তুরস্কের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক উন্নয়ন কি আদৌ সম্ভব?
jugantor
তুরস্কের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক উন্নয়ন কি আদৌ সম্ভব?

  সরোয়ার আলম, আঙ্কারা, তুরস্ক থেকে  

০৮ মে ২০২১, ২০:২১:২১  |  অনলাইন সংস্করণ

২০১৭ সালে নয়াদিল্লিতে তুরস্কের সঙ্গে ভারতের চুক্তি স্বাক্ষরের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগানের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি

তুরস্ক এবং ভারতের মধ্যের সম্পর্ক খারাপ হয় ২০১৯ সালে। যখন ভারতের নরেন্দ্র মোদী সরকার কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসনকে বাতিল করে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান তখন নিয়ে কড়া সমালোচনা করেন ভারতের। এরদোগান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদেও এ নিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন।

ফলে ২০১৯ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী তার পূর্বপরিকল্পিত তুরস্ক সফর বাতিল করেন এবং তুরস্কের সঙ্গে কয়েক বিলিয়ন ডলার মূল্যমানের নৌ-অস্ত্র চুক্তি স্থগিত করেন।

তুরস্ককে এক হাত দেখে নেওয়ার জন্য মাঠে নেমে পড়ে ভারতের মিডিয়া, কূটনীতিবিদ, সুশীল সমাজ, এবং গবেষণা সংস্থা।

ভারতীয় মিডিয়া প্রচার করতে থাকে তুরস্ক বিরোধী ফেইক নিউজ বা ভুয়া সংবাদ। এক্ষেত্রে তারা কয়েকটি কৌশল অবলম্বন করে।

১. দলিল প্রমাণ ছাড়া তুরস্ক বিরোধী বিভিন্ন ভুয়া আর্টিকেল প্রচার করে ভারত পরিচালিত নামকাওায়স্তে ওয়েবসাইটে।

২. ওই ভুয়া খবরকে পরবর্তীতে মেইনস্ট্রীম মিডিয়াতে ফলাও করে ছাপানো হয়।

৩. নামে-বেনামে তুরস্কের বিরুদ্ধে ব্ল্যাক প্রোপাগান্ডা ছড়ায়।

খবরগুলোর হেডলাইনে থাকে ইসলামফোবিয়ার রমরমা উপস্থিতি। আর টার্গেটে থাকেন এরদোগান, তার পরিবার এবং তুরস্কের সরকারি বেসরকারি সংস্থা। এই কাজে ভারত কাছে পায় গ্রীস, ইসরাইল, আর্মেনিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, আরব আমিরাত এমনকি সৌদি আরবকেও।

কাশ্মীরি এবং ভারতীয়দের তুরস্ক সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া শিক্ষা বৃত্তি নিয়েও নয়াদিল্লীর অভিযোগের শেষ নেই। তুরস্ক নাকি এগুলো দিয়ে জঙ্গি তৈরি করছে ভারতের মাটিতে!

এমনকি তুরস্কের গণমাধ্যমে কর্মরত কাশ্মীরি বা পাকিস্তানি সাংবাদিকদেরকেও বিভিন্নভাবে হয়রানি করে ভারতীয় মিডিয়া।

তুরস্কের বিরুদ্ধে ভারতের সাইবার এবং হাইব্রিড যুদ্ধ শুরু হয় ২০১৯ সালে। তখন একই সঙ্গেই মিডিয়া, গবেষণা সংস্থা, বিশেষজ্ঞ, কূটনীতিবিদ, সাবেক সরকারি এবং সামরিক অফিসার, গোয়েন্দা সংস্থা সব একত্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে তুরস্কের ওপর।

কারণ, পাকিস্তানের পরে মুসলিম বিশ্বের মধ্যে একমাত্র তুরস্কই কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্যাম্পেইন করে। কাশ্মীর নিয়ে ব্যাপক খবর প্রচার করে তুর্কি মিডিয়া। বাবরি মসজিদ ধ্বংস নিয়ে ভারতীয় আদালতের হাস্যকর সেই রায়েরও ব্যাপক সমালোচনা করে তুরস্ক এবং এর মিডিয়া।

তুরস্কের সমর্থনের কারণেই ভারত শত চেষ্টা করেও পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিক মানি লন্ডারিং সংস্থার কালো তালিকাভুক্ত করতে পারেনি। তুরস্কের কারণেই পাকিস্তান নৌবাহিনী পাচ্ছে অত্যাধুনিক যুদ্ধ জাহাজ।

তুরস্ক ২০১০ সালে ভারতকে না নিয়েই আফগানিস্তান শান্তি আলোচনার কমিটি গঠন করে। ২০১৬ সালে ভারতের নিউক্লিয়ার সাপ্লাইয়ারস গ্রুপের সদস্যপদ ব্লক করে দেয় আঙ্কারা।

অন্যদিকে ভারতের বিরুদ্ধে ছুঁড়ে দেওয়া হয় ২০১৬ সালে তুরস্কে সংঘটিত ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের সহযোগীদের সমর্থনের অভিযোগ। তুরস্কের শত অনুরোধ সত্ত্বেও এই অভ্যুত্থানের হোতা ফেতুল্লাহ গুলেন পরিচালিত স্কুল, থিংক ট্যাঙ্কগুলো বন্ধ করেনি ভারত। বরং সেগুলোকে তুরস্কের বিরুদ্ধে আরও ফুসলিয়ে দিয়েছে।

এছাড়াও ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সঙ্গে একত্র হয়ে তুরস্কে আস্তে আস্তে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা সক্রিয় হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন তুরস্কের বিভিন্ন সরকারি এবং বেসরকারি সংস্থায় কৌশলে ঢুকে পড়েছে বলেও অনেকের ধারণা।

ভারত-তুরস্কের সম্পর্কের ইতিহাস

২০১৮ সালের আগ পর্যন্ত তুরস্ক এবং ভারতের মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্ক বিরাজ করছিল। সম্পর্কের উত্থান-পতন হয়েছে। কিন্তু বর্তমানের মত এতো খারাপ পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

দুদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৪৮ সালে। কিন্তু তারপর ঠাণ্ডা যুদ্ধের সময় তুরস্ক ন্যাটো সদস্য হিসেবে আমেরিকান বলয়ে অবস্থান নেই — এবং ভারত সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষে অবস্থান নেয়।

১৯৬৫ সালের ইন্দো-পাকিস্তানি যুদ্ধে এবং ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধে তুরস্ক পাকিস্তানকে সমর্থন দেয়। অপরদিকে ১৯৭৪ সালে সাইপ্রাসে পরিচালিত তুরস্কের সামরিক অভিযানে ভারত জোরেশোরেই তুরস্কের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। এভাবে চলে আশির দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত।

এরপর সম্পর্ক উন্নত হয়। ১৯৮৬ সালে তুরস্কের তৎকালীন বিপুল জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী তুরগুত ওযাল ভারত সফর করেন। তার দুই বছর পর অর্থাৎ, ১৯৮৮ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধি তুরস্ক সফর করেন।

সম্পর্ক আরও উন্নত ২০০০ সালে যখন তুরস্কের সংখ্যালঘু কোয়ালিশন সরকারের প্রধান, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বুলেন্ত এজেভিত ভারত সফরে যান এবং সেখানে তিনি কাশ্মীর নিয়ে ভারতের অবস্থানকে সমর্থন করেন। তখন তিনি পাকিস্তান সফর না করেই ফিরে আসেন। ফলশ্রুতিতে, নয়াদিল্লি যারপরনাই খুশি হয়। আর তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে মনোযোগ দেয়।

এরপর এরদোগান শাসনামলে ২০০৩ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ী তুরস্ক সফরে এসে অনেকগুলো চুক্তি করেন। ২০০৮ সালে এরদোগান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভারত সফর করেন।

২০১০ সালে তৎকালীন তুরস্কের রাষ্ট্রপতি আব্দুল্লাহ গুল ভারত সফর করেন। ২০১৭ সালে এরদোগান আবার ভারত সফর করেন।

২০১৩ সালে ভারতের প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জি তুরস্কে আসেন। ২০১৫ সালে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তুরস্কে আসেন। ২০১৯ সালেও তার আসার কথা ছিল কিন্তু পরে কাশ্মীর ইস্যুর কারণে বাতিল করেন।

ভারত-তুরস্কের বাণিজ্যিক সম্পর্ক

দুই দেশের বাণিজ্যিক ভলিউম ২০০০ সালে ৫০৫ মিলিয়ন ডলার থেকে ২০১৮ সালে এসে দাঁড়ায় প্রায় নয় বিলিয়ন (৮.৭ বিলিয়ন) ডলারে। এতে ভারতের ভাগ ৭.৫ বিলিয়ন ডলার এবং তুরস্কের ভাগ মাত্র ১.১ বিলিয়ন ডলার।

ভারত-তুরস্কের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়ন কি সম্ভব?

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দু দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠক করছেন এবং সুসম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার ইচ্ছা পোষণ করেছেন। ২৯ মার্চ তুরস্ক এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা তাজিকিস্তানের রাজধানীতে দেখা করছেন, বৈঠক করেছেন। সেখানে তারা অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক উন্নয়নের আশাবাদ ব্যাক্ত করেছেন। তার দুদিন আগে, ২৭ মার্চ, তুরস্কের রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা ফোনে কথা বলেছেন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার সঙ্গে । তখন ভারতে করোনা মহামারী মোকাবেলায় তুরস্ক সাহায্য পাঠানোরও ইচ্ছা পোষণ করে। যদিও তুরস্ক থেকে সাহায্য নিতে আগ্রহী না ভারত। তবে দুইও দেশ সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী এবং এ ব্যাপারে তারা ব্যাকচ্যানেল ডিপ্লোম্যাসি চালিয়ে যাচ্ছে বলে আমার বিশ্বাস।

দুদেশ কেন সম্পর্ক উন্নত করতে চাচ্ছে?

আসলে দু’দেশই পড়েছে বিভিন্ন রকম অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক চাপে। তাদের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে একে অপরের প্রয়োজন।

যেমন, চতুর্মুখী আক্রমণে হাঁপিয়ে উঠেছে মোদী সরকার। দেশের মধ্যে জনপ্রিয়তায় ধস। করোনার কারণে অর্থনীতিতে ধস। চীনের কাছে সীমান্তে পরাজয়। চীন-পাকিস্তান দ্বৈত ফ্রন্ট মোকাবেলা করার হিম্মত হারিয়েছে ভারত। আঞ্চলিকভাবে বন্ধুহীন হয়ে পড়েছে দেশটি। সারা বিশ্বে মোদীর কারিশমায় ফানুস ফুটে গেছে। আমেরিকার নতুন বাইডেন সরকারকে পরম বন্ধু হিসেবে কাছে পাচ্ছে না নয়াদিল্লি।

বাইডেন সরকারের বঙ্গোপসাগরে ব্যাপক সামরিক উপস্থিতির পরিকল্পনা ভারতকে ভাবিয়ে তুলছে। অন্যদিকে রাশিয়া থেকে এস-৪০০ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয় নিয়ে আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক অবনতির সম্ভবনা আছে ভারতের। চীনের ব্যাপক সামরিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক শক্তি অর্জন।
এগুলো সব আসলে ভারতকে নতুন বন্ধু খুঁজতে বাধ্য করেছে।

এছাড়াও, চীনের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক। তুরস্ক থেকে চীন পর্যন্ত বাণিজ্যিকট্রেন চালু। এগুলোও ভাবিয়ে তুলছে ভারতকে।

বেইজিং তুরস্ককে এই অঞ্চলের প্রধান খেলোয়াড়ের ভূমিকায় দেখতে চায়। দেশটি তুরস্কের সঙ্গে আরও বেশি বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন আগ্রহী । তাতে ভারতের ৮ বিলিয়ন ডলারের এই তুর্কি বাজারটি হাতছাড়া হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

অন্যদিকে তুরস্ক, ইরান হয়ে পাকিস্তানে ট্রেন লাইন চালু করেছে। আফগানিস্তানে তুরস্ক মেইন প্লেয়ারেরে ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। ভবিষ্যতে হয়তো আফগানিস্তানের নিরাপত্তার দায়িত্ব পড়তে পারে তুরস্কের ওপর। কিন্তু সেখানে ভারতের ব্যাপক বিনিয়োগ আছে।

এছাড়াও গ্রীস, ইসরাইল, আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক উন্নয়েনের চেষ্টা করেছে। অথচ এই দেশগুলো ছিল ভারতের তুরস্ক বিরোধী বন্ধু রাষ্ট্র। এই সবকিছুই আসলে ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে যাচ্ছে।

সুতরাং তুরস্ককে শত্রুতা বজায় রেখে এই বিভিন্ন ফ্রন্টে ক্ষতির মুখামুখি হতে চাচ্ছে না ভারত। এ কারণে দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী মোদী সরকার। ভারত চাচ্ছে তার ইকোনোমিক ডিপ্লোম্যাসি ব্যবহার করে তুরস্কের ওপড়ে প্রভাব বিস্তার করতে। বিপরীতে তুরস্ক যেন পাকিস্তান এবং কাশ্মীর থেকে হাত গুঁটিয়ে নেয়।

আর তুরস্ক চাচ্ছে ভারত থেকে আরও বেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে এবং ভারতে তার রপ্তানি বাড়াতে। ইতিমধ্যে অবশ্য এর আভাসও পাওয়া গেছে।

ভারতের কাশ্মীর দখলের বর্ষপূর্তিতে অর্থাৎ ৫ আগস্ট ২০২০ সালে এরদোগান কাশ্মীর নিয়ে কোন কথাই বলেননি।

কিছুদিন আগে তুরস্ক-ভারত বিজিনেস কাউন্সিল একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। সে চুক্তিতে আছে ভারত এবং তুরস্কের ব্যাংকের মধ্যে লেনদেন সহজিকরন।

২০১৭ সালে এরদোগানকে লালগালিচার সংবর্ধনা দেয় ভারতের সরকার। ফাইল ছবি

ভারত-তুরস্ক পারস্পরিক যত বিনিয়োগ

ভারতের TAFE ট্রাক্টর, Mahindra, Sonalika, Tata সহ আরও অনেক কোম্পানি মোট ১২৫ মিলিয়ন ডলারের বিনয়োগ করছে তুরস্কে। ভারত সরকার গান্ধি ফেস্টিভাল, বলিউড ফিল্ম ফেস্টিভাল, রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর ফেস্টিভাল, ইন্ডিয়া বাই দ্যা বসফরাস ফেস্টিভ্যাল, হোলি ফেস্টিভ্যাল, যোগ ব্যায়াম সহ আরও অনেক ভারতীয় কালচারাল প্রোগ্রামের আয়োজন করে তুরস্কে ।

অন্যদিকে তুরস্ক তার রপ্তানি পরিকল্পনার শীর্ষ ১৭ দেশের তালিকায় রেখেছে ভারতকেও। বর্তমানের সাড়ে ৮ বিলিয়ন ট্রেড ভলিউমকে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ২০ বিলিয়ন ডলার করতেও আগ্রহী উভয় দেশ। তুরস্কের বড় বড় কোম্পানি ভারতের মুম্বাই সাবওয়ে, লাখনোউ সাবওয়ে, পুনে সাবওয়ে, জম্মু কাশ্মীরের রেলওয়ে টানেল, সহ প্রচুর আবাসন প্রকল্প তৈরি করছে।

তুরস্কের চেলেবি কোম্পানি ভারতের দিল্লি, মুম্বাই, আহমেদাবাদ, এবং হায়দ্রাবাদসহ সাতটি বিমানবন্দরের বিমান এবং কারগো পরিচালনায় গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং সার্ভিস দিয়ে থাকে। ভারতে তার কমচারি আছে প্রায় ৭,৮০০।

এছাড়াও তুরস্কের Koc Holding, Arcelik A.S, Dogus Holding Dogus Construction, Celebi Holding, Orhan Holding, সহ আরও অনেক টার্কিশ কোম্পানি মোট ২২৩ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ করেছে ভারতে।

তুরস্কে প্রায় আড়াই লাখ ভারতীয় পর্যটক ঘুরতে আসেন। এছাড়াও ভারতীয় ধনকুবেররা বিয়ের জন্য তুরস্ককে বেছে নিতে শুরু করেছে।

সুতরাং ভারত যেমন তুরস্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বাজার তেমনি তুরস্কও ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মার্কেট।

এরকম একটি বাজার কিছুতেই হাতছাড়া করতে চাইবে না তারা।

তবে পাকিস্তান এবং কাশ্মীরের প্রতি তুরস্কের মনোভাব কী হবে সেটা অনেকটাই গুরুত্বপূর্ণ। আর ভারতের তুরস্ক বিরোধী মিডিয়া এবং গোয়েন্দা কার্যক্রম বন্ধ হবে কি-না সেটাও দেখার বিষয়। কিন্তু ভারতও যেহেতু পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে কিছু গোপন বৈঠক করেছে, আর তুরস্কও তার পররাষ্ট্রনীতিতে কিছু পরিবর্তন নিয়ে এসেছে সেহেতু দু'দেশই উইন-উইন পজিশনে কিছু কিছু বিষয়ে ছাড় দিয়ে সম্পর্ক উন্নয়েন যেতে পারে।

লেখক: সরোয়ার আলম

চিফ রিপোর্টার, আনাদলু নিউজ, তুরস্ক

তুরস্কের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক উন্নয়ন কি আদৌ সম্ভব?

 সরোয়ার আলম, আঙ্কারা, তুরস্ক থেকে 
০৮ মে ২০২১, ০৮:২১ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
২০১৭ সালে নয়াদিল্লিতে তুরস্কের সঙ্গে ভারতের চুক্তি স্বাক্ষরের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগানের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি
২০১৭ সালে নয়াদিল্লিতে তুরস্কের সঙ্গে ভারতের চুক্তি স্বাক্ষরের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগানের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ফাইল ছবি: এএফপি

তুরস্ক এবং ভারতের মধ্যের সম্পর্ক খারাপ হয় ২০১৯ সালে। যখন ভারতের নরেন্দ্র মোদী সরকার কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসনকে বাতিল করে।  তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান তখন নিয়ে কড়া সমালোচনা করেন ভারতের। এরদোগান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদেও এ নিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন।  

ফলে ২০১৯ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী তার পূর্বপরিকল্পিত তুরস্ক সফর বাতিল করেন এবং তুরস্কের সঙ্গে কয়েক বিলিয়ন ডলার মূল্যমানের নৌ-অস্ত্র চুক্তি স্থগিত করেন।

তুরস্ককে এক হাত দেখে নেওয়ার জন্য মাঠে  নেমে পড়ে ভারতের মিডিয়া, কূটনীতিবিদ, সুশীল সমাজ, এবং গবেষণা সংস্থা।  

ভারতীয় মিডিয়া প্রচার করতে থাকে তুরস্ক বিরোধী ফেইক নিউজ বা ভুয়া সংবাদ। এক্ষেত্রে তারা কয়েকটি কৌশল অবলম্বন করে।

১. দলিল প্রমাণ ছাড়া তুরস্ক বিরোধী বিভিন্ন ভুয়া আর্টিকেল প্রচার করে ভারত পরিচালিত নামকাওায়স্তে ওয়েবসাইটে।

২. ওই ভুয়া খবরকে পরবর্তীতে মেইনস্ট্রীম মিডিয়াতে ফলাও করে ছাপানো হয়।

৩. নামে-বেনামে তুরস্কের বিরুদ্ধে ব্ল্যাক প্রোপাগান্ডা ছড়ায়।

খবরগুলোর হেডলাইনে থাকে ইসলামফোবিয়ার রমরমা উপস্থিতি। আর টার্গেটে থাকেন এরদোগান, তার পরিবার এবং তুরস্কের সরকারি বেসরকারি সংস্থা। এই কাজে ভারত কাছে পায় গ্রীস, ইসরাইল, আর্মেনিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, আরব আমিরাত এমনকি সৌদি আরবকেও।

কাশ্মীরি এবং ভারতীয়দের তুরস্ক সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া শিক্ষা বৃত্তি নিয়েও নয়াদিল্লীর অভিযোগের শেষ নেই।  তুরস্ক নাকি এগুলো দিয়ে জঙ্গি তৈরি করছে ভারতের মাটিতে!

এমনকি তুরস্কের গণমাধ্যমে কর্মরত কাশ্মীরি বা পাকিস্তানি সাংবাদিকদেরকেও বিভিন্নভাবে হয়রানি করে ভারতীয় মিডিয়া।

তুরস্কের বিরুদ্ধে ভারতের সাইবার এবং হাইব্রিড যুদ্ধ শুরু হয় ২০১৯ সালে।  তখন একই সঙ্গেই মিডিয়া, গবেষণা সংস্থা, বিশেষজ্ঞ, কূটনীতিবিদ, সাবেক সরকারি এবং সামরিক অফিসার, গোয়েন্দা সংস্থা সব একত্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে তুরস্কের ওপর।  

কারণ, পাকিস্তানের পরে মুসলিম বিশ্বের মধ্যে একমাত্র তুরস্কই কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্যাম্পেইন করে।  কাশ্মীর নিয়ে ব্যাপক খবর প্রচার করে তুর্কি মিডিয়া। বাবরি মসজিদ ধ্বংস নিয়ে ভারতীয় আদালতের হাস্যকর সেই রায়েরও ব্যাপক সমালোচনা করে তুরস্ক এবং এর মিডিয়া।

তুরস্কের সমর্থনের কারণেই ভারত শত চেষ্টা করেও পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিক মানি লন্ডারিং সংস্থার কালো তালিকাভুক্ত করতে পারেনি।  তুরস্কের কারণেই পাকিস্তান নৌবাহিনী পাচ্ছে অত্যাধুনিক যুদ্ধ জাহাজ।  

তুরস্ক ২০১০ সালে ভারতকে না নিয়েই আফগানিস্তান শান্তি আলোচনার কমিটি গঠন করে।  ২০১৬ সালে ভারতের নিউক্লিয়ার সাপ্লাইয়ারস গ্রুপের সদস্যপদ ব্লক করে দেয় আঙ্কারা।

অন্যদিকে ভারতের বিরুদ্ধে ছুঁড়ে দেওয়া হয় ২০১৬ সালে তুরস্কে সংঘটিত ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের সহযোগীদের সমর্থনের অভিযোগ। তুরস্কের শত অনুরোধ সত্ত্বেও এই অভ্যুত্থানের হোতা ফেতুল্লাহ গুলেন পরিচালিত  স্কুল, থিংক ট্যাঙ্কগুলো বন্ধ করেনি ভারত। বরং সেগুলোকে তুরস্কের বিরুদ্ধে আরও ফুসলিয়ে দিয়েছে।

এছাড়াও ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সঙ্গে একত্র হয়ে তুরস্কে আস্তে আস্তে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা সক্রিয় হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।  ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন তুরস্কের বিভিন্ন সরকারি এবং বেসরকারি সংস্থায় কৌশলে ঢুকে পড়েছে বলেও অনেকের ধারণা।

ভারত-তুরস্কের সম্পর্কের ইতিহাস

২০১৮ সালের আগ পর্যন্ত তুরস্ক এবং ভারতের মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্ক বিরাজ করছিল।  সম্পর্কের উত্থান-পতন হয়েছে।  কিন্তু বর্তমানের মত এতো খারাপ পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

দুদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৪৮ সালে। কিন্তু তারপর ঠাণ্ডা যুদ্ধের সময় তুরস্ক ন্যাটো সদস্য হিসেবে আমেরিকান বলয়ে অবস্থান নেই — এবং ভারত সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষে অবস্থান নেয়।

১৯৬৫ সালের ইন্দো-পাকিস্তানি যুদ্ধে এবং ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধে তুরস্ক পাকিস্তানকে সমর্থন দেয়।  অপরদিকে ১৯৭৪ সালে সাইপ্রাসে পরিচালিত তুরস্কের সামরিক অভিযানে ভারত জোরেশোরেই তুরস্কের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। এভাবে চলে আশির দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত।

এরপর সম্পর্ক উন্নত হয়। ১৯৮৬ সালে তুরস্কের তৎকালীন বিপুল জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী তুরগুত ওযাল ভারত সফর করেন।  তার দুই বছর পর অর্থাৎ, ১৯৮৮ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধি তুরস্ক সফর করেন।  

সম্পর্ক আরও উন্নত ২০০০ সালে যখন তুরস্কের সংখ্যালঘু কোয়ালিশন সরকারের প্রধান, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বুলেন্ত এজেভিত ভারত সফরে যান এবং সেখানে তিনি কাশ্মীর নিয়ে ভারতের অবস্থানকে সমর্থন করেন।  তখন তিনি পাকিস্তান সফর না করেই ফিরে আসেন। ফলশ্রুতিতে, নয়াদিল্লি যারপরনাই খুশি হয়।  আর তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে মনোযোগ দেয়।

এরপর এরদোগান শাসনামলে ২০০৩ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ী তুরস্ক সফরে এসে অনেকগুলো চুক্তি করেন।  ২০০৮ সালে এরদোগান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভারত সফর করেন।

২০১০ সালে তৎকালীন তুরস্কের রাষ্ট্রপতি আব্দুল্লাহ গুল ভারত সফর করেন।  ২০১৭ সালে এরদোগান আবার ভারত সফর করেন।  

২০১৩ সালে ভারতের প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জি তুরস্কে আসেন।  ২০১৫ সালে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তুরস্কে আসেন। ২০১৯ সালেও তার আসার কথা ছিল কিন্তু পরে কাশ্মীর ইস্যুর কারণে বাতিল করেন।

ভারত-তুরস্কের বাণিজ্যিক সম্পর্ক

দুই দেশের বাণিজ্যিক ভলিউম ২০০০ সালে ৫০৫ মিলিয়ন ডলার থেকে  ২০১৮ সালে এসে দাঁড়ায় প্রায় নয় বিলিয়ন (৮.৭ বিলিয়ন) ডলারে। এতে ভারতের ভাগ ৭.৫ বিলিয়ন ডলার এবং তুরস্কের ভাগ মাত্র ১.১ বিলিয়ন ডলার।

ভারত-তুরস্কের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়ন কি সম্ভব?

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দু দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠক করছেন এবং সুসম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার ইচ্ছা পোষণ করেছেন। ২৯ মার্চ তুরস্ক এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা তাজিকিস্তানের রাজধানীতে দেখা করছেন, বৈঠক করেছেন। সেখানে তারা অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক উন্নয়নের আশাবাদ ব্যাক্ত করেছেন। তার দুদিন আগে, ২৭ মার্চ, তুরস্কের রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা  ফোনে কথা বলেছেন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার সঙ্গে । তখন ভারতে করোনা মহামারী মোকাবেলায় তুরস্ক সাহায্য পাঠানোরও ইচ্ছা পোষণ করে। যদিও তুরস্ক থেকে সাহায্য নিতে আগ্রহী না ভারত।  তবে দুইও দেশ সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী এবং এ ব্যাপারে তারা ব্যাকচ্যানেল ডিপ্লোম্যাসি চালিয়ে যাচ্ছে বলে আমার বিশ্বাস।

দুদেশ কেন সম্পর্ক উন্নত করতে চাচ্ছে?

আসলে দু’দেশই পড়েছে বিভিন্ন রকম অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক চাপে। তাদের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে একে অপরের প্রয়োজন।

যেমন,  চতুর্মুখী আক্রমণে হাঁপিয়ে উঠেছে মোদী সরকার। দেশের মধ্যে জনপ্রিয়তায় ধস।  করোনার কারণে অর্থনীতিতে ধস।  চীনের কাছে সীমান্তে পরাজয়।  চীন-পাকিস্তান দ্বৈত ফ্রন্ট মোকাবেলা করার হিম্মত হারিয়েছে ভারত।  আঞ্চলিকভাবে বন্ধুহীন হয়ে পড়েছে দেশটি।  সারা বিশ্বে মোদীর কারিশমায় ফানুস ফুটে গেছে। আমেরিকার নতুন বাইডেন সরকারকে পরম বন্ধু হিসেবে কাছে পাচ্ছে না নয়াদিল্লি।

বাইডেন সরকারের বঙ্গোপসাগরে ব্যাপক সামরিক উপস্থিতির পরিকল্পনা ভারতকে ভাবিয়ে তুলছে। অন্যদিকে রাশিয়া থেকে এস-৪০০ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয় নিয়ে আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক অবনতির সম্ভবনা আছে ভারতের।  চীনের ব্যাপক সামরিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক শক্তি অর্জন।
এগুলো সব আসলে ভারতকে নতুন বন্ধু খুঁজতে বাধ্য করেছে।

এছাড়াও, চীনের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক। তুরস্ক থেকে চীন পর্যন্ত বাণিজ্যিকট্রেন চালু। এগুলোও ভাবিয়ে তুলছে ভারতকে।

বেইজিং তুরস্ককে এই অঞ্চলের প্রধান খেলোয়াড়ের ভূমিকায় দেখতে চায়। দেশটি তুরস্কের সঙ্গে আরও বেশি বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন আগ্রহী । তাতে ভারতের ৮ বিলিয়ন ডলারের এই তুর্কি বাজারটি হাতছাড়া হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

অন্যদিকে তুরস্ক, ইরান হয়ে পাকিস্তানে ট্রেন লাইন চালু করেছে। আফগানিস্তানে তুরস্ক মেইন প্লেয়ারেরে ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।  ভবিষ্যতে হয়তো আফগানিস্তানের নিরাপত্তার দায়িত্ব পড়তে পারে তুরস্কের ওপর। কিন্তু সেখানে ভারতের ব্যাপক বিনিয়োগ আছে।

এছাড়াও গ্রীস, ইসরাইল, আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক উন্নয়েনের চেষ্টা করেছে। অথচ এই দেশগুলো ছিল ভারতের তুরস্ক বিরোধী বন্ধু রাষ্ট্র। এই সবকিছুই আসলে ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে যাচ্ছে।

সুতরাং তুরস্ককে শত্রুতা বজায় রেখে এই বিভিন্ন ফ্রন্টে ক্ষতির মুখামুখি হতে চাচ্ছে না ভারত। এ কারণে দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী মোদী সরকার। ভারত চাচ্ছে তার ইকোনোমিক ডিপ্লোম্যাসি ব্যবহার করে তুরস্কের ওপড়ে প্রভাব বিস্তার করতে।  বিপরীতে তুরস্ক যেন পাকিস্তান এবং কাশ্মীর থেকে হাত গুঁটিয়ে নেয়।

আর তুরস্ক চাচ্ছে ভারত থেকে আরও বেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে এবং ভারতে তার রপ্তানি বাড়াতে।  ইতিমধ্যে অবশ্য এর আভাসও পাওয়া গেছে।

ভারতের কাশ্মীর দখলের বর্ষপূর্তিতে অর্থাৎ ৫ আগস্ট ২০২০ সালে এরদোগান কাশ্মীর নিয়ে কোন কথাই বলেননি।

কিছুদিন আগে তুরস্ক-ভারত বিজিনেস কাউন্সিল একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে।  সে চুক্তিতে আছে ভারত এবং তুরস্কের ব্যাংকের মধ্যে লেনদেন সহজিকরন।  

২০১৭ সালে এরদোগানকে লালগালিচার সংবর্ধনা দেয় ভারতের সরকার। ফাইল ছবি

ভারত-তুরস্ক পারস্পরিক যত বিনিয়োগ

ভারতের TAFE ট্রাক্টর, Mahindra, Sonalika, Tata সহ আরও অনেক কোম্পানি মোট ১২৫ মিলিয়ন ডলারের বিনয়োগ করছে তুরস্কে। ভারত সরকার গান্ধি ফেস্টিভাল, বলিউড ফিল্ম ফেস্টিভাল, রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর ফেস্টিভাল, ইন্ডিয়া বাই দ্যা বসফরাস ফেস্টিভ্যাল, হোলি ফেস্টিভ্যাল, যোগ ব্যায়াম সহ আরও অনেক ভারতীয় কালচারাল প্রোগ্রামের আয়োজন করে তুরস্কে ।

অন্যদিকে তুরস্ক তার রপ্তানি পরিকল্পনার শীর্ষ ১৭ দেশের তালিকায় রেখেছে ভারতকেও। বর্তমানের সাড়ে ৮ বিলিয়ন ট্রেড ভলিউমকে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ২০ বিলিয়ন ডলার করতেও আগ্রহী উভয় দেশ।  তুরস্কের বড় বড় কোম্পানি ভারতের মুম্বাই সাবওয়ে, লাখনোউ সাবওয়ে, পুনে সাবওয়ে, জম্মু কাশ্মীরের রেলওয়ে টানেল, সহ প্রচুর আবাসন প্রকল্প তৈরি করছে।

তুরস্কের চেলেবি কোম্পানি ভারতের দিল্লি, মুম্বাই, আহমেদাবাদ, এবং হায়দ্রাবাদসহ সাতটি  বিমানবন্দরের বিমান এবং কারগো পরিচালনায় গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং সার্ভিস দিয়ে থাকে। ভারতে তার কমচারি আছে প্রায় ৭,৮০০।

এছাড়াও তুরস্কের Koc Holding, Arcelik A.S, Dogus Holding Dogus Construction, Celebi Holding, Orhan Holding, সহ আরও অনেক টার্কিশ কোম্পানি মোট ২২৩ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ করেছে ভারতে।

তুরস্কে প্রায় আড়াই লাখ ভারতীয় পর্যটক ঘুরতে আসেন।  এছাড়াও ভারতীয় ধনকুবেররা বিয়ের জন্য তুরস্ককে বেছে নিতে শুরু করেছে।

সুতরাং ভারত যেমন তুরস্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বাজার তেমনি তুরস্কও ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মার্কেট।

এরকম একটি বাজার কিছুতেই হাতছাড়া করতে চাইবে না তারা।

তবে পাকিস্তান এবং কাশ্মীরের প্রতি তুরস্কের মনোভাব কী হবে সেটা অনেকটাই গুরুত্বপূর্ণ। আর ভারতের তুরস্ক বিরোধী মিডিয়া এবং গোয়েন্দা কার্যক্রম বন্ধ হবে কি-না সেটাও দেখার বিষয়।  কিন্তু ভারতও যেহেতু পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে কিছু গোপন বৈঠক করেছে, আর তুরস্কও তার পররাষ্ট্রনীতিতে কিছু পরিবর্তন নিয়ে এসেছে সেহেতু দু'দেশই উইন-উইন পজিশনে কিছু কিছু বিষয়ে ছাড় দিয়ে সম্পর্ক উন্নয়েন যেতে পারে। 

লেখক: সরোয়ার আলম

চিফ রিপোর্টার, আনাদলু নিউজ, তুরস্ক

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : সারওয়ার আলমের লেখা