ইস্তাম্বুল খাল কি এরদোগানের লস প্রজেক্ট?
jugantor
ইস্তাম্বুল খাল কি এরদোগানের লস প্রজেক্ট?

  সরোয়ার আলম, আঙ্কারা, তুরস্ক থেকে  

০১ জুলাই ২০২১, ২০:৩৪:৩৮  |  অনলাইন সংস্করণ

তুরস্কে বহুল আলোচিত ইস্তাম্বুল খাল উদ্বোধন করছেন প্রেসিডেন্ট এরদোগান। ফাইল ছবি

এর আগের পর্বে এরদোগানের ইস্তাম্বুল খাল নিয়ে বিরোধীদের যুক্তি এবং সরকারের উত্তর নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। সেখানে অনেকগুলো যুক্তি ছিল। তবে এই খাল নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত একটি বিষয় হচ্ছে এই খালের অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতি। অনেকেই বলছেন, এই খাল খনন একটি লস প্রজেক্ট। কারণ এই খাল খননে খরচ হবে প্রায় ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই বিশাল পরিমাণ টাকা খালের মধ্য দিয়ে জাহাজ পারাপার থেকে তোলা সম্ভব না। কারণ বসফরাস প্রণালি দিয়ে বিনামূল্যে পার হতে পারলে কেন এই খাল ব্যবহার করবে মালবাহী জাহাজ।

যারা এই যুক্তি নিয়ে আসেন তারা বলেন, পানামা খাল এবং সুয়েজ খাল বছরে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করে, কারণ তাদের কোনো বিকল্প নেই। আর ওই খালগুলো জাহাজের যাত্রাপথ হাজার হাজার কিলোমিটার কমিয়ে দেয়। কিন্তু এই খালের তো বিকল্প আছে? তাই এটি লস প্রজেক্ট।

সরকারের উত্তর হলো, খাল খনন হবে "Build–operate–transfer" নীতির ভিত্তিতে। অর্থাৎ যে কোম্পানি এটি তৈরি করবে সে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এটি অপারেট করবে তার খরচ তুলে নেওয়ার জন্য। পরে এটি সরকারের কাছে হস্তান্তর করবে। সেহেতু সরকারের তেমন কোনো টাকা খরচ করতে হবে না।

আর এ কথা ঠিক যে, পানামা বা সুয়েজ খালের মত এটি নির্বিকল্প না। এর বিকল্প আছে। তবে পানামা খাল দিয়ে ২০১৯ সালে ১৩ হাজার ৭৮৫ জাহাজে পার হয়েছে ২৫২ মিলিয়ন টন মালামাল এবং কর্তৃপক্ষ আয় করেছে বছরে সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলার। অথচ ইস্তাম্বুলের বসফরসা প্রণালি ৪১ হাজার ১১২টি জাহাজে পার হয়েছে ৬৪০ মিলিয়ন টন মালামাল। কিন্তু কর্তৃপক্ষ আয় করেছে মাত্র ১৫০ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বসফরাস প্রণালি দিয়ে পানামা খালের চেয়ে তিন গুণেরও বেশি জাহাজ চলাচল করা সত্ত্বেও ইস্তাম্বুল খাল থেকে আয় মাত্র ১৫০ মিলিয়ন ডলার আর পানামা খালের আয় তার প্রায় ২৫ গুণ বেশি।

এর কারণ, বসফরাস একটি প্রাকৃতিক প্রণালি তাই এখান থেকে টোল আদায় করা সম্ভব না। আর মন্ট্রেক্স চুক্তির কারণে তুরস্ক শুধুমাত্র পথ দেখানো এবং অন্যান্য সার্ভিসের জন্য জাহাজ প্রতি নামমাত্র ৩ হাজার ৪০০ ডলার আদায় করতে পারে। এগুলো টোল না। তাই সরকারের যুক্তি হলো বসফরাসের অর্ধেক জাহাজও যদি ইস্তাম্বুল খাল দিয়ে যায় তাহলে বছরে অন্তত দুই আড়াই বিলিয়ন ডলার টোল আদায় করা সম্ভব।

এবার প্রশ্ন আসে বসফরাসে ফ্রি পারাপারের সুযোগ থাকতে জাহাজগুলো কেন নতুন খাল ব্যবহার করবে? এর উত্তর হলো। বর্তমানে বসফরাস দিয়ে পার হতে একটা জাহাজের ৮ থেকে ১৫ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। তুরস্ক চাইলে এই জাহাজ পারাপারে বিলম্ব করাতে পারে। অর্থাৎ বসফরাসের নিরাপত্তার অজুহাতে দৈনিক মালবাহী জাহাজ পারাপারের সংখ্যা কমিয়ে দিতে পারে। এবং বসফরাস দিয়ে অতিরিক্ত বড় মাপের জাহাজগুলোর চলাচল নিষিদ্ধও করে দিতে পারে। সে এখতিয়ার তুরস্কের আছে। মন্ট্রেক্স চুক্তি অনুযায়ীই তা সম্ভব। সুতরাং তুরস্কের সরকার চাচ্ছে এ পরিকল্পনাটি ব্যবহার করতে।

আর কার্গো শিপের দৈনিক ভাড়া ১০ থেকে ২০ হাজার ডলার। সুতরাং একটা জাহাজের এই প্রণালি পার হতে একদিন অপেক্ষা করা মানে এই বিশাল পরিমাণের অর্থ বসে বসে খরচ করা তাই এই জাহাজগুলো তখন অপেক্ষা করে অর্থ ও মালের ক্ষতি না করে বরং টোল দিয়ে হলেও বিকল্প পথে যাবে। আর এভাবে যদি দৈনিক ৫০ টি জাহাজও পার হয় তাতেও বছরে আয় হবে আড়াই থেকে তিন বিলিয়ন ডলার। আর ওই খালএর তীর ঘেঁষে গড়ে উঠবে নতুন নতুন শহর যা গতি নিয়ে আসবে তুরস্কের অর্থনীতিতে।

ইস্তাম্বুল খাল কি এরদোগানের লস প্রজেক্ট?

 সরোয়ার আলম, আঙ্কারা, তুরস্ক থেকে 
০১ জুলাই ২০২১, ০৮:৩৪ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
তুরস্কে বহুল আলোচিত ইস্তাম্বুল খাল উদ্বোধন করছেন প্রেসিডেন্ট এরদোগান। ফাইল ছবি
তুরস্কে বহুল আলোচিত ইস্তাম্বুল খাল উদ্বোধন করছেন প্রেসিডেন্ট এরদোগান। ফাইল ছবি

এর আগের পর্বে এরদোগানের ইস্তাম্বুল খাল নিয়ে বিরোধীদের যুক্তি এবং সরকারের উত্তর নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। সেখানে অনেকগুলো যুক্তি ছিল। তবে এই খাল নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত একটি বিষয় হচ্ছে এই খালের অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতি। অনেকেই বলছেন, এই খাল খনন একটি লস প্রজেক্ট। কারণ এই খাল খননে খরচ হবে প্রায় ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই বিশাল পরিমাণ টাকা খালের মধ্য দিয়ে জাহাজ পারাপার থেকে তোলা সম্ভব না। কারণ বসফরাস প্রণালি দিয়ে বিনামূল্যে পার হতে পারলে কেন এই খাল ব্যবহার করবে মালবাহী জাহাজ।

যারা এই যুক্তি নিয়ে আসেন তারা বলেন, পানামা খাল এবং সুয়েজ খাল বছরে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করে, কারণ তাদের কোনো বিকল্প নেই। আর ওই খালগুলো জাহাজের যাত্রাপথ হাজার হাজার কিলোমিটার কমিয়ে দেয়। কিন্তু এই খালের তো বিকল্প আছে? তাই এটি লস প্রজেক্ট।

সরকারের উত্তর হলো, খাল খনন হবে "Build–operate–transfer" নীতির ভিত্তিতে। অর্থাৎ যে কোম্পানি এটি তৈরি করবে সে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এটি অপারেট করবে তার খরচ তুলে নেওয়ার জন্য। পরে এটি সরকারের কাছে হস্তান্তর করবে। সেহেতু সরকারের তেমন কোনো টাকা খরচ করতে হবে না।

আর এ কথা ঠিক যে, পানামা বা সুয়েজ খালের মত এটি নির্বিকল্প না। এর বিকল্প আছে। তবে পানামা খাল দিয়ে ২০১৯ সালে ১৩ হাজার ৭৮৫ জাহাজে পার হয়েছে ২৫২ মিলিয়ন টন মালামাল  এবং কর্তৃপক্ষ আয় করেছে বছরে সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলার। অথচ ইস্তাম্বুলের বসফরসা প্রণালি ৪১ হাজার ১১২টি জাহাজে পার হয়েছে ৬৪০ মিলিয়ন টন মালামাল। কিন্তু কর্তৃপক্ষ আয় করেছে মাত্র ১৫০ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বসফরাস প্রণালি দিয়ে পানামা খালের চেয়ে তিন গুণেরও বেশি জাহাজ চলাচল করা সত্ত্বেও ইস্তাম্বুল খাল থেকে আয় মাত্র ১৫০ মিলিয়ন ডলার আর পানামা খালের আয় তার প্রায় ২৫ গুণ বেশি।

এর কারণ, বসফরাস একটি প্রাকৃতিক প্রণালি তাই এখান থেকে টোল আদায় করা সম্ভব না। আর মন্ট্রেক্স চুক্তির কারণে তুরস্ক শুধুমাত্র পথ দেখানো এবং অন্যান্য সার্ভিসের জন্য জাহাজ প্রতি নামমাত্র ৩ হাজার ৪০০ ডলার আদায় করতে পারে। এগুলো টোল না। তাই সরকারের যুক্তি হলো বসফরাসের অর্ধেক জাহাজও যদি ইস্তাম্বুল খাল দিয়ে যায় তাহলে বছরে অন্তত দুই আড়াই বিলিয়ন ডলার টোল আদায় করা সম্ভব।

এবার প্রশ্ন আসে বসফরাসে ফ্রি পারাপারের সুযোগ থাকতে জাহাজগুলো কেন নতুন খাল ব্যবহার করবে? এর উত্তর হলো। বর্তমানে বসফরাস দিয়ে পার হতে একটা জাহাজের ৮ থেকে ১৫ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। তুরস্ক চাইলে এই জাহাজ পারাপারে বিলম্ব করাতে পারে। অর্থাৎ বসফরাসের নিরাপত্তার অজুহাতে দৈনিক মালবাহী জাহাজ পারাপারের সংখ্যা কমিয়ে দিতে পারে। এবং বসফরাস দিয়ে অতিরিক্ত বড় মাপের জাহাজগুলোর চলাচল নিষিদ্ধও করে দিতে পারে। সে এখতিয়ার তুরস্কের আছে। মন্ট্রেক্স চুক্তি অনুযায়ীই তা সম্ভব। সুতরাং তুরস্কের সরকার চাচ্ছে এ পরিকল্পনাটি ব্যবহার করতে।

আর কার্গো শিপের দৈনিক ভাড়া ১০ থেকে ২০  হাজার ডলার। সুতরাং একটা জাহাজের এই প্রণালি পার হতে একদিন অপেক্ষা করা মানে এই বিশাল পরিমাণের অর্থ বসে বসে খরচ করা তাই এই জাহাজগুলো তখন অপেক্ষা করে অর্থ ও মালের ক্ষতি না করে বরং টোল দিয়ে হলেও বিকল্প পথে  যাবে। আর এভাবে যদি দৈনিক ৫০ টি জাহাজও পার হয় তাতেও বছরে আয় হবে আড়াই থেকে তিন বিলিয়ন ডলার। আর ওই খালএর তীর ঘেঁষে গড়ে উঠবে নতুন নতুন শহর যা গতি নিয়ে আসবে তুরস্কের অর্থনীতিতে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : সরোয়ার আলমের লেখাসমূহ