চুট পিয়ন গ্রামে যেভাবে গণহত্যা হয়েছিল

  যুগান্তর ডেস্ক ২৬ আগস্ট ২০১৮, ২৩:২৭ | অনলাইন সংস্করণ

রাখাইনে রোহিঙ্গা শরণার্থী
ছবি: নিউ ইয়র্ক টাইমস

রাখাইনে যার নেতৃত্বে তাদের গ্রামে হামলা হয়েছে, তাকে ভালো করেই চিনতেন মোহাম্মদ হোসেন। সেনাবাহিনীর সঙ্গে মিলে রোহিঙ্গাদের নির্যাতন করা এই লোকটি সম্পর্কে বহু আগে থেকেই জানতেন তিনি। গ্রামে ঢুকেই চিৎকার করে বলেছিলেন-এগুলোকে কেটে টুকরা টুকরা করে ফেল।

মোহাম্মদ হোসেন বলেন, দুই বছর আগে সেই একই ব্যক্তি তাকে অন্ধকার কক্ষে আটকে নির্যাতন করেছেন। দুই উরুতে গরম লোহার ছেঁক দিয়ে দগ্ধ করে দিয়েছেন ও হাতের নখের ভেতর সুই ভরে দিয়েছেন।

রোহিঙ্গা নারী মোস্তফা খাতুনও সেই একই ব্যক্তির আরেক বিভৎসতার কথা বলেন।

প্রায়ই এই ব্যক্তির ধর্ষণের শিকার হতেন তিনি। মিয়ানমারের হানাদাররা তাদের গ্রাম ঢুকলে সেই একই ব্যক্তি তার স্বামীর গলা কেটে দুই ভাগ করে হত্যা করেছিল।

মার্কিন দৈনিক নিউ ইয়র্ক টাইমসকে দুই ডজন নারী এরকম ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। চুট পিয়ন গ্রামে বছরের পর বছর ধরে এমন ভয়াবহ নির্যাতন ও নিপীড়নই একসময় ব্যাপক হত্যাকাণ্ডে রূপ নিয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, মাত্র একজন মানুষ গত বছরের ২৭ আগস্টের গণহত্যার পেছনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছেন। ওই হত্যাকাণ্ডের জন্য সেই দায়ী। রোহিঙ্গারা জানেন সে কোথায় থাকে, এমনকি তার মুঠোফোন নম্বরও।

ব্যক্তিটি হলেন স্থানীয় প্রশাসক অং থেইন মেই। চুট পিয়নসহ বেশ কয়েকটি গ্রামের দায়িত্ব তার হাতে। তবে এত এত ভয়ঙ্কর অপরাধ সত্ত্বেও তিনি সামান্য শাস্তিও পেয়েছেন বলে কখনো শোনা যায়নি।

রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতিগত নির্মূল অভিযানের এক বছর চলে গেছে। একটার পর একটা গ্রাম পুড়িয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে, হাজার হাজার লোককে নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণ ও লাখ লাখ লোককে নিজেদের জন্মভূমি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছে।

কিন্তু দেশটিতে এজন্য কাউকে বিচারের মুখোমুখি করার ন্যূনতম উদ্যোগ দেখা যায়নি।

এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চেষ্টাও বড়সরো হোঁচট খেয়েছে। এতে মূলত দেশটির নেতৃবৃন্দ, হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী সেনাবাহিনীর জেনারেল ও সহিংসতা বন্ধে ব্যর্থ হওয়া দেশটির বেসামরিক নেতা শান্তিতে নোবেলজয়ী অংসান সুচিকে আলোকপাত করা হয়েছে।

অং থেইন মেই প্রভাবশালী জেনারেলদের কেউ নন। তিনি দেশটির একজন নগন্য বেসামরিক প্রশাসক। কয়েক যুগ ধরে নিপীড়নের শিকার রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অভিযানে সেনাবাহিনী ও সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধদের সঙ্গে অংশ নিয়েছিলেন তিনিও।

নিউ ইয়র্ক টাইমসকে দেয়া টেলিফোন সাক্ষাৎকারে নিজের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি। অং থেইন বলেন, ওই গণহত্যার সময় তিনি সেখানে ছিলেন না।

চুট পিয়ন গ্রামবাসীদের মুখে নির্যাতনের এ বর্ণনা মানবাধিকার কর্মীদেরও ভাবিয়ে তুলেছে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া ১০ লাখের বেশি শরণার্থী শান্তিপূর্ণভাবে মর্যাদাসহকারে নিজেদের আবাসভূমিতে ফিরতে পারবে কিনা; তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।

ছবি: নিউ ইয়র্ক টাইমস

কয়েক দশক ধরে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নানা খেলা খেলার পর বিশ্বের সবচেয়ে নিপীড়িত এ জনগোষ্ঠীকে ষড়যন্ত্রকারী বানাতে চেষ্টা করেছে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ। রাজ্যটিতে এই নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে বিদ্বেষকে চরম বাস্তবতা হিসেবে আখ্যায়িত করতে চাচ্ছেন তারা।

বঙ্গোপসাগরের কূল ঘেষে এক টুকরো ভূখণ্ড রাখাইনে কয়েক শত বছর ধরে রোহিঙ্গারা বসবাস করে আসছেন। রেডক্রসের পরিচালক (অপারেশন) ডমিনিক স্টিলহার্ট বলেন, দুই সম্প্রদায়ই পরস্পরকে ঘিরে আতঙ্ক নিয়ে বসবাস করতেন সেখানে।

চুট পিয়নসহ এখানকার অন্যান্য গ্রামেও সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ ও সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গারা এক অস্বস্তিকর বিচ্ছিন্নতা নিয়ে পাশাপাশি অবস্থান করেছেন। ধানের ক্ষেত, মাছ ধরার জলাশয় ও গবাদিপশুকে ঘাস খাওয়ানো নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব লেগেই থাকত।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই অনাস্থা শত্রুতায় পরিণত হয়। তখন বৌদ্ধরা জাপান ও তাদের বিরোধী ব্রিটেনকে সমর্থন দিয়েছেন মুসলমানরা।

দেশটির সেনাবাহিনীর কয়েক দশকের শাসনামলে অং থেইন মেইর মতো রাখাইনের বৌদ্ধরা ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী হন। তারা স্থানীয় প্রশাসনের অধিকাংশ পদগুলো দখল করেন। রোহিঙ্গাদের ওপর কর্তৃত্ব আরোপ শুরু করেন। এ সময় তারা রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও স্বাধীনভাবে চলাফেরার অধিকার কেড়ে নেন।

অ্যাডভোকেসি গ্রুপ ফোর্টিফাই রাইটসের প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, হামলার আগে স্থানীয় বৌদ্ধদের সহায়তায় দেশটির সেনবাহিনী কীভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার নিখুঁত পরিকল্পনা করেছিল।

অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায় এমন ধারালো হাতিয়ার রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে আগেই হাতিয়ে নেয়া হয়েছিল। তাদের বাড়িঘরের চারপাশের বেড়াগুলো ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়েছিল। আর রাখাইনজুড়ে মোতায়েন করা হয়েছিল কয়েক হাজার সেনা।

কিন্তু আরও বহু বছর আগে থেকেই অং থেইন মে রোহিঙ্গাদের একটা আতঙ্কগ্রস্ত অবস্থার ভেতর নিয়ে গেছেন। ব্যাপক নির্যাতন ও নিপীড়নের মধ্য দিয়ে তিনি রোহিঙ্গাদের ভেতর ত্রাস ছড়িয়ে দিয়েছিলেন।

প্রত্যক্ষদর্শী রোহিঙ্গারা বলেন, অং থেইন তাদের গবাদিপশু ও উৎপাদিত ফসল লুট করে নিয়ে যেতেন। পশুকে ঘাস খাওয়ানো থেকে শুরু করে বিয়ের প্রস্তাবেও অতিরিক্ত ফি আরোপ করে রেখেছিলেন। সামান্য ভুলেও তাদেরকে কঠোর শাস্তি দেয়া হত।

আব্দুল্লাহ নামের এক শরণার্থী বলেন, কেবল তার নামটি মুখে নেয়ার অপরাধে তিনি আক্রোশে ফেটে পড়তেন। এত বেশি নির্যাতন করতেন যে, মনে হয় যেন তাকে কাঁচা খেয়ে ফেলি।

চুট পিয়নে মানবাধিকার গোষ্ঠীর তদন্তেও এমন তথ্য বেরিয়ে এসেছে। জুনে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে, বহু বছর ধরে অং থেইন মে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে আসছেন।

এখনো নিজের পদে বহাল থাকা অং থেইন মেকে কথা বলার সময় খুবই উচ্ছসিত দেখা গেছে বলে জানিয়েছে নিউ ইয়র্ক টাইমস। অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, রোহিঙ্গা প্রতিবেশীদের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক তিনি খুবই উপভোগ করতেন। এ সময় তিনি রোহিঙ্গাদের বর্ণবাদী সম্বোধন বাঙালি হিসেবে ডাকেন।

মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা অনাহূত প্রবেশকারী এমনটা বোঝাতেই তাদের বাঙালি বলে ডাকা হয়। তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা নিজেদের বাড়িঘর নিজেরা পুড়িয়ে দিয়ে অজ্ঞাত কারণে পালিয়ে গেছে। এ সম্পর্কে তিনি আসলে কিছুই জানেন না। কিন্তু তারা চলে যাওয়ায় প্রতিবেশী ও তার জীবন উন্নত হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

অং থেইন মে বলেন, আমি চাইনা, তারা আবার ফিরে আসুক। বাঙালিদের ছাড়াই আমাদের গ্রামটি শান্তিতে আছে।

চুট পিয়ন থেকে ৯০ মাইল দূরে গ্রামটির বেঁচে থাকা লোকজন ব্লোক সি-১০ এ জড়ো হয়েছেন। বাংলাদেশের টিয়াংখালী আশ্রয়শিবিরের সবচেয়ে বেশি ঈর্ষণীয় সেক্টর হচ্ছে এটি।

ছবি: নিউ ইয়র্ক টাইমস

পাহাড় চূড়ায় ব্লোকটিতে সবসময় হালকা বাতাস বয়ে চলে। রোদের কঠিন তাপেও মৃদুমন্দ বায়ু এসে শরীর জুড়িয়ে দিয়ে যায়। কিন্তু মাঝে মাঝে কটুগন্ধ ও মশামাছিরা জীবনকে অসহনীয় করে তোলে।

সেখানে কোনো জলাধার কিংবা বিদ্যুৎ নেই। বিদেশি সংস্থাগুলোর সহায়তার বাইরে কোনো কাজের সুযোগ কিংবা উন্নত জীবনের সম্ভবনাও নেই।

নেড়া পাহাড়ের ওপর শত শত বাঁশের খুপড়ি। এলোমেলোভাবে নির্মিত এসব ঝুপড়ির ভেতর দিয়ে হাঁটলে পথ ঠাহর করাও বেশ কঠিন। গ্রীষ্মের শেষে সেখানে নানা ধরনের ঝুঁকি রয়েছে। ভূমিধসের বাইরেও কলেরা, ডিপথেরিয়া রোগের প্রাদুর্ভাবের আশঙ্কা বিরাজ করছে।

কিন্তু একটি সুন্দর জীবন পেছনে ফেলে এসে নরকের এই রূপ বেছে নেয়ার পেছনে যৌক্তিক কারণ আছে। সহিংসতার মাসখানেক পর চুট পিয়নের সাবেক বাসিন্দা ২৫ বছর বয়সী আহমাদ হোসেন গ্রামটির বেঁচে থাকা অন্যান্য লোকজনের ওপর একটি জরিপ করেন।

তার হিসাবে গ্রামে ২৭ আগস্টের হামলায় এখানে আশ্রয় নেয়া ৯৪ জনের মতো গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। ১৯ নারী বলেছেন, তারা ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। আর ৩৫৮ গ্রামবাসী নিহত হয়েছেন।

নিহতদের তালিকায় তার বাবা ও ভাইয়ের নামও আছে। তার এক বোন এখনো বেঁচে আছেন, উদ্ধাকারীদের তিনি বলেছেন, গুলিবিদ্ধ হওয়ার আগে তিনি ধর্ষণের শিকার হন।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর জরিপের সঙ্গে তার হিসাবের মিল পাওয়া গেছে। গত গ্রীষ্মে সহিংসতার বহু আগ থেকেই এ যন্ত্রণা শুরু হয়েছিল।

নিজের বাড়ির কাছেই নির্যাতন কক্ষটি বানিয়েছিলেন অং থেইন মে। নোংরা মেঝ, কোনো জানালা নেই তাতে। প্রচণ্ড দুর্গন্ধে প্রাণ বেরিয়ে আসার অবস্থা। রোহিঙ্গাদের সেখানে আটকে রেখে নির্যাতন করা হত।

কক্ষটিতে নিয়ে নির্যাতনের শিকার অন্তত ১২ রোহিঙ্গা নিজেদের নির্মম অভিজ্ঞতার কথা এভাবেই বর্ণনা করেছেন। অন্ধকার কক্ষটিতে দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ তাদের আটকে রাখা হত। এ সময় তাদের হাত-পা বাঁধা থাকত।

জানালা না থাকায় প্রচণ্ড গরম ও মশার উপদ্রপ ছিল। সামান্য খাবার ও পানি দেয়া হত, যাতে ক্ষুধা-তৃষ্ণা কিছুই মিটত না। আর সারাদিন মারধর করা হত। যে নির্মমতা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব।

বছর দুয়েক আগের কথা। অং থেইন মে লোকজন মোহাম্মদ হোসেনের খোঁজে আসেন। চল্লিশ বছর বয়সী এই সাত সন্তানের বাবা তখন তার দোকানের কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তারা তাকে রোহিঙ্গা বিদ্রোহী হিসেবে মনে করতে পারে এই ভয়ে তিনি ‘কেন’ শব্দটিও উচ্চরণ করেননি।

মোহাম্মদ হোসেন বলেন, তারা আমাকে বারবার জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন- তোমার অস্ত্র কোথায়? অস্ত্র গোপন করে রেখেছ কোথায়? স্বর্ণ কোথায়? কোথায় লুকিয়ে রেখেছ?

এর পর তাকে ধরে নির্যাতন কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। হাতকড়া পরিয়ে চোখ বেঁধে হাতলের সঙ্গে আটকে রাখা হয়। দুপুর একটায় অং থেইন মে আসলে নির্যাতন শুরু হয়।

তিনি বলেন, তার হাতের কবজি ছোরা দিয়ে কেটে ফেলা হয়। নখের ভেতর সুই ভরে দেয়া হয়। এর পর অং থেইন নিজের কাজ শুরু করেন। তপ্ত লোহার রড তার কোমর, উরু ও পায়ের পেছনে বসিয়ে দেন। তার শরীরের এসব দগদগে ঘা এখনো দেখা যাচ্ছে।

এভাবে ১৩ দিন তাকে আটকে রাখা হয়। এরে মধ্যে তাকে কোনো খাবার দেয়া হয়নি বললেই চলে। এমনকি তাকে প্রয়োজনীয় পানিটুকুও কিনতে বাধ্য করা হয়েছে। তিনি বলেন, তারা আমাকে সামান্য লবণ ও পুরনো ভাত দিত। যা আমি খেতে পারতাম না।

অং থেইন মে নারীদের নির্যাতন করত ভিন্নভাবে।

২৫ বছর বয়সী মোস্তফা খাতুনের স্বামী আবুল হাসেমকে অং থেইন মে নিজ হাতে হত্যা করেছেন। এই রোহিঙ্গা নারী বলেন, আমার শিশু সন্তানদের সামনেই সে আমার স্বামীকে হত্যা করে। তার গলা কেটে আলাদা করে ফেলে। যে বিভীষিকা আমার পরিবার সহ্য করে আসছিল, এটা ছিল তার চূড়ান্ত ধাপ।

চুট পিয়ন গ্রামে হামলার চার থেকে পাঁচ দিন আগে অং থেইন মে গ্রামে ঢুকে তার স্বামীকে খোঁজ করেন। কেন তাকে খোঁজা হচ্ছে, সেই কারণ বলেননি।

মোস্তফা খাতুন বলেন, অন্যান্য নারীদের ক্ষেত্রেও সে এমনটা ঘটিয়েছে। কেবল মুসলমানদের নির্যাতন করাই ছিল তার উদ্দেশ্য। সে ও তার লোকজন মুসলিম পুরুষদের নির্যাতন কক্ষে আটকে রাখত, মোটা অঙ্কের টাকা না দেয়া পর্যন্ত তাদের ছাড়া হত না।

অং থেইন মেকে বলেছিলাম আমার স্বামী বাইরে কাজে গেছেন। কিন্তু সে আমার কথা বিশ্বাস করেনি। স্বামীকে আমি লুকিয়ে রেখেছি বলে অভিযোগ করে চার সন্তানসহ আমাকে আটক করে নিয়ে যায়, বলেন মোস্তফা খাতুন।

তিনি বলেন, শক্ত রশি দিয়ে হাত-পা বেঁধে লোহার রড দিয়ে আমাকে বেদম মারধর করেছে।

এই মারধরের ফাঁকে তার একটাই জানতে চাওয়া ছিল-আমার স্বামী কোথায়? আমার স্বামীকে না পাওয়া পর্যন্ত আটকে রাখা হবে বলে সে জানায়।

কোনো খাবার-দাবার ছাড়াই সন্তানসহ আমাকে চার-পাঁচ দিন আটকে রাখে। আমার সঙ্গে আমার শিশুরাও ক্ষুধার কষ্টে ভুগছিল, জানান মোস্তফা খাতুন।

তিনি বলেন, এক রাতে সে আমাকে ইচ্ছামত পিটিয়ে মুখ চেপে ধরে ধর্ষণ করে। ভয়ে আমার শিশুরা চিৎকার করছিল। অন্ধকারে সে এমন অপরাধগুলো করত।

প্রতিবেশীরা টাকা নিয়ে আসার পরেই তাকে ছেড়ে দেয়া হয় বলে তিনি জানান।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, নির্বিচার গ্রেফতারের হিড়িক শুরু হওয়ার পরই নৃতাত্ত্বিক রাখাইন জনগোষ্ঠীর লোকজন আত্মগোপনে যাওয়া শুরু করেন।

মোবাইল ক্যামেরায় অং থেইন মে। ছবি: নিউ ইয়র্ক টাইমস

মোস্তফা খাতুন বলেন, ছেলে-মেয়েসহ তিনি আটক হলেও তার স্বামী ইচ্ছাকৃতই আত্মগোপনে ছিলেন। কারণ তিনি আটক হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হত। প্রকাশ্যে চলে আসলে তিনি আটক হতেন, অং থেইন তাকে হত্যা করত।

বছর ত্রিশের সবিয়া খাতুনসহ আরও তিন নারীকে এমনই ভাগ্য বরণ করতে হয়েছে। স্বামীকে রক্ষা করতে গিয়ে তারা নির্যাতিত হয়েছিলেন।

তিনি যাতে কাঁদতে না পারেন, সেজন্য তার ওড়না দিয়ে নাখমুখ পেঁচিয়ে রেখেছিলেন অং থেইন ও তার সহকারী। সোবিয়া বলেন, তারা আমাকে এত জোরে আঘাত করছিল যে আমি চিৎকার করে কাঁদছিলাম ও ক্ষমা ভিক্ষা চাচ্ছিলাম।

বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে অং থেইন মের নম্বর নিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদক তাকে ফোন দেন। তখন তিনি তার প্রশাসনিক কেন্দ্র রাথিডং থেকে নিজের বাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন। একজন দোভাষীর সহায়তায় তিনি কথা বলেন। এই একবারেই তার সঙ্গে কথা হয়, এরপর তিনি আর কখনো ফোন ধরেননি।

তিনি বলেন, তার বয়স ৫৭। তিন দশকের বেশি সময় ধরে তিন চুট পিয়নে বসবাস করেন। আশপাশের গ্রামগুলোও দেখাশেনা করেন তিনি।

তার দাবি, কালারদের সমর্থন নিয়েই তিনি প্রশাসকের পদে আসীন হয়েছেন। রোহিঙ্গাদের নিন্দার্থে কালার ডাকা হয়।

গ্রামগুলোতে জীবন সম্পর্কে তার ভাষ্যই রোহিঙ্গাদের বর্ণনায় আয়নার মতো ফুটে উঠেছে। তিনি বলেন, রাখাইনের বৌদ্ধরা সবসময় তাদের মুসলিম প্রতিবেশীদের নিয়ে আতঙ্কে থাকতেন। কিন্তু কেন এই ভয়- সেই ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বিপাকে পড়ে যান।

তিনি কোনোদিন কোনো রোহিঙ্গাকে অস্ত্র হাতে দেখেননি। চুট পিয়নে বৌদ্ধদের বসতিতে কখনো কোনো মুসলমান হামলা চালিয়েছেন বলেও জানা নেই তার।

তিনি দাবি করেন, তার ভাইয়ের ছেলেকে রোহিঙ্গারা হত্যা করেছেন। কিন্তু এ ব্যাপারে বিস্তারিত কোনো তথ্য তিনি দিতে পারেননি।

অং থেইন বলেন, রোহিঙ্গারা দলবদ্ধ হয়ে বৌদ্ধদের বসতবাড়িতে গিয়ে রাতে হুমকি-ধমকি দিয়ে আসতেন। তবে তারা কী বলতেন, তা আমি স্পষ্টভাবে শুনতে পাইনি। কিন্তু আমরা জানতাম, তারা আমাদের ক্ষতি করবে।

হুমকি দিতে আসার সময় তিনি কখনো কাউকে আটক করেননি বলেও জানান। তিনি বলেন, আহমাদ হোসেনের সঙ্গে তার ভালো কাজের সম্পর্ক ছিল।

অং থেইন মের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের প্রশাসনিক যোগাযোগকারী হিসেবে কাজ করতেন আহমাদ। যে সম্পর্ককে অং থেইন ভিন্নভাবে মূল্যায়ন করেন।

তিনি বলেন, আহমাদ আমাকে চাচা বলে ডাকতেন। তিনি তার বিয়েতেও গিয়েছিলেন। তাকে আমি নিজের খুবই ঘনিষ্ঠ একজন বলে মনে করি।

আহমাদ হোসেনও নিশ্চিত করে বলেন যে তিনি অং থেইনকে চাচা বলে ডাকতেন। কারণ এতে তিনি বিরক্ত হতেন বলে মনে হয়েছে। রাখাইনের অন্যান্য গ্রামবাসী বলেন, অং থেইন প্রায়ই রোহিঙ্গাদের বিয়েতে এসে হাজির হতেন। তবে সেটা কেবল মুরগীর রোস্টগুলো গ্রাস করতেই।

নিজ জেলায় রোহিঙ্গাদের দুর্ভোগের মূল পরিকল্পনকারী হলেও তিনি হলেন একটি বড় যন্ত্রের ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। অর্থাৎ এ ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীকে নিপীড়নের জন্য দায়ী তাতমাদো নামে পরিচিত মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও বৌদ্ধ সংখ্যালঘুদের একজন হলেন তিনি। তার মতো এমন আরও বহু পরিকল্পনাকারী রয়েছে।

ফোর্টিফাই রাইটসের নির্বাহী পরিচালক ম্যাথিও স্মিথ বলেন, একজন স্থানীয় প্রশাসক হিসেবে তিনি সেনাবাহিনীর অধীনস্ত। তিনি সেনাবাহিনীর নিপীড়নমূলক নীতি বাস্তবায়ন করতে বাধ্য। অথবা তাকে নিরাপত্তা বাহিনীর ক্রোধ সহ্য করতে হবে।

তিনি বলেন, তারা সরকারের একটা ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। সে অনুসারেই স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তারা নিপীড়ন চালিয়েছেন।

চুট পিয়ন গ্রামটি দুটি ভাগে বিভক্ত। গ্রামটির সঙ্গে একটি ছোট্ট সড়কের সংযোগ রয়েছে, ভেতর দিয়ে একটি নদীও বয়ে গেছে। উত্তরাংশে রাখাইনের বৌদ্ধরা বসবাস করেন। আর দক্ষিণ পাশে রোহিঙ্গাদের আবাস।

গেল বছরের ২৭ আগস্ট সকাল ৯টায় অং থেইন মে গ্রামের রাখাইনে অংশে আসেন। একদল সৈনিকও তার সঙ্গে ছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, তারা এক বিধবার একটি গরু লুট করে নেন। বিধবা সোম খাতুনও এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

অং থেইন মে গরুটি জবাই করে গোশত রান্না করেন। এটা সহিংসতা শুরু হওয়ার ঘণ্টা খানেক আগের ঘটনা। অং থেইন সৈনিকদের নিয়ে সেই গোশত গলাধঃকরণ করেন। একটু পরে যাদের তিনি হত্যা করতে যাচ্ছেন, তাদের চোখের সামনেই এসব কাজ করেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, দুপুর ১টা কিংবা ২টার পরে হত্যাকাণ্ড শুরু হয়।

৭৩ বছর বয়সী বৃদ্ধ আবুল হাশেম বলেন, জোহরের নামাজের পর তিনি তখন মসজিদে ছিলেন মুসল্লিদের সঙ্গে। কারিমা খাতুন বলেন, সেনারা যখন তার বাড়ির দিকে ধেয়ে আসছিল, তিনি তখন রান্নাঘর পরিষ্কার করছিলেন। ৪৮ বছর বয়সী রওশন আলী বলেন, তিনি শুনতে পেলেন, কেউ একজন সবাইকে ঘর থেকে বেরিয়ে আসার নির্দেশ দিয়েছেন।

অং থেইন মে মূলত সেনাদের শিকার ধরতে সহায়তা করেছেন। গুলি করে হত্যাকাণ্ড শুরুর আগে অং থেইন কারও সঙ্গে ফোনে আলাপ করছিলেন বলে জানান আহমাদ হোসেন।

ফোনে তিনি বলছিলেন, আমাদের অংশে আমরা প্রস্তুত। তোমরা চলে আস এবং দ্রুত হত্যাকাণ্ড চালাও। হত্যা কর, হত্যা কর, তাদের সবাইকে হত্যা কর।

আহমাদ হোসেন বলেন, তারা গুলি চালানো শুরু করার পর থেকেই আরও সাতজনের সঙ্গে পুকুরের ভেতর লুকিয়ে সংহারের দৃশ্য দেখছিলাম।

তিনি বলেন, লোকজন নিহত হচ্ছিলেন। আহতরা ব্যথায় আঁকুপাঁকু ও চিৎকার করছিলেন। তাদের জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হচ্ছিল।

প্রাণ বাঁচাতে কিছু লোক পাহাড়ের আড়ালে, কিছু লোক পুকুরে, কিছু লোক ঝোপঝাড়ে ও বাথরুমে আত্মগোপন করেছিলেন, বলেন আহমাদ।

১৬ বছর বয়সী কিশোর পীর মোহাম্মদ যখন দেখল সেনারা তার বাড়ির দিকে আসছে, সঙ্গে সঙ্গে খিড়কি দরজা দিয়ে সে জোরে দৌড় দেয়। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। পেছন থেকে একটা বুলেট এসে তার শরীরে বিদ্ধ হয়।

রোহিঙ্গা কিশোরটি জানায়, প্রথম যখন আমি চোখ মেলি, তখন দেখি গ্রামজুড়ে আগুনের লেলিহান শিখা। সেনাবাহিনী বসতবাড়িগুলো পুড়িয়ে দিয়েছে। এলোপাতাড়ি গুলি করে লোকজনকে হত্যা করছে।

এর পর সে অচেতন হয়ে পড়ে। কয়েকদিন পর পাশের একটি গ্রামে তার জ্ঞান ফিরে। তার মাকে তাকে এখানে নিয়ে এসেছিলেন।

দুই বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ আনাসকে নিয়ে কারিমা খাতুন ধান ক্ষেতে লুকিয়ে ছিলেন। তিনি বলেন, সেখানে বৃষ্টির মতো বুলেট ছোড়া হয়েছে। একটি গুলি এসে তার ছেলের ছোট্ট শরীর ভেদ করে বেরিয়ে যায়।

আনাসকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সে মাত্র ঘণ্টা কয়েক জীবিত ছিল।

এই গণহত্যায় মূল ভূমিকা রেখেছেন অং থেইন মে। যদিও প্রত্যক্ষদর্শীরা এ ব্যাপারে ভিন্ন তথ্যও দিয়েছেন। একজন বলেন, সে একটা অ্যাসল্ট রাইফেল নিয়ে সেনাদের সঙ্গে গণহত্যায় মেতে উঠেছিলেন। কেউ কেউ বলেন, তার হাতে তরবারি ও বড় ছোরা ছিল।

ফাতিমা খাতুন বলেন, তিনি দেখেছেন অং থেইন একটি ছোট্ট শিশুকে একটি জলন্ত বাড়ির ভেতর ছুড়ে মেরেছেন।

শিশুটির মাকে গুলি করে হত্যা করা হলে সে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পালিয়ে যেতে চেষ্টা করেছিল। তখনই অং থেইন তাকে ধরে আগুনের শিখার ভেতরে নিক্ষেপ করেন।

ছবি: নিউ ইয়র্ক টাইমস

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তদন্তেও একই তথ্য দিচ্ছে। প্রত্যক্ষদর্শীর বরাতে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের জুনের প্রতিবেদন বলছে, গ্রামটির প্রশাসক অং থেইন মেও বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগে অংশ নিয়েছিলেন।

ফোর্টিফাই রাটসকে চুট পিয়নের বাসিন্দারা বলেন, সেনা সদস্যরা যেসব গ্রামবাসীকে গুলি করেছিল সশস্ত্র বৌদ্ধ বেসামরিক লোকজন তলোয়ার দিয়ে তাদের ছিরশ্ছেদ করেছেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, সেদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত ওই হত্যাকাণ্ড চলছিল। সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত অং থেইন মেকে ঘটনাস্থলে দেখেছেন রওশন আলী। তিনি বলেন, আমি তাকে এলোপাতাড়ি হাঁটাচলা করতে দেখেছি। তিনি জীবিতদের খুঁজে খুঁজে বের করছিলেন। যদি তিনি দেখতেন, কেউ জীবিত আছেন, তবে গলা কেটে তার মৃত্যু নিশ্চিত করতেন।

ঘটনাপ্রবাহ : রোহিঙ্গা বর্বরতা

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter