মোদির স্লোগানে দুর্দশার অন্ত নেই মানুষের!

  যুগান্তর ডেস্ক ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২৩:৩১ | অনলাইন সংস্করণ

মোদির স্লোগানে দুর্দশার শেষ নেই মানুষের!
মধ্যপ্রদেশের ভোমাদা গ্রামে ঘরের বাইরে হতাশা নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন ৫২ বছর বয়সী শ্রমিক মিসরি লাল-রয়টার্স

‘সুদিন আসছে’ স্লোগানে ভর করে ২০১৪ সালের নির্বাচনে ব্যাপক জনসমর্থন নিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদি। চার বছর পর আগামী বছরের মে মাসে ফের ক্ষমতায় যেতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি।

কিন্তু এ সময়ের মধ্যে তার স্লোগানকে তিনি মোটেও কার্যকর রূপ দিতে পারেননি। এমনকি সাধারণ মানুষের সুদিন দূরের কথা তাদের জীবন মানে ন্যূনতম পরিবর্তন আনতে সক্ষম হননি ভারতের জনপ্রিয় এ বিজেপি নেতা।

একদিকে হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টিকে(বিজেপি) অপ্রতুল কর্মসংস্থানের জন্য হাপিত্যেশ করতে হচ্ছে। অন্যদিকে কৃষিপণ্যের দাম ও গ্রামীণ লোকজনের শ্রমমূল্য পড়ে গেছে।

ক্ষমতাসীন দলের কর সংস্কার নীতিতে ভারতে বেকারত্ব বেড়েছে। মুদ্রার মূল্য কমানোর চর্চা তারল্যকেও কাবু করে দিয়েছে।

চলতি বছরে অর্থনৈতিক উচ্চ প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও রেকর্ড পরিমাণ রুপির দরপতন হয়েছে। এতে দেশটির আমদানি হওয়া জ্বালানি মূল্য বেড়েছে ব্যাপক, ঘটেছে মুদ্রাস্ফীতিও। দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাওয়া দেশজুড়ে বিক্ষোভ দেখা গেছে।

মধ্যপ্রদেশের ভোমাদা গ্রামে বসবাস করেন ৫২ বছর বয়সী মিসরি লাল। হলুদ-সবুজ সয়াবিন ক্ষেত দেখাশুনা করে দিনে দুই ডলার আয় করেন।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের আমলে সাধারণ মানুষের জীবনে কোনো উন্নতি ঘটেনি। আমরা দুই বেলা কোনো রকম খেতে পাই। কিন্তু এর বাইরে দুই পয়সা জমাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

ভারতের রাজনীতির মূলকেন্দ্র উত্তর ও মধ্যাঞ্চলীয় সমভূমিতে বহু লোকের সাক্ষৎকার নিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। এসব মানুষ বলেছেন, মোদি সরকারে তারা হতাশ।

কিন্তু একশ ৩০ কোটি মানুষের বিশাল দেশটিতে দলটির ওপর মানুষের মোহভঙ্গ হয়েছে এমনটাও হলফ করে বলা যাচ্ছে না।

এসব ব্যর্থতা আগামী নির্বাচনে মোদি ও ক্ষমতাসীন হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপির ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে তাও অনুমান করা যাচ্ছে না এখন।

অর্থনীতিতে অনিয়মিত সাফল্য সত্ত্বেও বিজেপি এখনো জোরালোভাবে হিন্দু জাতীয়তাবাদের কথা দেশজুড়ে প্রচার করে বেড়াচ্ছে। যা দিয়ে দলটি বহু ভোটারকে কাছে টানতেও পারছে।

মোদির সহকারীরা জোর দিয়ে বলেন, তাদের দল আগামী নির্বাচনে কোনো সংকটে পড়বে না। ২০১৪ সালের পর আগামী নির্বাচনেও তারা ফের সফল হবেন।

তাদের মতে, চলতি বছরের শেষের দিকে অনুষ্ঠেয় বড় তিনটি রাজ্যের নির্বাচনেও ভালো করবে বিজেপি। এ তিনটি নির্বাচনই বলে দেবে জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল কোন দিকে যাবে।

এ কথা সত্যি যে জনমত জরিপে মোদি এগিয়ে রয়েছেন। সে অনুসারে পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনে তিনি ক্ষমতায় যাচ্ছেন বলেই ধরে নেয়া যায়। তবে বিরোধীদের সঙ্গে ব্যবধান খুব বেশি হবে না। অল্প কিছু ভোটে এগিয়ে থাকতে পারেন।

কিন্তু আসছে দিন বলে যে স্লোগান তিনি দিয়েছিলেন, যা মোদি ও তার শাসনের সমর্থক শব্দে পরিণত হয়ে গেছে, ভারতের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তা নিয়ে পুরোদমে টিটকারি ও মশকরা চলছে।

যেমন এক ব্যক্তি দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে মোদির আসছে দিন তন্ন তন্ন করে খুঁজছেন, কিন্তু কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না, এমন একটি কার্টুন ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপে ছড়িয়ে পড়েছে।

আরেকটিতে দেখা যায়, আসছে দিনের গল্প ফাঁদছে একটি চরকা, আর মোদি সেটির সামনে আনমনে বসে আছেন।

বেশ কয়েকজন বিজেপি নেতা ব্যক্তিগতভাবে রয়টার্সকে বলেছেন, গ্রামীণ ভারতের ছোট শহর ও গ্রামগুলোর লোকজনের মানসিকতা সম্পর্কে তাদের ধারনা নেই। অথচ সেখানে দেশটির দুই তৃতীয়াংশ লোক বসবাস করেন।

কৃষি খামারের কর্মী লাল বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তিনি বিজেপিকে সমর্থন দিয়ে আসছেন। কিন্তু এখন তা পরিবর্তনের সময় এসেছে।

“আমরা সবসময় তাদের ভোট দিয়েছি। কিন্তু লোকজন এখন ক্ষেপে আছেন। সামনের দিনগুলোতে মানুষ তাদের সিদ্ধান্ত পাল্টাবে বলে মনে হচ্ছে,” মন্তব্য লালের।

তিনি যখন কথা বলছিলেন তখন তার স্ত্রী ও দুই নাতনি অবারিত সয়াবিন ক্ষেতের মাঝে ছোট্ট টিনের ছাপড়া দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিলেন।

ছবি: রয়টার্স

তবে মোদি প্রশাসন স্বীকার করছে, দেশের কৃষকরা ভোগান্তিতে রয়েছেন। যেখানে কৃষিকাজেই অধিকাংশ লোক নিয়োজিত। সংখ্যার হিসাবে ২৬ কোটি ৩০ লাখ লোক। অর্থাৎ মোট শ্রমিকদের ৫৫ শতাংশ কৃষিকাজ করেন।

গত মাসের এক প্রতিবেদনে ভারতের কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মুদ্রাস্ফীতির প্রবণতা বলে দিচ্ছে, উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করে কোনো লাভ না হওয়ায় কৃষকরা বিপর্যয়ের মধ্যে রয়েছেন। তাদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেয়া দরকার।

কংগ্রেস আমলের উচ্চ প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তুলনা করলে দেশটিতে গ্রামের শ্রমের মূল্য কমে গেছে। তখন দেশটিতে গ্রামের জন্য কর্মসংস্থান পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছিল। এতে বছরে অন্তত ১০০দিন প্রতিটি নাগরিককে কাজের বিনিময়ে মজুরির নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছিল।

অর্থনীতিবীদরা বলেন, প্রকল্পটির সেই সুফল এখন রাতারাতি কমে গিয়েছে।

অবকাঠামো খাতের বিকাশ মজুরি বৃদ্ধিকে টেকসই করে তুলতে পারত, কিন্তু নাটকীয়ভাবে সেটার অবনমন ঘটেছে। বলতে গেলে মোদি সরকার সেটাকে জোর করে টেনে নামিয়েছেন।

২০১৬ সালে দুর্নীতির বিরুদ্ধের যুদ্ধের নামে উচ্চ মূল্যের মুদ্রা বাজার থেকে তুলে নেয়া হয়। তখন থেকে পণ্য ও সেবা করকে (জিএসটি) ব্যবসার সঙ্গে মানিয়ে নেতে বেগ পেতে হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সংস্থা ফিচের ভারতীয় শাখা রেইটিং অ্যান্ড রিসার্চ জানিয়েছে, গ্রামীণ মজুরিতে গড় মুদ্রাস্ফীতি-সমন্বিত প্রবৃদ্ধি ২০১৫/১৬ ও ২০১৭/১৮ এর মধ্যে শূন্য দশমিক ৪৫ শতাংশ কমে গেছে। ২০১২/১৩ ও ২০১৪/১৫ সালে যা ছিল ১১. ১৪ শতাংশ।

রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, ২০০৭/০৮ সাল থেকে ২০১২/১৩ সালের মধ্যে গ্রামীণ মজুরির প্রবৃদ্ধিতে বড় ধরনের অধঃপতন ঘটেছে।

মধ্যপ্রদেশের রাজধানী ভোপালের অবকাঠামো ঠিকাদার চোটেলা রাজপুত বলেন, জিএসটি ও মুদ্রার মূল্য পতনে এ খাতে মন্দা দেখা দিয়েছে। মুদ্রার মূল্য কমে যাওয়ার পর আমি শুধু ২০ শতাংশ কাজ পাচ্ছি।

কথা বলতে বলতে তিনি একটি সড়কের মোড়ে এসে থেমে যান। সেখানে কয়েক ডজন শ্রমিক দৈনিক মজুরিভিত্তিক কাজ পেতে জড়ো হয়েছেন।

দক্ষিণ মুম্বাইয়ের ছোট্ট শহর ওয়াইতে অভিবাসী শ্রমিক মিথিলেশ যাদভ বলেন, সর্বশেষ নির্বাচনে তিনি মোদিকে ভোট দেন। কিন্তু দ্বিতীয়বার আর তাকে সমর্থন দিচ্ছেন না।

২৬ বছর বয়সী চোটেলা রাজপুত বলেন, মুদ্রাস্ফীতি কমিয়ে আনতে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে ভারতের ক্ষমতাসীন দলটি। শুধু তাই নয়, পেট্রোল ও ডিজেলের দাম কীভাবে কমানো যায়, তা নিয়েও ভাবছে। কিন্তু প্রতিদিন তার উল্টোটাই ঘটছে। দিনে দিনে এসবের মূল্য বাড়ছেই।

“মোদির লম্বা লম্বা কথাগুলোতে তার নিজের ঢাক নিজে পেটানো ছাড়া আর কিছু ছিল না। আমরা তার কথার জাদুতে মুগ্ধ হয়েছিলাম। কিন্তু তাই বলে একই ভুল দ্বিতীয়বার করব না,” ঠিকাদার রাজপুতের মন্তব্য।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মোদি কয়েক লাখ বেকার যুবকদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যর্থ হয়েছেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে অথচ তিনি সেই ম্যান্ডেট দিয়ে রেখেছেন। কাজেই দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতি পালনের এই ব্যর্থতা তার সামনে বড় বাধা হয়ে দেখা দিতে পারে।

রাজস্থানের কসবা বনলি শহরে স্নাতক পাশ করে রঙ মিস্ত্রির কাজ করেছেন যুবক রাকেশ কুমার। এত পড়াশুনা ও সনদ অর্জন করেও একটি চাকরি যোগাতে তাকে খাবি খেতে হয়েছে। রাকেশ বলেন, এখানের কেউ মোদিকে ভোট দেবে না।

গত মাসে একটি প্রাইভেট কলেজের শিক্ষক হিসেবে চাকরি পান রাকেশ। কিন্তু তাতে প্রতি মাসে তার বেতন ধরেছে মাত্র আট হাজার রুপি। কাজেই তার বাকি ছয় ভাইকে এখন কায়িক শ্রমিক হিসেবেই কাজ করতে হচ্ছে।

গত জাতীয় নির্বাচনে শহরটিতে বিজেপি ব্যাপক ভোট পেয়েছিল।

রাজধানীর দিল্লির পানিপথ শহরের বস্ত্র কারখানার শ্রমিকরা বলেন, শত শত শ্রমিককে সেখান থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। কারণ ছোট ছোট বহু ব্যবসার মালিকরা নতুন জিএসটি জটিলতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পেরে কারখানা বন্ধ করে দিয়েছেন।

বিজেপির মুখপাত্র গোপাল কৃষ্ণ আগারওয়াল বলেন, এ অল্প সময়ের মধ্যে মোদি সরকার সব সমস্যার সুরাহা করে ফেলবেন এমনটা প্রত্যাশা করা উচিত না।

“ভারত স্বাধীন হয়েছে ৭০ বছরেরও বেশি হবে। কাজেই এ কথা বলতে পারছি না যে ৬৫ বছর ধরে জমে থাকা সমস্যা মাত্র সাড়ে চার বছরের মধ্যে দূর করতে পারব,” বিজেপি মুখপাত্রের ভাষ্য।

তিনি বলেন, আমরা বলছি না, প্রতিটি সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের মূলকেন্দ্রবিন্দু ও গতিপথ সঠিক। তাতে কোনো ভুল নেই।

বিরোধীদের মধ্যে ভাঙনের কারণে আগামী নির্বাচনে সম্ভাব্য জয়ের ব্যাপারে বিজেপি আশাবাদী। মোদির মূল প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী। কিন্তু দেশটিতে আঞ্চলিক দলের অভাব নেই। বিরোধীদের ভোট তারা ভাগাভাগি করে নিয়ে যাবে।

গত মাসে ইন্ডিয়া টুডে ম্যাগাজিন একটি জরিপ প্রকাশ করেছে। তাদের বলা হয়েছে, আগের নির্বাচনের তুলনায় বিজেপির আসন কমবে। তবে বিরোধীরা যদি বিভক্ত থাকে, তবে জোটকে সঙ্গে নিয়ে সরকার গঠনের মতো যথেষ্ট আসন তারা পাবে।

সাময়িকীটি আভাস দিচ্ছে, বিজেপি যেখানে ৩৬ শতাংশ ভোট পাবে, কংগ্রেস সেখানে ৩১। আর ছোট দলগুলোর মধ্যে ভাগ হয়ে যাবে ৩৩ শতাংশ।

রাহুল গান্ধী গত মাসে সাংবাদিকদের বলেন, ২০১৯ সালের নির্বাচনে একটি শক্তিশালী বিরোধী জোট গঠন করা হবে। সব কটি আসনে ঐক্যবদ্ধ বিরোধী জোটের একজন করে প্রার্থী থাকবেন।

“অতীতের যে কোনো সরকারের চেয়ে মোদি প্রশাসন ভারতের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে। সবাই স্বীকার করছেন, ধ্বংসাত্মক বিজেপিকে থামাতে সর্মাত্মক চেষ্টা দরকার”, বলেন কংগ্রেস সভাপতি।

বিজেপির হিন্দু জাতীয়তাবাদী অ্যাজেন্ডায় সংখ্যালঘুরা বিভিন্ন সময় হামলার শিকার হচ্ছেন।

তবে মিরুত শহরের কলেজ শিক্ষার্থী সুবান্সু সেথিয়া বলেন, মোদির সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা কর্মসংস্থানের অভাব। আসছে দিন স্লোগান কেবল ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের জন্য, যারা বড় বড় ইজারা হাতিয়ে নিতে পারছেন। বাকি সবার জন্য কেবল একরাশ হতাশা।

“ চাকরির জন্য এখানে একটা যুদ্ধ চলছে,” জানালেন এ শিক্ষার্থী।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×