রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে তুরস্কের লাভ ক্ষতি কী?
jugantor
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে তুরস্কের লাভ ক্ষতি কী?

  সরোয়ার আলম, আঙ্কারা, তুরস্ক থেকে  

২৩ এপ্রিল ২০২১, ২৩:৩১:২৫  |  অনলাইন সংস্করণ

ইউক্রেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, তাদের পূর্ব সীমান্তে জড়ো করা রুশ সেনার সংখ্যা ৪০ হাজার।

২০১৪ সালে ইউক্রেনের ক্রিমিয়া অঞ্চল দখল করে নেয় রাশিয়া। ২০১৩ সালের নভেম্বর মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে একটি আর্থিক চুক্তি সই করতে অস্বীকৃতি জানান তখনকার ক্রিমিয়ার প্রেসিডেন্ট ইয়ানুকোভিচ। বিপরীতে তিনি বেছে নেন রুশ কাস্টমস ইউনিয়ন যেখানে, বেলারুশ ও কাজাখস্তানের সঙ্গে ইউক্রেনকে যুক্ত করতে চেয়েছিল রাশিয়া। এর প্রতিবাদে শুরু হয় ব্যাপক বিক্ষোভ এবং ইউরোপের মদতে সে বিক্ষোভ রূপ নেয় সরকার পতনের আন্দোলনে।

দেশে তখন এই বিক্ষোভ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে যে সরকার বিভিন্ন অঞ্চলের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। আর তখনই রাশিয়া দখল করে নেয় ইউক্রেনের স্বায়ত্তশাসিত ক্রিমিয়া উপদ্বীপ। পরে একটি তথাকথিত গণভোটের মাধ্যমে এই দখলকে জায়েজ করে নেয়।

এছাড়াও ইউক্রেনের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের দোনবাস অঞ্চলের দোনেৎস্ক আর লুহানস্ক এলাকাতেও ২০১৪ সালে রাশিয়াপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদীরা কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নেয় এবং সেখানে রাশিয়ার মদতে ‘পিপলস রিপাবলিকস’ নামে আলাদা শাসনব্যবস্থা চালু করে।

তখন থেকেই থেমে থেমে উত্তেজনা চলছিল ইউক্রেনের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের সীমান্তবর্তী এলাকা দোনবাসে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই সীমান্তে বিপুলসংখ্যক সেনা ট্যাংক এবং সামরিক সরঞ্জাম জড়ো করে রাশিয়া।

এ ব্যাপারে মস্কো থেকে নির্দিষ্ট কোন সংখ্যা বলা না হলেও ইউক্রেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, তাদের পূর্ব সীমান্তে জড়ো করা রুশ সেনার সংখ্যা ৪০ হাজার। সঙ্গে রয়েছে সাঁজোয়া যান, ট্যাংক, কামানের বহর। এ ছাড়া ইউক্রেনের কাছ থেকে দখলকৃত ক্রিমিয়াতেও ৪০ হাজার সশস্ত্র সেনা মোতায়েন করেছে মস্কো। আর ক্রিমিয়ার পার্শ্ববর্তী সামুদ্রিক এলাকাগুলোতে প্রায় ২০টির মতো যুদ্ধ জাহাজ প্রস্তুত রেখেছে রাশিয়া।

অর্থাৎ ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়া পুরোপুরি এক যুদ্ধের জন্য সব ধরণের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।

রাশিয়ার নতুন করে উত্তপ্ত করার পেছনে কারণ কী?

রাশিয়া এবং ইউক্রেনের মধ্যে ২০১৪ সালের পরে প্রায় ৮ থেকে ১০ বার যুদ্ধ বিরতির চুক্তি হয় আবার ভেঙে যায়। সর্বশেষ যুদ্ধ বিরতির চুক্তি হয় ২০১৯ সালের জুলাই মাসে। কিন্তু ২০২১ সালের জানুয়ারিতে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ক্ষমতায় আসার পরেই আবার সেখানে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষ বাঁধানোর জন্য ইউক্রেন তার পূর্বাঞ্চলে রাশিয়া সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দায়ী করে।

এখানে একটি বিষয় স্মরণ করা দরকার যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সময় তিনি ইউক্রেন থেকে তার সব ধরণের সামরিক সহযোগিতা উঠিয়ে নেন। সুতরাং ইউক্রেন ২০১৪ সালের পরে পাশ্চত্য থেকে বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সহযোগিতা পেয়ে আসছিল বাইডেনের সময় সে সহযোগিতা আবার নতুন করে পাওয়ার চেষ্টা করে। সেজন্য ইউক্রেনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট কৌতুকাভিনেতা ভ্লাদিমির জেলেনস্কি মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে ফোনালাপের এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে সযোগিতার আশ্বাস পাওয়ার সুযোগ খুঁজেন।

গত ২ এপ্রিল ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন বাইডেন। তখন ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে টান টান উত্তেজনা। সুতরাং, বাইডেনকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে কাছে পাওয়ার প্রস্তাব দেন জেলেনস্কি। বাইডেনও তার সমর্থনের কথা ঘোষণা দেন। এরপরই ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ন্যাটোসহ অন্যান্য পশ্চিমা শক্তি ইউক্রেনের পাশে থাকার কথা জোড়ালোভাবে উচ্চারণ করতে থাকে। সুতরাং এই উত্তেজনায় ইউক্রেন তার চাওয়া পূর্ণ করলো।

এদিকে মার্চ মাসে রাশিয়ার পুতিন বিরোধী নেতা অ্যালেক্সেই নাভালনিকে বিষ প্রয়োগে হত্যার চেষ্টা এবং তাকে গ্রেফতারের অভিযোগে বাইডেন সরকার কয়েকজন রাশিয়ার সরকারি কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে।ওয়াশিংটন এমনকি এ হুঁশিয়ারিও দেয় যে, নাভালনির কিছু হলে পুতিনের মূল্য দিতে হবে।

এছাড়াও ২০২০ সালে আমেরিকার বিভিন্ন সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হ্যাক করার অভিযোগে বাইডেন প্রশাসন রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরও কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এছাড়াও গত বছর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের অভিযোগে দেশটির বিরুদ্ধে বড়সড় ধরণের নিষেধাজ্ঞারও তোরজোড় চলছে ওয়াশিংটনে।

এরই মধ্যে মার্চের শেষ দিকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনকে ‘খুনি’ বলে আখ্যায়িত করেন। যার ফলে রাশিয়া তার ওয়াশিংটনে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতকে দেশে ফিরিয়ে আনে এবং পুতিন জো বাইডেনকে টেলিভিশনে লাইভ বিতর্কের দাওয়াত দেন।

সুতরাং, এই সবকিছুর বিরুদ্ধে রাশিয়ার হাতে যে মোক্ষম অস্ত্রটি আছে সেটা হলো ইউক্রেনের ওপর দিয়ে আমেরিকাকে মুগুর দেখানো। একই সঙ্গে বাইডেন প্রশাসনের ইউক্রেনকে কতটুক সামরিক সহযোগিতা দিতে সক্ষম তাও মেপে নেওয়া।

এছাড়াও যদি পুতিন এবং বাইডেনের মধ্যে কোন সরাসরি বৈঠক হয় তাহলে সেই আলোচনার টেবিলেও নিজের অবস্থানকে পোক্ত করতে চাইছেন পুতিন। অর্থাৎ আলোচনার টেবিলে বসার আগেই আপনি শত্রুর দৌড় কোন পর্যন্ত তা মেপে নিলেন। এতে কয়েকটি সুবিধা আছে। পুতিন বাইডেনকে কোনো বিষয়ে রাজি করানোর জন্য সামরিক হুমকি দিতে পারবেন। ইউক্রেন ছাড়াও অন্যান্য যে সকল অঞ্চলে রাশিয়া-আমেরিকা মুখোমুখি, যেমন সিরিয়া, সে সব অঞ্চলেও রাশিয়ায় বাইডেনকে সামরিক থ্রেট দিতে পারবেন।

কারণ, রাশিয়া খুব ভালভাবে জানে যে ইউক্রেন রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়াবে না। কারণ কিয়েভের সে ধরণের সামরিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক সক্ষমতা নেই। যদি শুধুমাত্র আমেরিকা, ইউরোপ, ন্যাটো সরাসরি ইউক্রেনে বিপুল পরিমাণে সেনা পাঠিয়ে সমর্থন দেয় তখনই শুধু সরাসরি যুদ্ধ সম্ভব। সুতরাং, রাশিয়া ইউক্রেন সীমান্তে সৈন্য, অস্ত্র, ট্যাংক জড়ো করার মাধ্যমে ইউক্রেনের প্রতি পশ্চিমাদের সাপোর্টের পরিধিটা মাপতে চাচ্ছে।

পুতিন ইতিমধ্যে উত্তর ও পেয়েছেন, মার্কিন প্রশাসন কৃষ্ণ সাগরে দুটি যুদ্ধ জাহাজ প্রেরণ করার ঘোষণা দিয়েও একেবারে শেষ সময়ে তা বাতিল করে। আর পশ্চিমাদের ইউক্রেনকে সহযোগিতার কথা আশ্বাসের মধ্যেই থেকে যায়। কারণ ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের যে জায়গাতে উত্তেজনা চলছে সেখানে আমেরিকার যুদ্ধ জাহাজ পৌছা সম্ভব না। এছাড়াও কৃষ্ণ সাগরে রাশিয়ার বিশাল নৌ বহর মওজুদ আছে যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি যুদ্ধ জাহাজ কিছুই করতে পারবে না।

সুতরাং, রাশিয়া মূলত যুক্তরাষ্ট্রকে চাপে ফেলতে চাচ্ছে।

এছাড়াও ইউরোপে রাশিয়ার তেল গ্যাস রপ্তানির যে আলোচনা জার্মানি এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের সঙ্গে চলছে আমেরিকা সেখানও বাঁধা দিচ্ছে। সুতরাং, বাইডেনকে চাপে ফেলে রাশিয়া তার স্বার্থ গুলো আদায় করতে চাইবে।

তুরস্কের ওপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব কী হবে?

তুরস্ক শুরু থেকেই ইউক্রেনের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে। গত কয়েক বছরে তুরস্কের সঙ্গে ইউক্রেনের বিভিন্ন রকমের সামরিক এবং অর্থনৈতিক চুক্তি হয়েছে। তুরস্ক ইউক্রেন থেকে ড্রোনের ইঞ্জিন কিনেছে, আবার ইউক্রেনের কাছে ড্রোন বিক্রি করছে। দু’দেশের মধ্যে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসায়িক সম্পর্ক বিরাজমান।

এছাড়াও ক্রিমিয়া অঞ্চলে রাশিয়ার দখলদারিত্বকেও তুরস্ক মেনে নেয়নি। কারণ ওই অঞ্চলের ক্রিমিয়ান তাতার জনগোষ্ঠী মূলত তুর্কি বংশোদ্ভূত। তাইতো রাশিয়ার এই পদক্ষেপকে অবৈধ দখলদারি বলে আখ্যা দিয়েছে আঙ্কারা।

তবে তুরস্ক আলোচনাকেই দু'দেশের মধ্যে বিরাজমান সমস্যার সমধানের একমাত্র উপায় হিসেবে দেখছে। আবার কৃষ্ণ সাগরে আমেরিকার বা ব্রিটেনের যুদ্ধ জাহাজ পাঠানোরও বিরোধিতা করছে। আবার এরদোয়ানের সঙ্গে পুতিনের সম্পর্কও ভালো। অন্যদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টে ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গেও আছে সুসম্পর্ক। সুতরাং তুরস্ক এখানে একদিকে দুইও দেশের সঙ্গে তার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বজায় রাখছে, অন্যদিকে ন্যাটোর সদস্য হিসবে এবং নিজের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্য ইউক্রেনের পক্ষে দাঁড়াচ্ছে। রাশিয়াও তুরস্কের এই অবস্থান সম্পর্কে আগে থেকেই অবগত। আবার এই সমস্যার সমাধানে আলোচনাকেই একমাত্র পথ হিসেবে দেখছে। এখানে তুরস্ক চমৎকার এক ভারসাম্যের নীতি বজায় রাখছে।

তুরস্কের কিলার ড্রোন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলাফল কি পরিবর্তন করতে পারবে?

তুরস্কের ড্রোনগুলো সিরিয়া লিবিয়া এবং আজারবাইজানে শত শত রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করেছে। আর ওই এলাকাতে ড্রোন আঘাতেই মূলত শত্রুর কোমর ভেঙে দিয়েছিল তুরস্ক সমর্থিত শক্তিগুলো। সুতরাং ইউক্রেনেও তুরস্কের ড্রোনগুলো রাশিয়ার বিরুদ্ধে সফলতা পাবে এবং যুদ্ধের মোড় ইউক্রেনের পক্ষে ঘুরিয়ে দিতে পারবে বলে অনেকেরই ধারণা। কিন্তু এখানে একটি কথা ভুলে গেলে চলবে না যে ইউক্রেনে যদি যুদ্ধ বাঁধে সেখানে রাশিয়া সব শক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পরবে। আর যুদ্ধটা হবে তার একেবারে বর্ডারে। লিবিয়া বা সিরিরার মত হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে না। সুতরাং এখানে তুরস্কের ড্রোন কতটুকু সফলতা পায় তা নিশ্চিত না।

সম্ভব্য এই যুদ্ধ কি তুরস্কের জন্য সুযোগ নাকি অশনিসংকেত?

যদি সত্যি সত্যি যুদ্ধ বেঁধেই যায়, এবং সেটা ২০১৪ সালের মতো না হয়ে বরং পশ্চিমারা যদি সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পরে তাহলে এ অঞ্চলে ভারসাম্য পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাবে। কৃষ্ণ সাগর হয়ে উঠবে নতুন রণক্ষেত্র।

আমেরিকার নেতৃত্বকে ন্যাটো কৃষ্ণ সাগরে যদি যুদ্ধ জাহাজ পাঠায়, তাহলে তুরস্কও জড়িয়ে পরবে এই যুদ্ধে এবং তখন রাশিয়া তুরস্ককে আক্রমণ করতেও দ্বিধাবোধ করবে না। সে আক্রমণে যোগ দিতে পারে সিরিয়া, আর্মেনিয়া এমনকি গ্রীসও। সুতরাং এ ধরণের একটি যুদ্ধ বাঁধলে ইউক্রেনের চেয়েও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে তুরস্ক। তাইতো তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদগান বারবার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন আমরা কৃষ্ণ সাগরকে একটি যুদ্ধের নয় বরং শান্তির সাগর হিসেবে দেখতে চাই।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে তুরস্কের লাভ ক্ষতি কী?

 সরোয়ার আলম, আঙ্কারা, তুরস্ক থেকে 
২৩ এপ্রিল ২০২১, ১১:৩১ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
ইউক্রেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, তাদের পূর্ব সীমান্তে জড়ো করা রুশ সেনার সংখ্যা ৪০ হাজার।
ইউক্রেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, তাদের পূর্ব সীমান্তে জড়ো করা রুশ সেনার সংখ্যা ৪০ হাজার। ছবি: সংগৃহীত

২০১৪ সালে ইউক্রেনের ক্রিমিয়া অঞ্চল দখল করে নেয় রাশিয়া। ২০১৩ সালের নভেম্বর মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে একটি আর্থিক চুক্তি সই করতে অস্বীকৃতি জানান তখনকার ক্রিমিয়ার প্রেসিডেন্ট ইয়ানুকোভিচ। বিপরীতে তিনি বেছে নেন রুশ কাস্টমস ইউনিয়ন যেখানে, বেলারুশ ও কাজাখস্তানের সঙ্গে ইউক্রেনকে যুক্ত করতে চেয়েছিল রাশিয়া। এর প্রতিবাদে শুরু হয় ব্যাপক বিক্ষোভ এবং ইউরোপের মদতে সে বিক্ষোভ রূপ নেয় সরকার পতনের আন্দোলনে।

দেশে তখন এই বিক্ষোভ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে যে সরকার বিভিন্ন অঞ্চলের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে।  আর তখনই রাশিয়া দখল করে নেয় ইউক্রেনের স্বায়ত্তশাসিত ক্রিমিয়া উপদ্বীপ।  পরে একটি তথাকথিত গণভোটের মাধ্যমে এই দখলকে জায়েজ করে নেয়।

এছাড়াও ইউক্রেনের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের দোনবাস অঞ্চলের দোনেৎস্ক আর লুহানস্ক এলাকাতেও ২০১৪ সালে রাশিয়াপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদীরা কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নেয় এবং সেখানে রাশিয়ার মদতে ‘পিপলস রিপাবলিকস’ নামে আলাদা শাসনব্যবস্থা চালু করে।

তখন থেকেই থেমে থেমে উত্তেজনা চলছিল ইউক্রেনের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের সীমান্তবর্তী এলাকা দোনবাসে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই সীমান্তে বিপুলসংখ্যক সেনা ট্যাংক এবং সামরিক সরঞ্জাম জড়ো করে রাশিয়া।

এ ব্যাপারে মস্কো থেকে নির্দিষ্ট কোন সংখ্যা বলা না হলেও ইউক্রেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, তাদের পূর্ব সীমান্তে জড়ো করা রুশ সেনার সংখ্যা ৪০ হাজার। সঙ্গে রয়েছে সাঁজোয়া যান, ট্যাংক, কামানের বহর। এ ছাড়া ইউক্রেনের কাছ থেকে দখলকৃত ক্রিমিয়াতেও ৪০ হাজার সশস্ত্র সেনা মোতায়েন করেছে মস্কো। আর ক্রিমিয়ার পার্শ্ববর্তী সামুদ্রিক এলাকাগুলোতে প্রায় ২০টির মতো যুদ্ধ জাহাজ প্রস্তুত রেখেছে রাশিয়া।

অর্থাৎ ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়া পুরোপুরি এক যুদ্ধের জন্য সব ধরণের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।   

রাশিয়ার নতুন করে উত্তপ্ত করার পেছনে কারণ কী?

রাশিয়া এবং ইউক্রেনের মধ্যে ২০১৪ সালের পরে প্রায় ৮ থেকে ১০ বার যুদ্ধ বিরতির চুক্তি হয় আবার ভেঙে যায়।  সর্বশেষ যুদ্ধ বিরতির চুক্তি হয় ২০১৯ সালের জুলাই মাসে। কিন্তু ২০২১ সালের জানুয়ারিতে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ক্ষমতায় আসার পরেই আবার সেখানে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষ বাঁধানোর জন্য ইউক্রেন তার পূর্বাঞ্চলে রাশিয়া সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দায়ী করে।

এখানে একটি বিষয় স্মরণ করা দরকার যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সময় তিনি ইউক্রেন থেকে তার সব ধরণের সামরিক সহযোগিতা উঠিয়ে নেন। সুতরাং ইউক্রেন ২০১৪ সালের পরে পাশ্চত্য থেকে বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সহযোগিতা পেয়ে আসছিল বাইডেনের সময় সে সহযোগিতা আবার নতুন করে পাওয়ার চেষ্টা করে।  সেজন্য ইউক্রেনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট কৌতুকাভিনেতা ভ্লাদিমির জেলেনস্কি মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে ফোনালাপের এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে সযোগিতার আশ্বাস পাওয়ার সুযোগ খুঁজেন।

গত ২ এপ্রিল  ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন বাইডেন। তখন ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে টান টান উত্তেজনা। সুতরাং, বাইডেনকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে কাছে পাওয়ার প্রস্তাব দেন জেলেনস্কি।  বাইডেনও তার সমর্থনের কথা ঘোষণা দেন।  এরপরই ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ন্যাটোসহ অন্যান্য পশ্চিমা শক্তি ইউক্রেনের পাশে থাকার কথা জোড়ালোভাবে উচ্চারণ করতে থাকে।  সুতরাং এই উত্তেজনায় ইউক্রেন তার চাওয়া পূর্ণ করলো।  

এদিকে মার্চ মাসে রাশিয়ার পুতিন বিরোধী নেতা অ্যালেক্সেই নাভালনিকে বিষ প্রয়োগে হত্যার চেষ্টা এবং তাকে গ্রেফতারের অভিযোগে বাইডেন সরকার কয়েকজন রাশিয়ার সরকারি কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে।ওয়াশিংটন এমনকি এ হুঁশিয়ারিও দেয় যে, নাভালনির কিছু হলে পুতিনের মূল্য দিতে হবে।

এছাড়াও ২০২০ সালে আমেরিকার বিভিন্ন সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হ্যাক করার অভিযোগে বাইডেন প্রশাসন রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরও কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এছাড়াও গত বছর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের অভিযোগে দেশটির বিরুদ্ধে বড়সড় ধরণের নিষেধাজ্ঞারও তোরজোড় চলছে ওয়াশিংটনে।

এরই মধ্যে মার্চের শেষ দিকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনকে ‘খুনি’ বলে আখ্যায়িত করেন। যার ফলে রাশিয়া তার ওয়াশিংটনে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতকে দেশে ফিরিয়ে আনে এবং পুতিন জো বাইডেনকে টেলিভিশনে লাইভ বিতর্কের দাওয়াত দেন।

সুতরাং, এই সবকিছুর বিরুদ্ধে রাশিয়ার হাতে যে মোক্ষম অস্ত্রটি আছে সেটা হলো ইউক্রেনের ওপর দিয়ে আমেরিকাকে মুগুর দেখানো। একই সঙ্গে বাইডেন প্রশাসনের ইউক্রেনকে কতটুক সামরিক সহযোগিতা দিতে সক্ষম তাও মেপে নেওয়া।

এছাড়াও যদি পুতিন এবং বাইডেনের মধ্যে কোন সরাসরি বৈঠক হয় তাহলে সেই আলোচনার টেবিলেও নিজের অবস্থানকে পোক্ত করতে চাইছেন পুতিন। অর্থাৎ আলোচনার টেবিলে বসার আগেই আপনি শত্রুর দৌড় কোন পর্যন্ত তা মেপে নিলেন। এতে কয়েকটি সুবিধা আছে। পুতিন বাইডেনকে কোনো বিষয়ে রাজি করানোর জন্য সামরিক হুমকি দিতে পারবেন। ইউক্রেন ছাড়াও অন্যান্য যে সকল অঞ্চলে রাশিয়া-আমেরিকা মুখোমুখি, যেমন সিরিয়া, সে সব অঞ্চলেও রাশিয়ায় বাইডেনকে সামরিক থ্রেট দিতে পারবেন।

কারণ, রাশিয়া খুব ভালভাবে জানে যে ইউক্রেন রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়াবে না। কারণ কিয়েভের সে ধরণের সামরিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক সক্ষমতা নেই। যদি শুধুমাত্র আমেরিকা, ইউরোপ, ন্যাটো সরাসরি ইউক্রেনে বিপুল পরিমাণে সেনা পাঠিয়ে সমর্থন দেয়  তখনই শুধু সরাসরি যুদ্ধ সম্ভব। সুতরাং, রাশিয়া ইউক্রেন সীমান্তে সৈন্য, অস্ত্র, ট্যাংক জড়ো করার মাধ্যমে ইউক্রেনের প্রতি পশ্চিমাদের সাপোর্টের পরিধিটা মাপতে চাচ্ছে।

পুতিন ইতিমধ্যে উত্তর ও পেয়েছেন, মার্কিন প্রশাসন কৃষ্ণ সাগরে দুটি যুদ্ধ জাহাজ প্রেরণ করার ঘোষণা দিয়েও একেবারে শেষ সময়ে তা বাতিল করে। আর পশ্চিমাদের ইউক্রেনকে সহযোগিতার কথা আশ্বাসের মধ্যেই থেকে যায়। কারণ ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের যে জায়গাতে উত্তেজনা চলছে সেখানে আমেরিকার যুদ্ধ জাহাজ পৌছা সম্ভব না। এছাড়াও কৃষ্ণ সাগরে রাশিয়ার বিশাল নৌ বহর মওজুদ আছে যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি যুদ্ধ জাহাজ কিছুই করতে পারবে না।

সুতরাং, রাশিয়া মূলত যুক্তরাষ্ট্রকে চাপে ফেলতে চাচ্ছে।   

এছাড়াও ইউরোপে রাশিয়ার তেল গ্যাস রপ্তানির যে আলোচনা জার্মানি এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের সঙ্গে চলছে আমেরিকা সেখানও বাঁধা দিচ্ছে। সুতরাং, বাইডেনকে চাপে ফেলে রাশিয়া তার স্বার্থ গুলো আদায় করতে চাইবে।

তুরস্কের ওপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব কী হবে?

তুরস্ক শুরু থেকেই ইউক্রেনের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে। গত কয়েক বছরে তুরস্কের সঙ্গে ইউক্রেনের বিভিন্ন রকমের সামরিক এবং অর্থনৈতিক চুক্তি হয়েছে। তুরস্ক ইউক্রেন থেকে ড্রোনের ইঞ্জিন কিনেছে, আবার ইউক্রেনের কাছে ড্রোন বিক্রি করছে। দু’দেশের মধ্যে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসায়িক সম্পর্ক বিরাজমান।

এছাড়াও ক্রিমিয়া অঞ্চলে রাশিয়ার দখলদারিত্বকেও তুরস্ক মেনে নেয়নি। কারণ ওই অঞ্চলের ক্রিমিয়ান তাতার জনগোষ্ঠী মূলত তুর্কি বংশোদ্ভূত। তাইতো রাশিয়ার এই পদক্ষেপকে অবৈধ দখলদারি বলে আখ্যা দিয়েছে আঙ্কারা।

তবে তুরস্ক আলোচনাকেই দু'দেশের মধ্যে বিরাজমান সমস্যার সমধানের একমাত্র উপায় হিসেবে দেখছে। আবার কৃষ্ণ সাগরে আমেরিকার বা ব্রিটেনের যুদ্ধ জাহাজ পাঠানোরও বিরোধিতা করছে। আবার এরদোয়ানের সঙ্গে পুতিনের সম্পর্কও ভালো। অন্যদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টে ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গেও আছে সুসম্পর্ক। সুতরাং তুরস্ক এখানে একদিকে দুইও দেশের সঙ্গে তার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বজায় রাখছে, অন্যদিকে ন্যাটোর সদস্য হিসবে এবং নিজের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্য ইউক্রেনের পক্ষে দাঁড়াচ্ছে। রাশিয়াও তুরস্কের এই অবস্থান সম্পর্কে আগে থেকেই অবগত। আবার এই সমস্যার সমাধানে আলোচনাকেই একমাত্র পথ হিসেবে দেখছে। এখানে তুরস্ক চমৎকার এক ভারসাম্যের নীতি বজায় রাখছে।

তুরস্কের কিলার ড্রোন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলাফল কি পরিবর্তন করতে পারবে?

তুরস্কের ড্রোনগুলো সিরিয়া লিবিয়া এবং আজারবাইজানে শত শত রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করেছে। আর ওই এলাকাতে ড্রোন আঘাতেই মূলত শত্রুর কোমর ভেঙে দিয়েছিল তুরস্ক সমর্থিত শক্তিগুলো। সুতরাং ইউক্রেনেও তুরস্কের ড্রোনগুলো রাশিয়ার বিরুদ্ধে সফলতা পাবে এবং যুদ্ধের মোড় ইউক্রেনের পক্ষে ঘুরিয়ে দিতে পারবে বলে অনেকেরই ধারণা। কিন্তু এখানে একটি কথা ভুলে গেলে চলবে না যে ইউক্রেনে যদি যুদ্ধ বাঁধে সেখানে রাশিয়া সব শক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পরবে। আর যুদ্ধটা হবে তার একেবারে বর্ডারে। লিবিয়া বা সিরিরার মত হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে না। সুতরাং এখানে তুরস্কের ড্রোন কতটুকু সফলতা পায় তা নিশ্চিত না।
 
সম্ভব্য এই যুদ্ধ কি তুরস্কের জন্য সুযোগ নাকি অশনিসংকেত?

যদি সত্যি সত্যি যুদ্ধ বেঁধেই যায়, এবং সেটা ২০১৪ সালের মতো না হয়ে বরং পশ্চিমারা যদি সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পরে তাহলে এ অঞ্চলে ভারসাম্য পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাবে।  কৃষ্ণ সাগর হয়ে উঠবে নতুন রণক্ষেত্র।

আমেরিকার নেতৃত্বকে ন্যাটো কৃষ্ণ সাগরে যদি যুদ্ধ জাহাজ পাঠায়, তাহলে তুরস্কও জড়িয়ে পরবে এই যুদ্ধে এবং তখন রাশিয়া তুরস্ককে আক্রমণ করতেও দ্বিধাবোধ করবে না। সে আক্রমণে যোগ দিতে পারে সিরিয়া, আর্মেনিয়া এমনকি গ্রীসও।  সুতরাং এ ধরণের একটি যুদ্ধ বাঁধলে ইউক্রেনের চেয়েও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে তুরস্ক।  তাইতো তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদগান বারবার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন আমরা কৃষ্ণ সাগরকে একটি যুদ্ধের নয় বরং শান্তির সাগর হিসেবে দেখতে চাই।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : সরোয়ার আলমের লেখাসমূহ