ট্রাফিক না হয়েও কেন সড়ক সামলান এই নারী?

  যুগান্তর ডেস্ক    ০৫ আগস্ট ২০১৮, ১৮:১১ | অনলাইন সংস্করণ

ডরিস আন্টি
ডরিস আন্টি। ফাইল ছবি

তার পরনে পুলিশের মতো কোনও খাকি উর্দি পর্যন্ত নেই। একেবারে সাদামাটা সালোয়ার-কুর্তা, বড়জোর মাথায় একটা টুপি কখনো-সখনো - কিংবা গায়ে জড়ানো একটা সস্তা ফ্লুরোসেন্ট জ্যাকেট।

ভদ্রমহিলার নাম ডরিস ফ্রান্সিস। রাস্তায় নিয়মিত যাতায়াত করা লোকজন 'ডরিস আন্টি' নামেই চেনেন তাকে।

ভারতের দিল্লির উপকণ্ঠে গাজিয়াবাদের বুক চিরে গেছে যে ন্যাশনাল হাইওয়ে টোয়েন্টি ফোর, সেই ব্যস্ত মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ একটা ক্রসিংয়ে, রোজ সকালেই অদ্ভুত ওই দৃশ্যটা চোখে পড়ত।

মাত্র কয়েকমাস আগেও এমন দৃশ্য দেখতেন স্থানীয়রা।

খোডা, ইন্দিরাপুরম আর দিল্লিগামী সড়কের ওই ত্রিমুখী মোড়টায় সকালের ব্যস্ত অফিস টাইমে রোজ দেখা যেত পঞ্চাশোর্ধ্ব এই নারীকে। হাতে স্রেফ একটা লাঠি আর গলায় বাঁশি ঝুলিয়ে ট্রাফিক সামলাচ্ছেন।

২০০৯ সাল থেকে একটানা তিনি এন এইচ টোয়েন্টি ফোরের ওই ব্যস্ত মোড়ে দাঁড়িয়ে বাস-ট্রাক-প্রাইভেটকার-অটো-টেম্পোর চলাচল সামলাচ্ছেন, একই সঙ্গে নিয়ম মেনে রাস্তা পেরোতে হাজার হাজার পথচারীকে সাহায্য করছেন।

আর ডরিস আন্টির লাঠির ইশারায় নিমেষে থেমে যাচ্ছে হাজার হাজার গাড়ি, হুইশেল দিয়ে রাস্তা পার করাচ্ছেন অগণিত লোককে - সেটাও ছিল দেখার মতো একটা দৃশ্য!

রোদ-বৃষ্টি-ঝড়-জল যাইহোক, সকাল সাতটা থেকে দশটা পর্যন্ত ডরোথির ছিল ওটাই বাঁধা রুটিন। কখনও পাশে ট্রাফিক পুলিশের কর্মীরা থাকতেন, কখনও বা থাকতেন না।

নেহাত কোনও দিন কঠিন রোগে আক্রান্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত এ রুটিনের কোনও ব্যত্যয় হয়নি ডরোথি ফ্রান্সিসের জীবনে। বছরখানেক আগে ক্যানসারে শয্যাশায়ী হওয়ার আগে পর্যন্ত টানা সাত-আট বছর ধরে এই কাজ চালিয়ে গেছেন তিনি।

কিন্তু বাহান্ন বছর বয়সে কেন এমন একটা অদ্ভুত মিশনে নেমেছিলেন ডরিস ফ্রান্সিস?

যখন আরও সুস্থ ছিলেন ও ভালভাবে কথা বলতে পারতেন, তখন নিজেই ফাঁস করেছিলেন সে রহস্য। আসলে পথ দুর্ঘটনায় নিহত মেয়ের আত্মাকে শান্তি দিতেই এ রাস্তা বেছে নিয়েছিলেন তিনি।

ডরিস বলেছিলেন, "ঘটনাটা ২০০৮ সালের। মেয়ে আর স্বামীকে নিয়ে একটা অটোতে (সিএনজি) চেপে আমরা যাচ্ছিলাম এন এইচ টোয়েন্টি ফোর দিয়েই। এমন সময় গাজিয়াবাদের দিক থেকে একটা ওয়াগন-আর গাড়ি তীব্র গতিতে এসে সোজা ধাক্কা মারে আমাদের অটোতে। আমরা তিনজন তিনদিকে ছিটকে পড়ি।"

‘আমি আর আমার স্বামী দুজনেই গুরুতর জখম হয়েছিলাম - কিন্তু সবচেয়ে সাঙ্ঘাতিক অবস্থা ছিল আমাদের মেয়ে নিকির। ধাক্কার আঘাতে ওর ফুসফুসে মারাত্মক চোট লেগেছিল, শরীরের নানা অংশ বেরিয়ে এসেছিল পর্যন্ত!’

এরপর টানা এক বছরেরও বেশি সতেরো বছরের মেয়ে নিকি হাসপাতালে শুয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেছিল - তবে তাকে বাঁচানো যায়নি। কিন্তু সেই দুষ্টুমিষ্টি মেয়েটার স্মৃতি এক মুহূর্তের জন্যও ভুলতে পারেননি ডরিস।

সন্তানহারা মা এর পরেই স্থির করে ফেলেন, যে ক্রসিংয়ের কাছে বেপরোয়া ট্র্যাফিকের কারণে তার নিকি চিরতরে হারিয়ে গেছে সেখানে তিনি নিজেই ট্র্যাফিক সামলানোর ভার হাতে তুলে নেবেন।

এ প্রসঙ্গে তিনি বিবিসিকে বলেন, ‘আমার শুধু মনে হত, সেদিন যদি ওই মোড়ে একজন ট্র্যাফিক পুলিশ থাকত তাহলে ওয়াগন-আর গাড়িটা অত জোরে ছুটে আসার কথা হয়তো ভাবতেই পারত না। হয়তো বেঁচে যেত নিকির জীবনটা!’

‘এখন ওই ক্রসিংয়ে আমি নিজেই দাঁড়িয়ে যদি বেপরোয়া যানবাহন সামলাতে পারি, তাহলে হয়তো কয়েকটা জীবন নিশ্চয় বাঁচাতে পারব। মৃত্যুর ওপারে গিয়ে নিকি এর চেয়ে বেশি শান্তি কিছুতেই পাবে না।’

বলতে বলতে আবেগে গলা ধরে আসে ডরোথির।

ব্যাস, যে কথা সে-ই কাজ। সে দিন থেকেই তার মিশনে লেগে পড়েন ডরিস।

‘প্রথম প্রথম যে অসুবিধা হত না, তা বলব না। আমার ইশারায় গাড়িগুলো থামতে চাইত না, পাল্টা প্রশ্ন করত আপনার কী এখতিয়ার আছে ট্র্যাফিক কন্ট্রোল করার? লোকজনও অনেকেই মানতে চাইত না।’

"কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই সবাই একদম পাল্টে গেল। লোকে বুঝল যে আমি থাকার ফলে ওই মোড়টা পারাপার করা অনেক নিরাপদ হচ্ছে, সহজ হচ্ছে। এখন তো গাড়ির কাঁচ নামিয়েও অনেকে বলে যায় থ্যাংক ইউ আন্টি, অনেকে থাম্বস আপ দেখায়।’

'আনসাং ইন্ডিয়ানস' নামে একটি বিবিসি সিরিজেও তুলে ধরা হয়েছিল ডরিসের এই অসামান্য কাজের কথা। বিবিসির ওই সিরিজে তাকে অভিহিত করা হয়েছিল দিল্লির 'ট্র্যাফিক কুইন' হিসেবে।

ডরিস ফ্রান্সিসের এই নিঃস্বার্থ সেবাকে স্বীকৃতি দিয়েছে পুলিশ কর্তৃপক্ষও।

গাজিয়াবাদের পুলিশ প্রধান আকাশ টোমার বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "উনি একজন নাগরিক হিসেবে আমাদের ট্রাফিক পুলিশের পরিপূরক ভূমিকা পালন করেছেন বহু বছর ধরে।"

"খোডা-ইন্দিরাপুরম ক্রসিংয়ে সড়ক দুর্ঘটনার হার অনেক কমে যাওয়ার পেছনে ডরিস ফ্রান্সিসের যে বিরাট অবদান আছে তা স্বীকার করতে আমাদের কোনও দ্বিধা নেই।"

কয়েক মাস আগে দুরারোগ্য ক্যান্সার ডরিস ফ্রান্সিসের জীবনীশক্তি অনেকটাই কেড়ে নিয়েছে - এখন আর তিনি আগের মতো লাঠি হাতে আর হুইশল ঝুলিয়ে এন এইচ টোয়েন্টি ফোরের মোড়ে এসে দাঁড়াতে পারেন না।

তাকে স্থানীয়রা সড়কে খুব মিস করেন!

সূত্র: বিবিসি বাংলা

ঘটনাপ্রবাহ : বিমানবন্দর সড়কে দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.