রাখাইনে গণহত্যার দলিল সংগ্রহ করছেন রোহিঙ্গারা

  যুগান্তর ডেস্ক ১৭ আগস্ট ২০১৮, ১৪:২০ | অনলাইন সংস্করণ

রোহিঙ্গা
ছবি: রয়টার্স

মুহিবুল্লাহ প্রচলিত কোনো মানবাধিকার তদন্তকারীদের মতো কেউ নন। পরনে মিয়ানমারের ঐতিহ্যবাহী লুঙ্গি আর মুখে পান। কক্সবাজারে রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরের প্লাস্টিক ও বাঁশ দিয়ে নির্মিত একটি নড়বড়ে কুঁড়েঘরে থাকেন তিনি।

ত্রাণ বিতরণের সময় তাকে দীর্ঘ সারিতে অপেক্ষা করতে দেখা যায়।

কিন্তু এই মুহিবুল্লাহসহ রোহিঙ্গাদের একটি দল এমন কিছু করে দেখিয়েছেন, সাহায্য সংস্থা, বিদেশি সরকার কিংবা সাংবাদিকরা যা পারেননি।

রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সামরিক অভিযানে নিহত রোহিঙ্গা মুসলমানদের তালিকা তৈরি করেছেন তারা।

যত্নের সঙ্গে গণহত্যার শিকার রোহিঙ্গাদের একটার পর একটা নাম ধারাবাহিকভাবে তারা লিখে রাখছেন। সঙ্গে নৃশংসতার অন্যান্য প্রমাণও নথিভুক্ত করছেন। যাতে মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচারের মুখোমুখি করতে পারেন।

ওই অভিযানে সাড়ে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন আরও কয়েক হাজার রোহিঙ্গা।

কক্সবাজারে কাজ করেছে জেনেভাভিত্তিক সাহায্য সংস্থা মেডিসিনস স্যানস ফ্রন্টিয়ার্স। সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০১৭ সালের আগস্টের শেষ দিকে শুরু হওয়া সহিংসতায় প্রথম মাসেই ছয় হাজার ৭০০ রোহিঙ্গা নিহত হয়েছেন।

কিন্তু তাদের জরিপ কেবল ওই এক মাসের তথ্যই দিচ্ছে। এ ছাড়া গণহত্যার শিকার রোহিঙ্গাদের শনাক্ত করা হয়নি তাতে।

কিন্তু মুহিবুল্লাহরা তালিকা তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। চূড়ান্ত হিসাব বলছে, সেনা অভিযানে ১০ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা নিহত হয়েছেন। এতে ২০১৬ সালের অক্টোবরের সহিংসতার হিসাবও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

নিহতদের নাম, বয়স, বাবার নাম ও ঠিকানাভিত্তিক ক্যাটালগ তৈরি করা হচ্ছে। কীভাবে তাদের হত্যা করা হয়েছে, সেই বর্ণনাও থাকছে তাতে।

৪৩ বছর বয়সী মুহিবুল্লাহ বলেন, যখন আমাকেও একজন শরণার্থী হতে হয়েছে, তখন মনে হয়েছে- আমারও কিছু করার আছে।

তার মতে, এ তালিকা গণহত্যার ঐতিহাসিক সাক্ষ্যপ্রমাণ হয়ে থাকবে। নতুবা একদিন সবাই তা ভুলে যাবে।

রোহিঙ্গাদের এ তালিকা সম্পর্কে জানতে মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সাড়া পাওয়া যায়নি।

গত বছরের শেষ দিকে মিয়ানমার সেনাবাহিনী বলেছে, নিরাপত্তা বাহিনীর ১৩ সদস্য নিহত হয়েছেন। তারা বলেন, গত বছরের ২৫ আগস্ট ও ৫ সেপ্টেম্বর ৩৭৬ রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীর গণকবরের খোঁজ পেয়েছেন তারা।

রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনকে তারা জঙ্গিবিরোধী অভিযান বলে দাবি করছে।

রোহিঙ্গারা বলেন, তারা রাখাইন রাজ্যের অধিবাসী। কিন্তু ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন অন্যান্য সংখ্যালঘুসহ তাদের নাগরিকত্বের অধিকার কেড়ে নিয়েছে। তাদের রাষ্ট্রহীন সম্প্রদায় হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

মিয়ানমারের ২০১৪ সালের আদমশুমারি থেকে রোহিঙ্গাদের নাম বাদ দিয়ে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্রকে মূল্যহীন ঘোষণা করা হয়েছে। ২০১৫ সালের জাতীয় নির্বাচনে তাদের ভোট দিতেও দেয়া হয়নি।

এমনকি রোহিঙ্গা শব্দটি ব্যবহারের বদলে তাদের বাঙালি ও মুসলমান বলে আখ্যায়িত করছে মিয়ানমার সরকার।

ছবি: রয়টার্স

কিন্তু বাংলাদেশে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবিরে রোহিঙ্গারা নিহতদের তালিকা, ছবি ও মোবাইল ফোনে ধারণ করা নৃশংসতার ভিডিও সংরক্ষণ করছেন। মিয়ানমারে তাদের ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টার বিরুদ্ধে এভাবেই তারা রুখে দাঁড়িয়েছেন।

রোহিঙ্গাদের দাবি, পুরো রাখাইন রাজ্যজুড়ে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ধর্ষণ ও ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। তাদের বসতবাড়ি পুড়িয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে।

জাতিসংঘ জানিয়েছে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাখাইনে গণহত্যা চালিয়েছে। কিন্তু দেশটির দাবি, সন্ত্রাসী হামলার বিরুদ্ধে তারা শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করেছে।

রোহিঙ্গাদের এ দলটি নিজেদের আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস নামে ডাকছেন। তারা বলেন, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সব অভিযোগের ব্যাপারে তারা সচেতন। কিন্তু নিহতদের তালিকা তৈরি করার ক্ষেত্রে বিপরীত দিক থেকে আসা সমালোচনায় তারা কান দেবেন না।

মিয়ানমার সরকার দাবি করছে, বৈশ্বিক সমর্থন পেতে কিছু বিদেশি ও রোহিঙ্গা মর্মান্তিক গল্প ফাঁদছে।

মুহিবুল্লাহ একসময় সাহায্যকর্মী হিসেবেও কাজ করেছেন। তিনি মংডু জেলায় নদীর পাশের গ্রাম তুলাতোলি গ্রামের একটি উদহারণ দেন। সেখানে সহস্রাধিক রোহিঙ্গা হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।

তিনি বলেন, আমরা মাত্র ৭৫০ জনের তালিকা পেয়েছি। আমরা পরিবারের পর পরিবার, নামের পর নাম ধরে এগিয়ে যাচ্ছি। অধিকাংশ তথ্য আসছে হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া রোহিঙ্গাদের বেঁচে যাওয়া পরিবার সদস্যদের কাছ থেকে। কখনও প্রতিবেশীরাও তথ্য দিচ্ছেন।

ছবি: রয়টার্স

মুহিবুল্লাহ বলেন, যখন কোনো নিহতের আত্মীয়স্বজনদের কাউকে খুঁজে পাই না, তখন পাশের গ্রামের লোকজনের সাহায্য নিই।

তালিকা তৈরি করায় ব্যস্ত এসব রোহিঙ্গা একসময় সাহায্যকর্মী, শিক্ষক ও ধর্মীয় পণ্ডিত হিসেবে কাজ করেছেন। তারা বলেন, এখানে বসে তারা ভালোভাবে সহিংসতার ঘটনাবলির নথি তৈরি করতে পারছেন।

তালিকা তৈরির কাজ করছেন কিউ প্যান ডু গ্রামের সাবেক প্রশাসক মোহাম্মদ রাফি। তিনি বলেন, আমাদের লোকজনের অক্ষরজ্ঞান কম। সাক্ষাৎকার ও তদন্তের মুখোমুখি হওয়ার সময় তারা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত উপায়েই তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

মুহিবুল্লাহ ও তার কয়েকজন বন্ধু বলেন, এ তথ্য তারা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে ব্যবহার করতে পারবেন, এমন আশা থেকেই কাজ করছেন। যাতে মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায়, সেভাবেই তালিকা তৈরি করছেন।

কিন্তু কেউ কেউ বলছেন, মিয়ানমারে নিজেদের বসতবাড়িতে ফিরতে পারবেন, এমন স্বপ্ন নিয়ে তারা এ কাজে জড়িত হয়েছেন।

মোহাম্মদ জুবায়ের নামে একজন বলেন, আমি যদি বাংলাদেশে দীর্ঘদিন থাকি, তবে আমার সন্তানরা জিন্স পরা শিখে ফেলবে। কিন্তু আমি চাই, তারা লুঙ্গি পরুক। আমি নিজের ঐতিহ্য হারাতে চাই না। আমার সংস্কৃতিও আমি হারাতে চাই না।

জুবায়ের বলেন, জাতিসংঘকে দিতে আমরা এ তালিকা তৈরি করছি। আমরা ন্যায়বিচার চাচ্ছি। যাতে আমরা নিজ ভূমি মিয়ানমারে ফেরত যেতে পারি।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সিনিয়র কর্মকর্তা ম্যাট ওয়েলস বলেন, সংঘাতে আক্রান্ত আফ্রিকান দেশগুলোতে তিনি এভাবে তালিকা তৈরি করতে দেখেছেন। কিন্তু রোহিঙ্গারা সেই কাজও আরও নিখুঁত পরিকল্পিতভাবে করছেন।

তিনি বলেন, এ তালিকা সম্ভাব্য মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্তকারীদের সহায়তা করবে।

ঘটনাপ্রবাহ : রোহিঙ্গা বর্বরতা

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter