শাঁতো দ্যু ভার্সাই: যত দেখি ততই ভালো লাগে
jugantor
শাঁতো দ্যু ভার্সাই: যত দেখি ততই ভালো লাগে

  দেলওয়ার হোসেন সেলিম, ফ্রান্স থেকে  

৩০ এপ্রিল ২০২১, ২২:২১:০৮  |  অনলাইন সংস্করণ

ফ্রান্সের শাঁতো দ্যু ভার্সাই বিশ্ববিখ্যাত একটি দুর্গ। একটি প্রাচীন রাজকীয় প্রাসাদ। এই প্যালেস অব ভার্সাইতে ফ্রান্সের রূপকার রাজারা বসবাস করেছিলেন। তাদের মধ্যে কিং লুই চতুর্দশ, চার্লস এক্স, লুই ফিলিপ, নেপোলিয়ানের নাম উল্লেখযোগ্য।
১৬৮২ থেকে ১৭৮৯ সাল পর্যন্ত ফ্রান্সের রাজধানী ছিল ভার্সাইয়ে।

ফরাসি সম্রাট ত্রয়োদশ লুই সর্বপ্রথম ১৬২৩ খ্রিস্টাব্দে ইট ও পাথর দিয়ে ভার্সাইয়ে একটি হান্টিং লজ নির্মাণ করেন। সেটিই ছিল শাঁতো দ্যু ভার্সাইর সূচনা। এরই ধারাবাহিকতায় ফরাসি নৃপতি লুই চতুর্দশ নিজের বাস ভবন হিসেবে বিশাল প্রাসাদ ও উদ্যান বানান। ১৬৭৭ খ্রিস্টাব্দে প্রাসাদের নির্মাণ কাজ পূর্ণতা পায়। এরপর ফরাসি বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে শাঁতো দ্যু ভার্সাইকে আরো সুন্দর এবং পরিপূর্ণ করা হয় নতুন ডিজাইনার দিয়ে। পরে ইউরোপের অন্যান্য শাসকগণ তাদের নিজস্ব "ভার্সাই" নির্মাণের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ফরাসি সম্রাটের বাস ভবনটি হয়ে যায় পৃথিবীখ্যাত রাজপ্রাসাদ।

বিশাল আয়তনের মনোরম পরিবেশে অবস্থিত ঐতিহাসিক এই রাজপ্রাসাদ দেখতে প্রতিদিন দেশি-বিদেশি অসংখ্য পর্যটক ভিড় জমান। বছরে প্রায় ১ কোটি পর্যটক এই রাজপ্রাসাদ পরিদর্শনে আসেন বলে জানা গেছে। বৈশ্বিক মমহামারি করোনাভাইরাস, লকডাউনের কারণে এখন আর আগের মতো পর্যটকদের ভিড় জমছে না। এর মাঝেই যখন দর্শণার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়, তখন স্বাস্থ্যবিধি মেনে এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে অসংখ্য ভ্রমণ পিপাসু, ইতিহাসপ্রেমী, সৌখিন মানুষের ঢল যেন থামছে না! কেউ কেউ যদি রাজপ্রাসাদের ভেতরে প্রবেশ করতে না পারেন, তাহলে এর বাহিরের বিশাল বাগান এলাকায়, লেকগুলোর পাড়ে রিলাক্স করছেন প্রাকৃতিক মনোরম পরিবেশে। কেউবা ব্যায়াম, জগিং, হাঁটাচলা করছেন ঘণ্টাব্যাপী।

প্যারিস গারদ্যু নর্দ এরিয়া থেকে মাত্র ২১ কিলোমিটার দূরত্বে শাঁতো দ্যু ভার্সাই অবস্থিত। ইউনাইটেড ন্যাশন্স এডুকেশন, সাইন্স অ্যান্ড কালচারাল অর্গানাইজেশন (ইউনেস্কো) কর্তৃক স্বীকৃত ও প্রণীত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্হান হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে প্যালেস অ্যান্ড পার্ক অব ভার্সাই।

ভার্সাই শহরটি অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। এখানে রয়েছে বড় প্রশস্ত- সোজাসুজি রাস্তা। সারি সারি গাছ গাছালি আর ফুল ফলের সমারোহ। গাছগুলোর ডাল-পাতা আধুনিক ডিজাইনে চুলের মতো সুন্দর করে কেটে রাখা হয়। এখানকার সবকিছুই সাজানো গোছানো। প্রাচীন হাট বাজার, পৌরসভা, অফিস, আদালত, পুলিশ স্টেশন, হাসপাতাল, ইউনিভার্সিটিসহ গোটা ভার্সাই নগরের সবই পর্যটকদের আকর্যণীয়। এখানে কয়েকটি ফরাসি সেবামূলক অ্যাসোসিয়েশন নিয়মিত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ভার্সাই শহরটি ইলদ্যু ফঁস অঞ্চলের দেজ ইউভলিন ডিপার্টমেন্টের অন্তর্ভুক্ত একটি পর্যটন ও ঐতিহ্যবাহী এরিয়া। ফ্রান্সের অর্থনৈতিক স্বচ্ছল এবং সেবামুলক কার্যক্রমের জন্যে ভার্সাই শহরের সুনাম সুখ্যাতি রয়েছে। ভার্সাই রাজপ্রাসাদের চোখ ধাঁধাঁনো মনুমেন্ট স্মৃতিস্তম্বের ঐতিহাসিক রাজকীয় চরিত্রগুলোর উপস্থিতি চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না কতই সুন্দর!

শাঁতো দ্যু ভার্সাইয়ে রাজকীয় ফটকের ভিতরে মস্ত বড় এক প্রাঙ্গণকে তিন দিকে ঘিরে চওড়া কাঁধ বলশালী পুরুষের মতো সামনে দু'হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল ইমারত। ইমারতের ঠিক মাঝে ফঁতেনব্লোর পরিচয় চিহ্ন হয়ে যাওয়া সেই বিখ্যাত অশ্বক্ষুরাকৃতি সিড়ি। দু'ধারে যেন উইম্বলডনের চারটে সেন্টার কোর্ট। উপমাটা লাগসই। কারণ এইসব প্রাসাদেই ফরাসী রাজারা টেনিস খেলার উদ্ভব করেছিলেন। যাজকদের আশ্রম ভেঙ্গে নির্মিত পশ্চিমের এই ইমারতটির পিছনে আরও পুর্বে আছে শিকার গৃহ, মূল প্রাসাদ। মাঝে যোগসূত্র আড়াই শত ফুট লম্বা খিলান যুক্ত এক অলিন্দ। যার একতলার স্নাগারে ফ্রান্সিস নিভৃতে উপভোগ করতেন বিখ্যাত চিত্র শিল্পী লিও নার্দোর লা জোকন্ডা অর্থাৎ মোনালিসার সান্নিধ্য। দোতলায় তৈরি হয় রেসো, প্রিম্যাতিচ্ছের নতুন ধরনের ছবিতে সাজানো ফরাসী রেনেসাঁর আদি নিদর্শন বলে খ্যাত ফ্রান্সিস গ্যালারি। পুর্বমুখি মুল প্রাসাদের বাহিরের অংশে শুধুমাত্র কিছু করিন্তিয়ান ঢং-এর কলাম আর কলোনেড। এটি সোনার পাথে বাঁধানো আর্চ করা জানালা আর খাজকাটা ইটের পিল্যাস্টার। এই বহুভুজ সুবিশাল প্রাসাদকে ঘিরে দীঘি, ফোয়ারা, জলপথ, বাগান, গাছপালা, ফুল ফল, বিস্তৃত উদ্যান। আর প্রাসাদের সামনে উচুঁ একটি ঘোড়ার মুর্তির উপরে বানানো হয়েছে কিং লুই চতুর্দশের মুর্তি। দেখে মনে হয় বিশ্বনন্দিত রাজপ্রাসাদটি দেখতে আসা অসংখ্য পর্যটকদের তিনি স্বাগতম ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন।

বহু মূল্যবান মার্বেল, সোনা, রুপার পাথে ঘেরা নানান দুষ্প্রাপ্য শিল্প সম্ভার, ঝকঝকে ছবি, নজরকাড়া মুর্তি আর রকমারি আলোকসজ্জা দিয়ে প্রাসাদের ঘরগুলো নান্দনিক সৌন্দর্য্যে ভরপুর। যা দেখে অনুভব করা যায় রাজা রানিদের নিত্যদিনের আরাম আয়েশের কাহিনি। ক্যাথলিক ধর্ম রাজাদের জীবনযাত্রার কতখানি জুড়ে ছিল। তা বোঝা যায় প্রাসাদের প্রধান চ্যাপেল ট্রিনিটির জমকালো অন্দরসজ্জায়। রাজা, রানিসহ তাদের সন্তানদের এবং আত্মীয়-স্বজনদের পৃথক পৃথক সুরম্য অট্টালিকা। ভার্সাই প্রাসাদে মোট কক্ষের সংখ্যা ১ হাজার ৮ শতটি। ক্যাসল স্হাপত্য সাদৃশ্য, প্রাচীন রাজকীয় এই বাসভবনের আয়তন প্রায় ৮ হাজার স্কয়ার হেক্টর। এর আশ পাশে ও আন্ডারগ্রাউন্ড জুড়ে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী স্হাপনা। বিশাল আয়তনের নয়নাভিরাম গার্ডেন ও পার্ক, লেক, ঝরণা সমুহের পাশে ঘুরতে গিয়ে পথ হারিয়ে যেতে পারেন। তাই শাঁতো দ্যু ভার্সাইর ভ্রমণ ম্যাপ সাথে রাখলে ভালো হয়।

শাঁতো দ্যু ভার্সাইয়ে যা দেখার আছে
প্লেস দ্য আর্ম, কর্টয়ার্ড অব অনার, রয়্যাল কর্টয়ার্ড, মার্বেল কর্টয়ার্ড, নর্থ উইং, সাউথ উইং, মিনিস্টার্স নর্থ উইং, মিনিস্টার সাউথ উইং, এপোলো ফন্টিন, ইনসালাডস গ্রোভ, কিংস গার্ডেন, চেষ্টনট থ্রিজ রুম, কলনেড গ্রোভ, ডম্স গ্রোভ, মিরর ফন্টিন, গ্রিন কার্পেট, জিরান্ডাল গ্রোভ, ডফিন্স গ্রোভ, লেঠোনা ফন্টিন এন্ড পারটের, বেলরুম, এপোলো বাথ্স গ্রোভ, ওয়াটার পারটের, থ্রি ফন্টিন, নেপচুন ফন্টিন, ড্রাগন ফন্টিন, ওরান্জেরি, সাউথ পারটের, নর্থ পারটের, ট্রায়ামফল আর্কশ গ্রোভ, সেটার্ন ফন্টিন, বাকাস ফন্টিন, কুইন্স গ্রোভ, অবলিস্ক গ্রোভ, ফ্লোরা ফন্টিন, স্টার ফন্টিন, সেরিজ ফন্টিন, ওয়াটার ওর মারমুসেট্ ওয়াক, নেম্পস বাথ, পিরামিড, ডাউন ফন্টিন, নাইট ফন্টিন, ওয়াটার থিয়েটার গ্রোভ, চ্যাপেল, ফ্রেন্চ গার্ডেন, ফ্রেন্চ পাভিলিয়ন, কুইন্স থিয়েটার, রক, বিউদুয়া, কেটালপাস ক্লিয়ারিং, যিশু গার্ডেন, লেন্ডস্কেপ গার্ডেন, টেম্পল অব লাভ, কুইন্স হাউজ, মার্লবুরুজ টাওয়ার, রেফরেশমেন্ট ডেইরি, মিল, বদুয়ার, ওয়ার্মিং রুম, ফার্ম, হর্সেস ফন্টিন, বটম ফন্টিন, ওয়াটার সাইড বোর্ড, অ্যাম্ফিথিয়েটার, গ্রিন গ্রোভ, যিসূ প্যাভিলিয়ন, লাশাপেল, রয়্যাল অপেরা ইত্যাদি।
ভার্সাই শহরে আমাদের বাংলাদেশের বাঙালি কবি মাইকেল মধুসুদন দত্ত বসবাস করেছিলেন। ভার্সাইর বিশ্ব নন্দিত রাজপ্রাসাদ ও নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কবির জন্য ছিলো উপরি পাওয়া। তাই প্রায়ই অনাহারে, অর্ধাহারে কাটানো চরম দুর্দশার মধ্যেও ভার্সাইয়ে বসে মহা কবি মধুসুদন রচনা করতে পেরেছিলেন তাঁর বিখ্যাত চতুর্দশপদী কবিতা (সনেট)। কালজয়ী কবিতাটি প্রথমে ইন্ডিয়ার কোলকাতায় রচিত হলেও পরে ভার্সাইয়ে তিনি কবিতাটি নতুন করে লিখেছিলেন। প্রিয় কবির সেই কবিতাটি এখানে উল্লেখ করছি।
ভার্সাইয়ে যেভাবে আসা যাবে

প্যারিস অস্টারলিজ হতে ট্রেন লাইন আরইআর "সি" যোগে ভার্সাই শাঁতো রিভঘোশ স্টেশনে নামতে হবে। প্যারিস মনটপারনাস হতে ট্রেন লাইন "এন" যোগে ভার্সাই শন্তির স্টেশনে নামতে হবে। প্যারিস সেন্ট লেজার হতে লাইন "এল" যোগে ভার্সাই রিভদ্রোয়াত স্টেশনে নামতে হবে। এছাড়া ফ্রান্সের যেকোনো এরিয়া থেকে অটো বাস, ট্যাক্সি যোগেও ভার্সাইয়ে আসতে পারবেন। প্যারিসের জিরো পয়েন্ট গার দ্যু নর্দ হতে ভার্সাইয়ে আসতে সময় লাগবে মাত্র ২০ থেকে ৪০ মিনিট।

শাঁতো দ্যু ভার্সাই: যত দেখি ততই ভালো লাগে

 দেলওয়ার হোসেন সেলিম, ফ্রান্স থেকে 
৩০ এপ্রিল ২০২১, ১০:২১ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

ফ্রান্সের শাঁতো দ্যু ভার্সাই বিশ্ববিখ্যাত একটি দুর্গ। একটি প্রাচীন রাজকীয় প্রাসাদ। এই প্যালেস অব ভার্সাইতে ফ্রান্সের রূপকার রাজারা বসবাস করেছিলেন। তাদের মধ্যে কিং লুই চতুর্দশ, চার্লস এক্স, লুই ফিলিপ, নেপোলিয়ানের নাম উল্লেখযোগ্য।
১৬৮২ থেকে ১৭৮৯ সাল পর্যন্ত ফ্রান্সের রাজধানী ছিল ভার্সাইয়ে।

ফরাসি সম্রাট ত্রয়োদশ লুই সর্বপ্রথম ১৬২৩ খ্রিস্টাব্দে ইট ও পাথর দিয়ে ভার্সাইয়ে একটি হান্টিং লজ নির্মাণ করেন। সেটিই ছিল শাঁতো দ্যু ভার্সাইর সূচনা। এরই ধারাবাহিকতায় ফরাসি নৃপতি লুই চতুর্দশ নিজের বাস ভবন হিসেবে বিশাল প্রাসাদ ও উদ্যান বানান। ১৬৭৭ খ্রিস্টাব্দে প্রাসাদের নির্মাণ কাজ পূর্ণতা পায়। এরপর ফরাসি বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে শাঁতো দ্যু ভার্সাইকে আরো সুন্দর এবং পরিপূর্ণ করা হয় নতুন ডিজাইনার দিয়ে। পরে ইউরোপের অন্যান্য শাসকগণ তাদের নিজস্ব "ভার্সাই" নির্মাণের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ফরাসি সম্রাটের বাস ভবনটি হয়ে যায় পৃথিবীখ্যাত রাজপ্রাসাদ।

বিশাল আয়তনের মনোরম পরিবেশে অবস্থিত ঐতিহাসিক এই রাজপ্রাসাদ দেখতে প্রতিদিন দেশি-বিদেশি অসংখ্য পর্যটক ভিড় জমান। বছরে প্রায় ১ কোটি পর্যটক এই রাজপ্রাসাদ পরিদর্শনে আসেন বলে জানা গেছে। বৈশ্বিক মমহামারি করোনাভাইরাস, লকডাউনের কারণে এখন আর আগের মতো পর্যটকদের ভিড় জমছে না। এর মাঝেই যখন দর্শণার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়, তখন স্বাস্থ্যবিধি মেনে এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে অসংখ্য ভ্রমণ পিপাসু, ইতিহাসপ্রেমী, সৌখিন মানুষের ঢল যেন থামছে না! কেউ কেউ যদি রাজপ্রাসাদের ভেতরে প্রবেশ করতে না পারেন, তাহলে এর বাহিরের বিশাল বাগান এলাকায়, লেকগুলোর পাড়ে রিলাক্স করছেন প্রাকৃতিক মনোরম পরিবেশে। কেউবা ব্যায়াম, জগিং, হাঁটাচলা করছেন ঘণ্টাব্যাপী।

প্যারিস গারদ্যু নর্দ এরিয়া থেকে মাত্র ২১ কিলোমিটার দূরত্বে শাঁতো দ্যু ভার্সাই অবস্থিত। ইউনাইটেড ন্যাশন্স এডুকেশন, সাইন্স অ্যান্ড কালচারাল অর্গানাইজেশন (ইউনেস্কো) কর্তৃক স্বীকৃত ও প্রণীত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্হান হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে প্যালেস অ্যান্ড পার্ক অব ভার্সাই।

ভার্সাই শহরটি অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। এখানে রয়েছে বড় প্রশস্ত- সোজাসুজি রাস্তা। সারি সারি গাছ গাছালি আর ফুল ফলের সমারোহ। গাছগুলোর ডাল-পাতা আধুনিক ডিজাইনে চুলের মতো সুন্দর করে কেটে রাখা হয়। এখানকার সবকিছুই সাজানো গোছানো। প্রাচীন হাট বাজার, পৌরসভা, অফিস, আদালত, পুলিশ স্টেশন, হাসপাতাল, ইউনিভার্সিটিসহ গোটা ভার্সাই নগরের সবই পর্যটকদের আকর্যণীয়। এখানে কয়েকটি ফরাসি সেবামূলক অ্যাসোসিয়েশন নিয়মিত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ভার্সাই শহরটি ইলদ্যু ফঁস অঞ্চলের দেজ ইউভলিন ডিপার্টমেন্টের অন্তর্ভুক্ত একটি পর্যটন ও ঐতিহ্যবাহী এরিয়া। ফ্রান্সের অর্থনৈতিক স্বচ্ছল এবং সেবামুলক কার্যক্রমের জন্যে ভার্সাই শহরের সুনাম সুখ্যাতি রয়েছে। ভার্সাই রাজপ্রাসাদের চোখ ধাঁধাঁনো মনুমেন্ট স্মৃতিস্তম্বের ঐতিহাসিক রাজকীয় চরিত্রগুলোর উপস্থিতি চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না কতই সুন্দর! 

শাঁতো দ্যু ভার্সাইয়ে রাজকীয় ফটকের ভিতরে মস্ত বড় এক প্রাঙ্গণকে তিন দিকে ঘিরে চওড়া কাঁধ বলশালী পুরুষের মতো সামনে দু'হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল ইমারত। ইমারতের ঠিক মাঝে ফঁতেনব্লোর পরিচয় চিহ্ন হয়ে যাওয়া সেই বিখ্যাত অশ্বক্ষুরাকৃতি সিড়ি। দু'ধারে যেন উইম্বলডনের চারটে সেন্টার কোর্ট। উপমাটা লাগসই। কারণ এইসব প্রাসাদেই ফরাসী রাজারা টেনিস খেলার উদ্ভব করেছিলেন। যাজকদের আশ্রম ভেঙ্গে নির্মিত পশ্চিমের এই ইমারতটির পিছনে আরও পুর্বে আছে শিকার গৃহ, মূল প্রাসাদ। মাঝে যোগসূত্র আড়াই শত ফুট লম্বা খিলান যুক্ত এক অলিন্দ। যার একতলার স্নাগারে ফ্রান্সিস নিভৃতে উপভোগ করতেন বিখ্যাত চিত্র শিল্পী লিও নার্দোর লা জোকন্ডা অর্থাৎ মোনালিসার সান্নিধ্য। দোতলায় তৈরি হয় রেসো, প্রিম্যাতিচ্ছের নতুন ধরনের ছবিতে সাজানো ফরাসী রেনেসাঁর আদি নিদর্শন বলে খ্যাত ফ্রান্সিস গ্যালারি। পুর্বমুখি মুল প্রাসাদের বাহিরের অংশে শুধুমাত্র কিছু করিন্তিয়ান ঢং-এর কলাম আর কলোনেড। এটি সোনার পাথে বাঁধানো আর্চ করা জানালা আর খাজকাটা ইটের পিল্যাস্টার। এই বহুভুজ সুবিশাল প্রাসাদকে ঘিরে দীঘি, ফোয়ারা, জলপথ, বাগান, গাছপালা, ফুল ফল, বিস্তৃত উদ্যান। আর প্রাসাদের সামনে উচুঁ একটি ঘোড়ার মুর্তির উপরে বানানো হয়েছে কিং লুই চতুর্দশের মুর্তি। দেখে মনে হয় বিশ্বনন্দিত রাজপ্রাসাদটি দেখতে আসা অসংখ্য পর্যটকদের তিনি স্বাগতম ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন।

বহু মূল্যবান মার্বেল, সোনা, রুপার পাথে ঘেরা নানান দুষ্প্রাপ্য শিল্প সম্ভার, ঝকঝকে ছবি, নজরকাড়া মুর্তি আর রকমারি আলোকসজ্জা দিয়ে প্রাসাদের ঘরগুলো নান্দনিক সৌন্দর্য্যে ভরপুর। যা দেখে অনুভব করা যায় রাজা রানিদের নিত্যদিনের আরাম আয়েশের কাহিনি। ক্যাথলিক ধর্ম রাজাদের জীবনযাত্রার কতখানি জুড়ে ছিল। তা বোঝা যায় প্রাসাদের প্রধান চ্যাপেল ট্রিনিটির জমকালো অন্দরসজ্জায়। রাজা, রানিসহ তাদের সন্তানদের এবং আত্মীয়-স্বজনদের পৃথক পৃথক সুরম্য অট্টালিকা। ভার্সাই প্রাসাদে মোট কক্ষের সংখ্যা ১ হাজার ৮ শতটি। ক্যাসল স্হাপত্য সাদৃশ্য, প্রাচীন রাজকীয় এই বাসভবনের আয়তন প্রায় ৮ হাজার স্কয়ার হেক্টর। এর আশ পাশে ও আন্ডারগ্রাউন্ড জুড়ে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী স্হাপনা। বিশাল আয়তনের নয়নাভিরাম গার্ডেন ও পার্ক, লেক, ঝরণা সমুহের পাশে ঘুরতে গিয়ে পথ হারিয়ে যেতে পারেন। তাই শাঁতো দ্যু ভার্সাইর ভ্রমণ ম্যাপ সাথে রাখলে ভালো হয়।

শাঁতো দ্যু ভার্সাইয়ে যা দেখার আছে
প্লেস দ্য আর্ম, কর্টয়ার্ড অব অনার, রয়্যাল কর্টয়ার্ড, মার্বেল কর্টয়ার্ড, নর্থ উইং, সাউথ উইং, মিনিস্টার্স নর্থ উইং, মিনিস্টার সাউথ উইং, এপোলো ফন্টিন, ইনসালাডস গ্রোভ, কিংস গার্ডেন, চেষ্টনট থ্রিজ রুম, কলনেড গ্রোভ, ডম্স গ্রোভ, মিরর ফন্টিন, গ্রিন কার্পেট, জিরান্ডাল গ্রোভ, ডফিন্স গ্রোভ, লেঠোনা ফন্টিন এন্ড পারটের, বেলরুম, এপোলো বাথ্স গ্রোভ, ওয়াটার পারটের, থ্রি ফন্টিন, নেপচুন ফন্টিন, ড্রাগন ফন্টিন, ওরান্জেরি, সাউথ পারটের, নর্থ পারটের, ট্রায়ামফল আর্কশ গ্রোভ, সেটার্ন ফন্টিন, বাকাস ফন্টিন, কুইন্স গ্রোভ, অবলিস্ক গ্রোভ, ফ্লোরা ফন্টিন, স্টার ফন্টিন, সেরিজ ফন্টিন, ওয়াটার ওর মারমুসেট্ ওয়াক, নেম্পস বাথ, পিরামিড, ডাউন ফন্টিন, নাইট ফন্টিন, ওয়াটার থিয়েটার গ্রোভ, চ্যাপেল, ফ্রেন্চ গার্ডেন, ফ্রেন্চ পাভিলিয়ন, কুইন্স থিয়েটার, রক, বিউদুয়া, কেটালপাস ক্লিয়ারিং, যিশু গার্ডেন, লেন্ডস্কেপ গার্ডেন, টেম্পল অব লাভ, কুইন্স হাউজ, মার্লবুরুজ টাওয়ার, রেফরেশমেন্ট ডেইরি, মিল, বদুয়ার, ওয়ার্মিং রুম, ফার্ম, হর্সেস ফন্টিন, বটম ফন্টিন, ওয়াটার সাইড বোর্ড, অ্যাম্ফিথিয়েটার, গ্রিন গ্রোভ, যিসূ প্যাভিলিয়ন, লাশাপেল, রয়্যাল অপেরা ইত্যাদি।
ভার্সাই শহরে আমাদের বাংলাদেশের বাঙালি কবি মাইকেল মধুসুদন দত্ত বসবাস করেছিলেন। ভার্সাইর বিশ্ব নন্দিত রাজপ্রাসাদ ও নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কবির জন্য ছিলো উপরি পাওয়া। তাই প্রায়ই অনাহারে, অর্ধাহারে কাটানো চরম দুর্দশার মধ্যেও ভার্সাইয়ে বসে মহা কবি মধুসুদন রচনা করতে পেরেছিলেন তাঁর বিখ্যাত চতুর্দশপদী কবিতা (সনেট)। কালজয়ী কবিতাটি প্রথমে ইন্ডিয়ার কোলকাতায় রচিত হলেও পরে ভার্সাইয়ে তিনি কবিতাটি নতুন করে লিখেছিলেন। প্রিয় কবির সেই কবিতাটি এখানে উল্লেখ করছি।
ভার্সাইয়ে যেভাবে আসা যাবে

প্যারিস অস্টারলিজ হতে ট্রেন লাইন আরইআর "সি" যোগে ভার্সাই শাঁতো রিভঘোশ স্টেশনে নামতে হবে। প্যারিস মনটপারনাস হতে ট্রেন লাইন "এন" যোগে ভার্সাই শন্তির স্টেশনে নামতে হবে। প্যারিস সেন্ট লেজার হতে লাইন "এল" যোগে ভার্সাই রিভদ্রোয়াত স্টেশনে নামতে হবে। এছাড়া ফ্রান্সের যেকোনো এরিয়া থেকে অটো বাস, ট্যাক্সি যোগেও ভার্সাইয়ে আসতে পারবেন। প্যারিসের জিরো পয়েন্ট গার দ্যু নর্দ হতে ভার্সাইয়ে আসতে সময় লাগবে মাত্র ২০ থেকে ৪০ মিনিট।
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন