মাহাথির-আনোয়ার: বেইমানি ও ট্রাজেডির জুটি

  যুগান্তর ডেস্ক    ১৮ মে ২০১৮, ০৮:৫৪ | অনলাইন সংস্করণ

মাহাথির মোহাম্মদ ও আনোয়ার ইব্রাহিম

মালয়েশিয়ায় ৯ মের সাধারণ নির্বাচনে বড় ধরনের বিজয়ের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন দলকে ক্ষমতাচ্যুত করেছেন মাহাথির মোহাম্মদ। এর পরপরই আনোয়ার ইব্রাহিমের কারামুক্তির ঘটনাকে দেশটির নতুন সূচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

কেননা এ দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে আনুগত্যের পরীক্ষার লড়াইটা ছিল স্পষ্ট। তাদের একজন একসময় আরেকজনকে কারাগারে পাঠিয়েছিলেন।

মালয়েশিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে এভাবেই ব্যাখ্যা করেছেন রোমের জন ক্যাবট বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ব্রিজেট ওয়েলশ।

সদ্য নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ ও আনোয়ার ইব্রাহিমের মধ্যে এই সম্পর্কের গল্পটি এতটাই নাটকীয় যে একে শেকসপিয়ারের নাটকের সঙ্গে তুলনা করা যায়, যেখানে কাহিনীর মধ্যে আনুগত্য, বেইমানি, ট্র্যাজেডি এবং বিদ্রূপ একের অপরের সঙ্গে মিশে আছে।

ড. মাহাথিরের বয়স এখন ৯২। ১৯৯৯ সালে দেশটির অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তিনি আনোয়ার ইব্রাহিমকে দুর্নীতি এবং সমকামিতার অভিযোগে জেলে পাঠিয়েছিলেন।

জেলে বসে আনোয়ার শেকসপিয়ারের প্রতিটি গ্রন্থ পড়ে শেষ করেন। কিন্তু তিনি ভাবতেও পারেননি এই নাটকের আবির্ভাব হবে তার রাজনৈতিক জীবনে।

ড. মাহাথির জয়লাভের পর তিনি আনোয়ারের মুক্তি ও ক্ষমা নিশ্চিত করলে দুজনের সম্পর্ক একই বৃত্তে আসে। শত্রু হয়ে পড়েন বন্ধু, ঠিক শেকসপিয়ারের নাটকের মতোই যেখানে গল্পের একপর্যায়ে খলনায়ক, নায়ক হয়ে ওঠেন।

স্রোতে গা ভাসানো

এ দুজনের সম্পর্কোন্নয়নের মূলে রয়েছে রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং একে অপরের ঢাল হওয়া। ড. মাহাথির ১৯৮২ সালে সর্বপ্রথম আনোয়ারকে তার প্রশাসনে জায়গা দেন।

আনোয়ার একজন দৃঢ়চেতা, উদ্যমী ছাত্রনেতা ছিলেন। যিনি সত্তরের দশকে তৎকালীন প্রভাবশালী দল ইউনাইটেড মালায়স ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন-ইউএনএমও-এর বিরুদ্ধে একটি দল গঠন করতে পেরেছিলেন।

হয়ে উঠেছিলেন দেশটির স্থানীয় প্রবক্তা, যিনি ওই শক্তিশালী দলটির বিরোধিতা করতে পেরেছেন।

রাজনীতিতে ইসলামের ব্যবহারের সময়কালে আনোয়ারও একই স্রোতে গা ভাসিয়েছিলেন। ১৯৮৯ সালে ইরানে বিপ্লবের পর বহু দেশে মুসলিম ক্ষমতায়নের যে জোয়ার উঠেছিল সেই সময় মালয়েশিয়ার ধর্মকেন্দ্রিক রাজনীতির শূন্যস্থান দখল করে নেন আনোয়ার।

মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে যে কয়েকটি পালাবদল হয়েছে, তার একটি ছিল আনোয়ারকে ইউএনএমও জোটে অন্তর্ভুক্ত করা। তার পর আনোয়ার খুব দ্রুত ওপরে উঠতে থাকেন। আনোয়ারের ব্যক্তিত্ব ও দক্ষতার কারণে তার সমর্থকরা এমনভাবে কাজ করেছে যেন বিরোধীরা একটি নিরপেক্ষ অবস্থানে চলে আসে।

আশির দশক এবং নব্বইয়ের শুরুটা ছিল মালয়েশিয়ার জন্য সুবর্ণ সময়, যখন দেশটিতে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন ঘটে।

বিশ্বে যখন এশিয়ার প্রভাব বাড়ছিল, ঠিক তখনই ড. মাহাথির তার নেতৃত্বে মালয়েশিয়াকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে আসেন।

এদিকে ১৯৯৩ সালে ইউএনএমও-এর অধীনে বড় ধরনের জয়লাভের মধ্য দিয়ে আনোয়ার, ড. মাহাথিরের বিরুদ্ধে একজন শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী রূপে আবির্ভূত হন।

সেই সময় আনোয়ার ‘এশিয়ার রেনেসাঁ’ শীর্ষক একটি বই লেখেন। এভাবে তিনি মালয়েশিয়ার প্রেরণা ও আকাঙ্ক্ষার ওপর জোর দিয়ে নিজেকে এশিয়ার একজন বুদ্ধিজীবী হিসেবে আলাদা পরিচিতি দেন।

তিনি রাজনৈতিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে খোলাখুলিভাবে আলোচনা শুরু করেন। দুটি পক্ষের মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরেন, যেখানে একপক্ষ শুধুই ক্ষমতা ধরে রাখতে চায় এবং অন্যদিকে যারা সংস্কারের মাধ্যমে জয় অর্জন করতে চায়।

ভঙ্গুর সময় ১৯৯৭ সালে এশিয়ার আর্থিক সংকটের পর মালয়েশিয়ার পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর পরের বছরই আনোয়ার দলের নিয়ন্ত্রণ নিতে ড. মাহাথিরকে চ্যালেঞ্জ করেন।

ওই চ্যালেঞ্জজুড়ে রাজনৈতিক বিভেদ বা মতাদর্শের লড়াইয়ের চেয়ে বেশি ছিল ব্যক্তিগত আক্রমণ। তবে ক্ষমতার সিঁড়িতে ড. মাহাথির তার দক্ষতা প্রমাণ করায় আনোয়ার সেই চ্যালেঞ্জ জয়ে ব্যর্থ হন।

এর পর আনোয়ারকে মারধর করা হয় এবং এমন ঘটনার অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়, যা মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে নাড়িয়ে দেয়।

যে কোনো মূল্যে ক্ষমতা ধরে রাখতে বিদ্রোহকে কঠোরভাবে দমন করেন মাহাথির। ১৯৯৯ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর তিনি রাজনৈতিক সংস্কারের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন।

১৯৯৮-৯৯ সালে এমন একটি প্যাটার্ন তৈরি করা হয়, যা দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলা মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে একটি আকৃতি দেয়।

এর পর আবদুল্লাহ বাদাউই ২০০৪ সালে এবং পরে রাজাক ২০১৩ সালে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন, সেগুলো তাদের সংস্কারপন্থী হিসেবেই পরিচিতি দিয়েছে। ২০০৩ সালে ড. মাহাথির পদত্যাগের পর আবদুল্লাহ বাদাউই ক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং তিনি আনোয়ারকে মুক্তি দেন।

প্রথম দিকে আবদুল্লাহ জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও তিনি তার পার্টির অংশীদার ও জনসাধারণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হন এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে হেরে যান।

আবদুল্লাহর পতনকে কাজে লাগিয়ে পুনরায় রাজনৈতিক জীবনে ফিরে এসেছেন ড. মাহাথির। যিনি আনোয়ারকে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে তিনিও ড. মাহাথিরের রাজনৈতিক ক্রোধের শিকার হন।

মাহাথিরের আরেকটি সফল পদক্ষেপ ছিল ২০০৯ সালে নাজিবকে ক্ষমতায় নিয়ে আসা। আনোয়ার তখন বিরোধী দলের নেতা ছিলেন। যিনি সফলভাবে বিভিন্ন দলকে ২০০৮ সালে একই ছাতার নিচে নিয়ে আসেন।

নাজিব রাজাক সেই সময় ড. মাহাথিরের ভূমিকার পুনরাবৃত্তি করেন। আনোয়ারের বিরুদ্ধে সমকামিতার অভিযোগ এনে তাকে একটি বিতর্কিত বিচারের মুখোমুখি করেন।

তবে শেষ পর্যন্ত নাজিব রাজাকও আবদুল্লাহর মতো একই ভুল করেন। ব্যর্থ হন জাতীয় নেতৃত্ব ধরে রাখতে।

পরিবর্তনের দিকগুলো ২০১৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নাজির রাজাকের বিরুদ্ধে গৃহায়ণ খাতে দুর্নীতির ওয়ান এমডিবি কেলেঙ্কারির অভিযোগ ওঠে এবং তার এমন কিছু সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়, যেগুলো দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জন করা হয়েছে বলে মনে করা হতো।

এ অবস্থায় খোলাখুলিভাবে নাজিব রাজাকের নেতৃত্বের কড়া সমালোচনা করেন ড. মাহাথির। পরে নাজিব রাজাক ড. মাহাথিরের সঙ্গে ব্যক্তিগত আক্রমণে জড়িয়ে পড়েন। পরে তাকে দল থেকে বহিষ্কারের পাশাপাশি মামলার হুমকি দেন।

আনোয়ারের মতো ড. মাহাথিরকেও একই ফাঁদে ফেলতে চান নাজিব রাজাক।

এ অবস্থায় ২০১২ সালের ডিসেম্বরে ড. মাহাথির বিরোধী দলের সঙ্গে কাজ করতে শুরু করেন এবং নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।

এ সম্পর্কের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশজুড়ে ছিল আনোয়ারকে পুনরায় ক্ষমতায় ফেরানো এবং তার মুক্তি ও ক্ষমা সুরক্ষিত করা।

নাজিবের পতন, আইনের শাসন পুনর্বহাল এবং রাজনৈতিক সংস্কারের ডাক দেয়ার মাধ্যমে চলতি মাসে ৯২ বছর বয়সী মাহাথির বিরোধীদের জয় ছিনিয়ে নেন।

১৯৯০ সালে আনোয়ারের যে এজেন্ডাগুলো একসময় সমালোচনার শিকার হয়েছিল, সেগুলোই এখন গ্রহণ করা হচ্ছে সেই ব্যক্তির দ্বারা, যিনি একসময় তাকে প্রত্যাখ্যান ও শাস্তি দিয়েছিলেন।

এবার আনোয়ারের মুক্তির মাধ্যমে দুজন পুনরায় জোট বেঁধেছেন এবং তারা একই সঙ্গে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন রাজনৈতিক সংস্কারের।

অবশ্য পুরনো ক্ষত এখনও রয়ে গেছে, তবে সেটি একই লক্ষ্য অর্জনের পথে কীভাবে দূর হবে তা পরিষ্কার নয়। ক্ষমতার পালাবদল এবং রাজনৈতিক সংস্কারের কথা উঠলেও দুজনের মধ্যে মত-ভিন্নতাও রয়েছে যথেষ্ট।

তার পরও অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায় এখন মালয়েশিয়ানরা আশা করছেন যে, এ দুই নেতা ব্যক্তিগত বিষয় ভুলে দেশের উন্নয়নে একত্রে কাজ করবেন। সূত্র : বিবিসি বাংলা।

ঘটনাপ্রবাহ : মালয়েশিয়ায় নির্বাচন

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter