তুরস্ক কেন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান কিনতে চায়?
jugantor
তুরস্ক কেন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান কিনতে চায়?

  সরোয়ার আলম, আঙ্কারা, তুরস্ক থেকে  

১৩ অক্টোবর ২০২১, ১৬:০৪:১৪  |  অনলাইন সংস্করণ

একটা দেশের বিমানবাহিনীকে শক্তিশালী করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হচ্ছে সর্বশেষ প্রযুক্তি সম্পন্ন যুদ্ধবিমান।

তুরস্ক নতুন করে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান কেনার আগ্রহ প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্রে চিঠি পাঠিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে— আঙ্কারা ৪০টি এফ-১৬ ব্লক 70 এবং ৮০টি যুদ্ধবিমান মডার্নেজেশন কিট কিনতে ইচ্ছুক।

তুরস্কের বিমানবহর পুরোটাই আমেরিকার যুদ্ধবিমান দিয়ে সাজানো। এদের মধ্যে আছে— এফ-৪ এবং এফ-১৬।

১৯৭৪ সালে এফ-৪ যুদ্ধবিমান কিনতে শুরু করে তুরস্ক এবং ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত এই বিমানগুলো সরবরাহ করে আমেরিকা। এই লম্বা সময় ধরে কয়েকশ এফ-৪ যুদ্ধবিমান পায় তুরস্ক। এর বেশিরভাগই এখন সার্ভিসে নেই। অবসর নিয়েছে। বাকিগুলো ২০২০ সালের দিকে সার্ভিস থেকে অবসর নেওয়ার কথা। কিন্তু এগুলোকে বারবার মডার্নাইজেশন করে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এদের জীবনকাল দীর্ঘায়িত করছে তুরস্কের সেনাবাহিনী। এমনকি এগুলোকে আরেকটু ঘষেমেজে ২০৩০ সাল পর্যন্ত ব্যবহার করতে চায় দেশটি।

অন্যদিকে তুরস্কের এফ-১৬ যুদ্ধবিমানের যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৩ সালে। তখন আমেরিকার সঙ্গে ১৬০টি বিমান কেনার চুক্তি হয়। এদের আটটি আমেরিকায় এবং ১৫২টি তুরস্কে উৎপাদনের কথা থাকে সে চুক্তিতে। তুরস্কের এরোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ বা TAI ১৯৮৭ সালে আমেরিকার সঙ্গে একত্রে এই বিমানগুলো উৎপাদন শুরু করে তুরস্কে।

শুরুর দিকের কাজগুলোকে বিমান তৈরি বলার চেয়ে বরং আমেরিকা থেকে সব যন্ত্রাংশ নিয়ে এসে তুরস্কে সেট করা বলা যায়। পরে আমেরিকা থেকে লাইসেন্স নিয়ে তুরস্কেই উৎপাদন করতে থাকে এই বিমানগুলো। দেশীয়ভাবে উৎপাদন করে প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ এবং সফটওয়্যার। ১৯৮০ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে ২৩২টি ব্লক ৩০/৪০/৫০ মডেলের এফ-১৬ তৈরি করে তাই। এভাবে তুরস্কের বিমানবহর সজ্জিত হয় এফ-১৬ যুদ্ধবিমান দিয়ে। তুরস্কের বিমানবাহিনীকে সর্বশেষ F-16 বিমান সরবরাহ করা হয় ২০১২ সালে। সেগুলো ছিল F-16D ব্লক 50+ মডেলের।

তুরস্কের TAI এই F-16 গুলো আধুনিকায়নেরও কাজ করে। মিসর, পাকিস্তান এবং জর্ডানের সেনাবাহিনীর এফ-১৬ যুদ্ধবিমানগুলোকেও মডার্নাইজ করে তুরস্কের এই এরোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ। মিসর বিমানবাহিনীর জন্য ৪৬টি ব্লক ৪০ মডেলের এফ-১৬ তৈরি করেছে তুরস্কের TAI.

আধুনিকায়নের মাধ্যমে যুদ্ধবিমানের আয়ু বাড়ানো এবং নতুন বা আপডেটেড প্রযুক্তি যোগ করা হয়। যেমন— স্বাভাবিকভাবে এফ-১৬ যুদ্ধবিমানগুলো ৮ হাজার ঘণ্টা বা ৩০-৩৫ বছর উড়ার পর অবসরে যায়। সে অনুযায়ী তুরস্কের কাছে যে এফ-১৬ আছে, তার অনেকগুলোর জীবনকাল শেষ হয়ে গেছে। তুরস্ক সেগুলোকেও মডার্নাইজেশন করে তাদের বয়স আরও চার হাজার ঘণ্টা বাড়িয়ে ১২ হাজার ঘণ্টা উড়ার ক্ষমতা সম্পন্ন করছে। সে অনুযায়ী এই বিমানগুলো ২০৩০ সাল পর্যন্ত উড়তে পারবে। তবে এখনও অনেক F-16 আছে যেগুলোর স্বাভাবিক উড্ডয়নকাল ২০৪০ সালের পরে শেষ হবে।

তুরস্কের যে যুদ্ধবিমান আছে সেগুলোর অবস্থা কী?

তুরস্কের কাছে এখন ২৩৮টি এফ-১৬ এবং ৩০টি এফ-৪ সহ সর্বমোট ২৬৮টি যুদ্ধবিমান আছে। এগুলোর মধ্যে এফ-৪ এর সব থার্ড জেনারেশন যুদ্ধবিমান। আর এফ-১৬ গুলোর মধ্যে ৩৬টি হচ্ছে ব্লক-৩০, ১০২টি ব্লক-৪০, ৭১টি ব্লক-৫০ এবং ২৯টি ব্লক ৫০+মডেলের। এই এগুলো হচ্ছে ফোর্থ জেনারেশন ফাইটার জেট।

এখন এই এফ-৪ বিমানগুলো অলরেডি অবসরে যাওয়ার বয়সে এসে পৌঁছেছে। এদের ঘষে মেজে মানে আধুনিকায়নের ওপর আধুনিকায়ন করে এগুলোর বয়স আরও ২-৩ বছর বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এ ছাড়া এফ-১৬ এর ব্লক-৩০ মডেলের যে ৩৭টি বিমান আছে, সেগুলোও ২০৩০ সালের পর আর উড়তে পারবে না। তখন হাতে থাকবে এফ -১৬ এর চতুর্থ প্রজন্মের ১৯৭টি যুদ্ধবিমান, যেগুলো আধুনিকায়নের পর ২০৪০-২০৪৫ সালের দিকে অবসরে যাবে।

একটা দেশের বিমানবাহিনীকে শক্তিশালী করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হচ্ছে সর্বশেষ প্রযুক্তি সম্পন্ন যুদ্ধবিমান। সেদিক থেকে চিন্তা করলে তুরস্কের এখনো ফিফথ জেয়ানারেশনের যুদ্ধ বিমান নেই। যদিও এফ-১৬ এখনো সবচেয়ে ভালো যুদ্ধ বিমানগুলোর মধ্যে পরে। কিন্তু তুরস্কের মতো একটা দেশের জন্য যথেষ্ট নয়। এই বিষয়টি সামনে রেখেই তুরস্ক এফ-৩৫ যুদ্ধ বিমান প্রকল্পের অংশীদার হয়। দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী এই বিমান পাওয়ার কথা ছিল ২০১৮-২০১৯ সালের দিকে। কিন্তু রাশিয়া থেকে এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার অজুহাতে তুরস্ককে এই বিমান তৈরি প্রকল্প থেকে বেড় করে দেয়া হয় এবং যে বিমানগুলো কেনার চুক্তি হয়েছিল সেগুলোও দেয়নি আমেরিকা। ওখানে তুরস্কের লস হয় প্রায় ১,৪ বিলিয়ন ডলার।

এটা পুরোপুরি আমেরিকার খামখেয়ালী এবং ‘আমার শক্তি আছে, তাই যা ইচ্ছা করব’ মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ। যদিও তুরস্ক এখন ধরনা ধরছে আমেরিকার কাছে। যে আমাকে হয়তো F-35 প্রকল্পে নেও নয়তো আমার টাকা ফেরত দেও। অনেকটা গুলিস্তানের ফুটপাতে ধোঁকাবাজের কাছে ধোঁকা খাওয়ার মতো। আমও যায় থলেও যায়। তুরস্কের এখন সেরকম অবস্থা। আমেরিকা এই দুটার কোনটাই করবে না। অর্থাৎ প্রকল্পে ফেরতও নিবে না টাকাও ফেরত দিবে না।

তুরস্কের সেনাবাহিনীর কোন কনভেনশনাল বা প্রথাগত যুদ্ধের জন্য কমপক্ষে ২৪০টি ৪র্থ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান দরকার। যদিও তুরস্কের এখন সব মিলিয়ে আছে ২৬৪টি। কিন্তু এগুলো কমতে থাকবে এবং ২০৩০ সালে আরও কমে হবে ১৯০টি। এ কারণে এখন বিমানবাহিনীর এই প্রয়োজন পূরণ করা জরুরি। তুরস্কের ড্রোন যদিও যুদ্ধে অনেক সফল কিন্তু পুরোপুরি একটা বিমানবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে দরকার শক্তিশালী যুদ্ধবিমানের।

যুদ্ধ পরিস্থিতি

আসলে তুরস্কের এখন তিন ফ্রন্টে যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব। একদিকে ইরান-আজারবাইজান। এই ফ্রন্টে ইরান আজারবাইজানের চেয়েও তুরস্ককে বড় হুমকি হিসেবে দেখছে এবং আঙ্কারাকে হুমকিও দিচ্ছে। অন্যদিক গ্রিস দেদারসে অস্ত্র কিনছে আমেরিকা ও ফ্রান্স থেকে। এ ছাড়া তেল-গ্যাস অনুসন্ধান নিয়ে ভূমধ্যসাগর এখন উত্তপ্ত।

যে কোনো সময় যুদ্ধ বেঁধে যেতে পারে তুরস্ক ও গ্রিসের মধ্যে। যদি এমন কিছু হয় তা হলে সেটি ভয়াবহ বিপর্যয় নিয়ে আসবে এই অঞ্চলে। কারণ সেখানেও তুরস্কের বিরুদ্ধে শক্তিশালী একটা জোট গঠন হচ্ছে। সুতরাং এই তিনও ফ্রন্টে - অর্থাৎ ইরান, ভূমধ্যসাগর ও গ্রিস— এই তিন ফ্রন্টেও তুরস্কের বিমানবাহিনীর শক্তি গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই যুদ্ধ যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আপনার যদি সর্বশেষ প্রযুক্তির বিমান হাতে থাকে, তা হলে আপনার শক্তি শত্রুকে বিভিন্ন ম্যানুএভার থেকে বিরত রাখবে।

এয়ার ডিফেন্সের ক্ষেত্রে যেটাকে 'ডেটারেন্স' বলা হয়, অর্থাৎ শত্রু দেশ যেটাকে সমীহ করে চলে, সেটাও অনেকগুণ বাড়িয়ে দেয় আপনার এয়ার শক্তি।এ কারণে তুরস্কের নতুন বিমান কেনা জরুরি। অন্যদিকে নিজের হাতে যেগুলো আছে সেগুলোরও আধুনিকায়ন দরকার।

এক্ষেত্রে তুরস্কের নিজস্ব বিমান TF-X চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম কি না?

তুরস্ক ২০১০ সালের দিকে তার বিমানবাহিনীকে শক্তিশালী করার যে প্ল্যান নিয়ে এগোচ্ছিল এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান না পাওয়ায় সেখানে বড় একটা ধাক্কা খায় আঙ্কারা। এখন যদিও সরকার নিজেদের TF-X যুদ্ধবিমান নিয়ে আসার কথা বলছে, কিন্তু সেটি অত সহজ নয়। সব কিছু ঠিকমতো চললে হয়তো ২০৩২ বা ২০৩৫ সালের দিকে তুরস্কের বিমানবাহিনী পাবে এই বিমান। আমরা যদি ধরেও নেই যে তুরস্কের নিজস্ব তৈর পঞ্চম জেনারেশনের যুদ্ধ বিমান TF-X ২০৩৫ সালের দিকে দেশটির বিমানবহরে যোগ দেবে তাতেও ২০৪০ সাল পর্যন্ত বিমানবাহিনীর প্রয়োজনীয় পরিমাণ বিমান সরবরাহ করতে পারবে না তুরস্কের বিমান পরস্তুতকারক কোম্পানি TAI. এই TF-X নিয়ে আরেকটা ভিডিও আসবে কয়েকদিনের মধ্যেই। সেখানে বিস্তারিত আলোচনা করব।

নতুন বিমান দরকার

এসব কারণে তুরস্কের বিমানবাহিনীর এখন পঞ্চম প্রজন্মের না হলেও ৪র্থ প্রজন্মের কমপক্ষে ৪০-৫০ টি নতুন বিমান দরকার। আর এখন যেগুলো হাতে আছে সেগুলোর আধুনিকায়ন দরকার। নতুন করে ন্যাভিগেশন, রাডার সিস্টেম, আবহাওয়া সিস্টেম, আভিওনিক্স, অপটিক্স, অস্ত্র বহন ক্ষমতা সহ আরও অনেক ধরণের আধুনিক সিস্টেম ব্যবহার করে এই বিমানগুলোকে আপডেট করা দরকার। এ জন্য এফ-১৬ প্রস্তুতকারক দেশ থেকে ৮০টি মডার্নাইজেশন কিট কিনতে চায় তুরস্ক।

আরেকটি বিষয়, যা একটু আগে বলেছিলে যে এফ-১৬ এর সব পার্টসগুলো আমেরিকা থেকে এনে তুরস্কেই কিন্তু সেট করা হতো। এ ছাড়া তুরস্কের সেনাবাহিনী গত ৪৫ বছর ধরে আমেরিকার এ দুই বিমানই ব্যবহার করে আসছে।এফ-৪ ও এফ-১৬। তাই এফ১৬ কিনলে বিমানবাহিনী খুব সহজেই ব্যবহার শুরু করতে পারবে। কারণ পাইলট তো আগে থেকেই রেডি।

বিষয়টি এ কম ভাবুন, তুরস্কের পাইলট থেকে শুরু করে টেকনিশিয়ান পর্যন্ত এমনকি বিমানের হ্যাঙ্গার পর্যন্ত সব ছুই এই এফ-১৬ বিমানের সঙ্গে পরিচিত। তুরস্ক এই বিমানের অনেক পার্টস এবং আধুনিক সফটওয়্যারও তৈরি করছে। আর এই ক্যাটাগরির যতগুলো বিমান আছে যেমন রাশিয়ার শুখোই su-35 বা ফ্রান্সের রাফাল যুদ্ধ বিমান। এগুলোর তুলনায় এফ১৬ অনেক সাশ্রয়ী। (রাফাল ১৩০ মিলিয়ন, সু-৩৫ এর ধাম ৭৫ মিলিয়ন আর এফ-১৬ এর দাম ৫০-৭০ মিলিয়ন। তাই এই বিমান কিনলে তুরস্ক অনেক দিক দিয়ে লাভবান হবে।

কিন্তু বিশাল এক প্রশ্ন থেকে যায় এখানে। সেটি হলে আমেরিকা কি তুরস্কের কাছে এই বিমান বিক্রি করবে?

তুরস্ক যে প্রস্তাব দিয়েছে আমেরিকাকে সে প্রস্তাব প্রথমে আমেরিকার Foreign Military Sales process এর মধ্য দিয়ে যাবে। তারপর আমেরিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং কংগ্রেসের অনুমোদন লাগবে। তবে আমিরকার কংগ্রেস আটকে দিতে পারে এই প্রস্তাব। কারণ কংগ্রেসের দুইও পক্ষ অর্থাৎ ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকান দুইও পক্ষ গত ৭-৮ বছর ধরে তুরস্কের বিরুদ্ধে কঠিন অবস্থানে আছে। যেকোনো ঠুনকো বিষয়ে তুরস্কের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় তারা। তাই এখান থেকে এই প্রস্তাব অনুমোদন পাবে বলে মনে হয় না।

তা হলে তুরস্ক কেন এ রকম একটা প্রস্তাব দিল? তুরস্ক কি জানে না যে এই প্রস্তাব পাম হওয়ার নয়?

তুরস্ক আসলে এখানে দুইটা বিষয়কে সামনে নিয়ে এগুচ্ছে। এক. তুরস্ক মনে করছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান না দেওয়ার জন্য আমেরিকার হাতে দেখানোর মতো একটা সলিড কারণ ছিল সেটি হচ্ছে s-400. কিন্তু এই বিমান বিক্রি না করার জন্য সলিড কোনো কারণ নেই। তা ছাড়া আমেরিকা গ্রিসের কাছে যে পরিমাণ অস্ত্র এবং এফ-৩৫ বিক্রি করছে ইদানীং তাতে তুরস্কের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখতে তুরস্কেও কিছু চতুর্থ প্রজন্মের বিমান বিক্রি করতে পারে। আর তুরস্ক এই প্রস্তাবের মাধ্যমে আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের শেষ চেষ্টা চালাচ্ছে।
আর যদি না করে সেক্ষেত্রে তুরস্ক অন্য কোনো দেশ থেকে কিনলে অন্তত একটা বাহান দেখাতে পারবে যে দ্যাখো আমরা তোমাদের কাছ থেকে কিনতে চেয়েছি কিন্তু তোমরা বিক্রি না করায় অন্যদের কাছ থেকে কিনছি।

এক্ষেত্রে রাশিয়ার SU-35, ইউরোপের ইউরোফাইটার এবং ফ্রান্সের রাফালের দিকে ঝুঁকতে পারে তুরস্ক। ইউরফাইটার বা রাফাল কিনলে আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি থাকবে না আর তখন ভূমধ্যসাগরেও ইউরোপ বা ফ্রান্স গ্রিসের পক্ষে কম নাক গলাতে আসবে।

আর যদি এগুলোতে তুরস্ক সফল না হয় তাহলে তুরস্ক ঝুঁকবে রাশিয়ার দিকে। এবং সেটা হতে পারে ন্যাটোর কফিনে আরেকটা পেরেক। তুরস্ক সেক্ষেত্রে এই দুই দেশ থেকে টেকনোলজি ট্রান্সফারও চাইবে। তবে এই বিমানগুলো কিনলে তুরস্কের নতুন করে পাইলট ট্রেনিং, রক্ষণাবেক্ষণ টিম তৈরি, হ্যাঙ্গার তৈরি, এই বিমানগুলোর সঙ্গে তুরস্কের অস্ত্রের ইন্টিগ্রেশনসহ আরও অনেক জিনিস নতুন করে তৈরি এবং প্রস্তুত করতে হবে, যা প্রচুর সময় সাপেক্ষা ও ব্যয়বহুল। যুদ্ধবিমান আসলে এমন না যে আপনি একটা গাড়ি কিনলেন আর শোরুম থেকেই সেটি চালানো শুরু করলেন। তবে তুরস্ক যদি বাধ্য হয় তা হলে তো আর এই অতিরিক্ত খরচের দিকে তাকিয়ে ওই সব দেশ থেকে যুদ্ধবিমান কেনা থেকে বিরত থাকবে না?

আসলে এখন দুনিয়া এক মেরু বা দু মেরুর নয়। পৃথিবী এখন বহু মেরুর দুনিয়া হয়ে গেছে। একদিকে বিশ্ব ব্যবস্থায় চীনের বুলেটের গতিতে অগ্রগতি, অস্ত্রের দিক দিয়ে রাশিয়া আগাচ্ছে রকেটের গতিতে। ন্যাটো এখন আগের চেয়ে অনেক দুর্বল। ইউরোপীয় ইউনিয়ন দ্রুত শক্তি ক্ষয় করছে। পশ্চিমারা তাদের পুরো মনোযোগ এখন মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরিয়ে এশিয়া প্যাসিফিকে নিয়োগ করেছে। মার্কিন রুশ এই বড় দুটি বলয় ভেঙে এখন ছোট ছোট অনেক বলয় তৈরি হচ্ছে। তাই কে কার সঙ্গে কি রকম সম্পর্ক গড়ে তুলবে আগে থেকে আঁচ করা মুশকিল।

আর তুরস্ক ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক দিক দিয়ে এমন একটা পজিশনে আছে যেখানে সবাই শত্রু আবার সবাই বন্ধু হতে পারে। অথবা যেখানে কেউ পরম বন্ধু বা পরম শত্রু না। আর একটা দেশের স্বার্থের সঙ্গেজড়িত অনেকগুলো দেশ এবং বিষয়। এখানে কাউকে একেবারে কোলে তুলে নেয়া আবার কাউকে একেবারে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া সম্ভব না।

কোনোদেশের সাথে এক দিক দিয়ে সংঘাত তো অন্য দিক দিয়ে আবার সম্পর্ক, এক দিক দিয়ে শত্রুতা তো অন্য দিক দিয়ে বন্ধুত্ব। এটাই হচ্ছে অন্তর্জাতিক রাজনীতির আসল চেহারা। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আপনি যদি শক্তিশালী হতে চান, বড়দের ক্লাবে যোগ দিতে চান, তা হলে এই চ্যালেঞ্জগুলো আসবেই, এগুলো মোকাবিলা করেই সামনে এগোতে হবে।

তুরস্ক কেন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান কিনতে চায়?

 সরোয়ার আলম, আঙ্কারা, তুরস্ক থেকে 
১৩ অক্টোবর ২০২১, ০৪:০৪ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
একটা দেশের বিমানবাহিনীকে শক্তিশালী করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হচ্ছে সর্বশেষ প্রযুক্তি সম্পন্ন যুদ্ধবিমান।
একটা দেশের বিমানবাহিনীকে শক্তিশালী করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হচ্ছে সর্বশেষ প্রযুক্তি সম্পন্ন যুদ্ধবিমান। ফাইল ছবি

তুরস্ক নতুন করে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান কেনার আগ্রহ প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্রে চিঠি পাঠিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে— আঙ্কারা ৪০টি এফ-১৬ ব্লক 70 এবং ৮০টি যুদ্ধবিমান মডার্নেজেশন কিট কিনতে ইচ্ছুক। 

তুরস্কের বিমানবহর পুরোটাই আমেরিকার যুদ্ধবিমান দিয়ে সাজানো। এদের মধ্যে আছে— এফ-৪ এবং এফ-১৬।

১৯৭৪ সালে এফ-৪ যুদ্ধবিমান কিনতে শুরু করে তুরস্ক এবং ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত এই বিমানগুলো সরবরাহ করে আমেরিকা। এই লম্বা সময় ধরে কয়েকশ এফ-৪ যুদ্ধবিমান পায় তুরস্ক। এর বেশিরভাগই এখন সার্ভিসে নেই। অবসর নিয়েছে। বাকিগুলো ২০২০ সালের দিকে সার্ভিস থেকে অবসর নেওয়ার কথা। কিন্তু এগুলোকে বারবার মডার্নাইজেশন করে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এদের জীবনকাল দীর্ঘায়িত করছে তুরস্কের সেনাবাহিনী। এমনকি এগুলোকে আরেকটু ঘষেমেজে ২০৩০ সাল পর্যন্ত ব্যবহার করতে চায় দেশটি। 

অন্যদিকে তুরস্কের এফ-১৬ যুদ্ধবিমানের যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৩ সালে। তখন আমেরিকার সঙ্গে ১৬০টি বিমান কেনার চুক্তি হয়। এদের আটটি আমেরিকায় এবং ১৫২টি তুরস্কে উৎপাদনের কথা থাকে সে চুক্তিতে। তুরস্কের এরোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ বা TAI ১৯৮৭ সালে আমেরিকার সঙ্গে একত্রে এই বিমানগুলো উৎপাদন শুরু করে তুরস্কে।  

শুরুর দিকের কাজগুলোকে বিমান তৈরি বলার চেয়ে বরং আমেরিকা থেকে সব যন্ত্রাংশ নিয়ে এসে তুরস্কে সেট করা বলা যায়। পরে আমেরিকা থেকে লাইসেন্স নিয়ে  তুরস্কেই উৎপাদন করতে থাকে এই বিমানগুলো। দেশীয়ভাবে উৎপাদন করে প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ এবং সফটওয়্যার। ১৯৮০ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে ২৩২টি ব্লক ৩০/৪০/৫০ মডেলের এফ-১৬ তৈরি করে তাই। এভাবে তুরস্কের বিমানবহর সজ্জিত হয় এফ-১৬ যুদ্ধবিমান দিয়ে। তুরস্কের বিমানবাহিনীকে সর্বশেষ F-16 বিমান সরবরাহ করা হয় ২০১২ সালে। সেগুলো ছিল F-16D ব্লক 50+ মডেলের।

তুরস্কের TAI এই F-16 গুলো আধুনিকায়নেরও কাজ করে। মিসর, পাকিস্তান এবং জর্ডানের সেনাবাহিনীর এফ-১৬ যুদ্ধবিমানগুলোকেও মডার্নাইজ করে তুরস্কের এই এরোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ। মিসর বিমানবাহিনীর জন্য ৪৬টি ব্লক ৪০ মডেলের এফ-১৬ তৈরি করেছে তুরস্কের TAI.

আধুনিকায়নের মাধ্যমে যুদ্ধবিমানের আয়ু বাড়ানো এবং নতুন বা আপডেটেড প্রযুক্তি যোগ করা হয়। যেমন— স্বাভাবিকভাবে এফ-১৬ যুদ্ধবিমানগুলো ৮ হাজার ঘণ্টা বা ৩০-৩৫ বছর উড়ার পর অবসরে যায়। সে অনুযায়ী তুরস্কের কাছে যে এফ-১৬ আছে, তার অনেকগুলোর জীবনকাল শেষ হয়ে গেছে। তুরস্ক সেগুলোকেও মডার্নাইজেশন করে তাদের বয়স আরও চার হাজার ঘণ্টা বাড়িয়ে ১২ হাজার ঘণ্টা উড়ার ক্ষমতা সম্পন্ন করছে। সে অনুযায়ী এই বিমানগুলো ২০৩০ সাল পর্যন্ত উড়তে পারবে। তবে এখনও অনেক F-16 আছে যেগুলোর স্বাভাবিক উড্ডয়নকাল ২০৪০ সালের পরে শেষ হবে। 

তুরস্কের যে যুদ্ধবিমান আছে সেগুলোর অবস্থা কী? 

তুরস্কের কাছে এখন ২৩৮টি এফ-১৬ এবং ৩০টি এফ-৪ সহ সর্বমোট ২৬৮টি যুদ্ধবিমান আছে। এগুলোর মধ্যে এফ-৪ এর সব থার্ড জেনারেশন যুদ্ধবিমান। আর এফ-১৬ গুলোর মধ্যে ৩৬টি হচ্ছে ব্লক-৩০, ১০২টি ব্লক-৪০, ৭১টি ব্লক-৫০ এবং ২৯টি ব্লক ৫০+মডেলের। এই এগুলো হচ্ছে ফোর্থ জেনারেশন ফাইটার জেট। 

এখন এই এফ-৪ বিমানগুলো অলরেডি অবসরে যাওয়ার বয়সে এসে পৌঁছেছে। এদের ঘষে মেজে মানে আধুনিকায়নের ওপর আধুনিকায়ন করে এগুলোর বয়স আরও ২-৩ বছর বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এ ছাড়া এফ-১৬ এর ব্লক-৩০ মডেলের যে ৩৭টি বিমান আছে, সেগুলোও ২০৩০ সালের পর আর উড়তে পারবে না। তখন হাতে থাকবে এফ -১৬ এর চতুর্থ প্রজন্মের ১৯৭টি যুদ্ধবিমান, যেগুলো আধুনিকায়নের পর ২০৪০-২০৪৫ সালের দিকে অবসরে যাবে। 

একটা দেশের বিমানবাহিনীকে শক্তিশালী করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হচ্ছে সর্বশেষ প্রযুক্তি সম্পন্ন যুদ্ধবিমান। সেদিক থেকে চিন্তা করলে তুরস্কের এখনো ফিফথ  জেয়ানারেশনের যুদ্ধ বিমান নেই। যদিও এফ-১৬ এখনো সবচেয়ে ভালো যুদ্ধ বিমানগুলোর মধ্যে পরে। কিন্তু তুরস্কের মতো একটা দেশের জন্য যথেষ্ট নয়। এই বিষয়টি সামনে রেখেই তুরস্ক এফ-৩৫ যুদ্ধ বিমান প্রকল্পের অংশীদার হয়। দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী এই বিমান পাওয়ার কথা ছিল ২০১৮-২০১৯ সালের দিকে। কিন্তু রাশিয়া থেকে এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার অজুহাতে তুরস্ককে এই বিমান তৈরি প্রকল্প থেকে বেড় করে দেয়া হয় এবং যে বিমানগুলো কেনার চুক্তি হয়েছিল সেগুলোও দেয়নি আমেরিকা। ওখানে তুরস্কের লস হয় প্রায় ১,৪ বিলিয়ন ডলার।

এটা পুরোপুরি  আমেরিকার খামখেয়ালী এবং ‘আমার শক্তি আছে, তাই যা ইচ্ছা করব’ মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ। যদিও তুরস্ক এখন ধরনা ধরছে আমেরিকার কাছে। যে আমাকে হয়তো F-35 প্রকল্পে নেও নয়তো আমার টাকা ফেরত দেও। অনেকটা গুলিস্তানের ফুটপাতে ধোঁকাবাজের কাছে ধোঁকা খাওয়ার মতো। আমও যায় থলেও যায়। তুরস্কের এখন সেরকম অবস্থা। আমেরিকা এই দুটার কোনটাই করবে না। অর্থাৎ প্রকল্পে ফেরতও নিবে না টাকাও ফেরত দিবে না। 
 
তুরস্কের সেনাবাহিনীর কোন কনভেনশনাল বা প্রথাগত যুদ্ধের জন্য কমপক্ষে ২৪০টি ৪র্থ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান দরকার। যদিও তুরস্কের এখন সব মিলিয়ে আছে ২৬৪টি। কিন্তু এগুলো কমতে থাকবে এবং ২০৩০ সালে আরও কমে হবে ১৯০টি। এ কারণে এখন বিমানবাহিনীর এই প্রয়োজন পূরণ করা জরুরি। তুরস্কের ড্রোন যদিও যুদ্ধে অনেক সফল কিন্তু পুরোপুরি একটা বিমানবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে দরকার শক্তিশালী যুদ্ধবিমানের।

যুদ্ধ পরিস্থিতি 

আসলে তুরস্কের এখন তিন ফ্রন্টে যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব। একদিকে ইরান-আজারবাইজান। এই ফ্রন্টে ইরান আজারবাইজানের চেয়েও তুরস্ককে বড় হুমকি হিসেবে দেখছে এবং আঙ্কারাকে হুমকিও দিচ্ছে। অন্যদিক গ্রিস দেদারসে অস্ত্র কিনছে আমেরিকা ও ফ্রান্স থেকে। এ ছাড়া তেল-গ্যাস অনুসন্ধান নিয়ে ভূমধ্যসাগর এখন উত্তপ্ত।

যে কোনো সময় যুদ্ধ বেঁধে যেতে পারে তুরস্ক ও গ্রিসের মধ্যে। যদি এমন কিছু হয় তা হলে সেটি ভয়াবহ বিপর্যয় নিয়ে আসবে এই অঞ্চলে। কারণ সেখানেও তুরস্কের বিরুদ্ধে শক্তিশালী একটা জোট গঠন হচ্ছে। সুতরাং  এই তিনও ফ্রন্টে - অর্থাৎ ইরান, ভূমধ্যসাগর ও গ্রিস— এই তিন ফ্রন্টেও তুরস্কের বিমানবাহিনীর শক্তি গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই যুদ্ধ যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আপনার যদি সর্বশেষ প্রযুক্তির বিমান হাতে থাকে, তা হলে আপনার শক্তি শত্রুকে বিভিন্ন ম্যানুএভার থেকে বিরত রাখবে।

এয়ার ডিফেন্সের ক্ষেত্রে যেটাকে 'ডেটারেন্স' বলা হয়, অর্থাৎ শত্রু দেশ যেটাকে সমীহ করে চলে, সেটাও অনেকগুণ বাড়িয়ে দেয় আপনার এয়ার শক্তি। এ কারণে তুরস্কের নতুন বিমান কেনা জরুরি।  অন্যদিকে নিজের হাতে যেগুলো আছে সেগুলোরও আধুনিকায়ন দরকার। 

এক্ষেত্রে তুরস্কের নিজস্ব বিমান TF-X চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম কি না? 

তুরস্ক ২০১০ সালের দিকে তার বিমানবাহিনীকে শক্তিশালী করার যে প্ল্যান নিয়ে এগোচ্ছিল এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান না পাওয়ায় সেখানে বড় একটা ধাক্কা খায় আঙ্কারা। এখন যদিও সরকার নিজেদের TF-X যুদ্ধবিমান নিয়ে আসার কথা বলছে, কিন্তু সেটি অত সহজ নয়। সব কিছু ঠিকমতো চললে হয়তো ২০৩২ বা ২০৩৫ সালের দিকে তুরস্কের বিমানবাহিনী পাবে এই বিমান।  আমরা যদি ধরেও নেই  যে তুরস্কের নিজস্ব তৈর পঞ্চম জেনারেশনের যুদ্ধ বিমান TF-X  ২০৩৫ সালের দিকে দেশটির বিমানবহরে যোগ দেবে তাতেও ২০৪০ সাল পর্যন্ত বিমানবাহিনীর প্রয়োজনীয় পরিমাণ বিমান সরবরাহ করতে পারবে না তুরস্কের বিমান পরস্তুতকারক কোম্পানি TAI. এই TF-X নিয়ে আরেকটা ভিডিও আসবে কয়েকদিনের মধ্যেই। সেখানে বিস্তারিত আলোচনা করব।

নতুন বিমান দরকার

এসব কারণে তুরস্কের বিমানবাহিনীর এখন পঞ্চম প্রজন্মের না হলেও ৪র্থ প্রজন্মের কমপক্ষে ৪০-৫০ টি নতুন বিমান দরকার। আর এখন যেগুলো হাতে আছে সেগুলোর আধুনিকায়ন দরকার। নতুন করে ন্যাভিগেশন, রাডার সিস্টেম, আবহাওয়া সিস্টেম, আভিওনিক্স, অপটিক্স, অস্ত্র বহন ক্ষমতা সহ আরও অনেক ধরণের আধুনিক সিস্টেম ব্যবহার করে এই বিমানগুলোকে আপডেট করা দরকার। এ জন্য এফ-১৬ প্রস্তুতকারক দেশ থেকে ৮০টি মডার্নাইজেশন কিট কিনতে চায় তুরস্ক।

আরেকটি বিষয়, যা একটু আগে বলেছিলে যে এফ-১৬ এর সব পার্টসগুলো আমেরিকা থেকে এনে তুরস্কেই কিন্তু সেট করা হতো। এ ছাড়া তুরস্কের সেনাবাহিনী গত ৪৫ বছর ধরে আমেরিকার এ দুই বিমানই ব্যবহার করে আসছে।এফ-৪ ও এফ-১৬। তাই এফ১৬ কিনলে বিমানবাহিনী খুব সহজেই ব্যবহার শুরু করতে পারবে। কারণ পাইলট তো আগে থেকেই রেডি।

বিষয়টি এ কম ভাবুন, তুরস্কের পাইলট থেকে শুরু করে টেকনিশিয়ান পর্যন্ত এমনকি বিমানের হ্যাঙ্গার পর্যন্ত সব ছুই এই এফ-১৬ বিমানের সঙ্গে পরিচিত। তুরস্ক এই বিমানের অনেক পার্টস এবং আধুনিক সফটওয়্যারও তৈরি করছে। আর এই ক্যাটাগরির যতগুলো বিমান আছে যেমন রাশিয়ার শুখোই su-35 বা ফ্রান্সের রাফাল যুদ্ধ বিমান। এগুলোর তুলনায় এফ১৬ অনেক সাশ্রয়ী। (রাফাল ১৩০ মিলিয়ন, সু-৩৫ এর ধাম ৭৫ মিলিয়ন আর এফ-১৬ এর দাম ৫০-৭০ মিলিয়ন। তাই এই বিমান কিনলে তুরস্ক অনেক দিক দিয়ে লাভবান হবে। 

কিন্তু বিশাল এক প্রশ্ন থেকে যায় এখানে। সেটি হলে আমেরিকা কি তুরস্কের কাছে এই বিমান বিক্রি করবে? 

তুরস্ক যে প্রস্তাব দিয়েছে আমেরিকাকে সে প্রস্তাব প্রথমে আমেরিকার Foreign Military Sales process এর মধ্য দিয়ে যাবে। তারপর আমেরিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং কংগ্রেসের অনুমোদন লাগবে। তবে আমিরকার কংগ্রেস আটকে দিতে পারে এই প্রস্তাব। কারণ কংগ্রেসের দুইও পক্ষ অর্থাৎ ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকান দুইও পক্ষ গত ৭-৮ বছর ধরে তুরস্কের বিরুদ্ধে কঠিন অবস্থানে আছে। যেকোনো ঠুনকো বিষয়ে তুরস্কের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় তারা। তাই এখান থেকে এই প্রস্তাব অনুমোদন পাবে বলে মনে হয় না। 

তা হলে তুরস্ক কেন এ রকম একটা প্রস্তাব দিল? তুরস্ক কি জানে না যে এই প্রস্তাব পাম হওয়ার নয়? 

তুরস্ক আসলে এখানে দুইটা বিষয়কে সামনে নিয়ে এগুচ্ছে। এক. তুরস্ক মনে করছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান না দেওয়ার জন্য আমেরিকার হাতে দেখানোর মতো একটা সলিড কারণ ছিল সেটি হচ্ছে s-400. কিন্তু এই বিমান বিক্রি না করার জন্য সলিড কোনো কারণ নেই। তা ছাড়া আমেরিকা গ্রিসের কাছে যে পরিমাণ অস্ত্র এবং এফ-৩৫ বিক্রি করছে ইদানীং তাতে তুরস্কের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখতে তুরস্কেও কিছু চতুর্থ প্রজন্মের বিমান বিক্রি করতে পারে। আর তুরস্ক এই প্রস্তাবের মাধ্যমে আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের শেষ চেষ্টা চালাচ্ছে।    
আর যদি না করে সেক্ষেত্রে তুরস্ক অন্য কোনো দেশ থেকে কিনলে অন্তত একটা বাহান দেখাতে পারবে যে দ্যাখো আমরা তোমাদের কাছ থেকে কিনতে চেয়েছি কিন্তু তোমরা বিক্রি না করায় অন্যদের কাছ থেকে কিনছি।  

এক্ষেত্রে রাশিয়ার SU-35, ইউরোপের ইউরোফাইটার  এবং ফ্রান্সের রাফালের দিকে ঝুঁকতে পারে তুরস্ক। ইউরফাইটার বা রাফাল কিনলে আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি থাকবে না আর তখন ভূমধ্যসাগরেও ইউরোপ বা ফ্রান্স গ্রিসের পক্ষে কম নাক গলাতে আসবে। 

আর যদি এগুলোতে তুরস্ক সফল না হয় তাহলে তুরস্ক ঝুঁকবে রাশিয়ার দিকে। এবং সেটা হতে পারে ন্যাটোর কফিনে আরেকটা পেরেক। তুরস্ক সেক্ষেত্রে এই দুই দেশ থেকে টেকনোলজি ট্রান্সফারও চাইবে। তবে এই বিমানগুলো কিনলে তুরস্কের নতুন করে পাইলট ট্রেনিং, রক্ষণাবেক্ষণ টিম তৈরি, হ্যাঙ্গার তৈরি, এই বিমানগুলোর সঙ্গে তুরস্কের অস্ত্রের ইন্টিগ্রেশনসহ আরও অনেক জিনিস নতুন করে তৈরি এবং প্রস্তুত করতে হবে, যা প্রচুর সময় সাপেক্ষা ও ব্যয়বহুল। যুদ্ধবিমান আসলে এমন না যে আপনি একটা গাড়ি কিনলেন আর শোরুম থেকেই সেটি চালানো শুরু করলেন। তবে তুরস্ক যদি বাধ্য হয় তা হলে তো আর এই অতিরিক্ত খরচের দিকে তাকিয়ে ওই সব দেশ থেকে যুদ্ধবিমান কেনা থেকে বিরত থাকবে না? 

আসলে এখন দুনিয়া এক মেরু বা দু মেরুর নয়। পৃথিবী এখন বহু মেরুর দুনিয়া হয়ে গেছে। একদিকে বিশ্ব ব্যবস্থায় চীনের বুলেটের গতিতে অগ্রগতি, অস্ত্রের দিক দিয়ে রাশিয়া আগাচ্ছে রকেটের গতিতে। ন্যাটো এখন আগের চেয়ে অনেক দুর্বল। ইউরোপীয় ইউনিয়ন দ্রুত শক্তি ক্ষয় করছে। পশ্চিমারা তাদের পুরো মনোযোগ এখন মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরিয়ে এশিয়া প্যাসিফিকে নিয়োগ করেছে। মার্কিন রুশ এই বড় দুটি বলয় ভেঙে এখন ছোট ছোট অনেক বলয় তৈরি হচ্ছে। তাই কে কার সঙ্গে কি রকম সম্পর্ক গড়ে তুলবে আগে থেকে আঁচ করা মুশকিল।

আর তুরস্ক ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক দিক দিয়ে এমন একটা পজিশনে আছে যেখানে সবাই শত্রু আবার সবাই বন্ধু হতে পারে। অথবা যেখানে কেউ পরম বন্ধু বা পরম শত্রু না। আর একটা দেশের স্বার্থের সঙ্গে জড়িত অনেকগুলো দেশ এবং বিষয়। এখানে কাউকে একেবারে কোলে তুলে নেয়া আবার কাউকে একেবারে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া সম্ভব না।

কোনো দেশের সাথে এক দিক দিয়ে সংঘাত তো অন্য দিক দিয়ে আবার সম্পর্ক, এক দিক দিয়ে শত্রুতা তো অন্য দিক দিয়ে বন্ধুত্ব। এটাই হচ্ছে অন্তর্জাতিক রাজনীতির আসল চেহারা। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আপনি যদি শক্তিশালী হতে চান, বড়দের ক্লাবে যোগ দিতে চান, তা হলে এই চ্যালেঞ্জগুলো আসবেই, এগুলো মোকাবিলা করেই সামনে এগোতে হবে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : সরোয়ার আলমের লেখাসমূহ