তুরস্কে যেভাবে সেনা অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয় (ভিডিও)
jugantor
তুরস্কে যেভাবে সেনা অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয় (ভিডিও)

  সরোয়ার আলম, আঙ্কারা, তুরস্ক থেকে  

১৫ জুলাই ২০২১, ২২:৫৩:৪৭  |  অনলাইন সংস্করণ

ফাইল ছবি

আজ থেকে পাঁচ বছর আগে ২০১৬ সালের ১৫ জুলাই। তুরস্কের জনগণ সারা বিশ্বকে অবাক করে দেয়। সাধারণ মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেয় স্মরণকালের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সেনা অভ্যুত্থানের চেষ্টা। প্রাণে বেঁচে যান এরদোয়ান। টিকে থাকে গণতন্ত্র। কিন্তু যে ক্ষতি সেদিন তুরস্কের হয়েছে তা আজও কাটিয়ে উঠতে পারেনি দেশটি।

কী ঘটেছিল সে দিন?

২০১৬ সালের গ্রীষ্মকালের এক শুক্রবার বিকাল। তুরস্কের রাষ্ট্রপতি এরদোগান পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অবোকাশ যাপন করছেন ভূমধ্যসাগরের তীরে। পড়ন্ত বিকালে নাতিদের নিয়ে সময় কাটাচ্ছেন সাগরের তীরে। তাদের সঙ্গে খেলার ছলেও হয়ত ভাবছেন দেশের ভবিষ্যত নিয়ে ভাবছেন মুসলিম বিশ্বের ভবিষ্যত নিয়ে। অথচ তখন আঙ্কারায় তারই বাসভবনের অদূরে একদল সামরিক এবং বেসামরিক লোক মিলে তাকে উৎখাতের ষড়যন্ত্র করছে। তাকে সপরিবারে হত্যার পরিকল্পনা করছে। তিনি খুনাক্ষরেও জানলেন না যে তাকে হত্যার পরিকল্পনায় আছে তারই সবচেয়ে কাছের মানুষটি। তারই অ্যাডজুটেন্ট।

দিনটি ছিল শুক্রবার। সপ্তাহের শেষ দিন। আঙ্কারায় গোয়েন্দা প্রধান অন্যদিনগুলোর মতই রুটিন কার্যক্রমে ব্যাস্ত তার অফিসে। এরদোয়ানের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ব্যাক্তি এই গোয়েন্দা প্রধান হাকান ফিদান। বিকাল তিনটায় গোয়েন্দা বা MIT হেডকোয়ার্টারে ঢুকেন একজন মেজর। জানান যে সেনাবাহিনীর মধ্য থেকে একটা অংশ ওইদিন রাত ৩ টায় অভ্যুত্থান ঘটানোর প্লান করছে। খবরটি নিয়ে চুলছেড়া বিশ্লেষণ করেন গোয়েন্দা প্রধান। বুঝতে পারেন ঘটনা সিরিয়াস। এক ঘণ্টা পরে সেনা সদরদপ্তরে যান নিজেই। এরদোয়ান তার অফিস বা বাসবভনে নেই। পরিবার নিয়ে ছুটিতে আছেন। ফোন দেন তাকে রিসিভ করেন এরদোয়ানের অ্যাডজুটেন্ট। তেমন কিছু বলেননি তাকে এরদোয়ান ঘুম থেকে উঠলে কথা বলতে চান বলে রেখে দেন ফোন। এই বিষয়ে কাউকে বিশ্বাস করছেন না গোয়েন্দা প্রধান।

সেনাপ্রধান জেনারেল হুলুসি আকারের সঙ্গে বৈঠক করেন। বিস্তারিত জানান। প্লান করার চেষ্টা করেন। সময় দ্রুত যাচ্ছে। সেনাবাহিনীতে সামরিক অভ্যুত্থান হবে। কিন্তু কে কে বা কারা কারা জড়িত স্পস্ট না। কাকে ধরবেন কাকে রুখবেন। সেনাবাহিনীতে জানাজানি হয়ে গেলে আরও বড় ঝামেলা হবে।

গোয়েন্দা প্রধান জানালেন সবচেয়ে বেশি আক্রমণাত্মক হবে বিমানবাহিনী। তাই সেনা প্রধান জরুরি আদেশ জারি করে দিলেন, পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত কোন বিমান বা হেলিকপ্টার উড়বে না। অভ্যুত্থানের প্লানকারীরা বুঝতে পারলো যে তাদের পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে গেছে। কিন্তু তারা পিছু হটার নয়। রাত তিনটায় যে অভ্যুত্থানের প্লান করেছিলো, তারা সেটি এগিয়ে নিয়ে আসে। সন্ধ্যা নয়টায় রাস্তায় নামে শত শত ট্যাঙ্ক, হাজার হাজার সৈন্য।

সেনাবাহিনী বন্ধ করে দেয় ইস্তাম্বুলের সব চেয়ে ব্যস্ত বসফরাস ব্রিজ। ব্রিজের উভয়মুখে স্থাপন করা হয় ডজন খানেক ট্যাঙ্ক। ইউরোপকে এশিয়া থেকে আলাদাকারীএই ব্রিজই ছিল অভ্যুত্থানকারী সেনাদের অন্যতম টার্গেটগুলোর একটি।

অন্যদিকে আটকে দেয়া হয় আঙ্কারা ইস্তাম্বুলের মূল সড়কগুলো। পুলিশ হেডকোয়ার্টার, গভর্নর অফিস, মেয়র অফিস, এরদোয়ানের পার্টি অফিস সহ সব গুরুত্বপূর্ণ অফিস গুলো ঘিরে রেখেছে ট্যাঙ্ক। ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই হতভম্ব। কিং কর্তব্য বিমুর। শহরের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে প্রচারিত টেলিভিশনের লাইভ সম্প্রচারের দেখা যায় ব্যাপক পরিমাণ সেনা উপস্থিতি। খবর ছড়িয়ে পরে.... সেনাবাহিনী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করছে। কিন্তু রাজনীতিবিদদের থেকে স্পষ্ট কোন দিক নির্দেশনা আসছে না।

প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইলদিরিমের গাড়িবহরে গুলি করছে সামরিক হেলিকপ্টার। তিনি হাইওয়ে টানেলে ঢুকে নিজেকে রক্ষা কোরছেন। সেখান থেকেই পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা কোরছেন। টেলিভিশনে বিবৃতি দিলেন। জানালেন সেনাবাহিনীর একটা অংশ সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা করছে কিন্তু এখানে চেইন অব কমান্ড নেই। তাই তারা সফল হবে না।

কিন্তু জনগণ তার কথায় ভরসা পাচ্ছে না। তারা জানতে চায় প্রেসিডেন্টের খবর। তারা জানতে চায় এরদোয়ান কেমন আছেন, কোথায় আছেন? তারা এরদোয়ানের কণ্ঠস্বর শুনতে চায়। কারণ এই কণ্ঠস্বর তাদের ভরসার স্থল। এই কণ্ঠস্বরে তারা আশ্বস্ত হয়। এই কণ্ঠস্বরের সঙ্গে তাদের আত্মার যোগাযোগ।

কিন্তু এরদোয়ানের কোন খোঁজ নেই। ততক্ষণে কিছু কিছু লোকজন রাস্তায় নেমেছেন। অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খবর ছড়িয়ে দিচ্ছেন। ট্যাঙ্কের গতিরোধে রাস্তা ব্লকের ডাক দিচ্ছেন। কি দিয়ে রাস্তা ব্লক করবেন। ট্যাঙ্কের সামনে কি নিয়ে দাঁড়াবেন। তাই তারা পার্কিং লট থেকে গাড়ি বের করে রাস্তায় নিয়ে আসেন। শখের গাড়ি ট্যাঙ্কের সামনে সপে দিলেন ডেমোক্রাসিকে বাঁচানোর জন্য। কারণ তুর্কিদের জন্য গণতন্ত্রের দরকার সবচেয়ে বেশি। বিগত সেনা অভ্যুত্থনের করুণ ইতিহাস তাদের চোখের সামনে ভাসছে তখনও।

রাস্তা বন্ধ করে দেয়া এই গাড়িগুলো গুড়িয়ে দেয় ট্যাঙ্কগুলো। নিরস্ত্র নিরীহ সাধারণ মানুষের ওপর নির্বিচারে হামলা চালায় সেনাবাহিনীর এই গ্রুপটি। রাজধানী আঙ্কারা, এবং তুরস্কের প্রাণকেন্দ্র ইস্তাম্বুলে বিরাজ করছিলো পুরো এক যুদ্ধ পরিস্থিতি। মাথার ওপর যুদ্ধ বিমানের গগণ বিদারী আওয়াজ, বিভিন্ন স্থাপনায় বিমান হামলা, সামরিক হেলিকপ্টার থেকে গনজমায়েতের উপর মুহুর্মুহুর গুলি, রাজপথে ট্যাঙ্ক। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে তুরস্কের মূল রাস্তাগুলো। ইস্তাম্বুলের বসফরাস প্রণালীর উপর নান্দনিক ঝুলন্ত সেতুটি দখল করে রেখেছে ট্যাঙ্ক এবং এক প্লাটুন সৈন্য।

সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। রাত দশটা, সাড়ে দশটা, এগারোটা রাষ্ট্রপতি রেজেপ তায়্যিপ এরদোয়ান তখনও কোথায় আছে কেউ জানে না। তবে সবাই এটা জানে যে এই সেনা অভ্যুত্থানের মূল টার্গেট হোলেন এরদোয়ান। তাকে হয়তো হত্যা করবে নয়তো আটকে রাখবে। জনগণ এরদোয়ানের জন্য দোয়া করছে। তার সম্পর্কে জানতে চাচ্ছে। কিন্তু তার কোন খবর নেই। কেউ বোলতে পারছে না সে কোথায়।

তারা জানে এরদোয়ানকে আটক করলে এই অভ্যুত্থান সফল হবে। আর এই অভ্যুত্থান সফল হলে তুরস্কের সব অর্জন শেষ হয়ে যাবে। শেষ হয়ে যাবে তুরস্কের গণতন্ত্র।অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে দেশটির ভবিষ্যৎ। শেষ হয়ে যাবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা লক্ষ কোটি মানুষের বাঁচার স্বপ্ন। তাই লোকজন গণতন্ত্র রক্ষায় রাস্তায় নেমে আসে। যার যা আছে তাই দিয়ে ট্যাঙ্কের গতিরোধের চেষ্টা করে। যার কিছু নেই সে নিজেকে সঁপে দেয় ট্যাঙ্কের সামনে।

অন্যদিকে অভ্যুত্থানকারীরা যানে এরদোয়ান আছেন মারমারিসের একটি হোটেলে। তারা এরদোয়ানকে হত্যায় একটা চৌকশ দল পাঠায়। আদেশ দেয়া হয় এরদোয়ানকে সপরিবারে হত্যা করার।

তুরস্কে যেভাবে সেনা অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয় (ভিডিও)

 সরোয়ার আলম, আঙ্কারা, তুরস্ক থেকে 
১৫ জুলাই ২০২১, ১০:৫৩ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
ফাইল ছবি
ফাইল ছবি

আজ থেকে পাঁচ বছর আগে ২০১৬ সালের ১৫ জুলাই। তুরস্কের জনগণ সারা বিশ্বকে অবাক করে দেয়। সাধারণ মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেয় স্মরণকালের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সেনা অভ্যুত্থানের চেষ্টা। প্রাণে বেঁচে যান এরদোয়ান। টিকে থাকে গণতন্ত্র। কিন্তু যে ক্ষতি সেদিন তুরস্কের হয়েছে তা আজও কাটিয়ে উঠতে পারেনি দেশটি।

কী ঘটেছিল সে দিন? 

২০১৬ সালের গ্রীষ্মকালের এক শুক্রবার বিকাল। তুরস্কের রাষ্ট্রপতি এরদোগান পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অবোকাশ যাপন করছেন ভূমধ্যসাগরের তীরে। পড়ন্ত বিকালে নাতিদের নিয়ে সময় কাটাচ্ছেন সাগরের তীরে। তাদের সঙ্গে খেলার ছলেও হয়ত ভাবছেন দেশের ভবিষ্যত নিয়ে ভাবছেন মুসলিম বিশ্বের ভবিষ্যত নিয়ে। অথচ তখন আঙ্কারায় তারই বাসভবনের অদূরে একদল সামরিক এবং বেসামরিক লোক মিলে তাকে উৎখাতের ষড়যন্ত্র করছে। তাকে সপরিবারে হত্যার পরিকল্পনা করছে। তিনি খুনাক্ষরেও জানলেন না যে তাকে হত্যার পরিকল্পনায় আছে তারই সবচেয়ে কাছের মানুষটি। তারই অ্যাডজুটেন্ট।

দিনটি ছিল শুক্রবার। সপ্তাহের শেষ দিন। আঙ্কারায় গোয়েন্দা প্রধান অন্যদিনগুলোর মতই রুটিন কার্যক্রমে ব্যাস্ত তার অফিসে। এরদোয়ানের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ব্যাক্তি এই গোয়েন্দা প্রধান হাকান ফিদান। বিকাল তিনটায় গোয়েন্দা বা MIT হেডকোয়ার্টারে ঢুকেন একজন মেজর। জানান যে সেনাবাহিনীর মধ্য থেকে একটা অংশ ওইদিন রাত ৩ টায় অভ্যুত্থান ঘটানোর প্লান করছে। খবরটি নিয়ে চুলছেড়া বিশ্লেষণ করেন গোয়েন্দা প্রধান। বুঝতে পারেন ঘটনা সিরিয়াস। এক ঘণ্টা পরে সেনা সদরদপ্তরে যান নিজেই। এরদোয়ান তার অফিস বা বাসবভনে নেই। পরিবার নিয়ে ছুটিতে আছেন। ফোন দেন তাকে রিসিভ করেন এরদোয়ানের অ্যাডজুটেন্ট। তেমন কিছু বলেননি তাকে এরদোয়ান ঘুম থেকে উঠলে কথা বলতে চান বলে রেখে দেন ফোন। এই বিষয়ে কাউকে বিশ্বাস করছেন না গোয়েন্দা প্রধান। 

সেনাপ্রধান জেনারেল হুলুসি আকারের সঙ্গে বৈঠক করেন। বিস্তারিত জানান। প্লান করার চেষ্টা করেন। সময় দ্রুত যাচ্ছে। সেনাবাহিনীতে সামরিক অভ্যুত্থান হবে। কিন্তু কে কে বা কারা কারা জড়িত স্পস্ট না। কাকে ধরবেন কাকে রুখবেন। সেনাবাহিনীতে জানাজানি হয়ে গেলে আরও বড় ঝামেলা হবে। 

গোয়েন্দা প্রধান জানালেন সবচেয়ে বেশি আক্রমণাত্মক হবে বিমানবাহিনী। তাই সেনা প্রধান জরুরি আদেশ জারি করে দিলেন, পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত কোন বিমান বা হেলিকপ্টার উড়বে না। অভ্যুত্থানের প্লানকারীরা বুঝতে পারলো যে তাদের পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে গেছে। কিন্তু তারা পিছু হটার নয়। রাত তিনটায় যে অভ্যুত্থানের প্লান করেছিলো, তারা সেটি এগিয়ে নিয়ে আসে। সন্ধ্যা নয়টায় রাস্তায় নামে শত শত ট্যাঙ্ক, হাজার হাজার সৈন্য। 

সেনাবাহিনী বন্ধ করে দেয় ইস্তাম্বুলের সব চেয়ে ব্যস্ত বসফরাস ব্রিজ। ব্রিজের উভয়মুখে স্থাপন করা হয় ডজন খানেক ট্যাঙ্ক। ইউরোপকে এশিয়া থেকে আলাদাকারী এই ব্রিজই ছিল অভ্যুত্থানকারী সেনাদের অন্যতম টার্গেটগুলোর একটি। 

অন্যদিকে আটকে দেয়া হয় আঙ্কারা ইস্তাম্বুলের মূল সড়কগুলো। পুলিশ হেডকোয়ার্টার, গভর্নর অফিস, মেয়র অফিস, এরদোয়ানের পার্টি অফিস সহ সব গুরুত্বপূর্ণ অফিস গুলো ঘিরে রেখেছে ট্যাঙ্ক। ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই হতভম্ব। কিং কর্তব্য বিমুর। শহরের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে প্রচারিত টেলিভিশনের লাইভ সম্প্রচারের দেখা যায় ব্যাপক পরিমাণ সেনা উপস্থিতি। খবর ছড়িয়ে পরে.... সেনাবাহিনী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করছে। কিন্তু রাজনীতিবিদদের থেকে স্পষ্ট কোন দিক নির্দেশনা আসছে না।

প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইলদিরিমের গাড়িবহরে গুলি করছে সামরিক হেলিকপ্টার। তিনি হাইওয়ে টানেলে ঢুকে নিজেকে রক্ষা কোরছেন। সেখান থেকেই পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা কোরছেন। টেলিভিশনে বিবৃতি দিলেন। জানালেন সেনাবাহিনীর একটা অংশ সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা করছে কিন্তু এখানে চেইন অব কমান্ড নেই। তাই তারা সফল হবে না। 

কিন্তু জনগণ তার কথায় ভরসা পাচ্ছে না। তারা জানতে চায় প্রেসিডেন্টের খবর। তারা জানতে চায় এরদোয়ান কেমন আছেন, কোথায় আছেন? তারা এরদোয়ানের কণ্ঠস্বর শুনতে চায়। কারণ এই কণ্ঠস্বর তাদের ভরসার স্থল। এই কণ্ঠস্বরে তারা আশ্বস্ত হয়। এই কণ্ঠস্বরের সঙ্গে তাদের আত্মার যোগাযোগ। 

কিন্তু এরদোয়ানের কোন খোঁজ নেই। ততক্ষণে কিছু কিছু লোকজন রাস্তায় নেমেছেন। অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খবর ছড়িয়ে দিচ্ছেন। ট্যাঙ্কের গতিরোধে রাস্তা ব্লকের ডাক দিচ্ছেন। কি দিয়ে রাস্তা ব্লক করবেন। ট্যাঙ্কের সামনে কি নিয়ে দাঁড়াবেন। তাই তারা পার্কিং লট থেকে গাড়ি বের করে রাস্তায় নিয়ে আসেন। শখের গাড়ি ট্যাঙ্কের সামনে সপে দিলেন ডেমোক্রাসিকে বাঁচানোর জন্য। কারণ তুর্কিদের জন্য গণতন্ত্রের দরকার সবচেয়ে বেশি। বিগত সেনা অভ্যুত্থনের করুণ ইতিহাস তাদের চোখের সামনে ভাসছে তখনও। 

রাস্তা বন্ধ করে দেয়া এই গাড়িগুলো গুড়িয়ে দেয় ট্যাঙ্কগুলো। নিরস্ত্র নিরীহ সাধারণ মানুষের ওপর নির্বিচারে হামলা চালায় সেনাবাহিনীর এই গ্রুপটি। রাজধানী আঙ্কারা, এবং তুরস্কের প্রাণকেন্দ্র ইস্তাম্বুলে বিরাজ করছিলো পুরো এক যুদ্ধ পরিস্থিতি। মাথার ওপর যুদ্ধ বিমানের গগণ বিদারী আওয়াজ, বিভিন্ন স্থাপনায় বিমান হামলা, সামরিক হেলিকপ্টার থেকে গনজমায়েতের উপর মুহুর্মুহুর গুলি, রাজপথে ট্যাঙ্ক। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে তুরস্কের মূল রাস্তাগুলো। ইস্তাম্বুলের বসফরাস প্রণালীর উপর নান্দনিক ঝুলন্ত সেতুটি দখল করে রেখেছে ট্যাঙ্ক এবং এক প্লাটুন সৈন্য। 

সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। রাত দশটা, সাড়ে দশটা, এগারোটা  রাষ্ট্রপতি রেজেপ তায়্যিপ এরদোয়ান তখনও কোথায় আছে কেউ জানে না। তবে সবাই এটা জানে যে এই সেনা অভ্যুত্থানের মূল টার্গেট হোলেন এরদোয়ান। তাকে হয়তো হত্যা করবে নয়তো আটকে রাখবে। জনগণ এরদোয়ানের জন্য দোয়া করছে। তার সম্পর্কে জানতে চাচ্ছে। কিন্তু তার কোন খবর নেই। কেউ বোলতে পারছে না সে কোথায়। 

তারা জানে এরদোয়ানকে আটক করলে এই অভ্যুত্থান সফল হবে। আর এই অভ্যুত্থান সফল হলে তুরস্কের সব অর্জন শেষ হয়ে যাবে। শেষ হয়ে যাবে তুরস্কের গণতন্ত্র।অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে দেশটির ভবিষ্যৎ। শেষ হয়ে যাবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা লক্ষ কোটি মানুষের বাঁচার স্বপ্ন। তাই লোকজন গণতন্ত্র রক্ষায় রাস্তায় নেমে আসে। যার যা আছে তাই দিয়ে ট্যাঙ্কের গতিরোধের চেষ্টা করে। যার কিছু নেই সে নিজেকে সঁপে দেয় ট্যাঙ্কের সামনে।

অন্যদিকে অভ্যুত্থানকারীরা যানে এরদোয়ান আছেন মারমারিসের একটি হোটেলে। তারা এরদোয়ানকে হত্যায় একটা চৌকশ দল পাঠায়। আদেশ দেয়া হয় এরদোয়ানকে সপরিবারে হত্যা করার। 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : সরোয়ার আলমের লেখাসমূহ

আরও খবর