তুরস্কে রমজান এবং ইফতার
jugantor
তুরস্কে রমজান এবং ইফতার

  সরোয়ার আলম, আঙ্কারা, তুরস্ক থেকে  

০৩ মে ২০২১, ২৩:০৬:৪৯  |  অনলাইন সংস্করণ

যদিও গত বছরের মত এ বছরও তুর্কিরা রমজান পালন করছে ঘরে বসেই। এ বছরও রমজানে নেই সেই পুরাতন আমেজ আর উৎসাহ। তবু তুরস্কের রমজান নিয়ে কিছু লিখতেই হয়।

তুরস্কে প্রতি বছর রমজানকে স্বাগত জানাতে ব্যানার-ফেস্টুনে বিভিন্ন অভিবাদনমূলক বাক্য লিখে রাস্তার মোড়ে মোড়ে, বাসার জানালায় টাঙানো হয়। পুরো রমজানে তুরস্কজুড়ে বিরাজ করে রোজা পালনের এক মহা উৎসব।

ঘরে-বাইরে সর্বত্র শোনা যায় অভিনন্দন; ‘রমজানের শুভেচ্ছা, রমজান মুবারাক, আপনার জন্য রমজান কল্যাণময় হোক। শিশুরা প্রথম রোজা রাখলে সে ঘরে তার জন্য স্পেশাল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। দাদা-দাদি, নান-নানিরা ওই শিশুকে উপহার দিয়ে খুশি করেন।

তবে তুরস্কের রমজান এবং ঈদ আমাদের রমজান এবং ঈদের থেকে অনেকটাই ভিন্ন।

এখানে রমজানের চাঁদ দেখা হয় না। চাঁদ দেখার যে আনন্দ, যে উৎসব সেই আমেজ তুর্কিদের মধ্যে নেই। কারণ এখানে অনেক আগে থেকেই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যাবহার করে চাঁদ উঠার দিনক্ষণ নির্ধারণ করা হয়।

তবে দেশটিতে রোজাদারের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। ২০১৯ সালে অপটিমার নামক এক গবেষণা সংস্থার পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে তুরস্কের প্রায় ৪০ ভাগ লোক নিয়মিত নামাজ পরে এবং ৬৬ ভাগ লোক নিয়মিত রোজা রাখে। আর তুরস্কের ধর্ম বিষয়ক সরকারি সংস্থা দিয়ানেতের ২০১৩ সালের এক জরিপে দেখা গেছে দেশটির ৯৯.২ ভাগ মানুষ ইসলাম ধর্মের অনুসারী। সে জরিপ অনুযায়ী দেশটির ৭৫ ভাগ মানুষ জুমার নামাজ পরে। আর ৮৩.৫ ভাগ মানুষ রোজা রাখে।

এখানে রমজানে মসজিদগুলো সাজে অন্যরকম সাজে। তুরস্ক হল মসজিদের দেশ। ৮৫ মিলিয়ন জনসংখ্যার এ দেশটিতে মসজিদ আছে প্রায় ৮৫ হাজারেরও বেশি। সব এলাকায়, মহল্লায়, গ্রামে, গঞ্জে বিশাল বিশাল উচু মিনারের মসজিদ। রমজানে মজসিদের মিনার গুলকে আলোকসজ্জা দিয়ে সজ্জিত করা হয়। আলোকরশ্মিতে লেখা হয় রমজান সম্পর্কিত বিভিন্ন বানী, হাদিস, আয়াত। মানুষের বিপুল উপস্থিতির কারণেই এ মাসে মসজিদগুলো হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ ও তারাবির নামাজে থাকে ছোট-বড় সবার স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি।এখানে উসমানীয় ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে এখনও অনেক এলাকায় তোপধ্বনি দিয়ে ইফতারের সংকেত দেওয়া হয়।

তুর্কিরা কী দিয়ে ইফতার করে

তুর্কিরা ইফতার খেজুর দিয়ে শুরু করে। ইফতারের আরও থাকে বিভিন্ন ধরনের ফল, জয়তুন, পনির ও মিষ্টি। যুগ যুগ ধরে চলে আসা আরেকটি খাবার আছে যা তুর্কিদের ইফতারের মেন্যুর অবিচ্ছেদ্য অংশ তা হলো পিদে- এটি বিশাল এক রুটি যা শুধু রমজানে মাসেই স্পেশাল করে তৈরি করা হয়। তাই এটিকে রামাজান পিদে বা রমজানের পিঠা বলা হয়। ইফতারের আগে আগে এই পিঠা কিনতে রুটির দোকানের সামনে বিশাল লাইন দেখা যায়। তুর্কিদের আরও একটি বিশেষ আকর্ষণ হলও রমজানের স্পেশাল মিষ্টি নাম তার ‘’গুল্লাচ’’।

এখানে ইফতারিতে বুট-মুড়ি, বেগুনি, আলুর চপ, পেঁয়াজু, জিলেপি এগুলো পাওয়া যায় না। এরা ইফতারে আমাদের মত এরকম ভাজাপোড়া খায় না। এরা বাংলাদেশের মতো ইফতার এবং রাতের খাবার ভিন্ন ভিন্নভাবে খায় না। অর্থাৎ এক বসাতেই ইফতার এবং রাতের খাবার খেয়ে মাগরিবের নামাজ আদায় করে।

সেহেরীতে তুর্কিরা সকালের নাস্তায় যে খাবার খায় সেগুলোই খায়। যেমন রুটি, পনির, মধু, বাটার, সসিস, জয়তুন, শসা টমেটো ডিম, চা, ইত্যাদি। আমাদের মত ভারী খাবার বা মশলাযুক্ত খাবার এরা সেহেরীতে খায় না। আর চা না হলে তো এদের পেটের খাবার হজমই হয় না।

ইবাদত

রমজানে এখানেও মানুষের মধ্যে ইবাদতের পরিমান বেড়ে যায়। অনেকেই কুরআন খতম দেওয়ার চেষ্টা করেন। আছরের নামাজের পরে এবং ফজরের নামাজের পূর্বে এখানে মসজিদে মসজিদে একত্রে কুরআন পড়ার আসর বসে।ইমাম বা মুয়াজ্জিন কুরআন পড়েন আর প্রচুর মানুষ গোল হয়ে বসে কুরআন থেকে সেই আয়াতগুলো মনে মনে পরে। এরা ২০ রাকাত তারাবীহ পরে। তবে খতম তারাবীহ খুব একটা দেখা যায় না।

অনেক সরকারি এবং বেসরকারি অফিসে রমজান মাসে অফিস কর্মঘণ্টা কমিয়ে দেওয়া হয়। আবার বেরোজদারদের জন্য অফিসের ডাইনিং এবং ক্যান্টিন খোলা থাকে। কেউ তাদেরকে কখনও জিজ্ঞেসও করবে না সে রোজা রাখছে না কেন?

রাস্তায় ইফতার

তুরস্কে এখানে মসজিদে ইফতার করার বা ইফতার দেওয়ার কোনো নিয়ম নেই। তবে স্ট্রিট ইফতার বা রাস্তায় ইফতার নামে এখানে অনেক পুরাতন একটি নিয়ম চালু আছে। মহল্লার সবাই, ছেলে, মেয়ে, স্ত্রী, পুত্র নিয়ে রাস্তায় গিয়ে একত্রে ইফতার করা। আমার সবচেয়ে প্রিয় ইফতার এই রাস্তার ইফতার।

প্রথম যখন তুরস্কে আসি তখন এই রাস্তার ইফতারে যেতে হীনমন্যতায় ভুগতাম। কিন্তু পরে দেখলাম যে ধনী গরিব সবাই এখানে ইফতার করে। সামাজিক ভেদাভেদ ভুলে এক টেবিলে বসে ইফতার করার এর চেয়ে বড় আর কী সুযোগ থাকতে পারে। বর্তমান সময় শহরের গুরুত্বপূর্ণ ময়দানে বিশাল তাবু গেড়ে, চেয়ার টেবিল বসিয়ে এই ইফতারের আয়োজন করা হয়। সিটি কর্পোরেশন, ওয়ার্ড কমিশনার, উপজেলা চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন সরকারি এবং বেসরকারি সংস্থা থেকে আয়োজন করা হয় ইফতারের।

যেসব জায়গায় এই ইফতারের আয়োজন করা হয় সেখানে থাকে উম্মুক্ত আলচনার জায়গা এবং স্টেজ। মাগরিবের নামাজের পরে ওখানে চলে, হামদ, নাত সহ বড় বড় প্রফেসর, আলেম, এবং ইসলামিক স্কলারদের সেমিনার। এছাড়াও শিশুদের জন্য থাকে বিভিন্ন ধরনের আনন্দ উপকরণ। পাশেই বসে বিশাল মেলা। রঙ-বেরঙের নানা রকম জিনিস বিক্রি হয় এই মেলায়। মাঝ রাত পর্যন্ত চলে এই আয়োজন। তুরস্কের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ তাদের নিজস্ব তৈরি জিনিসপত্র এখানে বিক্রি করতে নিয়ে আসে। লাইলাতুল কদরের আগের রাত পর্যন্ত প্রতিরাতেই চলে এই আয়োজন।

আমাদের মতই ২৬শে রমজান দিবাগত রাতে এখানে কদরের নামাজ আদায় করা হয় ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে। মসজিদগুলো কানায় কানায় পূর্ণ হয় তখন। তবে বাংলাদেশের মত কদরের রাতের পরের দিন এখানে কোন সরকারি বা বেসরকারি ছুটি থাকেনা।

রমাজানের শেষের দিকে বিভিন্ন এলাকায় মানুষ এতেকাফে বসে।

সবকিছু মিলিয়ে তুরস্কে রমজান পালন করা হয় ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনায় উৎসবের আমেজে। তাই তো ইউরপের এবং আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার হাজার লোক রমজান পালন করতে পুরো পরিবার নিয়ে এক মাসের জন্য তুরস্কে আসেন। তারা বড়বড় গুরুতপুরন মসজিদের পাশে পুরো রমজান মাস বাসা ভাড়া নিয়ে থাকেন।

তবে তুর্কিদের মধ্যে, টুপি পাগড়ি, লম্বা পাঞ্জাবি, পাজামা পড়ার কালচার নেই। তাই রমজানেও এখানে মানুষ টুপি পাঞ্জাবি পরে ঘুরে না। টিভিতে সংবাদ পাঠক বা পাঠিকারা ধর্মীয় পোশাক বা স্কার্ফ পরে না রমজানে। এখানে রমজানে খুবই ইন্টারেস্টিং একটি জিনিশ হচ্ছে ঢোল বাজানো। রাতে ঢোল পিটিয়ে সেহেরিতে জাগানোর রেওয়াজ আছে সেই উসমানীয় আমল থেকেই। সেহেরি প্রায় এক দেড় ঘণ্টা আগে থেকেই প্রতিটা মহল্লার ঢোলক অলি গলি ঘুরে ঘুরে ঢোল বাজান। এই ঢোলকরা সিটি কর্পোরেশন থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত। তবে রমজানের শেষে তারা মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে টাকা কালেকশনও করেন।


কিন্তু তুরস্ক একটি সেক্যুলার রাষ্ট্র। সেক্যুলারিজমের চরম দৃষ্টান্ত হচ্ছে এ মুসলিম দেশটি। এখানে রমজানেও চলে হোটেল রেস্তোরাঁতে চলে খাওয়া-দাওয়া আনন্দ ফুর্তি। মদের দোকান, পানশালা এবং নাইটক্লাবগুলোও খোলা থাকে রমজানে। রাস্তার ধারে বা পার্কে বসে মদের বোতল হাতে নিয়ে মদ খাওয়া, গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে অন্তরঙ্গ ঘুরাফেরা করলেও কেউ এসে বাধা দেয় না। এনিয়ে কারও কোন মাথা ব্যাথাও নেই। যে যার মত করে তার জীবন চালায় এবং ধর্ম পালন করে। এ নিয়ে নেই কোন বাড়াবাড়ি।

তুরস্কে রমজান এবং ইফতার

 সরোয়ার আলম, আঙ্কারা, তুরস্ক থেকে 
০৩ মে ২০২১, ১১:০৬ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

যদিও গত বছরের মত এ বছরও তুর্কিরা রমজান পালন করছে ঘরে বসেই।  এ বছরও রমজানে নেই সেই পুরাতন আমেজ আর উৎসাহ।  তবু তুরস্কের রমজান নিয়ে কিছু লিখতেই হয়।

তুরস্কে প্রতি বছর রমজানকে স্বাগত জানাতে ব্যানার-ফেস্টুনে বিভিন্ন অভিবাদনমূলক বাক্য লিখে রাস্তার মোড়ে মোড়ে, বাসার জানালায় টাঙানো হয়।  পুরো রমজানে তুরস্কজুড়ে বিরাজ করে রোজা পালনের এক মহা উৎসব।

ঘরে-বাইরে সর্বত্র শোনা যায় অভিনন্দন; ‘রমজানের শুভেচ্ছা, রমজান মুবারাক, আপনার জন্য রমজান কল্যাণময় হোক।  শিশুরা প্রথম রোজা রাখলে সে ঘরে তার জন্য স্পেশাল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।  দাদা-দাদি, নান-নানিরা ওই শিশুকে উপহার দিয়ে খুশি করেন।

তবে তুরস্কের রমজান এবং ঈদ আমাদের রমজান এবং ঈদের থেকে অনেকটাই ভিন্ন।

এখানে রমজানের চাঁদ দেখা হয় না। চাঁদ দেখার যে আনন্দ, যে উৎসব সেই আমেজ তুর্কিদের মধ্যে নেই। কারণ এখানে অনেক আগে থেকেই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যাবহার করে চাঁদ উঠার দিনক্ষণ নির্ধারণ করা হয়।

তবে দেশটিতে রোজাদারের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। ২০১৯ সালে অপটিমার নামক এক গবেষণা সংস্থার পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে তুরস্কের প্রায় ৪০ ভাগ লোক নিয়মিত নামাজ পরে এবং ৬৬ ভাগ লোক নিয়মিত রোজা রাখে। আর তুরস্কের ধর্ম বিষয়ক সরকারি সংস্থা দিয়ানেতের ২০১৩ সালের এক জরিপে দেখা গেছে দেশটির ৯৯.২ ভাগ মানুষ ইসলাম ধর্মের অনুসারী। সে জরিপ অনুযায়ী দেশটির ৭৫ ভাগ মানুষ জুমার নামাজ পরে। আর ৮৩.৫ ভাগ মানুষ রোজা রাখে।

এখানে রমজানে মসজিদগুলো সাজে অন্যরকম সাজে। তুরস্ক হল মসজিদের দেশ। ৮৫ মিলিয়ন জনসংখ্যার এ দেশটিতে মসজিদ আছে প্রায় ৮৫ হাজারেরও বেশি। সব এলাকায়, মহল্লায়, গ্রামে, গঞ্জে  বিশাল বিশাল উচু মিনারের মসজিদ। রমজানে মজসিদের মিনার গুলকে আলোকসজ্জা দিয়ে সজ্জিত করা হয়।  আলোকরশ্মিতে লেখা হয় রমজান সম্পর্কিত বিভিন্ন বানী, হাদিস, আয়াত। মানুষের বিপুল উপস্থিতির কারণেই এ মাসে মসজিদগুলো হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ ও তারাবির নামাজে থাকে ছোট-বড় সবার স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি।এখানে উসমানীয় ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে এখনও অনেক এলাকায় তোপধ্বনি দিয়ে ইফতারের সংকেত দেওয়া হয়।

তুর্কিরা কী দিয়ে ইফতার করে

তুর্কিরা ইফতার খেজুর দিয়ে শুরু করে।  ইফতারের আরও থাকে বিভিন্ন ধরনের ফল, জয়তুন, পনির ও মিষ্টি।  যুগ যুগ ধরে চলে আসা আরেকটি খাবার আছে যা তুর্কিদের ইফতারের মেন্যুর অবিচ্ছেদ্য অংশ তা হলো পিদে- এটি বিশাল এক রুটি যা শুধু রমজানে মাসেই স্পেশাল করে তৈরি করা হয়।  তাই এটিকে রামাজান পিদে বা রমজানের পিঠা বলা হয়।  ইফতারের আগে আগে এই পিঠা কিনতে রুটির দোকানের সামনে বিশাল লাইন দেখা যায়।  তুর্কিদের আরও একটি বিশেষ  আকর্ষণ হলও রমজানের স্পেশাল মিষ্টি  নাম তার ‘’গুল্লাচ’’।

এখানে ইফতারিতে বুট-মুড়ি, বেগুনি, আলুর চপ, পেঁয়াজু, জিলেপি এগুলো পাওয়া যায় না। এরা ইফতারে আমাদের মত এরকম ভাজাপোড়া খায় না।  এরা বাংলাদেশের মতো ইফতার এবং রাতের খাবার ভিন্ন ভিন্নভাবে খায় না।  অর্থাৎ এক বসাতেই ইফতার এবং রাতের খাবার খেয়ে মাগরিবের নামাজ আদায় করে।

সেহেরীতে তুর্কিরা সকালের নাস্তায় যে খাবার খায় সেগুলোই খায়। যেমন রুটি, পনির, মধু, বাটার, সসিস, জয়তুন, শসা টমেটো ডিম, চা, ইত্যাদি। আমাদের মত ভারী খাবার বা মশলাযুক্ত খাবার এরা সেহেরীতে খায় না। আর চা না হলে তো এদের পেটের খাবার হজমই হয় না।

ইবাদত

রমজানে এখানেও মানুষের মধ্যে ইবাদতের পরিমান বেড়ে যায়। অনেকেই কুরআন খতম দেওয়ার চেষ্টা করেন। আছরের নামাজের পরে এবং ফজরের নামাজের পূর্বে এখানে মসজিদে মসজিদে একত্রে কুরআন পড়ার আসর বসে।ইমাম বা মুয়াজ্জিন কুরআন পড়েন আর প্রচুর মানুষ গোল হয়ে বসে কুরআন থেকে সেই আয়াতগুলো মনে মনে পরে।  এরা ২০ রাকাত তারাবীহ পরে। তবে খতম তারাবীহ খুব একটা দেখা যায় না।

অনেক সরকারি এবং বেসরকারি অফিসে রমজান মাসে অফিস কর্মঘণ্টা কমিয়ে দেওয়া হয়।  আবার বেরোজদারদের জন্য অফিসের ডাইনিং এবং ক্যান্টিন খোলা থাকে। কেউ তাদেরকে কখনও জিজ্ঞেসও করবে না সে রোজা রাখছে না কেন?  

রাস্তায় ইফতার

তুরস্কে এখানে মসজিদে ইফতার করার বা ইফতার দেওয়ার কোনো নিয়ম নেই।  তবে স্ট্রিট ইফতার বা রাস্তায় ইফতার নামে এখানে অনেক পুরাতন একটি নিয়ম চালু আছে। মহল্লার সবাই, ছেলে, মেয়ে, স্ত্রী, পুত্র নিয়ে রাস্তায় গিয়ে একত্রে ইফতার করা। আমার সবচেয়ে প্রিয় ইফতার এই রাস্তার ইফতার।

প্রথম যখন তুরস্কে আসি তখন এই রাস্তার ইফতারে যেতে হীনমন্যতায় ভুগতাম। কিন্তু পরে দেখলাম যে ধনী গরিব সবাই এখানে ইফতার করে। সামাজিক ভেদাভেদ ভুলে এক টেবিলে বসে ইফতার করার এর চেয়ে বড় আর কী সুযোগ থাকতে পারে। বর্তমান সময় শহরের গুরুত্বপূর্ণ ময়দানে বিশাল তাবু গেড়ে, চেয়ার টেবিল বসিয়ে এই ইফতারের আয়োজন করা হয়। সিটি কর্পোরেশন, ওয়ার্ড কমিশনার, উপজেলা চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন সরকারি এবং বেসরকারি সংস্থা থেকে আয়োজন করা হয় ইফতারের।

যেসব জায়গায় এই ইফতারের আয়োজন করা হয় সেখানে থাকে উম্মুক্ত আলচনার জায়গা এবং স্টেজ। মাগরিবের নামাজের পরে ওখানে চলে, হামদ, নাত সহ বড় বড় প্রফেসর, আলেম, এবং ইসলামিক স্কলারদের সেমিনার। এছাড়াও শিশুদের জন্য থাকে বিভিন্ন ধরনের আনন্দ উপকরণ। পাশেই বসে বিশাল মেলা। রঙ-বেরঙের নানা রকম জিনিস বিক্রি হয় এই মেলায়। মাঝ রাত পর্যন্ত চলে এই আয়োজন। তুরস্কের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ তাদের নিজস্ব তৈরি জিনিসপত্র এখানে বিক্রি করতে নিয়ে আসে। লাইলাতুল কদরের আগের রাত পর্যন্ত প্রতিরাতেই চলে এই আয়োজন।

আমাদের মতই ২৬শে রমজান দিবাগত রাতে এখানে কদরের নামাজ আদায় করা হয় ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে। মসজিদগুলো কানায় কানায় পূর্ণ হয় তখন। তবে বাংলাদেশের মত কদরের রাতের পরের দিন এখানে কোন সরকারি বা বেসরকারি ছুটি থাকেনা।

রমাজানের শেষের দিকে বিভিন্ন এলাকায় মানুষ এতেকাফে বসে।

সবকিছু মিলিয়ে তুরস্কে রমজান পালন করা হয় ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনায় উৎসবের আমেজে। তাই তো ইউরপের এবং আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার হাজার লোক রমজান পালন করতে পুরো পরিবার নিয়ে এক মাসের জন্য তুরস্কে আসেন। তারা বড়বড় গুরুতপুরন মসজিদের পাশে পুরো রমজান মাস বাসা ভাড়া নিয়ে থাকেন। 

তবে তুর্কিদের মধ্যে, টুপি পাগড়ি, লম্বা পাঞ্জাবি, পাজামা পড়ার কালচার নেই।  তাই রমজানেও এখানে মানুষ টুপি পাঞ্জাবি পরে ঘুরে না। টিভিতে সংবাদ পাঠক বা পাঠিকারা ধর্মীয় পোশাক বা স্কার্ফ পরে না রমজানে।  এখানে রমজানে খুবই ইন্টারেস্টিং একটি জিনিশ হচ্ছে ঢোল বাজানো। রাতে ঢোল পিটিয়ে সেহেরিতে জাগানোর রেওয়াজ আছে সেই উসমানীয় আমল থেকেই।  সেহেরি প্রায় এক দেড় ঘণ্টা আগে থেকেই প্রতিটা মহল্লার ঢোলক অলি গলি ঘুরে ঘুরে ঢোল বাজান।  এই ঢোলকরা সিটি কর্পোরেশন থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত।  তবে রমজানের শেষে তারা মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে টাকা কালেকশনও করেন।

 
কিন্তু তুরস্ক একটি সেক্যুলার রাষ্ট্র। সেক্যুলারিজমের চরম দৃষ্টান্ত হচ্ছে এ মুসলিম দেশটি। এখানে রমজানেও চলে হোটেল রেস্তোরাঁতে চলে খাওয়া-দাওয়া আনন্দ ফুর্তি। মদের দোকান, পানশালা এবং নাইটক্লাবগুলোও খোলা থাকে রমজানে।  রাস্তার ধারে বা পার্কে বসে মদের বোতল হাতে নিয়ে মদ খাওয়া, গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে অন্তরঙ্গ ঘুরাফেরা করলেও কেউ এসে বাধা দেয় না।  এনিয়ে কারও কোন মাথা ব্যাথাও নেই।  যে যার মত করে তার জীবন চালায় এবং ধর্ম পালন করে। এ নিয়ে নেই কোন বাড়াবাড়ি।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : সরোয়ার আলমের লেখাসমূহ