দাবানল এবং তুরস্কের ভবিষ্যৎ রাজনীতি
jugantor
দাবানল এবং তুরস্কের ভবিষ্যৎ রাজনীতি

  সরোয়ার আলম, আঙ্কারা, তুরস্ক থেকে  

০৫ আগস্ট ২০২১, ১৬:২০:২৭  |  অনলাইন সংস্করণ

দাবানল নিয়ে রাজনৈতিক কলহ কোনোভাবেই তুরস্কের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে না।

তুরস্কে সংগঠিত দাবানলের তাণ্ডব অনেকটা কমলেও এখনও অনেক জায়গায় তাজ্বলছে।

১৫৬জায়গায় আগুন লেগেছিল। ১৪৭ জায়গায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসছে। এখনও ৯ জায়গায় আগুন জ্বলছে।

হয়তো শীঘ্রই সেগুলো নিয়ন্ত্রণে আসবে কিন্তু নতুন করে আবার তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করেছে সেই সঙ্গে বাতাসের আদ্রতাও কমতে শুরু করেছে। অর্থাৎ আরও বেশি গরম এবং আরও শুষ্ক আবহাওয়া। আগুন নিভাতে ভালোই বেগ পোহাতে হতে পারে।

এখন আসল যে প্রশ্নটি সামনে আসছে তা হলো এই আগুন কে বা কারা ঘটিয়েছে। এর পেছনে আসল উদ্দেশ্য কী?

এর আগেও আমি বলেছিলাম এই দাবানলের পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। সবার আগে এর দায় পড়বে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার ওপর।

প্রথমে আসবে দেশের নিরাপত্তা এবং সুরক্ষায় নিয়জিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং গোয়েন্দা সংস্থা। এরপর এই আগুনের দায় পড়বে বন মন্ত্রণালয়ের। এরা কেন এতো বড় একটা বিপর্যয় আসতে পারে জেনেও যথেষ্ট প্রস্তুতি নেয়নি তারা।

আরও বলেছিলাম এর পিছনে থাকতে পারে দেশী বিদেশী বিভিন্ন গ্রুপ ও সংস্থা। কারণ, এতগুলো জায়গায় একত্রে আগুন লাগা কাকতালীয় হতে পারে না। কিন্তু আসল বিষয় হলো কারা এই গ্রুপ ও সংস্থা।

বিরোধীরা এবং বিশেষ করে পশ্চিমা কিছু সাংবাদাইক এটাকে সরকারের পরিকল্পনা হিসেবে সামনে নিয়ে আসছে। তাদের যুক্তি হচ্ছে সরকার এই সব জায়গায় আরও বেশি হোটেল তৈরি করার জন্য এই আগুন লাগিয়েছে। কারণ পর্যটন মন্ত্রী বড় একজন ট্যুরিজম ব্যবসায়ী। তার অনেক বড় বড় হোটেল আছে বিভিন্ন জায়গায়। তিনি আরও নতুন নতুন হোটেল করতে চাচ্ছেন। কিন্তু এগুলো সস্তা রাজনীতি। নতুন কোন হোটেল করতে এত বিশাল জায়গা সরকারের প্লান করে পোড়ানোর দরকার নেই।

অন্যদিকে এই আগুনের পরে অনেক বড় ধরণের খাদ্য সংকটে পড়তে পারে তুরস্ক। যে সব এলাকায় এই আগুন লেগেছে পুরোটাই তুরস্কের সবচেয়ে উৎপাদনশীল এলাকা। প্রচুর খাদ্যশস্য উৎপাদন হয় ওই সব এলাকায়।

সরকার ক্ষতিপূরণ দিবে ঠিকই। কিন্তু ৪০ বছরে বড় করা জয়তুন গাছের বাগান, বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা খামার, শস্যক্ষেতনতুন করে দুই এক বছরে গড়ে তোলা সম্ভব না। সরকার এ পর্যন্ত ৫০ মিলিয়ন তুরকিশ লিরা অর্থাৎ পঞ্চাশ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। মানুষজন ওই সব এলাকায় রোপণের জন্য কয়েক কোটি চারা দান করেছে। সহয়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে আপামর জনগণ। হয়তো সবকিছু কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে।

এবার এই আগুন লাগানোর পিছনে অন্য যে সন্দেহগুলো আছে সেগুলো নিয়ে আলোচনা করি।

আগেই বলেছিলাম সন্ত্রাসী গোষ্ঠী পিকেকে এই কাজ করে থাকতে পারে। এবং তাদেরকে ইন্ধন দিতে পারে বিভিন্ন বিদেশী সংস্থা এবং রাষ্ট্র।

গতকাল পিকেকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটির "আগুন লাগানো ইউনিট" তুরস্কের এই জঙ্গলে আগুন লাগানোর দায় স্বীকার করেছে।

"আগুনের সন্তান" নামক এই ইউনিটি তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইটে দেয়া এক বিবৃতিতে এই আগুন লাগানোর ঘটনাকে তারা তুরস্ককে "ধ্বংসের আন্দোলন" বলে অভিহিত করেছে।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী তুরস্কের পূর্বাঞ্চল, সিরিয়ায়া এবং ইরাকে তুর্কি সেনাবাহিনীর পিকেকে বিরোধী সামরিক অভিযানের প্রতিশোধ হিসেবে এই আক্রমণ শুরু করেছে।

এর আগেও পিকেকের এই "আগুনের সন্তান"রা তুরস্কে অনেক বার জঙ্গলে আগুন দিয়েছে। যেমন ২০১৯ সালের আগস্টে তুরস্কে যতগুলো জায়গায় জঙ্গলে আগুন লেগেছে সবগুলোর দায় স্বীকার করেছে তাড়া এই একই নামের ওয়েবসাইট থেকে। সরকার এই ওয়েবসাইটকে বহুবার বন্ধও করেছে এবং যতবারই বন্ধ করেছে নতুন করে খুলেছে তারা। এ কারণে এই ওয়েবসাইট খুব মানসম্মত কোন ওয়েবসাইট না। যেমন এর ওয়েব এড্রেস দেখলে কোন নির্ভরযোগ্য ওয়েবসাইট মনে হবে না এগুলোকে।

কেউ কেউ ধারণা করতে পারেন যে এগুলো সরকারী গোয়েন্দা সংস্থার তৈরি কিছু ওয়েবসাইট তড়িঘড়ি করে পিকেকের উপর দোষ চাপিয়ে দিতে।

কিন্তু বিষয়টি যদি এভাবে দেখি। এই বিবৃতিটি কিন্তু পিকেকের কিছু খবরের সাইটে প্রথম এসেছে। যে ওয়েবসাইটগুলো অনেক বছর ধরে তাদের প্রোপাগান্ডা করে আসছে সেই খবরের সাইট এবং তাদের টুইটার আকাউন্টে তারা ফলাও করে ছাপিয়েছে। আবার আগুন নিয়ে এ ধরণের বিবৃতি আসার পরে পিকেকের মূল যে দলটি তারা কিন্তু উলটো বিবৃতি দিতে পারত। তারা বলতে পারত যে এই অগ্নিসংযোগ আমরা ঘটাই নি। এগুলো বানোয়াট। তারা কিন্তু এই ধরণের কোন বিবৃতি দেয়নি। এমনকি তারা অনেক আগের একটা বিবৃতিতে এরকম হুমকি দিয়েছিলো যে, যদি আমাদের হাতের অস্ত্র শেষ হয়ে যায় তাহলে ইস্তানবুলের রাস্তার গাড়ি, মারমারিস এবং বদরুমের জঙ্গল আর আন্তালিয়ার ফসল আমরা পুড়িয়ে দেব। তাই ধরে নেয়া যায় যে এগুলো তারা করিয়ে থাকতে পারে।

তবে গত বছর তুরস্কের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, যে পিকেকে তুরস্কে ন্যাচারাল ভাবে ঘটা দাবানলের কৃতিত্ব নিতে অনেকসময় দায় স্বীকার করে। আসলে এগুলো পিকেকে ঘটায় না।

এখন এগুলোকে পিকেকে ঘটিয়ে সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে চাপে ফেলতে চাইছে? না-কি না ঘটিয়েই এগুলোকে তাদের ঘটানো বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে চাপে রাখতে চাইছে? খতিয়ে দেখা দরকার। কারণ যদি পিকেকে এই আগুন লাগায় তাহলে এর দায়ভার পরবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপর। তারা ব্যর্থ হয়েছে দেশের নিরাপত্তা দিতে। তাই কে ঘটিয়েছে বলা মুশকিল।

আর বিদেশ থেকে যারা ইন্ধন দিতে পারে তাদের মধ্যে প্রথমেই আসবে গ্রীসের কথা। গ্রীস ওই ভূমধ্যসাগর এবং এজিয়ান সাগরীয় এলাকায় আক্রমণ আসবে বলে আগেই ঘোষণা দিয়েছিল আড়ালে আবডালে। এছাড়াও গত কয়েকবছর ধরে গ্রীস তুরস্কের বিরুদ্ধে অনেক আক্রমণাত্মক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। এজিয়ান সাগরে তুরস্কের তীরবর্তী অনেক দ্বীপে তারা সামরিক ঘাঁটি গড়েছে এবং সেনা উপস্থিতি বাড়িয়েছে। তাই এই আগুনের পিছনে ইন্ধন দিতে পারে গ্রীস। সঙ্গে থাকতেপারে আমেরিকা, ইসরাইল, আরব আমিরাত বা অন্য তুরস্ক বিরোধী দেশগুলো।

আরেকটি সন্দেহ হচ্ছে এই দাবানাল একটা আন্তর্জাতিক বড় ধরণের চক্রান্তের ফল। কিছুটা করোনা ভাইরাসের মত। এ বিষয়ে এখন বিস্তারিত আলোচনা করবো না।

আর সবেচে বড় যে যুক্তি সেটি হল, এই দাবানল, বৈশ্বিক উষ্ণতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফল। আপনি যদি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দিকে তাকান তাহলে দেখবেন প্রায় ৫০-৬০ টা দেশ কিন্তু এই দাবানলের আগুনে জ্বলছে। যেমন রাশিয়ার সাইবেরিয়া অঞ্চলে আগুনে পুড়ে গেছে বিশাল এরিয়া। ফ্রান্সের আয়তনের ৫ গুনেরও বেশি জায়গা পুড়ে গেছে সেখানে। এক মাস ধরে জ্বলছে সে আগুন। এছাড়াও ইতালি, স্পেন এবং গ্রীসে জ্বলছে দাবানল। গ্রীসে গত ৪৮ ঘণ্টায় ১০০ টিরও বেশি জায়গায় আগুন লেগেছে। আমেরিকার ১৩ টি প্রদেশে দাবানল জ্বলছে কয়েক সপ্তাহ ধরে এখনও নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না সেগুলো। এছাড়াও দাবানলে পুড়ছে বসনিয়া, ফ্রান্স, রোমানিয়া, কানাডা সহ দক্ষিণ আমেরিকার অনেক দেশ। এদিক থেকে বিবেচনা করলে তুরস্কের এই দাবানল অন্য দেশের মত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘটা কোন আগুনও বলতে পারেন। মানে স্বাভাবিক ভাবে ঘটা কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কেন পিকেকের ওই ইউনিটি এই আগুনের দায় স্বীকার করলো? আর দেশের রাজনীতিতে এর কেমন প্রভাব পড়বে?

সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনায় আসতে চায়। সেটা আত্মঘাতী বোমা হামলা হোক বা কোন সন্ত্রাসী আক্রমণ হোক অথবা জঙ্গলে আগুন লাগানোই হোক। কারণ, তাদের সমর্থকদের কাছে, তাদের স্পন্সরদের কাছে তারা তাদের কাজকর্ম প্রদর্শন করতে বাধ্য। তারা যে নিঃশেষ হয়ে যায়নি সেটা দেখাতে চায়। অর্থাৎ তারা শক্তি প্রদর্শন করতে চায়। এজন্য এমনকি অনেক সময় নিজেরা না ঘটালেও অনেক ঘটনা তারা ঘটিয়েছে বলে চালিয়ে দেয়।

তবে এই দাবানলের সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে তুরস্কের রাজনীতিতে। রাষ্ট্রপতি এরদোয়ান ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা সফর করেছেন এবং সব ধরণের ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দিয়েছেন। সেখানে তিনি বলেছেন যে এই আগুনের পিছনে নাশকতা এবং ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত পাচ্ছেন তারা। তিনি বলেন, আমাদের কলিজায় যারা আগুন দিয়েছে তাদের কলিজা ছিঁড়ে ফেলব।

যদিও দোষীদের খুজে বের করতে সরকারী সংস্থাগুলো বিস্তারিত তদন্ত করছে। কিন্তু তুরস্কের মত একটা দেশের রাষ্ট্রপতির এই ধরণের ইঙ্গিত অনেক অর্থ বহন করে। হয়তো তুরস্কের সরকারী সংস্থাগুলোও তাদের তদন্তের পর কোন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর উপর দোষ চাপিয়ে দিবে। অথবা সত্যি সত্যি তাদের তদন্তে কোন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নাম বেড়িয়ে আসবে। হয়তো পিকেকের নাম চলে আসবে। কিন্তু আসল খেলা শুরু হবে তার পরে।

রাজনৈতিক খেলা

খুব সম্ভবত আগামী বছর তুরস্কে নির্বাচন হবে। অর্থাৎ ২০২৩ সালে যে নির্বাচন হওয়ার কথা সেটি এগিয়ে নিয়ে আসতে পারেন এরদোয়ান। এবং আগামী বছরের সেই আগাম নির্বাচনের মাঠ পর্যায়ের কাজ ইতিমধ্যে শুরু করে দিয়েছে সব দল। সরকারী বিরোধী সব দল। কিন্তু এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় সরকারী দল। করোনা মোকাবেলা এবং অর্থনৈতিক সংকটকে কাটিয়ে উঠতে পারছে না। তাই এই সংকটে জনগণকে কনভিন্স করতে হিমশিম খাচ্ছে।

অন্যদিকে বিরোধীদের মধ্যে এখন এরদোয়ান বিরোধী ঐক্য অনেক শক্তিশালী। তাদের কথা যে কোনভাবেই হোক ঐক্যবদ্ধভাবে এরদোয়ানকে এবার হটাতেই হবে। তাই তারা ডানপন্থী বামপন্থি, সেকুলার ইসলামি, তুর্কি কুর্দি সব দল এক হয়েছে এরদোয়ানের বিরুদ্ধে।গত স্থানীয় নির্বাচনে তারা আঙ্কারা এবং ইস্তাবুলে সফলও হয়েছে। আর এখন তো অর্থনৈতিক সংকট তাই তাদের এবার সফল হওয়ার সম্ভবনা আরও বেশি।

এবার এরদোয়ানও হিমশিম খাচ্ছেন। ২০ বছর ধরে ক্ষমতায় থেকেই রাজনীতি নিয়ে খেলছেন। প্রতিবারই নির্বাচনে জিতেছেন। এমন কোন রাজনৈতিক চাল নেই যে তিনি ব্যবহার করেন নি। এখন কোন চাল চালবেন? জনগণকে এবার বোঝানো খুবই কঠিন। মানুষ আর্থিক সংকটে থাকলে, পেটে ভাত না থাকলে, আপনি ক্ষমতায় থেকে তাদেরকে সহজে বুঝ দিতে পারবেন না। কনভিন্স করতে পারবেন না। তখন আর নীতি কথায় কাজ হয় না। তখন ব্যবহার করতে হয় মোক্ষম অস্ত্র। হয়তো ধর্ম, নয়ত জাতীয়তাবাদ, নয়তো যুদ্ধ। এগুলোও এরদোয়ান ব্যবহার করেছেন অনেক বার। এবার একটাই মাত্র পথ খোলা তা হলো বিরোধীদের মধ্যে ভাঙ্গন ধরানো।

বিরোধীদের মধ্যে ভাঙন ধরানোর কৌশল

এই আগুন লাগা নিয়ে যদি তুরস্কের জনগণকে সরকার বুঝাতে পারে যে সত্যি সত্যিই এই আগুন লাগিয়েছে পিকেকে। তাহলে হয়তো বিভিন্ন এলাকায় পিকেকের বিরুদ্ধে মিছিল হবে। সরকার তখন পিকেকের বিরুদ্ধে আরও চড়াও হবে। দেশব্যাপী পিকেকের বিরুদ্ধে অভিযান চালাবে নিরাপত্তা বাহিনী । সে অভিযান হয়তো চলবে পিকেকে সমর্থিত কুর্দি রাজনৈতিক দল এইচডিপির বিরুদ্ধেও। কারণ, এই আগুনের দায় পড়বে এইচডিপি পার্টির ওপর।

তুর্কি জাতীয়তাবাদ আবার তুঙ্গে চলে যাবে। জাতীয়তাবাদী ইয়ি পার্টি এবং আতাতুর্কের সেক্যুলার সিএইচপি পার্টি তখন কুর্দি ইচডিপি পার্টির সঙ্গে করা এই অলিখিত ঐক্য নিয়ে চাপে পড়বে। তাদেরকে আস্তে আস্তে সরে আসতে হবে এইচডিপি থেকে। তাদের তখন পিকেকে এবং এইচডিপি বিরোধী বক্তব্য বিবৃতি দিতে হবে। এবং শেষ পর্যন্ত ভাঙন ধরবে ওই জোটে। একঘরে হয়ে পড়বে এইচডিপি। এছাড়াও এই এইচডিপি পার্টি বন্ধের জন্য একটা মামলা চলছে তুরস্কের আদালতে। সেক্ষেত্রেও সরকার জনগণের সমর্থন আদায় করতে পারবে। সব কিছু মিলিয়ে আগামী রাজনীতিতে এই বিষয়টিকে ভালভাবেই ব্যবহার করা হতে পারে।

আবার বিরোধীরা এটাকে সরকারের ব্যর্থতা বলবে। তারা গত কয়েক বছর ধরেই কৃষি খাতকে ধ্বংস করার জন্য সরকারকে দোষারোপ করছে। তাদের দাবি সরকার কৃষির উপর গুরুত্ব না দিয়ে বরং ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রি, পর্যটন খাত, বিল্ডিং কন্সট্রাকশন খাতে বেশী গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার সমর্থিত অল্প কিছু ব্যবসায়িকে আরও ধনী করার জন্য। এবার হয়তো তারা বলবে ট্যুরিজমকে এবং কন্সট্রাকশন খাতকে কাজ দেয়ার জন্য এই আগুন লাগানো হয়েছে। অর্থাৎ রাজনৈতিক এই কাদা ছোড়াছুড়ি চলবে আগামী নির্বাচন পর্যন্ত এবং রাজনৈতিক দলগুলো এই বিষটি সহ সব বিষয় নিয়েই রাজনীতি করবে।

এগুলো আসলে সবই অনুমানের উপর ভিত্তি করে বলা। হয়তো হতে পারে হয়ত হবে না।

কিন্তু এই দাবানলে মানুষের যে ক্ষতি, দেশের যে ক্ষতি, প্রকৃতির যে ক্ষতি, সর্বপরি বিশ্বের যে ক্ষতি হলো তার কি হবে? আগুন যেভাবেই লাগুক সরকার কি কোনোভাবে এর দায় এড়াতে পারবে?

আগুন নেভাতে কোন কোন দেশ এগিয়ে আসছে

ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ন্যাটোভুক্ত অনেক দেশ আগুন নেভাতে তুরস্ককে সাহায্যের প্রস্তাব দিয়েছিল কিন্তু তারা পর্তবর্রতীতে কোন সাহায্য পাঠায় নি। শুধুমাত্র ইউক্রেন, রাশিয়া, আজারবাইজান, কাতার, ইরান, স্পেন এবং ক্রোয়েশিয়া থেকে অগ্নি নির্বাপণ বিমান হেলিকপ্টার এবং দমকলবাহিনী এসেছে।

কিছু সংবাদপত্র অবশ্য দাবি করছে যে, গ্রীস, ইসরাইল, ফ্রান্স এবং জার্মানি তুরস্ককে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে; কিন্তু তুরস্ক অহংকার করে সেগুলোকে প্রত্যখ্যান করেছে। যদিও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এগুলোকে বানোয়াট বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।

তিনি বলেন, আমরা এখন এক দুর্যোগ মোকাবেলা করছি। আর দুর্যোগ মোকাবেলায় অহংকারের কোন জায়গা নেই।

ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কেমন?

যেহেতু এখনও আগুন জ্বলছে তাই পুরো ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করা এখনও সম্ভব হয়নি। তবে আগুন নেভার পরে যে দৃশ্য আমরা দেখছি তা কোন ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্প বা যুদ্ধ বিধ্বস্ত কোন অঞ্চলের চেয়েও করুন। কোন এলাকায় ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প বা যুদ্ধে ওই এলাকার সবগুলো ঘরের ক্ষতি হয়না। কিন্তু আগুন কাউকে বেঁছে বেঁছে পুড়ে না। আগুনে ধ্বংস হয় পুরো এলাকা।

যাইহোক, আমি এখনও আশা করি তুরস্কের এই দাবানল যেন হয় কাকতালীয়ভাবে ঘটা প্রাকৃতিক কোন দুর্যোগ। এর পিছনে যেন না থাকে দেশি বিদেশী কোন ইন্ধন। তা না হলে এই দাবানল নিয়ে আসবে আরও বড় রাজনৈতিক কলহ যা কোনোভাবেই তুরস্কের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে না।

দাবানল এবং তুরস্কের ভবিষ্যৎ রাজনীতি

 সরোয়ার আলম, আঙ্কারা, তুরস্ক থেকে 
০৫ আগস্ট ২০২১, ০৪:২০ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
দাবানল নিয়ে রাজনৈতিক কলহ কোনোভাবেই তুরস্কের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে না।
ফাইল ছবি

তুরস্কে সংগঠিত দাবানলের তাণ্ডব অনেকটা কমলেও এখনও অনেক জায়গায় তা জ্বলছে।  

১৫৬জায়গায় আগুন লেগেছিল। ১৪৭ জায়গায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসছে। এখনও ৯ জায়গায় আগুন জ্বলছে।

হয়তো শীঘ্রই সেগুলো নিয়ন্ত্রণে আসবে কিন্তু নতুন করে আবার তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করেছে সেই সঙ্গে বাতাসের আদ্রতাও কমতে শুরু করেছে। অর্থাৎ আরও বেশি গরম এবং আরও শুষ্ক আবহাওয়া। আগুন নিভাতে ভালোই বেগ পোহাতে হতে পারে।

এখন আসল যে প্রশ্নটি সামনে আসছে তা হলো এই আগুন কে বা কারা ঘটিয়েছে। এর পেছনে আসল উদ্দেশ্য কী?

এর আগেও আমি বলেছিলাম এই দাবানলের পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। সবার আগে এর দায় পড়বে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার ওপর।

প্রথমে আসবে দেশের নিরাপত্তা এবং সুরক্ষায় নিয়জিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং গোয়েন্দা সংস্থা। এরপর এই আগুনের দায় পড়বে বন মন্ত্রণালয়ের। এরা কেন এতো বড় একটা বিপর্যয় আসতে পারে জেনেও যথেষ্ট প্রস্তুতি নেয়নি তারা।

আরও বলেছিলাম এর পিছনে থাকতে পারে দেশী বিদেশী বিভিন্ন গ্রুপ ও সংস্থা। কারণ, এতগুলো জায়গায় একত্রে আগুন লাগা কাকতালীয় হতে পারে না। কিন্তু আসল বিষয় হলো কারা এই গ্রুপ ও সংস্থা।

বিরোধীরা এবং বিশেষ করে পশ্চিমা কিছু সাংবাদাইক এটাকে সরকারের পরিকল্পনা হিসেবে সামনে নিয়ে আসছে। তাদের যুক্তি হচ্ছে সরকার এই সব জায়গায় আরও বেশি হোটেল তৈরি করার জন্য এই আগুন লাগিয়েছে। কারণ পর্যটন মন্ত্রী বড় একজন ট্যুরিজম ব্যবসায়ী। তার অনেক বড় বড় হোটেল আছে বিভিন্ন জায়গায়। তিনি আরও নতুন নতুন হোটেল করতে চাচ্ছেন। কিন্তু  এগুলো সস্তা রাজনীতি। নতুন কোন হোটেল করতে এত বিশাল জায়গা সরকারের প্লান করে পোড়ানোর দরকার নেই।

অন্যদিকে এই আগুনের পরে অনেক বড় ধরণের খাদ্য সংকটে পড়তে পারে তুরস্ক। যে সব এলাকায় এই আগুন লেগেছে পুরোটাই তুরস্কের সবচেয়ে উৎপাদনশীল এলাকা। প্রচুর খাদ্যশস্য উৎপাদন হয় ওই সব এলাকায়।

সরকার ক্ষতিপূরণ দিবে ঠিকই। কিন্তু ৪০ বছরে বড় করা জয়তুন গাছের বাগান, বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা খামার, শস্যক্ষেত নতুন করে দুই এক বছরে গড়ে তোলা সম্ভব না। সরকার এ পর্যন্ত ৫০ মিলিয়ন তুরকিশ লিরা  অর্থাৎ পঞ্চাশ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। মানুষজন ওই সব এলাকায় রোপণের জন্য কয়েক কোটি চারা দান করেছে। সহয়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে আপামর জনগণ। হয়তো সবকিছু কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে। 

এবার এই আগুন লাগানোর পিছনে অন্য যে সন্দেহগুলো আছে সেগুলো নিয়ে আলোচনা করি। 

আগেই বলেছিলাম সন্ত্রাসী গোষ্ঠী পিকেকে এই কাজ করে থাকতে পারে। এবং তাদেরকে ইন্ধন দিতে পারে বিভিন্ন বিদেশী সংস্থা এবং রাষ্ট্র।

গতকাল পিকেকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটির "আগুন লাগানো ইউনিট" তুরস্কের এই জঙ্গলে আগুন লাগানোর দায় স্বীকার করেছে।

"আগুনের সন্তান" নামক এই ইউনিটি তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইটে দেয়া এক বিবৃতিতে এই আগুন লাগানোর ঘটনাকে তারা তুরস্ককে "ধ্বংসের আন্দোলন" বলে অভিহিত করেছে।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী তুরস্কের পূর্বাঞ্চল, সিরিয়ায়া এবং ইরাকে তুর্কি সেনাবাহিনীর পিকেকে বিরোধী সামরিক অভিযানের প্রতিশোধ হিসেবে এই আক্রমণ শুরু করেছে।

এর আগেও পিকেকের এই "আগুনের সন্তান"রা তুরস্কে অনেক বার জঙ্গলে আগুন দিয়েছে। যেমন ২০১৯ সালের আগস্টে তুরস্কে যতগুলো জায়গায় জঙ্গলে আগুন লেগেছে সবগুলোর দায় স্বীকার করেছে তাড়া এই একই নামের ওয়েবসাইট থেকে। সরকার এই ওয়েবসাইটকে বহুবার বন্ধও করেছে এবং যতবারই বন্ধ করেছে নতুন করে খুলেছে তারা। এ কারণে এই ওয়েবসাইট খুব মানসম্মত কোন ওয়েবসাইট না। যেমন এর ওয়েব এড্রেস দেখলে কোন নির্ভরযোগ্য ওয়েবসাইট মনে হবে না এগুলোকে।

কেউ কেউ ধারণা করতে পারেন যে এগুলো সরকারী গোয়েন্দা সংস্থার তৈরি কিছু ওয়েবসাইট তড়িঘড়ি করে পিকেকের উপর দোষ চাপিয়ে দিতে। 

কিন্তু বিষয়টি যদি এভাবে দেখি। এই বিবৃতিটি কিন্তু পিকেকের কিছু খবরের সাইটে প্রথম এসেছে। যে ওয়েবসাইটগুলো অনেক বছর ধরে তাদের প্রোপাগান্ডা করে আসছে সেই খবরের সাইট এবং তাদের টুইটার আকাউন্টে তারা ফলাও করে ছাপিয়েছে। আবার  আগুন নিয়ে এ ধরণের বিবৃতি আসার পরে পিকেকের মূল যে দলটি তারা কিন্তু উলটো  বিবৃতি দিতে পারত। তারা বলতে পারত যে এই অগ্নিসংযোগ আমরা ঘটাই নি। এগুলো বানোয়াট। তারা কিন্তু এই ধরণের কোন বিবৃতি দেয়নি। এমনকি তারা অনেক আগের একটা বিবৃতিতে এরকম হুমকি দিয়েছিলো যে, যদি আমাদের হাতের অস্ত্র শেষ হয়ে যায় তাহলে ইস্তানবুলের রাস্তার গাড়ি, মারমারিস এবং বদরুমের জঙ্গল আর আন্তালিয়ার ফসল আমরা পুড়িয়ে দেব। তাই ধরে নেয়া যায় যে এগুলো তারা করিয়ে থাকতে পারে।

তবে গত বছর তুরস্কের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, যে পিকেকে তুরস্কে ন্যাচারাল ভাবে ঘটা দাবানলের কৃতিত্ব নিতে অনেকসময় দায় স্বীকার করে। আসলে এগুলো পিকেকে ঘটায় না। 

এখন এগুলোকে পিকেকে ঘটিয়ে সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে চাপে ফেলতে চাইছে? না-কি না ঘটিয়েই এগুলোকে তাদের ঘটানো বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে চাপে রাখতে চাইছে? খতিয়ে দেখা দরকার। কারণ যদি পিকেকে এই আগুন লাগায় তাহলে এর দায়ভার পরবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপর। তারা ব্যর্থ হয়েছে দেশের নিরাপত্তা দিতে। তাই কে ঘটিয়েছে বলা মুশকিল।

আর বিদেশ থেকে যারা ইন্ধন দিতে পারে তাদের মধ্যে প্রথমেই আসবে গ্রীসের কথা। গ্রীস ওই ভূমধ্যসাগর এবং এজিয়ান সাগরীয় এলাকায় আক্রমণ আসবে বলে আগেই ঘোষণা দিয়েছিল আড়ালে আবডালে। এছাড়াও গত কয়েকবছর ধরে গ্রীস তুরস্কের বিরুদ্ধে অনেক আক্রমণাত্মক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। এজিয়ান সাগরে তুরস্কের তীরবর্তী অনেক দ্বীপে তারা সামরিক ঘাঁটি গড়েছে এবং সেনা উপস্থিতি বাড়িয়েছে। তাই এই আগুনের পিছনে ইন্ধন দিতে পারে গ্রীস। সঙ্গে থাকতেপারে আমেরিকা, ইসরাইল, আরব আমিরাত বা অন্য তুরস্ক বিরোধী দেশগুলো।

আরেকটি সন্দেহ হচ্ছে এই দাবানাল একটা আন্তর্জাতিক বড় ধরণের চক্রান্তের ফল। কিছুটা করোনা ভাইরাসের মত।  এ বিষয়ে এখন বিস্তারিত আলোচনা করবো না। 

আর সবেচে বড় যে যুক্তি সেটি হল, এই দাবানল, বৈশ্বিক উষ্ণতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফল। আপনি যদি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দিকে তাকান তাহলে দেখবেন প্রায় ৫০-৬০ টা দেশ কিন্তু এই দাবানলের আগুনে জ্বলছে। যেমন রাশিয়ার সাইবেরিয়া অঞ্চলে আগুনে পুড়ে গেছে বিশাল এরিয়া। ফ্রান্সের আয়তনের ৫ গুনেরও  বেশি জায়গা পুড়ে গেছে সেখানে। এক মাস ধরে জ্বলছে সে আগুন। এছাড়াও ইতালি, স্পেন এবং গ্রীসে জ্বলছে দাবানল। গ্রীসে গত ৪৮ ঘণ্টায় ১০০ টিরও বেশি জায়গায় আগুন লেগেছে। আমেরিকার ১৩ টি প্রদেশে দাবানল জ্বলছে কয়েক সপ্তাহ ধরে এখনও নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না সেগুলো। এছাড়াও দাবানলে পুড়ছে বসনিয়া, ফ্রান্স, রোমানিয়া, কানাডা সহ দক্ষিণ আমেরিকার অনেক দেশ। এদিক থেকে বিবেচনা করলে তুরস্কের এই দাবানল অন্য দেশের মত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘটা কোন আগুনও বলতে পারেন। মানে স্বাভাবিক ভাবে ঘটা কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কেন পিকেকের ওই ইউনিটি এই আগুনের দায় স্বীকার করলো? আর দেশের রাজনীতিতে এর কেমন প্রভাব পড়বে?  

সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনায় আসতে চায়। সেটা আত্মঘাতী বোমা হামলা হোক বা কোন সন্ত্রাসী আক্রমণ হোক অথবা জঙ্গলে আগুন লাগানোই হোক। কারণ, তাদের সমর্থকদের কাছে, তাদের স্পন্সরদের কাছে তারা তাদের কাজকর্ম প্রদর্শন করতে বাধ্য। তারা যে নিঃশেষ হয়ে যায়নি সেটা দেখাতে চায়। অর্থাৎ তারা শক্তি প্রদর্শন করতে চায়। এজন্য এমনকি অনেক সময় নিজেরা না ঘটালেও অনেক ঘটনা তারা ঘটিয়েছে বলে চালিয়ে দেয়।

তবে এই দাবানলের সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে তুরস্কের রাজনীতিতে। রাষ্ট্রপতি এরদোয়ান ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা সফর করেছেন এবং সব ধরণের ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দিয়েছেন। সেখানে তিনি বলেছেন যে এই আগুনের পিছনে নাশকতা এবং ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত পাচ্ছেন তারা। তিনি বলেন, আমাদের কলিজায় যারা আগুন দিয়েছে তাদের কলিজা ছিঁড়ে ফেলব।

যদিও দোষীদের খুজে বের করতে সরকারী সংস্থাগুলো বিস্তারিত তদন্ত করছে। কিন্তু তুরস্কের মত একটা দেশের রাষ্ট্রপতির এই ধরণের ইঙ্গিত অনেক অর্থ বহন করে। হয়তো তুরস্কের সরকারী সংস্থাগুলোও তাদের তদন্তের পর কোন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর উপর দোষ চাপিয়ে দিবে। অথবা সত্যি সত্যি তাদের তদন্তে কোন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নাম বেড়িয়ে আসবে। হয়তো পিকেকের নাম চলে আসবে। কিন্তু আসল খেলা শুরু হবে তার পরে।

রাজনৈতিক খেলা 

খুব সম্ভবত আগামী বছর তুরস্কে নির্বাচন হবে। অর্থাৎ ২০২৩ সালে যে নির্বাচন হওয়ার কথা সেটি এগিয়ে নিয়ে আসতে পারেন এরদোয়ান। এবং আগামী বছরের সেই আগাম নির্বাচনের মাঠ পর্যায়ের কাজ ইতিমধ্যে শুরু করে দিয়েছে সব দল। সরকারী বিরোধী সব দল। কিন্তু এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় সরকারী দল। করোনা মোকাবেলা এবং অর্থনৈতিক সংকটকে কাটিয়ে উঠতে পারছে না। তাই এই সংকটে জনগণকে কনভিন্স করতে হিমশিম খাচ্ছে।

অন্যদিকে বিরোধীদের মধ্যে এখন এরদোয়ান বিরোধী ঐক্য অনেক শক্তিশালী। তাদের কথা যে কোনভাবেই হোক ঐক্যবদ্ধভাবে এরদোয়ানকে এবার হটাতেই হবে। তাই তারা ডানপন্থী বামপন্থি, সেকুলার ইসলামি, তুর্কি কুর্দি সব দল এক হয়েছে এরদোয়ানের বিরুদ্ধে।গত স্থানীয় নির্বাচনে তারা আঙ্কারা এবং ইস্তাবুলে সফলও হয়েছে। আর এখন তো অর্থনৈতিক সংকট তাই তাদের এবার সফল হওয়ার সম্ভবনা আরও বেশি।

এবার এরদোয়ানও হিমশিম খাচ্ছেন। ২০ বছর ধরে ক্ষমতায় থেকেই রাজনীতি নিয়ে খেলছেন। প্রতিবারই নির্বাচনে জিতেছেন। এমন কোন রাজনৈতিক চাল নেই যে তিনি ব্যবহার করেন নি। এখন কোন চাল চালবেন? জনগণকে এবার বোঝানো খুবই কঠিন। মানুষ আর্থিক সংকটে থাকলে, পেটে ভাত না থাকলে, আপনি ক্ষমতায় থেকে তাদেরকে সহজে বুঝ দিতে পারবেন না। কনভিন্স করতে পারবেন না। তখন আর নীতি কথায় কাজ হয় না। তখন ব্যবহার করতে হয় মোক্ষম অস্ত্র। হয়তো ধর্ম, নয়ত জাতীয়তাবাদ, নয়তো যুদ্ধ। এগুলোও এরদোয়ান ব্যবহার করেছেন অনেক বার। এবার একটাই মাত্র পথ খোলা তা হলো বিরোধীদের মধ্যে ভাঙ্গন ধরানো।

বিরোধীদের মধ্যে ভাঙন ধরানোর কৌশল 

এই আগুন লাগা নিয়ে যদি তুরস্কের জনগণকে সরকার বুঝাতে পারে যে সত্যি সত্যিই এই আগুন লাগিয়েছে পিকেকে। তাহলে হয়তো বিভিন্ন এলাকায় পিকেকের বিরুদ্ধে মিছিল হবে। সরকার তখন পিকেকের বিরুদ্ধে আরও চড়াও হবে। দেশব্যাপী পিকেকের বিরুদ্ধে অভিযান চালাবে নিরাপত্তা বাহিনী । সে অভিযান হয়তো চলবে পিকেকে সমর্থিত কুর্দি রাজনৈতিক দল এইচডিপির বিরুদ্ধেও। কারণ, এই আগুনের দায় পড়বে এইচডিপি পার্টির ওপর।

তুর্কি জাতীয়তাবাদ আবার তুঙ্গে চলে যাবে। জাতীয়তাবাদী ইয়ি পার্টি এবং আতাতুর্কের সেক্যুলার সিএইচপি পার্টি তখন কুর্দি ইচডিপি পার্টির সঙ্গে করা এই অলিখিত ঐক্য নিয়ে চাপে পড়বে। তাদেরকে আস্তে আস্তে সরে আসতে হবে এইচডিপি থেকে। তাদের তখন পিকেকে এবং এইচডিপি বিরোধী বক্তব্য বিবৃতি দিতে হবে। এবং শেষ পর্যন্ত ভাঙন ধরবে ওই জোটে। একঘরে হয়ে পড়বে এইচডিপি। এছাড়াও এই এইচডিপি পার্টি বন্ধের জন্য একটা মামলা চলছে তুরস্কের আদালতে। সেক্ষেত্রেও সরকার জনগণের সমর্থন আদায় করতে পারবে। সব কিছু মিলিয়ে আগামী রাজনীতিতে এই বিষয়টিকে ভালভাবেই ব্যবহার করা হতে পারে।

আবার বিরোধীরা এটাকে সরকারের ব্যর্থতা বলবে। তারা গত কয়েক বছর ধরেই কৃষি খাতকে ধ্বংস করার জন্য সরকারকে দোষারোপ করছে। তাদের দাবি সরকার কৃষির উপর গুরুত্ব না দিয়ে বরং ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রি, পর্যটন খাত, বিল্ডিং কন্সট্রাকশন খাতে বেশী গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার সমর্থিত অল্প কিছু ব্যবসায়িকে আরও ধনী করার জন্য।  এবার হয়তো তারা বলবে ট্যুরিজমকে এবং কন্সট্রাকশন খাতকে কাজ দেয়ার জন্য এই আগুন লাগানো হয়েছে। অর্থাৎ রাজনৈতিক এই কাদা ছোড়াছুড়ি চলবে আগামী নির্বাচন পর্যন্ত এবং রাজনৈতিক দলগুলো এই বিষটি সহ সব বিষয় নিয়েই রাজনীতি করবে।

এগুলো আসলে সবই অনুমানের উপর ভিত্তি করে বলা। হয়তো হতে পারে হয়ত হবে না। 

 কিন্তু এই দাবানলে মানুষের যে ক্ষতি, দেশের যে ক্ষতি, প্রকৃতির যে ক্ষতি, সর্বপরি বিশ্বের যে ক্ষতি হলো তার কি হবে? আগুন যেভাবেই লাগুক সরকার কি কোনোভাবে এর দায় এড়াতে পারবে?

আগুন নেভাতে কোন কোন দেশ এগিয়ে আসছে   

ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ন্যাটোভুক্ত অনেক দেশ আগুন নেভাতে তুরস্ককে সাহায্যের প্রস্তাব দিয়েছিল কিন্তু তারা পর্তবর্রতীতে কোন সাহায্য পাঠায় নি।  শুধুমাত্র ইউক্রেন, রাশিয়া, আজারবাইজান, কাতার, ইরান, স্পেন এবং ক্রোয়েশিয়া থেকে অগ্নি নির্বাপণ বিমান হেলিকপ্টার এবং দমকলবাহিনী এসেছে।  

কিছু সংবাদপত্র অবশ্য দাবি করছে যে, গ্রীস, ইসরাইল, ফ্রান্স এবং জার্মানি তুরস্ককে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে; কিন্তু তুরস্ক অহংকার করে সেগুলোকে প্রত্যখ্যান করেছে। যদিও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এগুলোকে বানোয়াট বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।

তিনি বলেন, আমরা এখন এক দুর্যোগ মোকাবেলা করছি। আর দুর্যোগ মোকাবেলায়  অহংকারের কোন জায়গা নেই। 

ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কেমন?

যেহেতু এখনও আগুন জ্বলছে তাই পুরো ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করা এখনও সম্ভব হয়নি। তবে আগুন নেভার পরে যে দৃশ্য আমরা দেখছি তা কোন ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্প বা যুদ্ধ বিধ্বস্ত কোন অঞ্চলের চেয়েও করুন। কোন এলাকায়  ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প বা যুদ্ধে ওই এলাকার সবগুলো ঘরের ক্ষতি হয়না। কিন্তু আগুন কাউকে বেঁছে বেঁছে পুড়ে না। আগুনে ধ্বংস হয় পুরো এলাকা।

যাইহোক, আমি এখনও আশা করি তুরস্কের এই দাবানল যেন হয় কাকতালীয়ভাবে ঘটা প্রাকৃতিক কোন দুর্যোগ। এর পিছনে যেন না থাকে দেশি বিদেশী কোন ইন্ধন। তা না হলে এই দাবানল নিয়ে আসবে আরও বড় রাজনৈতিক কলহ যা কোনোভাবেই তুরস্কের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে না। 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : সরোয়ার আলমের লেখাসমূহ