বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের চোখে তুরস্কের ঈদ

  সরোজ মেহেদী, তুর্কি স্কলারশিপ ফেলো ৩১ আগস্ট ২০১৮, ০১:৪৩ | অনলাইন সংস্করণ

তুরস্কে প্রবাসী শিক্ষার্থীদের ঈদ আনন্দ
তুরস্কে প্রবাসী শিক্ষার্থীদের ঈদ আনন্দ

সাম্প্রতিক উচ্চশিক্ষা গ্রহণে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জনপ্রিয় গন্তব্যগুলোর একটি হচ্ছে এক সময়কার অটোমান সাম্রাজ্য তথা অধুনা তুরস্ক। দেশটির প্রধানতম শহর ইস্তানবুলে কয়েকশ বাংলাদেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। এর বাইরে অন্যান্য শহরগুোলাতেও রয়েছে কয়েকশ শিক্ষার্থী। মুসলিম বিশ্বের নানা ঐতিহ্যবাহী নিদর্শনের দেশ তুরস্কে কেমন করে পালন করা হয় পবিত্র ঈদ। এ নিয়ে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা তাদের চোখে তুরস্কের ঈদ কেমন দেখেছে তা জানিয়েছেন যুগান্তরের কাছে।

আতরের গন্ধবিহীন ইস্তানবুলের ঈদ

ইস্তানবুলের ইয়েলদিজ টেকনিক ইউনিভার্সিটির ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী সালেহ ইমরান যুগান্তরকে বলেন, ফজরের পরপরই ঐতিহাসিক সুলতান আহমেদ (ব্লু মস্ক) মসজিদে ঈদের নামাযের মধ্য দিয়েই শুরু হয় এখানে ঈদের সকাল।

সালামি, কোলাকুলি, সেমাই কিংবা আতরের গন্ধবিহীন ইস্তানবুলের ঈদের সকালটা যতই সাদামাটা হোক না কেন বাংলাদেশি ভাইদের সমাগমে বিকালটা হয় ততই ঝলমলে।

গল্পে আড্ডায় নিজেদের মাঝে এক টুকরো ক্ষুদ্র বাংলাদেশের পরশ খুঁজে নেওয়া, দেশি খাবারে স্বদেশের ঘ্রাণ খুজে ফেরা। আর দেশি পোশাকে (পাঞ্জাবি) নিজেদের স্বকীয়তাকে বুক ফুলিয়ে জানান দেওয়াটাই আমাদের ঈদ। প্রবাসের ঈদ।

বাংলাদেশের একদিন আগে তুরস্কে ঈদ

ইস্তানবুলের ইয়েলদিজ টেকনিক ইউনিভার্সিটি, রিমোট সেন্সিং এবং জি আই এস বিভাগের শিক্ষার্থী তাহেরা আফরিন লিজা যুগান্তরকে বলেন, দুই বছর পরে বাংলাদেশে ঈদ করছি, সেই মহা আনন্দের সঙ্গে সঙ্গে তুরস্কে কাটানো গত বছরের ঈদ উদযাপনের কথাও মনে পড়ছে। দেশের বাইরে থাকা বাঙালিরাসহ টার্কিশরাও যে একটা পরিবার, তাদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়াটাও যে একটা উৎসব সেই অনুভূতিটা আমার ইস্তানবুল থেকেই পাওয়া।

তিনি বলেন, দেশের মত ওখানেও সবাই দেশের আঙ্গিকে ঈদ পালন করার চেষ্টা করে। সবার সঙ্গে কুশল বিনিময়, কিছুটা দেশীয় খাবারের স্বাদ নেয়া, সুন্দর কোনো জায়গায় একসঙ্গে ঘুরতে যাওয়া, সবাই মিলে বিকেলে আড্ডা, খেলাধুলার আয়োজন ইত্যাদি। বাংলাদেশের চেয়ে একদিন আগে তুরস্কে ঈদ হওয়াতে বলা যায় আমাদের ঈদ আসলে দুই দিন।

ইস্তানবুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী রায়হানা হানী যুগান্তরকে বলেন, ঈদ আসে খুশির বার্তা নিয়ে তা সবাই জানে। কিন্তু প্রবাসীদের জীবনে এর বাস্তবতা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ঈদ আছে, কিন্তু তা আনন্দহীন। বেদনাসিক্ত জীবন বললেই চলে। মনের ভেতর মরু শূন্যতা। পরিবার-পরিজন আর দেশের কথা ভেসে বেড়ায় চোখের জলে।

এত কষ্টের মাঝেও একটু হাসিমাখা ঈদ উদযাপন করতে বিদেশে বাংলাদেশ কমিউনিটিগুলোর তুলনা নেই। কমিউনিটিগুলো ঠিক যেন পরিবারের মতই।

ক্ষণিকের আনন্দের দিন শেষে আমরা আবারও সেই প্রবাসীই। সেই দুঃখ, কষ্টগুলো ভিড় জমবে দিনের আলোর শেষে।

সূর্যোদয়ের ১ ঘণ্টা পরই ঈদের জামাত

ইস্তানম্বুলের ফাতিহ সুলতান মেহমেদ বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউবিটাক (TUBITAK) পিএইচডি গবেষক মু. তারিকুল ইসলাম বলেন, তুরস্কে পড়তে এলাম প্রায় আড়াই বছর হয়ে গেল। তুরস্ক ইউরোপের মুসলিম প্রধান দেশ হলে ও এইখানে ঈদের আমেজ একটু ভিন্ন। সব মসজিদে সরকারের র্নিদিষ্ট করে দেওয়া সময় মত সূর্য উদয়ের ৪৫ মিনিট থেকে ১ ঘন্টার মধ্য ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

তিনি বলেন, তুর্কিরা আমাদের মত ‍নতুন জামা না হলে যেন ঈদই হল না এমন নয়, তারা সাধারন পোশাক পরিধান করে থাকে। তবে আমরা বাঙালিরা দেশ থেকে নিয়ে আসা পাঞ্জাবিটা ঈদের দিনই পরা হয়ে থাকে ।

তুর্কিরা নামাজের পর পর আমাদের মত কোলাকোলি খুব কম করে থাকে, তারা বেশিরভাগ ‍করমর্দন করে থাকে, আমাদের মত তারা ও ঈদের সময় আত্মীয়-স্বজনদের বাসায় গিয়ে থাকে।

ঈদ উপলক্ষে যানবাহনের ভাড়া অর্ধেক

তুরস্কে অবস্থানরত বাংলাদেশি গবেষক মু. তারিকুল ইসলাম আরও জানান, এইখানে ঈদের দিন থেকে ৩ দিন যানবাহনগুলো অর্ধেক বাড়া নিয়ে থাকে, যাতে ঈদের উৎসব একে অপরের সঙ্গে সহজে ভাগাভাগি করতে পারে, যা আমাদের দেশের সঙ্গে একবারেই বিপরীত।

তুরস্কে অবস্থানরত বেশিরভাগ বাংলাদেশি ইস্তাম্বুলে হওয়াতে, আমরা প্রতি ঈদে বিকাল বেলায় অধিকাংশ বাংলাদেশি ইয়েনিকাপিতে মারমারা সাগরপাড়ে একত্রিত হই। আমাদের দেশীয় খেলাধুলার আয়োজন করা হয়, তার মধ্য ক্রিকেট খেলা অন্যতম, কারণ তুরস্কের প্রায় মানুষ ক্রিকেট খেলাটার সঙ্গে পরিচিত নয়।

তারপর আমরা সবাই দেশীয় খাবার বিরিয়ানি খেয়ে থাকি, তবে সব কিছুর মূলে হচ্ছে বাংলা খাবার খাওয়া। কারণ বেশিরভাগ বাংলাদেশি ছাত্র হওয়াতে ছাত্রদের হলগুলোতে বাধ্য হয়ে তুর্কিস খাবার খেতে হয়।

আমার জন্য ঈদের অন্যতম আকর্ষণ হলো, তুর্কিদেরও বিভিন্ন দেশের বন্ধুদের দাওয়াত দিয়ে খাওয়াই। আমাদের দেশীয় খাবার খেয়ে তারা যখন তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলে, তখন বেশ মজা পাই।

সুলাইমান ডেমিরেল ইউনিভার্সিটির থিওলোজি বিভাগের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, তুরস্কে এটি আমার তৃতীয় ঈদ। এখানে পরিবার আত্মীয়-স্বজন ও বাঙালি সংস্কৃতি থেকে অনেক দুরে হলেও তার্কিশ ও বিভিন্ন দেশ থেকে আসা বিদেশী বন্ধুদের সঙ্গে একসঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করি। ঈদের দিন বিকেলে পার্কে গিয়ে বার্বিকিউ তৈরি, রাইডিং আর ঘোরাঘুরি করে কেটে যায়।

ঈদের জামাত শেষে লকুম বিতরণ, কোরবানির পশু জবাই গ্রামে

সাকারিয়া ইউনিভার্সিটির সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী বোরহান উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের মতো ঈদ আনন্দ পৃথিবীর অন্য কোথাও হয় কি না আমার সন্দেহ আছে। তুরস্কে আমি এ পর্যন্ত ৩টি ঈদ করেছি। টার্কিশ বন্ধুবান্ধবদের ঈদ নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তাদের কাছে এটি নরমাল। ঈদের দিন তাদের আলাদা উচ্ছ্বাস বা আনন্দ লাগে না। এরা সাধারণত মসজিদে ঈদের নামাজ পড়ে, তারপরে সবাই শুভেচ্ছা বিনিময় (মুসাফাহ) করে। নামাজ শেষে; কেউ কেউ ব্যাক্তিগত উদ্যোগে লকুম (টার্কিশ এক ধরনের মিষ্টি) বিতরণ করে। আর তাদের কোরবানির পশু জবাই করে গ্রামের দিকে।

বাংলাদেশিদের বোঝাপড়াটা খুব ভালো

এস্কিশাহির উসমানগাজী ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও লোক প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী বিল্লাল হোসাইন বলেন, আমাদের শহরে প্রায় আমরা ১২ জনের মত বাংলাদেশি আছি। সবচেয়ে ভালো বিষয় হচ্ছে আমাদের বোঝাপড়াটা খুব ভালো। সাধারণত নামাজ পরে বসে থাকা বা ঘুরা ছাড়া কোন কাজ থাকে না।

এবার এক বড় ভাই আমাদের শহরের সকলকে ঈদের দাওয়াত দিলেন উনার বাসায়। তার বাসায় সে নিজের হাতে ভাত, মাছ, মুরগী মাংস, গরুর মাংস, খাসির বট রান্না করেন। অনেক দিন পর বাংলা খাবার খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে, বিকেলে সবাই মিলে ঘুরতে বের হয়।

বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করি। সন্ধ্যার যার যার হোস্টেলে বা ঘরে ফিরি।

ঘটনাপ্রবাহ : সরোজ মেহেদীর লেখা

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter