তালেবান কি ডুরান্ড লাইন মেনে নেবে?
jugantor
তালেবান কি ডুরান্ড লাইন মেনে নেবে?

  সরোয়ার আলম, আঙ্কারা, তুরস্ক  

১০ আগস্ট ২০২১, ১৬:২৮:৩০  |  অনলাইন সংস্করণ

ডুরান্ড লাইন ও তালেবান

আগামীর আফগানিস্তানে যখন তালেবানের ক্ষমতায় বসা অনেকটাই নিশ্চিত। তখন নতুন করেই সামনে আসছে দেশটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়টি। বিশেষ করে ভবিষ্যৎ আফগানিস্তানের সঙ্গে ইরান, রাশিয়া, চীন, তুরস্ক, ভারত এবং পাকিস্তানের সম্পর্ক কেমন হবে সে বিষয়ে চলছে ব্যাপক বিশ্লেষণ।

তুরস্ক-আফগানিস্তান সম্পর্ক নিয়ে অনেক আলোচনা করেছি। ভবিষ্যতেও করবো। তালেবানের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা করেছি। তবে আজকে আলোচনা করবো বহুল আলোচিত ডুরান্ড লাইন নিয়ে। এই ডুরান্ড লাইন নিয়ে তালেবান কেমন নীতি অবলম্বন করতে পারে?

বহু বছর ধরে তালেবানের সবচেয়ে বড় সহযোগী দেশ হিসেবে পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের ভবিষ্যৎ সরকারের সম্পর্ক মধুর হওয়ারই কথা। এবং পাকিস্তান সেই সম্পর্ক আরও মধুর করার জন্য ইতিমধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপও নিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আসলেই কি পাকিস্তানের সঙ্গে তালেবান শাসিত আফগানিস্তানের সম্পর্ক মধুর হবে?
ইতিহাস বলে ভিন্ন কথা।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান নামক দেশটির জন্মের পর থেকে প্রায় সব সময়ই পাকিস্তানের সঙ্গে ২ হাজার ৬৪০ কিলোমিটার লম্বা সীমানার অধিকারী এই প্রতিবেশী রাষ্ট্রটি অর্থাৎ আফগানিস্তানের ছিল অস্থিতিশীল এবং টানাপোড়েনের সম্পর্ক। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলির মধ্যে পাক-আফগান বৈরী সম্পর্কের মূলে আছে ওই অঞ্চলে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের কুৎসিত রাজনীতি।
একটু পিছনের দিকে তাকালে দেখা যায়, আফগানিস্তান শত শত বছর ধরে স্বাধীন একটা রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

১৮৩০ সালের দিকে ব্রিটিশরা ভারত বর্ষ থেকে আফগানিস্তান, মধ্য এশিয়া এবং অটোম্যান সম্রাজ্যের মধ্য দিয়ে ইউরোপ পর্যন্ত একটা বাণিজ্যিক পথ চালু করার উদ্যোগ নেয়। এই বাণিজ্য পথের আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল আফগানিস্তানকে একটা বাফার স্টেটে পরিণত করে ক্রমবর্ধমান রাশিয়া সম্রাজ্যের ভারত মহাসাগর বা পারস্য উপসাগরে নামার রাস্তা বন্ধ করে দেয়া।
তখন এই আফগানিস্তান এবং তিব্বতকে নিজেদের পক্ষে টানতে রাশিয়া এবং ব্রিটেনের মধ্যে রাজনৈতিক এবং ডিপ্লোম্যাটিক যুদ্ধ শুরু হয়। ১৯০৭ সাল পর্যন্ত চলা এই শীতল যুদ্ধকে ইতিহাসে "দ্যা গ্রেট গেইম" হিসেবে উল্লেখ করা হয়। প্রায় পুরো উনিশ শতক ধরে, আফগানিস্তান আসলে রাশিয়া সম্রাজ্য এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মধ্যে তথাকথিত এই ‘গ্রেট গেম’ এর একটা গুরুত্বপূর্ণ গুটিতে পরিণত হয়।
রাশিয়া একের পর এক মধ্য এশীয় অঞ্চল দখল করতে শুরু করলে তার ক্রমবর্ধমান অগ্রগতি ব্রিটিশ ভারতের পামির সীমান্তবর্তী এলাকা পর্যন্ত চলে আসে। তখন ব্রিটিশ ভারত মধ্যএশিয় অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। কিন্তু আফগানিস্তানকে কোন ভাবেই বাগে আনতে পারছিল না। ব্রিটিশ রাজ তখন আফগানিস্তান দখল করতে কয়েকবার আক্রমণ চালায়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৮৮০ সালের দিকে দ্বিতীয় অ্যাংলো-আফগান যুদ্ধের পরে আফগানিস্তানের তখনকার আমির আসলে ব্রিটিশ রাজের হাতে এক ধরণের আটকা হয়ে পড়ে। তখন আফগানিস্তান আন্তর্জাতিক কর্মকাণ্ডের জন্য ব্রিটিশ রাজের অধীনে এবং অভ্যন্তরীণ কাজের ক্ষেত্রে স্বাধীন একটা দেশে পরিণত হয়।
কৌশলগত খাইবার পাসের নিয়ন্ত্রণ সুরক্ষার জন্য তখন ব্রিটিশ ভারত তাদেরই অধিনস্ত আফগান আমির আব্দুর রহমান খানকে একটা সীমান্ত চুক্তি করতে বাধ্য করে।

ব্রিটিশ ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্যার মর্টিমার ডুরান্ড এই সীমানা নির্ধারণী রেখাটি আঁকেন বলে এর নামকরণ হয় ডুরান্ড লাইন।

১৮৯৩ সালে স্বাক্ষরিত সেই ডুরান্ড লাইন চুক্তি কারণে আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় পশতুন এবং বেলুচিস্তান এলাকার পায় অর্ধেকটারও বেশি ব্রিটিশ ভারতের হাতে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। এতে পশতুন উপজাতিদের একতটা বড় অংশ ব্রিটিশ ভারতের অংশ হয়ে যায়, এবং বাকিটুকু আফগানিস্তানের অংশ হিসাবে থেকে যায়।

এই ডুরান্ড লাইন চুক্তিটির মধ্যমে তখন আফগানিস্তান এবং ব্রিটিশ ভারতের ২৬৪০ কিলোমিটার লম্বা এই সীমানা নির্ধারণ করা হয়। তখন পাকিস্তানের নাম গন্ধও ছিল না। কিন্তু এই ডুরান্ড লাইন তখন দেশের ভৌগোলিক সীমানা নির্ধারণের চেয়ে মূলত দুই দেশের প্রভাব বিস্তারের অঞ্চল হিসেবে বেশি গুরুত্ব পায়।

এই চুক্তির কারণেই আফগানিস্তান তার আরব সাগরের তীরবর্তী বেলুচিস্তান প্রদেশকে হারায় এবং সমুদ্রের সঙ্গে একমাত্র সংযোগস্থলটিও হাতছাড়া হয়ে যায়। আর তখন থেকেই আফগানিস্তান হয়ে পরে স্থলবেষ্টিত একটি দেশ।
অর্থাৎ এই ডুরান্ড লাইন চুক্তির কারণে মূলত পাখতুন বা পশতুন এবং বেলুচিস্তানের একটা বিশাল অংশ তখনকার আফগানিস্তানের হাতছাড়া হয়ে যায়। এবং এই পশতুন বা পাঠান এবং বেলুচ জাতিরা সীমানার দুই দুই দিকে ভাগ হয়ে যায়। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ওই অঞ্চলে বসবাসকারী পশতুনদের দৈনন্দিন জীবনে এই সীমানা তেমন কোন প্রভাব ফেলত না। তারা বিনা বাধায় ওই অঞ্চলে চলাচল করতে পারতো।

কিন্তু ঝামেলা বাঁধে ১৯৪৭ সালের পরে । যখন ব্রিটিশরা এই অঞ্চল ছেড়ে যায় এবং পাকিস্তান নামে একটা দেশের জন্ম হয়। যার পশ্চিম সীমানা অর্থাৎ আফগানিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তানের সীমানা নির্ধারণ হয় ব্রিটিশদের আঁকা সেই ডুরান্ড লাইনকে ভিত্তি করে।

ব্রিটিশরা ভারত ছাড়ার প্রস্তুতিকালে আফগানিস্তান তার এই সীমানা সংশোধনের দাবি তুলে জোড়েশোরেই। কিন্তু ব্রিটেন তখন এই অনুরোধ অস্বীকার করে।এবং একরকম জোড় করেই তখন সেই পুরাতন সীমানাকেই চাপিয়ে দেয় আফগানিস্তানের ওপর। তাইপাকিস্তানের জন্ম মেনে নিতে পারেনি আফগানিস্তান।

এমনকি ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান যখন জাতিসংঘে যোগ দেয়ার আবেদন করে, তখন একমাত্র আফগানিস্তানই তার সদস্যপদের বিরুদ্ধে ভেটো প্রদান করে। পরে অবশ্য ব্রিটেন এবং আমেরিকার চাপে সে ভেটো উঠিয়ে নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু আফগানিস্তান এই ডুরান্ড লাইন মেনে নেবে না বলে ঘোষণা দেয়। পাকিস্তানের মধ্যের পশতুন এবং বেলুচ অঞ্চল তার নিজস্ব ভূখণ্ড হিসেবে আখ্যায়িত করে।

তারপর থেকে বহুবার আলোচনায় আসে এই ডুরান্ড লাইন। এবং আফগানিস্তান এই সীমানা মানবে না বলে সরাসরি ঘোষণা দেয়। পাকিস্তান এক্ষেত্রে ব্রিটেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাপোর্ট নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার দোহাই দিয়ে এই লাইনকেই আফগানিস্তানের সঙ্গে তার আসল সীমানা হিসেবে গণ্য করে।
পরবর্তীকালে, আফগানিস্তান ঘোষণা করে যে পূর্ববর্তী ডুরান্ড লাইন চুক্তি এবং অ্যাংলো-আফগান চুক্তিগুলি অকার্যকর। কারণ আফগান শাসকরা তখন ব্রিটিশদের চাপে বাধ্য হয়েছিল এই অনৈতিক চুক্তি স্বাক্ষর করতে। এতে আফগানিস্তানের হাতছাড়া হয় বর্তমান সীমানা বা ডুরান্ড লাইন থেকে সিন্ধু নদী পর্যন্ত অঞ্চল।

এর পর স্নায়ুযুদ্ধের সময়, পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হয়ে ওঠে, এবং আফগানিস্তান সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকে কূটনৈতিক এবং সামরিক সহায়তা পায়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের বৃহত্তর শত্রুতা তখন আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানের মাঝেও ছড়িয়ে পড়ে। আর এই বিরোধ ডুরান্ড লাইন সমস্যার সমাধানকে বাধাগ্রস্থ করে।

১৯৭৯ সালে সোভিয়েত রাশিয়া যখন আফগানিস্তানে আক্রমণ করে তখন এই মার্কিন-পাকিস্তান পক্ষ রাশিয়ার বিরুদ্ধে আফগান মুজাহিদদের সমর্থন করে। আর এই মুজাহিদরা ছিল মূলত পশতুন উপজাতি অঞ্চল থেকে অর্থাৎ তারা ছিল পাঠান।

তখন থেকেই পাকিস্তান আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আরও বেশি নাক গলাতে শুরু করে। আসলে পাকিস্তানের জন্য একটা অস্থিতিশীল আফগানিস্তান মন্দের ভালো। কারণ, আফগানিস্তান যত স্থিতিশীল হবে, দেশটি তত শক্তিশালী হবে এবং যত সে শক্তিশালী হবে, ডুরান্ড লাইন নিয়ে ততই সোচ্চার হবে। আর শক্তিশালী এক আফগানিস্তানের ডুরান্ড লাইন না মানার অর্থ হল পাকিস্তানের অস্তিত্ব ধরে টান দেয়া।

যাহোক, ১৯৯২ সালে নাজিবুল্লাহ সরকারের পতনের মাধ্যমে রাশিয়ার পরাজয় হয়। কিন্তু সেটা মুজাহিদিনদের বিজয়ের পরিবর্তে বরং তাদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা এবং বিবাদ আরও বাড়িয়ে দেয়। বছরের পড় বছর রাশিয়ার বিরুদ্ধে জিহাদকারী এই মুজাহিদিনদের নিজেদের মধ্যে শুরু হয় ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। আর এই ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তখন দেশটিকে গৃহযুদ্ধের মধ্যে ঠেলে দেয়।

আর সেই অরাজকতার মধ্যে উদ্ভব হয় তালেবান নামক সংগঠনটির। এই তালেবানও মূলত মুজাহিদিনদের মতই পশতুনদের মধ্য থেকে গড়ে ওঠা একটা সংগঠন। আর পাকিস্তান তখন এই তালেবানকে সহযোগিতা করে ক্ষমতায় আসতে।

১৯৯৬ সালে তালেবান ক্ষমতায় আসলে মাত্র তিনটি দেশ তাদেরকে স্বীকৃতি দেয়। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং পাকিস্তান। পাকিস্তান তখন তালেবানের কাছ থেকে ডুরান্ড লাইনের স্বীকৃতি চায়। কিন্তু তালেবান সে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে। আর সে সময় তালেবান আসলে এই ডুরান্ড লাইন নিয়ে বিস্তারিত ভাববার সময়টুকুও পায়নি। এরই মধ্যে আবার শুরু হয় মার্কিন আগ্রাসন। তখন এই পাকিস্তানই আবার তালেবানের বিরুদ্ধে মার্কিনিদের সহযোগিতা করে।
কিন্তু গত ২০ বছরে মার্কিন সমর্থিত আফগানিস্তানের কোনো সরকারই এই ডুরান্ড লাইনকে স্বীকৃতি দেয়নি। এমনকি বর্তমান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি তালেবানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যে, তারা ক্ষমতায় এলে যেন ডুরান্ড লাইন মেনে না নেয়।

এর মাঝে জল অনেক গড়িয়েছে। পাকিস্তান এখন তালেবানকে সহযোগিতা করছে। তালেবানের রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসা প্রায় নিশ্চিত। তাই পাকিস্তান আশা করবে তালেবান সেই ১২৮ বছর আগের চুক্তি মেনে নিয়ে বর্তমান সীমানাকে স্বীকৃতি দেক।

অন্যদিকে তালেবান পশতুন জাতিগোষ্ঠী থেকে উদ্ভূত। তাই তারা এই লাইন মেনে নেয়া মানে পশতুনদের সঙ্গে এক ধরণের বিশ্বাসঘাতকতার সামিল। যদিও পাকিস্তানে বসবাসকারী বেশিরভাগ পশতুন/পাঠানই বর্তমান সীমারেখাকেই মেনে নিয়েছেন। তাদের এ নিয়ে তেমন মাথা ব্যাথা নেই। কিন্তু এই সীমানা লাইনের বিষয়টি এখনো অমীমাংসিত একটি বিষয় হিসেবে আফগানিস্তানের রাজনীতিতে জায়গা করে নিয়েছে।

তাই প্রশ্ন হচ্ছে তালেবান কি ডুরান্ড লাইন মেনে নিবে? নাকি রাষ্ট্র হিসেবে আফগানিস্তানের অধিকারের জন্য পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে?
অর্থাৎ, তালেবান ক্ষমতায় এলে ১২৮ বছর ধরে ঝুলে থাকা এই সমস্যার সমাধান করবে? নাকি, সিন্ধু নদ পর্যন্ত অঞ্চলকে তাদের নিজস্ব ভূমি হিসেবে ঘোষণা দিয়ে পাকিস্তানের অস্তিত্ব ধরে টান দিবে? নাকি এই সমস্যা জিইয়ে রাখার মাধ্যমে দু'দেশের মধ্যে সম্পর্কের টানাপড়েন চালিয়েই যাবে?

তালেবান কি ডুরান্ড লাইন মেনে নেবে?

 সরোয়ার আলম, আঙ্কারা, তুরস্ক 
১০ আগস্ট ২০২১, ০৪:২৮ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
ডুরান্ড লাইন ও তালেবান
তালেবান পশতুন জাতিগোষ্ঠী থেকে উদ্ভূত। ফাইল ছবি

আগামীর আফগানিস্তানে যখন তালেবানের ক্ষমতায় বসা অনেকটাই নিশ্চিত। তখন নতুন করেই সামনে আসছে দেশটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়টি। বিশেষ করে ভবিষ্যৎ আফগানিস্তানের সঙ্গে ইরান, রাশিয়া, চীন, তুরস্ক, ভারত এবং পাকিস্তানের সম্পর্ক কেমন হবে সে বিষয়ে চলছে ব্যাপক বিশ্লেষণ।

তুরস্ক-আফগানিস্তান সম্পর্ক নিয়ে অনেক আলোচনা করেছি। ভবিষ্যতেও করবো। তালেবানের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা করেছি। তবে আজকে আলোচনা করবো বহুল আলোচিত ডুরান্ড লাইন নিয়ে। এই ডুরান্ড লাইন নিয়ে তালেবান কেমন নীতি অবলম্বন করতে পারে? 

বহু বছর ধরে তালেবানের সবচেয়ে বড় সহযোগী দেশ হিসেবে পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের ভবিষ্যৎ সরকারের সম্পর্ক মধুর হওয়ারই কথা। এবং পাকিস্তান সেই সম্পর্ক আরও মধুর করার জন্য ইতিমধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপও নিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আসলেই কি পাকিস্তানের সঙ্গে তালেবান শাসিত আফগানিস্তানের সম্পর্ক মধুর হবে? 
ইতিহাস বলে ভিন্ন কথা। 

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান নামক দেশটির জন্মের পর থেকে প্রায় সব সময়ই পাকিস্তানের সঙ্গে ২ হাজার ৬৪০ কিলোমিটার লম্বা সীমানার অধিকারী এই প্রতিবেশী রাষ্ট্রটি অর্থাৎ আফগানিস্তানের ছিল অস্থিতিশীল এবং টানাপোড়েনের সম্পর্ক। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলির মধ্যে পাক-আফগান বৈরী সম্পর্কের মূলে আছে ওই অঞ্চলে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের কুৎসিত রাজনীতি।
একটু পিছনের দিকে তাকালে দেখা যায়, আফগানিস্তান শত শত বছর ধরে স্বাধীন একটা রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

১৮৩০ সালের দিকে ব্রিটিশরা ভারত বর্ষ থেকে আফগানিস্তান, মধ্য এশিয়া এবং অটোম্যান সম্রাজ্যের মধ্য দিয়ে ইউরোপ পর্যন্ত একটা বাণিজ্যিক পথ চালু করার উদ্যোগ নেয়। এই বাণিজ্য পথের আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল আফগানিস্তানকে একটা বাফার স্টেটে পরিণত করে ক্রমবর্ধমান রাশিয়া সম্রাজ্যের ভারত মহাসাগর বা পারস্য উপসাগরে নামার রাস্তা বন্ধ করে দেয়া।
তখন এই আফগানিস্তান এবং তিব্বতকে নিজেদের পক্ষে টানতে রাশিয়া এবং ব্রিটেনের মধ্যে রাজনৈতিক এবং ডিপ্লোম্যাটিক যুদ্ধ শুরু হয়। ১৯০৭ সাল পর্যন্ত চলা এই শীতল যুদ্ধকে ইতিহাসে "দ্যা গ্রেট গেইম" হিসেবে উল্লেখ করা হয়। প্রায় পুরো উনিশ শতক ধরে, আফগানিস্তান আসলে রাশিয়া সম্রাজ্য এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মধ্যে তথাকথিত এই ‘গ্রেট গেম’ এর একটা গুরুত্বপূর্ণ গুটিতে পরিণত হয়। 
রাশিয়া একের পর এক মধ্য এশীয় অঞ্চল দখল করতে শুরু করলে তার ক্রমবর্ধমান অগ্রগতি ব্রিটিশ ভারতের পামির সীমান্তবর্তী এলাকা পর্যন্ত চলে আসে। তখন ব্রিটিশ ভারত মধ্যএশিয় অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। কিন্তু আফগানিস্তানকে কোন ভাবেই বাগে আনতে পারছিল না। ব্রিটিশ রাজ তখন আফগানিস্তান দখল করতে কয়েকবার আক্রমণ চালায়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৮৮০ সালের দিকে দ্বিতীয় অ্যাংলো-আফগান যুদ্ধের পরে আফগানিস্তানের তখনকার আমির আসলে ব্রিটিশ রাজের হাতে এক ধরণের আটকা হয়ে পড়ে। তখন আফগানিস্তান আন্তর্জাতিক কর্মকাণ্ডের জন্য ব্রিটিশ রাজের অধীনে এবং অভ্যন্তরীণ কাজের ক্ষেত্রে স্বাধীন একটা দেশে পরিণত হয়। 
কৌশলগত খাইবার পাসের নিয়ন্ত্রণ সুরক্ষার জন্য তখন ব্রিটিশ ভারত তাদেরই অধিনস্ত আফগান আমির আব্দুর রহমান খানকে একটা সীমান্ত চুক্তি করতে বাধ্য করে। 

ব্রিটিশ ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্যার মর্টিমার ডুরান্ড এই সীমানা নির্ধারণী রেখাটি আঁকেন বলে এর নামকরণ হয় ডুরান্ড লাইন। 

১৮৯৩ সালে স্বাক্ষরিত সেই ডুরান্ড লাইন চুক্তি কারণে আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় পশতুন এবং বেলুচিস্তান এলাকার পায় অর্ধেকটারও বেশি ব্রিটিশ ভারতের হাতে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। এতে পশতুন উপজাতিদের একতটা বড় অংশ ব্রিটিশ ভারতের অংশ হয়ে যায়, এবং বাকিটুকু আফগানিস্তানের অংশ হিসাবে থেকে যায়।

এই ডুরান্ড লাইন চুক্তিটির মধ্যমে তখন আফগানিস্তান এবং ব্রিটিশ ভারতের ২৬৪০ কিলোমিটার লম্বা এই সীমানা নির্ধারণ করা হয়। তখন পাকিস্তানের নাম গন্ধও ছিল না। কিন্তু এই ডুরান্ড লাইন তখন দেশের ভৌগোলিক সীমানা নির্ধারণের চেয়ে মূলত দুই দেশের প্রভাব বিস্তারের অঞ্চল হিসেবে বেশি গুরুত্ব পায়। 

এই চুক্তির কারণেই আফগানিস্তান তার আরব সাগরের তীরবর্তী বেলুচিস্তান প্রদেশকে হারায় এবং সমুদ্রের সঙ্গে একমাত্র সংযোগস্থলটিও হাতছাড়া হয়ে যায়। আর তখন থেকেই আফগানিস্তান হয়ে পরে স্থলবেষ্টিত একটি দেশ। 
অর্থাৎ এই ডুরান্ড লাইন চুক্তির কারণে মূলত পাখতুন বা পশতুন এবং বেলুচিস্তানের একটা বিশাল অংশ তখনকার আফগানিস্তানের হাতছাড়া হয়ে যায়। এবং এই পশতুন বা পাঠান এবং বেলুচ জাতিরা সীমানার দুই দুই দিকে ভাগ হয়ে যায়। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ওই অঞ্চলে বসবাসকারী পশতুনদের দৈনন্দিন জীবনে এই সীমানা তেমন কোন প্রভাব ফেলত না। তারা বিনা বাধায় ওই অঞ্চলে চলাচল করতে পারতো। 

কিন্তু ঝামেলা বাঁধে ১৯৪৭ সালের পরে । যখন ব্রিটিশরা এই অঞ্চল ছেড়ে যায় এবং পাকিস্তান নামে একটা দেশের জন্ম হয়। যার পশ্চিম সীমানা অর্থাৎ আফগানিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তানের সীমানা নির্ধারণ হয় ব্রিটিশদের আঁকা সেই ডুরান্ড লাইনকে ভিত্তি করে। 

ব্রিটিশরা ভারত ছাড়ার প্রস্তুতিকালে আফগানিস্তান তার এই সীমানা সংশোধনের দাবি তুলে জোড়েশোরেই। কিন্তু ব্রিটেন তখন এই অনুরোধ অস্বীকার করে।এবং একরকম জোড় করেই তখন সেই পুরাতন সীমানাকেই চাপিয়ে দেয় আফগানিস্তানের ওপর। তাইপাকিস্তানের জন্ম মেনে নিতে পারেনি আফগানিস্তান। 

এমনকি ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান যখন জাতিসংঘে যোগ দেয়ার আবেদন করে, তখন একমাত্র আফগানিস্তানই তার সদস্যপদের বিরুদ্ধে ভেটো প্রদান করে। পরে অবশ্য ব্রিটেন এবং আমেরিকার চাপে সে ভেটো উঠিয়ে নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু আফগানিস্তান এই ডুরান্ড লাইন মেনে নেবে না বলে ঘোষণা দেয়। পাকিস্তানের মধ্যের পশতুন এবং বেলুচ অঞ্চল তার নিজস্ব ভূখণ্ড হিসেবে আখ্যায়িত করে।

তারপর থেকে বহুবার আলোচনায় আসে এই ডুরান্ড লাইন। এবং আফগানিস্তান এই সীমানা মানবে না বলে সরাসরি ঘোষণা দেয়। পাকিস্তান এক্ষেত্রে ব্রিটেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাপোর্ট নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার দোহাই দিয়ে এই লাইনকেই আফগানিস্তানের সঙ্গে তার আসল সীমানা হিসেবে গণ্য করে। 
পরবর্তীকালে, আফগানিস্তান ঘোষণা করে যে পূর্ববর্তী ডুরান্ড লাইন চুক্তি এবং অ্যাংলো-আফগান চুক্তিগুলি অকার্যকর। কারণ আফগান শাসকরা তখন ব্রিটিশদের চাপে বাধ্য হয়েছিল এই অনৈতিক চুক্তি স্বাক্ষর করতে। এতে আফগানিস্তানের হাতছাড়া হয় বর্তমান সীমানা বা ডুরান্ড লাইন থেকে সিন্ধু নদী পর্যন্ত অঞ্চল। 

এর পর স্নায়ুযুদ্ধের সময়, পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হয়ে ওঠে, এবং আফগানিস্তান সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকে কূটনৈতিক এবং সামরিক সহায়তা পায়। 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের বৃহত্তর শত্রুতা তখন আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানের মাঝেও ছড়িয়ে পড়ে। আর এই বিরোধ ডুরান্ড লাইন সমস্যার সমাধানকে বাধাগ্রস্থ করে।

১৯৭৯ সালে সোভিয়েত রাশিয়া যখন আফগানিস্তানে আক্রমণ করে তখন এই মার্কিন-পাকিস্তান পক্ষ রাশিয়ার বিরুদ্ধে আফগান মুজাহিদদের সমর্থন করে। আর এই মুজাহিদরা ছিল মূলত পশতুন উপজাতি অঞ্চল থেকে অর্থাৎ তারা ছিল পাঠান। 

তখন থেকেই পাকিস্তান আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আরও বেশি নাক গলাতে শুরু করে। আসলে পাকিস্তানের জন্য একটা অস্থিতিশীল আফগানিস্তান মন্দের ভালো। কারণ, আফগানিস্তান যত স্থিতিশীল হবে, দেশটি তত শক্তিশালী হবে এবং যত সে শক্তিশালী হবে, ডুরান্ড লাইন নিয়ে ততই সোচ্চার হবে। আর শক্তিশালী এক আফগানিস্তানের ডুরান্ড লাইন না মানার অর্থ হল পাকিস্তানের অস্তিত্ব ধরে টান দেয়া। 

যাহোক, ১৯৯২ সালে নাজিবুল্লাহ সরকারের পতনের মাধ্যমে রাশিয়ার পরাজয় হয়। কিন্তু সেটা মুজাহিদিনদের বিজয়ের পরিবর্তে বরং তাদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা এবং বিবাদ আরও বাড়িয়ে দেয়। বছরের পড় বছর রাশিয়ার বিরুদ্ধে জিহাদকারী এই মুজাহিদিনদের নিজেদের মধ্যে শুরু হয় ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। আর এই ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তখন দেশটিকে গৃহযুদ্ধের মধ্যে ঠেলে দেয়। 

আর সেই অরাজকতার মধ্যে উদ্ভব হয় তালেবান নামক সংগঠনটির। এই তালেবানও মূলত মুজাহিদিনদের মতই পশতুনদের মধ্য থেকে গড়ে ওঠা একটা সংগঠন। আর পাকিস্তান তখন এই তালেবানকে সহযোগিতা করে ক্ষমতায় আসতে। 

১৯৯৬ সালে তালেবান ক্ষমতায় আসলে মাত্র তিনটি দেশ তাদেরকে স্বীকৃতি দেয়। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং পাকিস্তান। পাকিস্তান তখন তালেবানের কাছ থেকে ডুরান্ড লাইনের স্বীকৃতি চায়। কিন্তু তালেবান সে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে। আর সে সময় তালেবান আসলে এই ডুরান্ড লাইন নিয়ে বিস্তারিত ভাববার সময়টুকুও পায়নি। এরই মধ্যে আবার শুরু হয় মার্কিন আগ্রাসন। তখন এই পাকিস্তানই আবার তালেবানের বিরুদ্ধে মার্কিনিদের সহযোগিতা করে। 
কিন্তু গত ২০ বছরে মার্কিন সমর্থিত আফগানিস্তানের কোনো সরকারই এই ডুরান্ড লাইনকে স্বীকৃতি দেয়নি। এমনকি বর্তমান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি তালেবানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যে, তারা ক্ষমতায় এলে যেন ডুরান্ড লাইন মেনে না নেয়।

এর মাঝে জল অনেক গড়িয়েছে। পাকিস্তান এখন তালেবানকে সহযোগিতা করছে। তালেবানের রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসা প্রায় নিশ্চিত। তাই পাকিস্তান আশা করবে তালেবান সেই ১২৮ বছর আগের চুক্তি মেনে নিয়ে বর্তমান সীমানাকে স্বীকৃতি দেক। 

অন্যদিকে তালেবান পশতুন জাতিগোষ্ঠী থেকে উদ্ভূত। তাই তারা এই লাইন মেনে নেয়া মানে পশতুনদের সঙ্গে এক ধরণের বিশ্বাসঘাতকতার সামিল। যদিও পাকিস্তানে বসবাসকারী বেশিরভাগ পশতুন/পাঠানই বর্তমান সীমারেখাকেই মেনে নিয়েছেন। তাদের এ নিয়ে তেমন মাথা ব্যাথা নেই। কিন্তু এই সীমানা লাইনের বিষয়টি এখনো অমীমাংসিত একটি বিষয় হিসেবে আফগানিস্তানের রাজনীতিতে জায়গা করে নিয়েছে। 

তাই প্রশ্ন হচ্ছে তালেবান কি ডুরান্ড লাইন মেনে নিবে? নাকি রাষ্ট্র হিসেবে আফগানিস্তানের অধিকারের জন্য পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে? 
অর্থাৎ, তালেবান ক্ষমতায় এলে ১২৮ বছর ধরে ঝুলে থাকা এই সমস্যার সমাধান করবে? নাকি, সিন্ধু নদ পর্যন্ত অঞ্চলকে তাদের নিজস্ব ভূমি হিসেবে ঘোষণা দিয়ে পাকিস্তানের অস্তিত্ব ধরে টান দিবে? নাকি এই সমস্যা জিইয়ে রাখার মাধ্যমে দু'দেশের মধ্যে সম্পর্কের টানাপড়েন চালিয়েই যাবে?

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : সরোয়ার আলমের লেখাসমূহ