রোহিঙ্গাদের হঠাৎ কেন স্বীকৃতি দিল মিয়ানমারের বিরোধী দলগুলো?
jugantor
রোহিঙ্গাদের হঠাৎ কেন স্বীকৃতি দিল মিয়ানমারের বিরোধী দলগুলো?

  অনলাইন ডেস্ক  

০৭ জুন ২০২১, ১৪:৩৩:০১  |  অনলাইন সংস্করণ

মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারানো অং সান সুচির দল এনএলডিসহ দেশটিরবিরোধী দলগুলোর একটি জাতীয় মোর্চা গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।সেই মোর্চারোহিঙ্গাদের অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেই সঙ্গে১৯৮২ সালের যে নাগরিকত্ব আইনের বলে রোহিঙ্গাদেরঅধিকার হরণ করা হয়েছিল, সেটি বিলোপের অঙ্গীকারও করেছে। খবর বিবিসির।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে অনেক চাপ সত্ত্বেও মিয়ানমারের যে রাজনীতিকরা রোহিঙ্গাদের অধিকারের বিন্দুমাত্র স্বীকৃতি দিতে রাজী হয়নি, হঠাৎ করে তাদের অবস্থানে নাটকীয় পরিবর্তন বেশ বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে।

গণতন্ত্রের দাবিতে রক্তাক্ত সংগ্রামে লিপ্ত মিয়ানমারের বিরোধী দলগুলো এখন গড়ে তুলেছে একটি সমান্তরাল সরকার, যেটি ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট বা এনইউজি নামে পরিচিত। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে স্বীকৃতি লাভের জন্য এই এনইউজি এখন সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে।

রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে ঘোষণাটি দেয়া হয়েছে এই এনইউজির তরফ থেকে। ঘোষণাটিকে বেশ ইতিবাচক একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।

রোহিঙ্গাদের অধিকারের পক্ষে সোচ্চার বিভিন্ন সংগঠনও এটিকে স্বাগত জানিয়েছে। তবে তাদের অবস্থান কতটা আন্তরিক অথবা রোহিঙ্গাদের অধিকারের পূর্ণাঙ্গ স্বীকৃতি এই ঘোষণায় আছে কিনা- তা নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে।

গত ৩ জুন এনইউজি রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে যে নীতি ঘোষণা করেছে, তাতে বেশ কয়েকটি অঙ্গীকার করেছে তারা।

প্রথমত, এতে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর হাতে রোহিঙ্গারা যে হত্যা-নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়েছে, তার স্বীকৃতির পাশাপাশি যারা এর জন্য দায়ী, তাদের বিচারের কথা বলা হয়েছে। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংগঠিত অপরাধের বিচারের এখতিয়ার দেয়ার প্রক্রিয়া শুরুর অঙ্গীকার করা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত: এতে ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন সংশোধন/বিলোপের অঙ্গীকার করা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব হরণের ক্ষেত্রে এই আইনটিকে ব্যবহার করে মিয়ানমারের সামরিক কর্তৃপক্ষ।

তৃতীয়ত: এই ঘোষণায় মিয়ানমার থেকে পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে আনার জন্য প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে করা চুক্তি মেনে চলার অঙ্গীকার আছে।

২০১৭ সালে সর্বশেষ রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট শুরু হওয়ার পর এতটা খোলাখুলি মিয়ানমারের রাজনীতিকদের এভাবে রোহিঙ্গাদের অধিকারের পক্ষে কথা বলতে দেখা যায়নি।

মিয়ানমারবিষয়ক বিশ্লেষক ল্যারি জ্যাগান বলেন, এটি আসলে মিয়ানমারের জাতীয় ঐক্যের সরকারের তরফ হতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক পদক্ষেপ। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে 'রোহিঙ্গা' পরিচয়ের স্বীকৃতি।

এই ঘোষণার মাধ্যমে এনইউজি স্পষ্টতই মিয়ানমারের সামরিক সরকারের চেয়ে একটা পরিষ্কার ভিন্ন অবস্থান নিতে চেয়েছে। কারণ সামরিক বাহিনী এখনো পর্যন্ত বলে যাচ্ছে 'রোহিঙ্গা' বলে কিছু নেই।

তিনি বলেন, "মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী দলগুলোর অবস্থানে যে একটা পরিবর্তন ঘটেছে এটা তারই ইঙ্গিত। কারণ আমরা দেখেছি অং সান সুচি এবং তার দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি এর আগে 'রোহিঙ্গা' কথাটির উল্লেখ পর্যন্ত এড়িয়ে গেছে, তারা এদেরকে 'আরাকানি মুসলিম' বলে বর্ণনা করতো।

ল্যারি জ্যাগানের মতে, এই ঘোষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক দুটি। প্রথমত, ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন বিলোপের অঙ্গীকার। কারণ এই আইনটাই অনেক সমস্যার মূলে।

আর দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গাদের দুর্ভোগের স্বীকৃতি এবং তাদের ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার।

এনইউজি'র এই ঘোষণা মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের অধিকার নিয়ে সক্রিয় গ্রুপগুলোর মধ্যেও আশাবাদ তৈরি করেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনও একে স্বাগত জানিয়েছে।

তবে রোহিঙ্গা নেতাদের অনেকে মনে করেন, এই ঘোষণায় কিছু অস্পষ্টতা এখনো রয়ে গেছে।

যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক একটি সংগঠন বার্মিজ রোহিঙ্গা অর্গানাইজেশনের প্রেসিডেন্ট টুন খিন বিবিসিকে বলেন, তারা একদম পুরোপুরি সঠিক নীতি এবং অবস্থান নিয়েছে এটা আমি বলবো না। তাদের দিক থেকে আরও অনেক কিছু পরিষ্কার করে বলার দরকার আছে। তবে একটা ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে আমরা একে স্বাগত জানাই।

টুন খিনের মতে, এই ঘোষণায় অনেক কিছু বলা হলেও রোহিঙ্গারা যে মিয়ানমারেরই এথনিক গোষ্ঠী এবং অন্যান্য এথনিক গোষ্ঠীর মতো তাদেরও যে সমান অধিকার আছে- সেটা স্পষ্ট করে বলা নেই।

এর প্রকাশ্য স্বীকৃতি আমরা চাই। আমরা আগের মতো আচরণ চাই না। তাই আমরা এনইউজির প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে একটি প্রকাশ্য নীতি ঘোষণা করতে।"

মিয়ানমারের প্রায় সব প্রধান বিরোধী দলগুলোর রাজনীতিকদের নিয়ে এনইউজি গঠিত হয় গত ১৬ই এপ্রিল। ফেব্রুয়ারিতে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা হারানো এনএলডির নির্বাচিত পার্লামেন্টারিয়ানরা আছেন এই সরকারে। আছেন আরও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধি এবং দলের রাজনীতিকরা।

রোহিঙ্গাদের হঠাৎ কেন স্বীকৃতি দিল মিয়ানমারের বিরোধী দলগুলো?

 অনলাইন ডেস্ক 
০৭ জুন ২০২১, ০২:৩৩ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারানো অং সান সুচির দল এনএলডিসহ দেশটির বিরোধী দলগুলোর একটি জাতীয় মোর্চা গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেই মোর্চা রোহিঙ্গাদের অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।  সেই সঙ্গে ১৯৮২ সালের যে নাগরিকত্ব আইনের বলে রোহিঙ্গাদের অধিকার হরণ করা হয়েছিল, সেটি বিলোপের অঙ্গীকারও করেছে। খবর বিবিসির।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে অনেক চাপ সত্ত্বেও মিয়ানমারের যে রাজনীতিকরা রোহিঙ্গাদের অধিকারের বিন্দুমাত্র স্বীকৃতি দিতে রাজী হয়নি, হঠাৎ করে তাদের অবস্থানে নাটকীয় পরিবর্তন বেশ বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে।

গণতন্ত্রের দাবিতে রক্তাক্ত সংগ্রামে লিপ্ত মিয়ানমারের বিরোধী দলগুলো এখন গড়ে তুলেছে একটি সমান্তরাল সরকার, যেটি ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট বা এনইউজি নামে পরিচিত। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে স্বীকৃতি লাভের জন্য এই এনইউজি এখন সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে।

রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে ঘোষণাটি দেয়া হয়েছে এই এনইউজির তরফ থেকে। ঘোষণাটিকে বেশ ইতিবাচক একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।

রোহিঙ্গাদের অধিকারের পক্ষে সোচ্চার বিভিন্ন সংগঠনও এটিকে স্বাগত জানিয়েছে। তবে তাদের অবস্থান কতটা আন্তরিক অথবা রোহিঙ্গাদের অধিকারের পূর্ণাঙ্গ স্বীকৃতি এই ঘোষণায় আছে কিনা- তা নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে।

গত ৩ জুন এনইউজি রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে যে নীতি ঘোষণা করেছে, তাতে বেশ কয়েকটি অঙ্গীকার করেছে তারা।

প্রথমত, এতে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর হাতে রোহিঙ্গারা যে হত্যা-নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়েছে, তার স্বীকৃতির পাশাপাশি যারা এর জন্য দায়ী, তাদের বিচারের কথা বলা হয়েছে। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংগঠিত অপরাধের বিচারের এখতিয়ার দেয়ার প্রক্রিয়া শুরুর অঙ্গীকার করা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত: এতে ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন সংশোধন/বিলোপের অঙ্গীকার করা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব হরণের ক্ষেত্রে এই আইনটিকে ব্যবহার করে মিয়ানমারের সামরিক কর্তৃপক্ষ।

তৃতীয়ত: এই ঘোষণায় মিয়ানমার থেকে পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে আনার জন্য প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে করা চুক্তি মেনে চলার অঙ্গীকার আছে।

২০১৭ সালে সর্বশেষ রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট শুরু হওয়ার পর এতটা খোলাখুলি মিয়ানমারের রাজনীতিকদের এভাবে রোহিঙ্গাদের অধিকারের পক্ষে কথা বলতে দেখা যায়নি।

মিয়ানমারবিষয়ক বিশ্লেষক ল্যারি জ্যাগান বলেন, এটি আসলে মিয়ানমারের জাতীয় ঐক্যের সরকারের তরফ হতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক পদক্ষেপ। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে 'রোহিঙ্গা' পরিচয়ের স্বীকৃতি।

এই ঘোষণার মাধ্যমে এনইউজি স্পষ্টতই মিয়ানমারের সামরিক সরকারের চেয়ে একটা পরিষ্কার ভিন্ন অবস্থান নিতে চেয়েছে। কারণ সামরিক বাহিনী এখনো পর্যন্ত বলে যাচ্ছে 'রোহিঙ্গা' বলে কিছু নেই।

তিনি বলেন, "মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী দলগুলোর অবস্থানে যে একটা পরিবর্তন ঘটেছে এটা তারই ইঙ্গিত। কারণ আমরা দেখেছি অং সান সুচি এবং তার দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি এর আগে 'রোহিঙ্গা' কথাটির উল্লেখ পর্যন্ত এড়িয়ে গেছে, তারা এদেরকে 'আরাকানি মুসলিম' বলে বর্ণনা করতো।

ল্যারি জ্যাগানের মতে, এই ঘোষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক দুটি। প্রথমত, ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন বিলোপের অঙ্গীকার। কারণ এই আইনটাই অনেক সমস্যার মূলে।

আর দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গাদের দুর্ভোগের স্বীকৃতি এবং তাদের ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার।

এনইউজি'র এই ঘোষণা মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের অধিকার নিয়ে সক্রিয় গ্রুপগুলোর মধ্যেও আশাবাদ তৈরি করেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনও একে স্বাগত জানিয়েছে।

তবে রোহিঙ্গা নেতাদের অনেকে মনে করেন, এই ঘোষণায় কিছু অস্পষ্টতা এখনো রয়ে গেছে।

যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক একটি সংগঠন বার্মিজ রোহিঙ্গা অর্গানাইজেশনের প্রেসিডেন্ট টুন খিন বিবিসিকে বলেন, তারা একদম পুরোপুরি সঠিক নীতি এবং অবস্থান নিয়েছে এটা আমি বলবো না। তাদের দিক থেকে আরও অনেক কিছু পরিষ্কার করে বলার দরকার আছে। তবে একটা ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে আমরা একে স্বাগত জানাই।

টুন খিনের মতে, এই ঘোষণায় অনেক কিছু বলা হলেও রোহিঙ্গারা যে মিয়ানমারেরই এথনিক গোষ্ঠী এবং অন্যান্য এথনিক গোষ্ঠীর মতো তাদেরও যে সমান অধিকার আছে- সেটা স্পষ্ট করে বলা নেই।

এর প্রকাশ্য স্বীকৃতি আমরা চাই। আমরা আগের মতো আচরণ চাই না। তাই আমরা এনইউজির প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে একটি প্রকাশ্য নীতি ঘোষণা করতে।"

মিয়ানমারের প্রায় সব প্রধান বিরোধী দলগুলোর রাজনীতিকদের নিয়ে এনইউজি গঠিত হয় গত ১৬ই এপ্রিল। ফেব্রুয়ারিতে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা হারানো এনএলডির নির্বাচিত পার্লামেন্টারিয়ানরা আছেন এই সরকারে। আছেন আরও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধি এবং দলের রাজনীতিকরা।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : অং সান সু চি আটক