জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধির নিবন্ধ

বিচার হয় না বলেই বারবার বর্বর হয়ে ওঠে মিয়ানমার সেনাবাহিনী

প্রকাশ : ২২ জুন ২০১৮, ১৪:৩৭ | অনলাইন সংস্করণ

  ইয়াং লি

ছবি: সংগৃহীত

অন্যান্য দিনের মতো সেনিও মাঠে কাজ করছিল তিন রোহিঙ্গা নারী। আচমকা তাদের ঘিরে ফেলে জনাকয়েক সেনা। দেখতে দেখতে ৮০ জন। তুলে নিয়ে গেল ব্যারাকে। তারপর সেই চিরপরিচিত বর্বর নির্যাতন গণধর্ষণ। টানা চার দিন।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বর অভিযান চালায় দেশটির সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনীর অমানবিক ও বর্বর এ নিধনযজ্ঞ ও গণহত্যার পর প্রায় ১০ মাস গত হয়েছে।

এর প্রতিক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য হারে নিন্দা ও উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার বিবৃতি দিয়েছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। সহিংসতার জন্য প্রধান দায়ী সেনাবাহিনীকে বিচারের কাঠগড়ায় আনতে পারেনি বিশ্ব সম্প্রদায়।

এ ক্ষেত্রে বরাবরের মতো এবারও পুরোপুরি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে তারা। বিশ্ব সম্প্রদায়ের এই বিস্মৃতি ও ব্যর্থতার কারণেই রোহিঙ্গাদের ওপর বাববার বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতার সুযোগ ও সাহস পেয়েছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী।

তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনাই সহিংসতা বন্ধের একমাত্র পথ। দ্য গার্ডিয়ানে লেখা এক নিবন্ধে এসব কথা বলেছেন মিয়ানমারের জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি ইয়াং লি।

জাতিসংঘ, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ অন্যান্য মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, রোহিঙ্গাদের ওপর অভিযানে তাদের ওপর গণহত্যা চালানো হয়েছে। অন্তত ৬ হাজার ৭০০ নারী, শিশু ও পুরুষকে হত্যা করা হয়েছে। ধর্ষণ ও অন্যান্য যৌন নির্যাতন করা হয়েছে বহু নারীকে।

‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ নামের এই অভিযানে রোহিঙ্গাদের শত শত গ্রাম, হাজার হাজার একর ফসলি জমি, মসজিদ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আগুনে জ্বালিয়ে দেয়া হয়। প্রাণে বাঁচতে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।

কক্সবাজারের কয়েকটি শরণার্থী শিবিরে এখন মানবেতর জীবনযাপন করছে তার। রাখাইনের অভ্যন্তরীণভাবে উদ্বাস্তু হয়েছে আরও অন্তত ১ লাখ ২০ হাজার।

মৌলিক অধিকার ছাড়াই প্রাদেশিক রাজধানী সিত্তের বিভিন্ন ক্যাম্পে অবস্থান করছে তারা। মিয়ানমারে এসব নতুন নয়। ১৯৪৮-র গৃহযুদ্ধের সময় থেকেই চলে আসছে। হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন নাবালকদের কাঁধে অস্ত্র তুলে দিয়ে ‘শিশু সৈনিক’- কি হয়নি তখন?
১৯৯০ সালে কায়িন রাজ্যের সংখ্যালঘুদের ওপরে সেনাবাহিনীর বর্বরতা!

সে সময়ও ১০ হাজার মানুষ মিয়ানমার ছাড়ে। পালিয়ে যায় থাইল্যান্ড। ১৯৯৬-৯৮ টানা দু’বছর ধরে দেশটির শান রাজ্যে নৃশংসতা চালায় এই সশস্ত্র বাহিনী। এখনও ৩ লাখের বেশি মানুষ মিয়ানমার থেকে পালিয়ে যায়।

তারপর ১৭ বছরে যুদ্ধবিরতি শেষে ২০১১ সালে আবার ঝাঁপিয়ে পড়ে শান ও কাচিন রাজ্যের গ্রামগুলোতে। আবার গ্রাম ছাড়ে এক লাখ। চলতি বছর মিয়ানমারের কাচিন প্রদেশে কাচিন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর ওপর অভিযান শুরু করে সেনাবাহিনী।

এতে নিহত হয়েছে কয়েকশ’ মানুষ। ঘরবাড়ি ছেড়ে বনে-জঙ্গলে আশ্রয় নিয়ে কয়েক হাজার মানুষ। প্রতি বছরই ক্ষেপে উঠেছে বিশ্ব বিবেক। দাবি উঠেছে বিচারের। কিন্তু কোনোবারই এই বাহিনীর শাস্তি হয়নি। বিচারের আওতায়ও আনা যায়নি। বিশ্ব সম্প্রদায়ের এই ব্যর্থতায় আজকের মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সবচেয়ে ‘বড় সাহস’।