জাতিগত নির্মূলের শিকার রোহিঙ্গাদের রক্ষায় বিশ্ব ব্যর্থ

প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০১৮, ১৬:৩৫ | অনলাইন সংস্করণ

  অ্যান্তনিও গুতেরেস

ছবি: রয়টার্স

বাবা-মায়ের সামনেই তাদের বাচ্চাদের কুপিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। একদিকে যুবতী ও নারীদের গণধর্ষণ অন্যদিকে পরিবারের সদস্যদের নির্যাতন ও হত্যা করা হয়েছে। আর গ্রামগুলো আগুন জ্বালিয়ে ভস্মীভূত করা হয়েছে।

গত সপ্তাহে রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবির পরিদর্শনে গিয়ে হাড়ে কাঁপন ধরানো যে বিবরণ শুনেছি, তার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ব্যাপক হত্যা ও সহিংসতার শিকার হয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে তারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন।

কীভাবে বড় ছেলেকে নিজের সামনে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে, সেই বর্ণণা দিতে গিয়ে এই মুসলিম নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর এক সদস্য কান্নায় ভেঙে পড়েন। তারা মাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। আর বসতবাড়িটি পুড়িয়ে ছাই করে দেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, তিনি একটি মসজিদে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু সেনারা তাকে সেখান থেকে খুঁজে বের করে নির্যাতন করে এবং পবিত্র কোরআন পুড়িয়ে দেয়।

সঠিকভাবে বললে জাতিগত নির্মূলের শিকার এসব লোকজন নিদারুণ যন্ত্রণা ভোগ করছেন, যা প্রত্যক্ষদর্শীদের হৃদয় ভেঙে ক্ষোভ উসকে দিতে পারে। তাদের এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা উপলব্ধি করা অসম্ভব হলেও প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর জন্য বাস্তবতা।

রোহিঙ্গারা এমনি নিপীড়নের শিকার যে নিজ দেশ মিয়ানমার তাদের নাগরিকত্বসহ অধিকাংশ মৌলিক অধিকার কেড়ে নিয়েছে।

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভীতি ঢুকিয়ে দিতে গত বছর মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী পরিকল্পিতভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ভয়ঙ্কর বিকল্প বেছে নিতে রোহিঙ্গাদের ঠেলে দেয়া: মৃত্যুর ভয় নিয়েই থেকে যাও কিংবা জানে বাঁচতে সবকিছু ছেড়ে পালিয়ে যাও।

নিরাপত্তার সন্ধানে দুর্বিষহ যাত্রা শেষে এসব শরণার্থীরা কক্সবাজারে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে খাপ খাইয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে। এটা এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী সংকট।

সীমিত সম্পদ নিয়ে বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। তারপরও বাংলাদেশের জনগণ ও সরকার রোহিঙ্গাদের জন্য তাদের সীমান্ত ও হৃদয় খুলে দিয়েছে, যেখানে বৃহত্তর ও সম্পদশালী দেশগুলো বাইরের মানুষের মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে।

বাংলাদেশের মানুষের মানুষের মমত্ববোধ ও উদারতা দেখিয়ে দিয়েছে মানবতার সর্বোচ্চ রূপ এবং হাজারো মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে।

কিন্তু এই সংকটের অবশ্যই বৈশ্বিক সমাধান করতে হবে।

প্রাণ হাতে নিয়ে পালানো মানুষের আশ্রয় দিতে বাংলাদেশের মতো সামনের সারির দেশগুলো যাতে একা হয়ে না যায় তার জন্য জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলো শরণার্থী বিষয়ে একটি বৈশ্বিক চুক্তি চূড়ান্ত করছে।

তবে এখনকার জন্য জাতিসংঘ ও অন্যান্য মানবিক সাহায্য সংস্থাগুলো পরিস্থিতির উন্নয়নে শরণার্থী ও আশ্রয়দাতা দেশগুলোর সঙ্গে কাজ করছে।

কিন্তু দুর্যোগ এড়াতে আরও সম্পদ জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন। সেই সঙ্গে শরণার্থী সংকটে বৈশ্বিকভাবে দায়িত্ব ভাগ করে নেয়ার যে নীতি তাকেও আরও গুরুত্ব দিতে হবে।

১০০ কোটি ডলারের আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার আহ্বানের বিপরীতে মাত্র ২৬ শতাংশ তহবিল জোগাড় হয়েছে। এই ঘাটতির অর্থ হচ্ছে আশ্রয় শিবিরে অপুষ্টি রয়েছে।

এর অর্থ হলো পানি ও পয়োনিষ্কাষণের সুযোগ আদর্শ অবস্থা থেকে অনেক দূরে। এর অর্থ আমরা শরণার্থী শিশুদের মৌলিক শিক্ষা দিতে পারছি না। শুধু তাই নয়, বর্ষাকালের তাৎক্ষণিক ঝুঁকি মোকাবেলায় পদক্ষেপগুলোও অপর্যাপ্ত।

আশ্রয় নেয়া শরণার্থীদের তাড়াহুড়ো করে তৈরি বস্তিগুলো এখন ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে। বিকল্প জায়গা খুঁজে আরও জোরালো আশ্রয়স্থল নির্মাণ নিতান্ত জরুরি।

এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অনেক কিছুই করা হয়েছে। তবু মারাত্মক ঝুঁকি রয়ে গেছে, সংকটের সামগ্রিক পরিসরের কারণে।

বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিমের সঙ্গে আমি বাংলাদেশ সফর করেছি। রোহিঙ্গা শরণার্থী ও তাদের আশ্রয়দাতাদের সহায়তায় ব্যাংক থেকে ৪৮০ মিলিয়ন ডলার দেয়ার ঘোষণাকে স্বাগত জানাই।

তারপরও আন্তর্জাতিক মহল থেকে অনেক অনেক সহায়তা দরকার। শুধু সংহতি জানালেই হবে না রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন বাস্তব সহায়তা।

মিয়ানমারে এতো নির্যাতন সহ্য করার পরও কক্সবাজারে আমার দেখা রোহিঙ্গারা আশা ছেড়ে দেয়নি।

আমরা চাই মিয়ানমারে আমাদের নিরাপত্তা ও নাগরিকত্ব দেয়া হোক। আমাদের বোন, কন্যা ও মায়েদের যে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে তার বিচার আমরা চাই, ধর্ষণের ফলে জন্ম নেয়া নিজ শিশুকে বুকে নিয়ে থাকা এক মাকে দেখিয়ে বললেন বিপর্যস্ত কিন্তু দৃঢ়চেতা এক নারী।

রাতারাতি এই সমস্যার সমাধান হবে না। একইভাবে এই পরিস্থিতি অনির্দিষ্টকালের জন্য চলতে দেয়াও যায় না।

মিয়ানমারকে অবশ্যই পূর্ণ অধিকারসহ শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের পরিস্থিতি তৈরি ও তাদের নিরাপদে মর্যাদার সঙ্গে বসবাসের প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।

এজন্য ব্যাপক বিনিয়োগ দরকার পড়বে। কেবল মিয়ানমারের অন্যতম এই দরিদ্র অঞ্চলটির উন্নয়ন ও অবকাঠামো নির্মাণই নয়, তাদের পুনর্মিলন ও মানবাধিকারের প্রতি সম্মান ফিরিয়ে আনার জন্যও এটা করতে হবে।

রাখাইনে সহিংসতার গোড়ার কারণগুলো সামগ্রিকভাবে সমাধান না করলে দুর্গতি ও ঘৃণা সংঘাতের আগুনে ঘি ঢেলে যাবে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বিস্মৃত ভুক্তভোগী হতে পারে না। তাদের সাহায্যের আবেদনে সাড়া দিয়ে কাজে নামতে হবে।

লেখক: জাতিসংঘের মহাসচিব