন কথাই বলেছেন। পাশ্চাত্যবিরোধী প্রচারণায় তোতাপাখির মতো বুলি আওড়াতে ট্রাম্প এতটাই উৎসাহিত ছিলেন যে মস্কোতে তা উদযাপিত হয়েছে।

১৯৮০-এর দশকে ইউরি শেভেতকে ওয়াশিংটনে নিয়োগ দেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘কেমব্রিজ ফাইভের’ সঙ্গে তুলনা করেন।

‘কেমব্রিজ ফাইভ’ হলো ব্রিটেনের একটি গুপ্তচর চক্র, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যারা সোভিয়েত ইউনিয়নকে তথ্য সরবরাহ করতেন। ১৯৩০-এর দশক থেকে পঞ্চাশের দশক পর্যন্ত তারা সক্রিয় ছিলেন।

সাংবাদিক ক্রেইগ উংগারের নতুন গ্রন্থ ‘আমেরিকান কমপ্রোম্যাটের’ মূল সূত্র হচ্ছে ৬৭ বছর বয়সী এই ইউরি শেভেত। এর আগে হাউস অব ট্রাম্প ও হাউস অব পুতিন নামেও দুটি বই লেখেন ক্রেইগ। বইটিতে কুখ্যাত অর্থদাতা জেফরি এপস্টিইনের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্কের ভেতরের খবরও তুলে ধরা হয়েছে।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জেনিয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস করেন ইউরি শেভেত। তিনি কেজিবির মেজর হিসেবে কর্মরত হলেও ওয়াশিংটনে রুশ সংবাদ সংস্থা তাসের প্রতিনিধি ছিলেন। এটি আশির দশকের ঘটনা।

পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালের দিকে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং আমেরিকার নাগরিকত্ব পান। বর্তমানে কর্পোরেট নিরাপত্তা তদন্তকারী হিসেবে কাজ করছেন। ২০০৬ সালে লন্ডনে গুপ্তহত্যার শিকার হওয়া আলেক্সান্ডার লিটভিনেকোর সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি।

সোমবার ফোনে তিনি গার্ডিয়ানের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ছাত্র থাকাকালেই কীভাবে লোকজনকে বেছে নেওয়া হয়, এটি তার নজির। এর পর বাছাই করা লোকজন গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন। ট্রাম্পের ক্ষেত্রে এমন কিছুই ঘটেছে।

১৯৭৭ সালে চেক মডেল ইভানকা জেলনিকোভাকে বিয়ে করেন সাবেক এই রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট। তখন রাশিয়ার পর্যবেক্ষণের আওতায় চলে আসেন তিনি। কেজিবির সহায়তায় চেকোস্লোভাকিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার তত্ত্বাবধানে গুপ্তচরবৃত্তির লক্ষ্যবস্তু হন ট্রাম্প।

এর বছর তিনেক পর ট্রাম্প তার আবাসন ব্যবসার বড় কাজে হাত দেন। গ্রান্ড সেন্ট্রাল স্টেশনের কাছে গ্রান্ড হায়াত নিউইয়র্ক হোটেল গড়ে তোলেন তিনি। তখন সিময়ন কিসলিন নামের এক ব্যক্তির শোরুম থেকে ওই হোটেলের জন্য ২০০ টেলিভিশন সেট কেনেন ট্রাম্প। ফিফথ অ্যাভিনিউতে জয়-লুড ইলেক্ট্রনিকসের অংশীদার ছিলেন সোভিয়েত অভিবাসী সিময়ন।

ইউরি শেভেতের তথ্যানুসারে, ওই ইলেট্রনিকসের দোকানটি নিয়ন্ত্রণ করত কেজিবি। আর সিময়ন ছিলেন কেজিবির স্থানীয় এজেন্ট। তিনিই প্রথম উদীয়মান ব্যবসায়ী ডোনাল্ড ট্রাম্পকে শনাক্ত করেন। তার কাছে ‘সম্ভাব্য ফসল’ হিসেবে হয়েছে ট্রাম্পকে।

তবে কেজিবির সঙ্গে নিজের সম্পর্কের কথা অস্বীকার করেন সিময়ন কিসলিন।

১৯৮৭ সালে প্রথমবারের মতো মস্কো ও সেন্ট পিটার্সবার্গ ভ্রমণে যান ট্রাম্প ও ইভানা। ইউরি শেভেত বলেন, কেজিবির আলোচনার বিষয়গুলো গিলছিলেন ট্রাম্প। কেজিবি তাকে প্রশংসায় ভাসিয়ে দেন। তার রাজনীতিতে ঢোকা উচিত বলেও বুদ্ধি দেন।

সাবেক এই কেজিবি মেজর বলেন, কেজিবির জন্য এটি ছিল ‘কথার জাদু’ দিয়ে ট্রাম্পের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা। তারা ট্রাম্পের প্রচুর ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করেন। তাকে নিয়ে খুঁটিনাটি জানতেই তখন এটা করা হয়েছিল।

মনস্তাত্ত্বিক ও বৃদ্ধিবৃত্তিকভাবে ট্রাম্প অনেক নাজুক এবং তোষামোদ পছন্দ করেন বলে তাদের মনে হয়েছে। এই বিষয়টিই কাজে লাগায় কেজিবি। এমন ভাব ধরে যে তারা ট্রাম্পের ব্যক্তিত্বে খুব মুগ্ধ হয়েছেন এবং তার মতো মানুষেরই উচিত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়া; যিনি বিশ্বটাকে বদলে দিতে পারেন।

রুশ গোয়েন্দাদের কথার জাদুতে ভালোই মজেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তখনকার কেজিবির জন্য এটি ছিল বড় অর্জন। যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যাওয়ার কিছু দিন পরে প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হতে রিপাবলিকান দলের মনোনয়ন প্রত্যাশা করেন ট্রাম্প। নিউ হ্যাম্পশায়ারের পোর্টসমাউথে একটি প্রচার সমাবেশেও করেন তিনি।

১৯৮৭ সালের ১ সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট ও বোস্টন গ্লোবে পুরো পাতাজুড়ে নিজের বিজ্ঞাপন দেন। যার শিরোনাম ছিল– ‘মার্কিন পররাষ্ট্র প্রতিরক্ষানীতিতে কোনো ভুল নেই, যা একটি ছোট মেরুদণ্ডকে সারিয়ে তুলতে পারে না।’

রোনাল্ড রিগ্যানের ঠাণ্ডাযুদ্ধের আমেরিকায় এই বিজ্ঞাপন ব্যাপক ভিন্নধর্মীয় মতামত প্রকাশ করা হয়েছিল। মিত্র দেশ জাপান যুক্তরাষ্ট্রকে শোষণ করছে বলে অভিযোগ এবং পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোতে যুক্তরাষ্ট্রের থাকা নিয়েও দ্বিমত পোষণ করা হয়। বিজ্ঞাপনটি আসলে মার্কিন জনগণের কাছে খোলাচিঠির আকার নিয়ে প্রকাশ পায়।

বলা হয়, ‘যেসব দেশ নিজেদের সুরক্ষা দিতে পারে তাদের সুরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ দেওয়া বন্ধ করা উচিত।’ ট্রাম্পের এই অদ্ভুত পদক্ষেপে রাশিয়ায় বিস্ময় ও উচ্ছ্বাস দেখা গেছে।

এর কিছু দিন পর ইউরি শেভেত নিজ দেশে ফিরে যান। ইয়াসেনেভোয় কেজিবির প্রধান মুখ্য পরিচালকের কার্যালয়ে ছিলেন তিনি। সেখানে তার কাছে একটি গোপনীয় তারবার্তা আসে, যাতে ট্রাম্পের এই বিজ্ঞাপন কেজিবির কর্মকাণ্ডের ফসল হিসেবে আনন্দ প্রকাশ করা হয়।

ইউরির ভাষ্যমতে, এটি ছিল নজিরবিহীন। সত্তর ও আশির দশকে কথার জাদুতে মুগ্ধ করার পদক্ষেপ গ্রহণ করে কেজিবি। মিথ্যা ও প্রপাগান্ডা ছড়াতেই এমন উদ্যোগ নেওয়া গোয়েন্দা সংস্থাটি। আমিও এসবের সঙ্গে পরিচিত ছিলাম।

‘কিন্তু ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে আমি এমন অদ্ভুত কাণ্ডের কথা কখনও শুনিনি। কারণ এটি ছিল খুবই তুচ্ছ। এটা বিশ্বাস করা কঠিন যে নিজের নামে কেউ এমন বিজ্ঞাপন প্রচার করবেন এবং পশ্চিমা জগতের মানুষ তা মেনে নেবেন। কিন্তু এটি ঘটেছে এবং এই লোক মার্কিন প্রেসিডেন্ট হয়েছেন।’

২০১৬ সালে হিলারি ক্লিনটনকে হারিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন রিপাবলিকান ট্রাম্প। মস্কো তাকে স্বাগত জানিয়েছে। ট্রাম্পের প্রচারশিবির ও রাশিয়ার মধ্যকার কোনো ষড়যন্ত্র প্রমাণ করতে পারেননি বিশেষ কৌঁসুলি রবার্ট মুলার। কিন্তু সেন্টার পর আমেরিকান প্রগ্রেস অ্যাকশন ফান্ডের মস্কো প্রকল্প বলছে, রুশ-সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দাদের অন্তত ২৭২টি নম্বর আছে ট্রাম্পের প্রচারশিবির ও ট্র্যানজিশন টিমের কাছে। তাদের মধ্যে অন্তত ৩৮ বার বৈঠক হয়েছে।

ইউরির বরাত দিয়ে গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৬ সালে ট্রাম্পের নির্বাচনে বিজয় মস্কোয় যেন উৎসবের আমেজ তৈরি করেছিল। প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, বিশেষ কৌঁসুলি রবার্ট মুলার ট্রাম্পের প্রচারশিবিরের সঙ্গে রুশ আঁতাতের বিষয়টি প্রমাণ করতে পারেননি।

কিন্তু সেন্টার ফর আমেরিকান প্রোগ্রেস অ্যাকশন ফান্ড নামের একটি প্রতিষ্ঠান ঠিকই নিজেদের অনুসন্ধানে ট্রাম্পের প্রচারশিবির ও অন্তর্বর্তী দলের কমপক্ষে ২৭২ জনের রুশ–সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পেয়েছিল। এ ছাড়া রুশ–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে ট্রাম্প শিবিরের বিভিন্ন সদস্যের কমপক্ষে ৩৮টি বৈঠকের তথ্যও তারা পেয়েছে।

আমেরিকান কমপ্রোম্যাট বইতে ক্রেগ আঙ্গার লিখেছেন, ট্রাম্প ছিলেন একটা সম্পদ। তবে বিষয়টা এমন নয় যে কেজিবি তার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, আমরা এই লোককে গড়ে তুলব এবং ৪০ বছর পর তিনি প্রেসিডেন্ট হবেন।

আশির দশকের যে সময় বিষয়টি শুরু হয়েছিল, তখন কেজিবি পাগলাটে লোকদেরই লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছিল। এবং ট্রাম্পের মতো আরও অনেকের পেছনেই ছুটছিল তারা। তবে নানা দিক থেকেই ট্রাম্প ছিল তাদের নির্ভুল লক্ষ্য। ২০১৬ সালে নির্বাচনে বিজয়ের আগপর্যন্ত তার পেছনে লেগেই ছিলেন রুশ গোয়েন্দারা।

রুশ গোয়েন্দাদের ৪০ বছরের চেষ্টার ফসল ট্রাম্প

 অনলাইন ডেস্ক 
৩১ জানুয়ারি ২০২১, ০১:৪৯ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
রুশ গোয়েন্দাদের ৪০ বছরের চেষ্টার ফসল ট্রাম্প
ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিজেদের সম্পদ হিসেবে ৪০ বছর ধরে গড়ে তুলেছেন রুশ গোয়েন্দারা। কেজিবি তার সঙ্গে এমন ভূমিকা পালন করেছে, যেন তারা ট্রাম্পের ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ।

কেজিবির সাবেক এক গোয়েন্দা গার্ডিয়ানকে এমন কথাই বলেছেন। পাশ্চাত্যবিরোধী প্রচারণায় তোতাপাখির মতো বুলি আওড়াতে ট্রাম্প এতটাই উৎসাহিত ছিলেন যে মস্কোতে তা উদযাপিত হয়েছে।

১৯৮০-এর দশকে ইউরি শেভেতকে ওয়াশিংটনে নিয়োগ দেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘কেমব্রিজ ফাইভের’ সঙ্গে তুলনা করেন।

‘কেমব্রিজ ফাইভ’ হলো ব্রিটেনের একটি গুপ্তচর চক্র, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যারা সোভিয়েত ইউনিয়নকে তথ্য সরবরাহ করতেন। ১৯৩০-এর দশক থেকে পঞ্চাশের দশক পর্যন্ত তারা সক্রিয় ছিলেন।

সাংবাদিক ক্রেইগ উংগারের নতুন গ্রন্থ ‘আমেরিকান কমপ্রোম্যাটের’ মূল সূত্র হচ্ছে ৬৭ বছর বয়সী এই ইউরি শেভেত। এর আগে হাউস অব ট্রাম্প ও হাউস অব পুতিন নামেও দুটি বই লেখেন ক্রেইগ। বইটিতে কুখ্যাত অর্থদাতা জেফরি এপস্টিইনের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্কের ভেতরের খবরও তুলে ধরা হয়েছে।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জেনিয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস করেন ইউরি শেভেত। তিনি কেজিবির মেজর হিসেবে কর্মরত হলেও ওয়াশিংটনে রুশ সংবাদ সংস্থা তাসের প্রতিনিধি ছিলেন। এটি আশির দশকের ঘটনা।

পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালের দিকে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং আমেরিকার নাগরিকত্ব পান। বর্তমানে কর্পোরেট নিরাপত্তা তদন্তকারী হিসেবে কাজ করছেন। ২০০৬ সালে লন্ডনে গুপ্তহত্যার শিকার হওয়া আলেক্সান্ডার লিটভিনেকোর সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি।

সোমবার ফোনে তিনি গার্ডিয়ানের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ছাত্র থাকাকালেই কীভাবে লোকজনকে বেছে নেওয়া হয়, এটি তার নজির। এর পর বাছাই করা লোকজন গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন। ট্রাম্পের ক্ষেত্রে এমন কিছুই ঘটেছে।

১৯৭৭ সালে চেক মডেল ইভানকা জেলনিকোভাকে বিয়ে করেন সাবেক এই রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট। তখন রাশিয়ার পর্যবেক্ষণের আওতায় চলে আসেন তিনি। কেজিবির সহায়তায় চেকোস্লোভাকিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার তত্ত্বাবধানে গুপ্তচরবৃত্তির লক্ষ্যবস্তু হন ট্রাম্প।

এর বছর তিনেক পর ট্রাম্প তার আবাসন ব্যবসার বড় কাজে হাত দেন। গ্রান্ড সেন্ট্রাল স্টেশনের কাছে গ্রান্ড হায়াত নিউইয়র্ক হোটেল গড়ে তোলেন তিনি। তখন সিময়ন কিসলিন নামের এক ব্যক্তির শোরুম থেকে ওই হোটেলের জন্য ২০০ টেলিভিশন সেট কেনেন ট্রাম্প। ফিফথ অ্যাভিনিউতে জয়-লুড ইলেক্ট্রনিকসের অংশীদার ছিলেন সোভিয়েত অভিবাসী সিময়ন।

ইউরি শেভেতের তথ্যানুসারে, ওই ইলেট্রনিকসের দোকানটি নিয়ন্ত্রণ করত কেজিবি। আর সিময়ন ছিলেন কেজিবির স্থানীয় এজেন্ট। তিনিই প্রথম উদীয়মান ব্যবসায়ী ডোনাল্ড ট্রাম্পকে শনাক্ত করেন। তার কাছে ‘সম্ভাব্য ফসল’ হিসেবে হয়েছে ট্রাম্পকে।

তবে কেজিবির সঙ্গে নিজের সম্পর্কের কথা অস্বীকার করেন সিময়ন কিসলিন।

১৯৮৭ সালে প্রথমবারের মতো মস্কো ও সেন্ট পিটার্সবার্গ ভ্রমণে যান ট্রাম্প ও ইভানা। ইউরি শেভেত বলেন, কেজিবির আলোচনার বিষয়গুলো গিলছিলেন ট্রাম্প। কেজিবি তাকে প্রশংসায় ভাসিয়ে দেন। তার রাজনীতিতে ঢোকা উচিত বলেও বুদ্ধি দেন।

সাবেক এই কেজিবি মেজর বলেন, কেজিবির জন্য এটি ছিল ‘কথার জাদু’ দিয়ে ট্রাম্পের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা। তারা ট্রাম্পের প্রচুর ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করেন। তাকে নিয়ে খুঁটিনাটি জানতেই তখন এটা করা হয়েছিল।

মনস্তাত্ত্বিক ও বৃদ্ধিবৃত্তিকভাবে ট্রাম্প অনেক নাজুক এবং তোষামোদ পছন্দ করেন বলে তাদের মনে হয়েছে। এই বিষয়টিই কাজে লাগায় কেজিবি। এমন ভাব ধরে যে তারা ট্রাম্পের ব্যক্তিত্বে খুব মুগ্ধ হয়েছেন এবং তার মতো মানুষেরই উচিত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়া; যিনি বিশ্বটাকে বদলে দিতে পারেন।

রুশ গোয়েন্দাদের কথার জাদুতে ভালোই মজেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তখনকার কেজিবির জন্য এটি ছিল বড় অর্জন। যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যাওয়ার কিছু দিন পরে প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হতে রিপাবলিকান দলের মনোনয়ন প্রত্যাশা করেন ট্রাম্প। নিউ হ্যাম্পশায়ারের পোর্টসমাউথে একটি প্রচার সমাবেশেও করেন তিনি।

১৯৮৭ সালের ১ সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট ও বোস্টন গ্লোবে পুরো পাতাজুড়ে নিজের বিজ্ঞাপন দেন। যার শিরোনাম ছিল– ‘মার্কিন পররাষ্ট্র প্রতিরক্ষানীতিতে কোনো ভুল নেই, যা একটি ছোট মেরুদণ্ডকে সারিয়ে তুলতে পারে না।’

রোনাল্ড রিগ্যানের ঠাণ্ডাযুদ্ধের আমেরিকায় এই বিজ্ঞাপন ব্যাপক ভিন্নধর্মীয় মতামত প্রকাশ করা হয়েছিল। মিত্র দেশ জাপান যুক্তরাষ্ট্রকে শোষণ করছে বলে অভিযোগ এবং পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোতে যুক্তরাষ্ট্রের থাকা নিয়েও দ্বিমত পোষণ করা হয়। বিজ্ঞাপনটি আসলে মার্কিন জনগণের কাছে খোলাচিঠির আকার নিয়ে প্রকাশ পায়।

বলা হয়, ‘যেসব দেশ নিজেদের সুরক্ষা দিতে পারে তাদের সুরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ দেওয়া বন্ধ করা উচিত।’ ট্রাম্পের এই অদ্ভুত পদক্ষেপে রাশিয়ায় বিস্ময় ও উচ্ছ্বাস দেখা গেছে।

এর কিছু দিন পর ইউরি শেভেত নিজ দেশে ফিরে যান। ইয়াসেনেভোয় কেজিবির প্রধান মুখ্য পরিচালকের কার্যালয়ে ছিলেন তিনি। সেখানে তার কাছে একটি গোপনীয় তারবার্তা আসে, যাতে ট্রাম্পের এই বিজ্ঞাপন কেজিবির কর্মকাণ্ডের ফসল হিসেবে আনন্দ প্রকাশ করা হয়।

ইউরির ভাষ্যমতে, এটি ছিল নজিরবিহীন। সত্তর ও আশির দশকে কথার জাদুতে মুগ্ধ করার পদক্ষেপ গ্রহণ করে কেজিবি। মিথ্যা ও প্রপাগান্ডা ছড়াতেই এমন উদ্যোগ নেওয়া গোয়েন্দা সংস্থাটি। আমিও এসবের সঙ্গে পরিচিত ছিলাম। 

‘কিন্তু ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে আমি এমন অদ্ভুত কাণ্ডের কথা কখনও শুনিনি। কারণ এটি ছিল খুবই তুচ্ছ। এটা বিশ্বাস করা কঠিন যে নিজের নামে কেউ এমন বিজ্ঞাপন প্রচার করবেন এবং পশ্চিমা জগতের মানুষ তা মেনে নেবেন। কিন্তু এটি ঘটেছে এবং এই লোক মার্কিন প্রেসিডেন্ট হয়েছেন।’

২০১৬ সালে হিলারি ক্লিনটনকে হারিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন রিপাবলিকান ট্রাম্প। মস্কো তাকে স্বাগত জানিয়েছে। ট্রাম্পের প্রচারশিবির ও রাশিয়ার মধ্যকার কোনো ষড়যন্ত্র প্রমাণ করতে পারেননি বিশেষ কৌঁসুলি রবার্ট মুলার। কিন্তু সেন্টার পর আমেরিকান প্রগ্রেস অ্যাকশন ফান্ডের মস্কো প্রকল্প বলছে, রুশ-সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দাদের অন্তত ২৭২টি নম্বর আছে ট্রাম্পের প্রচারশিবির ও ট্র্যানজিশন টিমের কাছে। তাদের মধ্যে অন্তত ৩৮ বার বৈঠক হয়েছে।

ইউরির বরাত দিয়ে গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৬ সালে ট্রাম্পের নির্বাচনে বিজয় মস্কোয় যেন উৎসবের আমেজ তৈরি করেছিল। প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, বিশেষ কৌঁসুলি রবার্ট মুলার ট্রাম্পের প্রচারশিবিরের সঙ্গে রুশ আঁতাতের বিষয়টি প্রমাণ করতে পারেননি। 

কিন্তু সেন্টার ফর আমেরিকান প্রোগ্রেস অ্যাকশন ফান্ড নামের একটি প্রতিষ্ঠান ঠিকই নিজেদের অনুসন্ধানে ট্রাম্পের প্রচারশিবির ও অন্তর্বর্তী দলের কমপক্ষে ২৭২ জনের রুশ–সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পেয়েছিল। এ ছাড়া রুশ–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে ট্রাম্প শিবিরের বিভিন্ন সদস্যের কমপক্ষে ৩৮টি বৈঠকের তথ্যও তারা পেয়েছে।

আমেরিকান কমপ্রোম্যাট বইতে ক্রেগ আঙ্গার লিখেছেন, ট্রাম্প ছিলেন একটা সম্পদ। তবে বিষয়টা এমন নয় যে কেজিবি তার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, আমরা এই লোককে গড়ে তুলব এবং ৪০ বছর পর তিনি প্রেসিডেন্ট হবেন। 

আশির দশকের যে সময় বিষয়টি শুরু হয়েছিল, তখন কেজিবি পাগলাটে লোকদেরই লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছিল। এবং ট্রাম্পের মতো আরও অনেকের পেছনেই ছুটছিল তারা। তবে নানা দিক থেকেই ট্রাম্প ছিল তাদের নির্ভুল লক্ষ্য। ২০১৬ সালে নির্বাচনে বিজয়ের আগপর্যন্ত তার পেছনে লেগেই ছিলেন রুশ গোয়েন্দারা।
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন