কাবুল হামলার নেপথ্যে কে বা কারা? 
jugantor
কাবুল হামলার নেপথ্যে কে বা কারা? 

  সরোয়ার আলম, আঙ্কারা (তুরস্ক) থেকে  

২৮ আগস্ট ২০২১, ২২:৫২:২৪  |  অনলাইন সংস্করণ

ভয়াবহ ওই হামলায় ১৯০ জন নিহত হয়েছেন।

আমেরিকা-আফগানিস্তান থেকে পুরোপুরি চলে যাওয়ার আগেই হামলা হলো কাবুল বিমানবন্দরে। এ পর্যন্ত পাওয়া খবরে জানা গেছে, ভয়াবহ ওই হামলায় ১৯০ জন নিহত হয়েছেন। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। যাদের মধ্যে অন্তত ১৩ জন আমেরিকান সৈন্য এবং কিছু আছেন তালেবান সদস্য। আহত হয়েছেন কয়েকশো। এই হামলার পরে এর দায় স্বীকার করেছে আইএসআইএস।

কিন্তু এখন মূল প্রশ্ন হচ্ছে এই হামলার পেছনে আসল ইন্দনদাতা কে বা কারা এবং এই হামলায় তাদের উদ্দেশ্য কী?

হামলা করে আইএসআইএস এর দায় স্বীকার করেছে ঠিকই, কিন্তু পিছন থেকে তাদেরকে আসল ইন্ধনটা জুগিয়েছে কে? আর এখানে কার লাভ কতটুকু? যদিও এগুলো গোয়েন্দা বিভাগের কাজ। বিশ্বের বড় বড় গোয়েন্দা সংস্থা এগুলো নিয়ে কাজ করবে। তারা খুঁজে বের করবে। তবুও আমরা অন্তত আমাদের পর্যায় থেকে ঘটনাটাকে একটু মূল্যায়ন করতে পারি।

এই ঘটনার পেছনের দিকে যদি তাকাই তাহলে দেখা যাবে যে, এই হামলা আগে থেকেই আঁচ করতে পারে কমপক্ষে তিন চারটি দেশের গোয়েন্দা সংস্থা। আমেরিকা, জার্মানি, ব্রিটেন এবং ফ্রান্স।

হামলা যে কাবুল বিমানবন্দরের মূল ফটকে করা হবে তাও তারা জানতে পারে। আমেরিকা ওইদিন তার নাগরিকদের কাবুল বিমানবন্দরের গেট থেকে তাৎক্ষণিক সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। এমনকি ব্রিটেন থেকে বলা হয় যে, হামলা হবে আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে। এবং ঠিকই তার দুই তিন ঘণ্টার মধ্যেই হামলা হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তারা এই হামলার খবর কিভাবে জানলো? খুব সম্ভবত ফোনে আড়ি পেতে তাদের গোয়েন্দা সংস্থা জানতে পেরেছে। অথবা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর মধ্যে থাকা তাদের স্পাইদের মাধ্যমে। এখন এই হামলার প্রায় সবকিছুই, যেমন এটা যে আত্মঘাতী বোমা হামলা হবে, এটা যে শক্তিশালী হামলা হবে, এটা যে কাবুল বিমানবন্দরের গেটে হবে এবং এই হামলা যে ওইদিন বিকালেই হবে এসব কিছুই জানার পরও আমেরিকা বা ওই বিমানবন্দরের দায়িত্বে যারা ছিল তারা কী ধরণের পদক্ষেপ নিয়েছে?

তারা কি কোনো নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করেছে? করেনি।

পেন্টাগনের ভাষ্যমতে, তারা এ বিষয়ে তালেবানের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য শেয়ার করেছে। তালেবান তো এখনো ঠিক মত ক্ষমতায়ই বসতে পারেনি। তাদের নিরাপত্তা বেষ্টনী কতটা শক্তিশালী হতে পারে, যে আপনি তাদের কাছে এতো বড় একটা হামলা রক্ষার পুরো দায়িত্ব দেবেন।

এত নিখুঁত গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার পর যে কোনো দেশের গোয়েন্দা সংস্থা এবং নিরাপত্তা বাহিনী ২-৩-৪ বেষ্টনীর নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে। হয়তো আক্রমণকে পুরোপুরি ঠেকাতে না পারলেও অন্তত এর টার্গেট মিস করাতে সক্ষম হয় অথবা হতাহতের সংখ্যা কমানোর জন্য সচেষ্ট হয়।

যেখানে আমেরিকার ৪-৫ হাজার সৈন্য আছে, হয়ত সেখানে কয়েকশো গোয়েন্দাও আছে। এছাড়াও, ব্রিটেন এবং জার্মানির গোয়েন্দারা আছে সেখানে। কিন্তু তাদের কারোই এই হামলা ঠেকানোর চেষ্টার কোন খবর কোথাও দেখিনি।

আরেকটা প্রশ্ন, এত বড় বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য যে বিস্ফোরক দরকার সেগুলো বহন করে হামলাকারী ওই পর্যন্ত কিভাবে নিয়ে গেল। কারণ, বিস্ফোরণের পরে যে ধোয়ার কুণ্ডলী আমরা লক্ষ্য করলাম তা খুব সাধারণ কোনো বিস্ফোরণের হতে পারে না। এত বড় বিস্ফোরণের জন্য যে পরিমাণ বিস্ফোরকের দরকার তা বহন করে এত পথ পাড়ি দিয়ে ওই গেট পর্যন্ত যাওয়া চাট্টিখানি কথা না। কে তাকে বা তাদেরকে এই সুযোগ করে দিল?

আর এরকম হামলার খবর গণমাধ্যমে ছড়ানোরও বা উদ্দেশ্য কী? যখন গণমাধ্যমে আসলো যে- এরকম একটা হামলা হবে, গোয়েন্দা সংস্থা এবং সামরিক বাহিনী নিশ্চয়ই তারও কয়েক ঘণ্টা আগেই জেনেছে। এটা জানার পরে মানুষের মধ্যে উৎকণ্ঠা এবং আগ্রহ বাড়াতেই কি গণমধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

আরেকটা বিষয় দেখুন, এই হামলা যে হবে তা মোটামুটি নিশ্চিত। ধরুন আপনি প্রতিরোধ করতে পারছেন না। তাহলে কী করবেন? ওই এলাকায় চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করে দেবেন। তাৎক্ষণিক ওখানে আরও বেশি চেকপোস্ট বসাবেন। অথবা কিছুই না করতে পারলে হামলার স্থান থেকে মানুষ এবং সৈন্যদের দূরে সরিয়ে নিবেন।কিন্তু, তারা কী করলো। হামলা হবে জেনেও ওই গেট দিয়ে লোকজনের চলাচল অব্যাহত থাকবে বলে ঘোষণা দিল এবং লোকজনকে ভিতরে নেয়া অব্যহত রাখলো। বিমানবন্দরের ভিতরে ঢুকতে মরিয়া হাজার হাজার লোকের ভিড় আরও বাড়লো। পরে হলো সেই ভয়ংকর বিস্ফোরণ।

এখন সরাসরি হয়ত কারও দিকে আঙুল তুলে নির্দেশ করা আমাদের ঠিক হবে না। কিন্তু এই ঘটনায় যারা লাভবান হবে তারাই ঘটিয়েছে? এ রকম হামলা হলে সবচেয়ে বড় যে বিষয়টা দেখা দরকার তা হলো এই ঘটনার পর সবচেয়ে বড় লাভবান হবে কে বা কারা, সে বা তারাই এই ঘটনায় ঘটিয়েছে বা ইন্ধন জুগিয়েছে।

বিমানবন্দরে আক্রমণ হওয়ার আগেই আমেরিকা, ব্রিটেন এবং জার্মানি তো জানিয়েই দিয়েছে এটি আইএসআইএস নামক সেই কুখ্যাত সংগঠনটি ঘটাবে এই বিস্ফোরণ। কিন্তু এতে এই সংগঠনটির লাভ কী?

আমেরিকার সৈন্যরা আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যাওয়ার সময়, তালেবানের ক্ষমতা পাকাপোক্ত হবে এমন সময়, তাদের এই হামলা করে কী লাভ? তারা কি তাহলে চায় যে আমেরিকা আফগানিস্তান ছেড়ে চলে না যাক?

এই হামলার বাহানা দিয়ে আমেরিকা কোনো না কোনোভাবে আফগানিস্তানে থাকুক? এবং তাদের ওপর হামলা চালাক?

তারা যদি আসলেই অন্য কারো দ্বারা পরিচালিত না হয়, অথবা বা অন্য কারো স্বার্থে পরিচালিত কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী না হয় তাহলে এ রকমটি চাইবে না। কারণ, আমেরিকা চলে গেলে তো তাদেরই উপকার হওয়ার কথা।

আপনাদের অনেকেই প্রশ্ন করেছেন, আইএসআইএস নামক এই সংগঠনটি কী বা কাদের তৈরি। এর উত্তর আসলে সবারই জানা। তারপরও আসুন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে এর উত্তর শুনি।

Donald Trump: 'President Obama is the founder of Isis' অর্থাৎ, ট্রাম্প স্পষ্ট করেই বলেছেন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এবং হিলারি ক্লিনটন ২০১৩ সালে ইরাক থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের মাধ্যমে যে ‘পাওয়ার গ্যাপ’ তৈরি করেন সেখানেই তারা আরেকটা শক্তির আবির্ভাব ঘটান। যেটাকে তখন জুনিয়র ভার্সিটি টিম বা JV হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়। তখন থেকে যেখানেই আমেরিকা পাওয়ার গ্যাপ তৈরি করেছে সেখানেই এদের দিয়ে সেই গ্যাপ পূরণ করিয়েছে। যেমন, ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া এবং আরও অনেক জায়গায়।

এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা দরকার এই আইএসআইএস নামক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটি গত সাত বছরে যত হামলা বা আক্রমণ করেছে তার বেশিরভাগেই টার্গেট ছিল মুসলমান নিরীহ মানুষ, মুসলিম ধর্মীয় উপাসনালয় এবং মুসলিম নেতৃত্ব। তবে এই প্রথমবার তাদের সরাসরি হামলার স্বীকার হলো মার্কিন সেনারা। যদিও এর বাইরে ওখানেও যারা মারা গেছেন তাদের প্রায় সবাই মুসলমান।

আমেরিকার মধ্যেও আফগানিস্তান নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন পরিকল্পনা করছে এমন অনেক সংস্থা এবং সংগঠন আছে। যাদের সেখানে আছে নিজস্ব স্বার্থ। যেমন আমেরিকার রাজনৈতিক হর্তাকর্তারা চান একটা, সেনাবাহিনী চায় আরেকটা, গোয়েন্দা সংস্থা চায় অন্য কিছু। এর পরে আছে বড় বড় কোম্পানি, বিশ্বের সব নাম করা সমরাস্ত্র কোম্পানি, প্রাইভেট মিলিটারি কোম্পানি এরা সবাই আফগানিস্তানে নিজেদের স্বার্থে ভিন্ন ভিন্ন এজেন্ডা নিয়ে কাজ করছে। তাদের ওখানে আছে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র ব্যবসা।

এর পরে আছে মিডল ইস্টে আমেরিকার ঘনিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলো; তারাও চাইবে না আমেরিকা ওখান থেকে পুরোপুরি উঠে যাক। বা আমেরিকা উঠে গেলেও ওখানে যেন বিশৃঙ্খলা যেন চলতেই থাকে। আর এর মাধ্যমে আফগানিস্তানে যেই ক্ষমতায় আসুক তার সঙ্গে যেন সমঝোতা হয়।

এই হামলার একটা ফলাফল কিন্তু স্পষ্ট আর সেটা হল, এখন তালেবানের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হবে। তালেবান আর আমেরিকা আরও আগে থেকেই একত্রে আইএসআইএসের বিরুদ্ধে অপারেশন পরিচালনা করেছে। তাই তাদের মধ্যে এই আইএসআইএস বিরোধী বন্ধন আরও শক্তিশালী হবে। বিশেষ করে গোয়েন্দা যোগাযোগ। এই ঘটনার শুরু থেকেই কিন্তু মার্কিন প্রশাসন বলে আসছে যে, তারা তালেবানের সঙ্গে সার্বক্ষণিক গোয়েন্দা যোগাযোগ রক্ষা করছেন এবং ভবিষ্যতেও করবেন।

কিছুদিন আগে সিএইএ প্রধান সফর করেছেন কাবুল, সেখানে তিনি তালেবান নেতার সঙ্গে ৩ ঘণ্টা বৈঠক করেন।

আপনারা লক্ষ্য করবেন, একজন রাষ্ট্রপ্রধান আরকজন রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে যখন দ্বিপাক্ষিক বিষয় নিয়ে কোনো মিটিং করেন তখনও কিন্তু ৪৫ মিনিট বা এক ঘণ্টাই তাদের আলোচনার জন্য যথেষ্ট হয়। কিন্তু আমেরিকার গোয়েন্দা প্রধান উড়ে এলেন কাবুলে, বৈঠক করলেন তিন ঘণ্টা। তিনি নিশ্চয়ই চা মিষ্টি খাওয়া বা আড্ডা দিতে সেখানে যাননি। আর একজন গোয়েন্দা প্রধান আবোল তাবোল কথা বলে তো তিন ঘণ্টা পার করবেন না। তিনি রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়েও কথা বলবেন না। এমনকি তিনি নিশ্চয়ই তাদের বিগত গোয়েন্দা কার্যক্রমের ফিরিস্তি দিতেও সেখানে যাননি। তিনি নিশ্চয়ই ভবিষ্যৎ গোয়েন্দা পরিকল্পনা শেয়ার বা এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা বা চুক্তির জন্যই সেখানে গিয়েছেন।

আরও বেশি ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো, এই বৈঠকের কথা প্রচার করে দেয়া। ইচ্ছা করেই এই খবর মার্কিন মিডিয়াতে ছাড়া হয়েছে কোনো কোনো দেশকে বার্তা দেয়ার জন্য।

যাইহোক, আমার ধারণা কাবুলের এই হামলা তালেবান এবং আমেরিকার মাঝে গোয়েন্দা সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করবে। হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন যে ঘোষণা দিয়েছেন যে, ‘আমরা প্রতিশোধ নিবো’।

তিনি তার সেনা কমান্ডারদের অভিযান পরিচালনার জন্য পরিকল্পানা তৈরি করার নির্দেশ দিয়েছেন। এখন দেখার বিষয় হচ্ছে, তিনি এই আইএসআইএস বিরোধী অভিযান কোথায় পরিচালনা করেন? আফগানিস্তানে? নাকি অন্য কোন দেশে।

আফগানিস্তানে আইএসআইএস বিরোধী অভিযান পরিচালনা করলে তালেবানের সঙ্গে একত্রে করতে হবে, যা রাশিয়া এবং চীন মেনে নেবে না। আর অন্য কোথাও নতুন করে অভিযান পরিচালনা করতে হলে নতুন করে আন্তর্জাতিক জোট গঠন করতে হবে যা এই ধূলিষ্যাৎ হওয়া প্রেস্টিজ নিয়ে আমেরিকার পক্ষে করা খুব সহজ না।

তবে আজকের শেষ কথা হচ্ছে, তালেবানের দ্রুত কাবুল দখলে নেওয়া যেমন কাকতালীয় ছিল না; তেমনি কাবুল বিমানবন্দরের হামলাও কাকতালীয় না।

এখন দেখার বিষয় এর পেছনে, দরজার অন্তরালে কে কার সঙ্গে কোন ধরণের চুক্তি করে। আর সারা দুনিয়াকে বলে কয়ে, ঘোষণা দিয়ে, সারা দুনিয়ার মানুষের আকর্ষণ কেড়ে যে হামলা কাবুলে করা হলো তা কি এখানেই শেষ নাকি এটা বড় কোনো অশনি সংকেত।

নাকি এটা ওই অঞ্চলে নতুন করে এই তথাকথিত সন্ত্রাসবাদের নতুন অধ্যায়ের সূচনা? যদি তাই হয় তাহলে এর প্রভাবমুক্ত থাকতে পারবে না ওই অঞ্চলের কোনো দেশ। আর তখন একটা স্থিতিশীল আফগানিস্তানের স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই হয়েই রয়ে যাবে। আমরা আশা করবো এমনটি যেন না হয়।

কাবুল হামলার নেপথ্যে কে বা কারা? 

 সরোয়ার আলম, আঙ্কারা (তুরস্ক) থেকে 
২৮ আগস্ট ২০২১, ১০:৫২ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
ভয়াবহ ওই হামলায় ১৯০ জন নিহত হয়েছেন।
হামলার আগে মার্কিন সেনাবাহিনী ও অন্য নিরাপত্তাকর্মীরা আফগানদের ভিড় সামলানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ফাইল ছবি: নিউ ইয়র্ক টাইমস

আমেরিকা-আফগানিস্তান থেকে পুরোপুরি চলে যাওয়ার আগেই হামলা হলো কাবুল বিমানবন্দরে। এ পর্যন্ত পাওয়া খবরে জানা গেছে, ভয়াবহ ওই হামলায় ১৯০ জন নিহত হয়েছেন। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। যাদের মধ্যে অন্তত ১৩ জন আমেরিকান সৈন্য এবং কিছু আছেন তালেবান সদস্য। আহত হয়েছেন কয়েকশো। এই হামলার পরে এর দায় স্বীকার করেছে আইএসআইএস।

কিন্তু এখন মূল প্রশ্ন হচ্ছে এই হামলার পেছনে আসল ইন্দনদাতা কে বা কারা এবং এই হামলায় তাদের উদ্দেশ্য কী? 

হামলা করে আইএসআইএস এর দায় স্বীকার করেছে ঠিকই, কিন্তু পিছন থেকে তাদেরকে আসল ইন্ধনটা জুগিয়েছে কে? আর এখানে কার লাভ কতটুকু?  যদিও এগুলো গোয়েন্দা বিভাগের কাজ। বিশ্বের বড় বড় গোয়েন্দা সংস্থা এগুলো নিয়ে কাজ করবে। তারা খুঁজে বের করবে। তবুও আমরা অন্তত আমাদের পর্যায় থেকে ঘটনাটাকে একটু মূল্যায়ন করতে পারি। 

এই ঘটনার পেছনের দিকে যদি তাকাই তাহলে দেখা যাবে যে, এই হামলা আগে থেকেই আঁচ করতে পারে কমপক্ষে তিন চারটি দেশের গোয়েন্দা সংস্থা। আমেরিকা, জার্মানি, ব্রিটেন এবং ফ্রান্স। 

হামলা যে কাবুল বিমানবন্দরের মূল ফটকে করা হবে তাও তারা জানতে পারে। আমেরিকা ওইদিন তার নাগরিকদের কাবুল বিমানবন্দরের গেট থেকে তাৎক্ষণিক সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। এমনকি ব্রিটেন থেকে বলা হয় যে, হামলা হবে আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে। এবং ঠিকই তার দুই তিন ঘণ্টার মধ্যেই হামলা হয়েছে। 

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তারা এই হামলার খবর কিভাবে জানলো? খুব সম্ভবত ফোনে আড়ি পেতে তাদের গোয়েন্দা সংস্থা জানতে পেরেছে। অথবা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর মধ্যে থাকা তাদের স্পাইদের মাধ্যমে। এখন এই হামলার প্রায় সবকিছুই, যেমন এটা যে আত্মঘাতী বোমা হামলা হবে, এটা যে শক্তিশালী হামলা হবে, এটা যে কাবুল বিমানবন্দরের গেটে হবে এবং এই হামলা যে ওইদিন বিকালেই হবে এসব কিছুই জানার পরও আমেরিকা বা ওই বিমানবন্দরের দায়িত্বে যারা ছিল তারা কী ধরণের পদক্ষেপ নিয়েছে? 

তারা কি কোনো নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করেছে? করেনি। 

পেন্টাগনের ভাষ্যমতে, তারা এ বিষয়ে তালেবানের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য শেয়ার করেছে। তালেবান তো এখনো ঠিক মত ক্ষমতায়ই বসতে পারেনি। তাদের নিরাপত্তা বেষ্টনী কতটা শক্তিশালী হতে পারে, যে আপনি তাদের কাছে এতো বড় একটা হামলা রক্ষার পুরো দায়িত্ব দেবেন। 

এত নিখুঁত গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার পর যে কোনো দেশের গোয়েন্দা সংস্থা এবং নিরাপত্তা বাহিনী ২-৩-৪ বেষ্টনীর নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে। হয়তো আক্রমণকে পুরোপুরি ঠেকাতে না পারলেও অন্তত এর টার্গেট মিস করাতে সক্ষম হয় অথবা হতাহতের সংখ্যা কমানোর জন্য সচেষ্ট হয়। 

যেখানে আমেরিকার ৪-৫ হাজার সৈন্য আছে, হয়ত সেখানে কয়েকশো গোয়েন্দাও আছে। এছাড়াও, ব্রিটেন এবং জার্মানির গোয়েন্দারা আছে সেখানে। কিন্তু তাদের কারোই এই হামলা ঠেকানোর চেষ্টার কোন খবর কোথাও দেখিনি।

আরেকটা প্রশ্ন, এত বড় বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য যে বিস্ফোরক দরকার সেগুলো বহন করে হামলাকারী ওই পর্যন্ত কিভাবে নিয়ে গেল। কারণ, বিস্ফোরণের পরে যে ধোয়ার কুণ্ডলী আমরা লক্ষ্য করলাম তা খুব সাধারণ কোনো বিস্ফোরণের হতে পারে না। এত বড় বিস্ফোরণের জন্য যে পরিমাণ বিস্ফোরকের দরকার তা বহন করে এত পথ পাড়ি দিয়ে ওই গেট পর্যন্ত যাওয়া চাট্টিখানি কথা না। কে তাকে বা তাদেরকে এই সুযোগ করে দিল? 

আর এরকম হামলার খবর গণমাধ্যমে ছড়ানোরও বা উদ্দেশ্য কী? যখন গণমাধ্যমে আসলো যে- এরকম একটা হামলা হবে, গোয়েন্দা সংস্থা এবং সামরিক বাহিনী নিশ্চয়ই তারও কয়েক ঘণ্টা আগেই জেনেছে। এটা জানার পরে মানুষের মধ্যে উৎকণ্ঠা এবং আগ্রহ বাড়াতেই কি গণমধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। 

আরেকটা বিষয় দেখুন, এই হামলা যে হবে তা মোটামুটি নিশ্চিত। ধরুন আপনি প্রতিরোধ করতে পারছেন না। তাহলে কী করবেন? ওই এলাকায় চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করে দেবেন। তাৎক্ষণিক ওখানে আরও বেশি চেকপোস্ট বসাবেন। অথবা কিছুই না করতে পারলে হামলার স্থান থেকে মানুষ এবং সৈন্যদের দূরে সরিয়ে নিবেন। কিন্তু, তারা কী করলো। হামলা হবে জেনেও ওই গেট দিয়ে লোকজনের চলাচল অব্যাহত থাকবে বলে ঘোষণা দিল এবং লোকজনকে ভিতরে নেয়া অব্যহত রাখলো। বিমানবন্দরের ভিতরে ঢুকতে মরিয়া হাজার হাজার লোকের ভিড় আরও বাড়লো। পরে হলো সেই ভয়ংকর বিস্ফোরণ।

এখন সরাসরি হয়ত কারও দিকে আঙুল তুলে নির্দেশ করা আমাদের ঠিক হবে না। কিন্তু এই ঘটনায় যারা লাভবান হবে তারাই ঘটিয়েছে? এ রকম হামলা হলে সবচেয়ে বড় যে বিষয়টা দেখা দরকার তা হলো এই ঘটনার পর সবচেয়ে বড় লাভবান হবে কে বা কারা, সে বা তারাই এই ঘটনায় ঘটিয়েছে বা ইন্ধন জুগিয়েছে। 

বিমানবন্দরে আক্রমণ হওয়ার আগেই আমেরিকা, ব্রিটেন এবং জার্মানি তো জানিয়েই দিয়েছে এটি আইএসআইএস নামক সেই কুখ্যাত সংগঠনটি ঘটাবে এই বিস্ফোরণ। কিন্তু এতে এই সংগঠনটির লাভ কী? 

আমেরিকার সৈন্যরা আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যাওয়ার সময়, তালেবানের ক্ষমতা পাকাপোক্ত হবে এমন সময়, তাদের এই হামলা করে কী লাভ? তারা কি তাহলে চায় যে আমেরিকা আফগানিস্তান ছেড়ে চলে না যাক? 

এই হামলার বাহানা দিয়ে আমেরিকা কোনো না কোনোভাবে আফগানিস্তানে থাকুক? এবং তাদের ওপর হামলা চালাক? 

তারা যদি আসলেই অন্য কারো দ্বারা পরিচালিত না হয়, অথবা বা অন্য কারো স্বার্থে পরিচালিত কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী না হয় তাহলে এ রকমটি চাইবে না। কারণ, আমেরিকা চলে গেলে তো তাদেরই উপকার হওয়ার কথা। 

আপনাদের অনেকেই প্রশ্ন করেছেন, আইএসআইএস নামক এই সংগঠনটি কী বা কাদের তৈরি। এর উত্তর আসলে সবারই জানা। তারপরও আসুন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে এর উত্তর শুনি। 

Donald Trump: 'President Obama is the founder of Isis' অর্থাৎ, ট্রাম্প স্পষ্ট করেই বলেছেন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এবং হিলারি ক্লিনটন ২০১৩ সালে ইরাক থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের মাধ্যমে যে ‘পাওয়ার গ্যাপ’ তৈরি করেন সেখানেই তারা আরেকটা শক্তির আবির্ভাব ঘটান। যেটাকে তখন জুনিয়র ভার্সিটি টিম বা JV হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়। তখন থেকে যেখানেই আমেরিকা পাওয়ার গ্যাপ তৈরি করেছে সেখানেই এদের দিয়ে সেই গ্যাপ পূরণ করিয়েছে। যেমন, ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া এবং আরও অনেক জায়গায়। 

এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা দরকার এই আইএসআইএস নামক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটি গত সাত বছরে যত হামলা বা আক্রমণ করেছে তার বেশিরভাগেই টার্গেট ছিল মুসলমান নিরীহ মানুষ, মুসলিম ধর্মীয় উপাসনালয় এবং মুসলিম নেতৃত্ব। তবে এই প্রথমবার তাদের সরাসরি হামলার স্বীকার হলো মার্কিন সেনারা। যদিও এর বাইরে ওখানেও যারা মারা গেছেন তাদের প্রায় সবাই মুসলমান। 

আমেরিকার মধ্যেও আফগানিস্তান নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন পরিকল্পনা করছে এমন অনেক সংস্থা এবং সংগঠন আছে। যাদের সেখানে আছে নিজস্ব স্বার্থ। যেমন আমেরিকার রাজনৈতিক হর্তাকর্তারা চান একটা, সেনাবাহিনী চায় আরেকটা, গোয়েন্দা সংস্থা চায় অন্য কিছু। এর পরে আছে বড় বড় কোম্পানি, বিশ্বের সব নাম করা সমরাস্ত্র কোম্পানি, প্রাইভেট মিলিটারি কোম্পানি এরা সবাই আফগানিস্তানে নিজেদের স্বার্থে ভিন্ন ভিন্ন এজেন্ডা নিয়ে কাজ করছে। তাদের ওখানে আছে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র ব্যবসা।

এর পরে আছে মিডল ইস্টে আমেরিকার ঘনিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলো; তারাও চাইবে না আমেরিকা ওখান থেকে পুরোপুরি উঠে যাক। বা আমেরিকা উঠে গেলেও ওখানে যেন বিশৃঙ্খলা যেন চলতেই থাকে। আর এর মাধ্যমে আফগানিস্তানে যেই ক্ষমতায় আসুক তার সঙ্গে যেন সমঝোতা হয়। 

এই হামলার একটা ফলাফল কিন্তু স্পষ্ট আর সেটা হল, এখন তালেবানের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হবে। তালেবান আর আমেরিকা আরও আগে থেকেই একত্রে আইএসআইএসের বিরুদ্ধে অপারেশন পরিচালনা করেছে। তাই তাদের মধ্যে এই আইএসআইএস বিরোধী বন্ধন আরও শক্তিশালী হবে। বিশেষ করে গোয়েন্দা যোগাযোগ। এই ঘটনার শুরু থেকেই কিন্তু মার্কিন প্রশাসন বলে আসছে যে, তারা তালেবানের সঙ্গে সার্বক্ষণিক গোয়েন্দা যোগাযোগ রক্ষা করছেন এবং ভবিষ্যতেও করবেন। 

কিছুদিন আগে সিএইএ প্রধান সফর করেছেন কাবুল, সেখানে তিনি তালেবান নেতার সঙ্গে ৩ ঘণ্টা বৈঠক করেন। 

আপনারা লক্ষ্য করবেন, একজন রাষ্ট্রপ্রধান আরকজন রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে যখন দ্বিপাক্ষিক বিষয় নিয়ে কোনো মিটিং করেন তখনও কিন্তু ৪৫ মিনিট বা এক ঘণ্টাই তাদের আলোচনার জন্য যথেষ্ট হয়। কিন্তু আমেরিকার গোয়েন্দা প্রধান উড়ে এলেন কাবুলে, বৈঠক করলেন তিন ঘণ্টা। তিনি নিশ্চয়ই চা মিষ্টি খাওয়া বা আড্ডা দিতে সেখানে যাননি। আর একজন গোয়েন্দা প্রধান আবোল তাবোল কথা বলে তো তিন ঘণ্টা পার করবেন না। তিনি রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়েও কথা বলবেন না। এমনকি তিনি নিশ্চয়ই তাদের বিগত গোয়েন্দা কার্যক্রমের ফিরিস্তি দিতেও সেখানে যাননি। তিনি নিশ্চয়ই ভবিষ্যৎ গোয়েন্দা পরিকল্পনা শেয়ার বা এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা বা চুক্তির জন্যই সেখানে গিয়েছেন। 

আরও বেশি ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো, এই বৈঠকের কথা প্রচার করে দেয়া। ইচ্ছা করেই এই খবর মার্কিন মিডিয়াতে ছাড়া হয়েছে কোনো কোনো দেশকে বার্তা দেয়ার জন্য। 

যাইহোক, আমার ধারণা কাবুলের এই হামলা তালেবান এবং আমেরিকার মাঝে গোয়েন্দা সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করবে। হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন যে ঘোষণা দিয়েছেন যে, ‘আমরা প্রতিশোধ নিবো’। 

তিনি তার সেনা কমান্ডারদের অভিযান পরিচালনার জন্য পরিকল্পানা তৈরি করার নির্দেশ দিয়েছেন। এখন দেখার বিষয় হচ্ছে, তিনি এই আইএসআইএস বিরোধী অভিযান কোথায় পরিচালনা করেন? আফগানিস্তানে? নাকি অন্য কোন দেশে।
 
আফগানিস্তানে আইএসআইএস বিরোধী অভিযান পরিচালনা করলে তালেবানের সঙ্গে একত্রে করতে হবে, যা রাশিয়া এবং চীন মেনে নেবে না। আর অন্য কোথাও নতুন করে অভিযান পরিচালনা করতে হলে নতুন করে আন্তর্জাতিক জোট গঠন করতে হবে যা এই ধূলিষ্যাৎ হওয়া প্রেস্টিজ নিয়ে আমেরিকার পক্ষে করা খুব সহজ না। 

তবে আজকের শেষ কথা হচ্ছে, তালেবানের দ্রুত কাবুল দখলে নেওয়া যেমন কাকতালীয় ছিল না; তেমনি কাবুল বিমানবন্দরের হামলাও কাকতালীয় না। 

এখন দেখার বিষয় এর পেছনে, দরজার অন্তরালে কে কার সঙ্গে কোন ধরণের চুক্তি করে। আর সারা দুনিয়াকে বলে কয়ে, ঘোষণা দিয়ে, সারা দুনিয়ার মানুষের আকর্ষণ কেড়ে যে হামলা কাবুলে করা হলো তা কি এখানেই শেষ নাকি এটা বড় কোনো অশনি সংকেত। 

নাকি এটা ওই অঞ্চলে নতুন করে এই তথাকথিত সন্ত্রাসবাদের নতুন অধ্যায়ের সূচনা? যদি তাই হয় তাহলে এর প্রভাবমুক্ত থাকতে পারবে না ওই অঞ্চলের কোনো দেশ। আর তখন একটা স্থিতিশীল আফগানিস্তানের স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই হয়েই রয়ে যাবে। আমরা আশা করবো এমনটি যেন না হয়। 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : সরোয়ার আলমের লেখাসমূহ