Logo
Logo
×
   

ইসলাম ও জীবন

শিশুর প্রতি আচরণ ও শাসন— ইসলাম কী বলে?

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬, ০৭:৫০ পিএম

শিশুর প্রতি আচরণ ও শাসন— ইসলাম কী বলে?

ছবি: সংগৃহীত

সন্তান মহান আল্লাহ তাআলার দেওয়া সবচেয়ে মূল্যবান নেয়ামত এবং পিতা-মাতার কাছে অর্পিত এক মহামূল্যবান আমানত। একজন সন্তানের ভবিষ্যৎ, চরিত্র, নৈতিকতা ও ইমানি ভিত্তি গড়ে ওঠে মূলত পরিবার থেকেই। তাই সন্তানকে শুধু ভরণ-পোষণ দেওয়া নয়; বরং দ্বীনি শিক্ষা, উত্তম চরিত্র, নৈতিক মূল্যবোধ এবং আল্লাহভীতি অর্জনের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করাও প্রত্যেক মুসলিম পিতা-মাতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

বর্তমান সময়ে সন্তান লালন-পালনের ক্ষেত্রে দুটি চরম প্রবণতা লক্ষ করা যায়। একদল অভিভাবক অতিরিক্ত আদর-স্নেহের কারণে সন্তানকে শাসনের বাইরে রাখেন, অন্যদিকে কেউ কেউ শাসনের নামে কঠোরতা কিংবা শারীরিক নির্যাতনের পথ বেছে নেন। অথচ ইসলাম এ দুই চরমপন্থার কোনোটিকেই সমর্থন করে না। বরং ইসলাম শিক্ষা দেয় ভারসাম্যপূর্ণ তারবিয়াতের— যেখানে ভালোবাসা, শিক্ষা, আদর্শ, ধৈর্য, উৎসাহ ও প্রয়োজনীয় শাসনের সমন্বয়ে একজন সন্তানকে ধীরে ধীরে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা হয়।

তারবিয়াত: সন্তান প্রতিপালনের মূল ভিত্তি

ইসলামের দৃষ্টিতে সন্তান প্রতিপালন কেবল একটি পারিবারিক দায়িত্ব নয়; বরং এটি আল্লাহ তাআলার কাছে জবাবদিহিতার বিষয়। মহান আল্লাহ বলেন—

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ

‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবারকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর।’ (সুরা আত-তাহরীম: আয়াত ৬)

মুফাসসিরগণ ব্যাখ্যা করেছেন, এ আয়াতের অন্যতম শিক্ষা হলো— পরিবারকে দ্বীনি শিক্ষা দেওয়া, সৎ আমলের অভ্যাস গড়ে তোলা এবং উত্তম চরিত্রে গড়ে তোলাই তাদের জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষার অন্যতম উপায়।

শাসন সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

ইসলামে সন্তানকে সংশোধনের জন্য শাসনের সুযোগ থাকলেও তার উদ্দেশ্য কখনোই প্রতিশোধ বা রাগের বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং সংশোধন ও কল্যাণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

مُرُوا أَوْلَادَكُمْ بِالصَّلَاةِ وَهُمْ أَبْنَاءُ سَبْعِ سِنِينَ، وَاضْرِبُوهُمْ عَلَيْهَا وَهُمْ أَبْنَاءُ عَشْرِ سِنِينَ، وَفَرِّقُوا بَيْنَهُمْ فِي الْمَضَاجِعِ

‘তোমরা তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে নামাজের নির্দেশ দাও। আর তারা যখন দশ বছরে পৌঁছবে (এবং ইচ্ছাকৃতভাবে অবহেলা করবে), তখন এ বিষয়ে শাসন করো এবং তাদের বিছানা পৃথক করে দাও।’ (আবু দাউদ ৪৯৫)

এই হাদিস থেকে স্পষ্ট হয়, ইসলাম শাস্তির আগে দীর্ঘ সময় ধরে ভালোবাসা, শিক্ষা ও অভ্যাস গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। অর্থাৎ শাসনের চেয়ে তারবিয়াতই ইসলামের মূল পদ্ধতি।

শিশুদের প্রতি নবীজি (সা.)-এর আচরণ

বিশ্বনবী (সা.) ছিলেন শিশুদের প্রতি অসীম স্নেহশীল ও কোমল হৃদয়ের অধিকারী। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন—

مَا ضَرَبَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ شَيْئًا قَطُّ بِيَدِهِ، وَلَا امْرَأَةً، وَلَا خَادِمًا، إِلَّا أَنْ يُجَاهِدَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ

‘রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর পথে জিহাদ ছাড়া কখনো নিজ হাতে কোনো নারী, কোনো খাদেম বা কাউকে প্রহার করেননি।’ (মুসলিম ২৩২৮)

শিশুদের সঙ্গে তার হাসিমুখে কথা বলা, সালাম দেওয়া, কোলে নেওয়া, খেলায় অংশ নেওয়া এবং স্নেহময় আচরণ প্রমাণ করে যে, শিশুদের চরিত্র গঠনে ভয় নয়; ভালোবাসা ও সম্মানই সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।

ইসলামি আইনজ্ঞরাও বলেছেন, সন্তান বা শিক্ষার্থীকে সংশোধনের সর্বোত্তম উপায় হলো উত্তম আচরণ, ধৈর্য, উৎসাহ এবং ধারাবাহিক শিক্ষা। শাসনের প্রয়োজন দেখা দিলে সেটি হবে সর্বশেষ ব্যবস্থা এবং কেবল সংশোধনের উদ্দেশ্যে।

শাসনের সীমারেখা

ইসলাম সন্তান সংশোধনের ক্ষেত্রে শাসনের সুযোগ দিলেও এর জন্য সুস্পষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ করেছে।

১. মুখমণ্ডলে আঘাত নিষিদ্ধ

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

إِذَا ضَرَبَ أَحَدُكُمْ فَلْيَتَّقِ الْوَجْهَ

‘তোমাদের কেউ যদি (প্রয়োজনে) আঘাত করে, তবে যেন মুখমণ্ডলে আঘাত না করে।’ (মুসলিম ২৬১২)

২. কোনো ধরনের ক্ষতি করা যাবে না

শাসনের নামে এমন আচরণ করা যাবে না, যাতে শরীরে ক্ষত সৃষ্টি হয়, স্থায়ী ক্ষতি হয় কিংবা সন্তানের মর্যাদা নষ্ট হয়। ইসলামি ফিকহবিদরা কুরআন-সুন্নাহর আলোকে এ ধরনের সীমালঙ্ঘনকে নিষিদ্ধ বলে উল্লেখ করেছেন।

৩. রাগের বশে শাসন নয়

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

لَا تَغْضَبْ

‘রাগ কর না।’ (বুখারি ৬১১৬)

রাগের মুহূর্তে মানুষ অনেক সময় ন্যায়বিচার হারিয়ে ফেলে। তাই সন্তানকে শাসনের প্রয়োজন হলে তা শান্ত অবস্থায়, বিবেচনার সঙ্গে করতে হবে।

৪. অপমান বা কটু আচরণ নয়

সন্তানকে গালিগালাজ করা, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা কিংবা অন্যের সামনে অপমান করা ইসলামের উত্তম চরিত্রের শিক্ষার পরিপন্থী। এ ধরনের আচরণ শিশুর আত্মসম্মান ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

সন্তান ভুল করলে ইসলামের আলোকে অভিভাবকের করণীয়

সন্তানকে সংশোধনের জন্য ইসলাম ধাপে ধাপে কিছু কার্যকর পদ্ধতির শিক্ষা দেয়—

● ভুল বুঝিয়ে বলা

প্রথমে ভালোবাসা ও কোমল ভাষায় তার ভুলটি বুঝিয়ে বলতে হবে এবং এর পরিণতি সম্পর্কে সচেতন করতে হবে।

● উৎসাহ ও পুরস্কার

সৎ কাজের প্রশংসা ও উপযুক্ত পুরস্কার শিশুর মধ্যে ভালো কাজের আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়।

● প্রিয় সুবিধা সাময়িকভাবে সীমিত করা

সরাসরি আঘাত না করে প্রয়োজন হলে সাময়িকভাবে কোনো প্রিয় সুবিধা সীমিত করে তাকে সতর্ক করা যেতে পারে।

● প্রতীকী শাসন

যদি অন্য কোনো উপায় কার্যকর না হয়, তবে দশ বছর বয়সের পর অত্যন্ত সংযত, প্রতীকী এবং ক্ষতিবিহীন শাসন করা যেতে পারে। এর উদ্দেশ্য হবে কেবল সংশোধন; কখনোই প্রতিশোধ নয়।

ভালোবাসা ও শিক্ষার ভারসাম্য

শিশুবিকাশ বিশেষজ্ঞদের বহু পর্যবেক্ষণের সঙ্গেও ইসলামের এই শিক্ষার গভীর মিল রয়েছে। ভালোবাসা ও শৃঙ্খলার ভারসাম্য শিশুকে আত্মবিশ্বাসী, দায়িত্বশীল ও নৈতিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। অতিরিক্ত কঠোরতা যেমন শিশুকে বিদ্রোহী করে তুলতে পারে, তেমনি অতিরিক্ত প্রশ্রয়ও তাকে দায়িত্বহীন ও বিপথগামী করতে পারে।

ইসলামের লক্ষ্য সন্তানকে ভয়ভীতির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা নয়; বরং তার হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ এবং আত্মসংযম সৃষ্টি করা।

সন্তান আল্লাহ তাআলার অর্পিত এক মহামূল্যবান আমানত। এই আমানতের যথাযথ হেফাজত কেবল খাদ্য, বস্ত্র বা শিক্ষা নিশ্চিত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তার ইমান, চরিত্র, আচার-আচরণ ও নৈতিক ব্যক্তিত্ব গঠনের মধ্যেই এর প্রকৃত সফলতা নিহিত। ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয়—তারবিয়াতের ভিত্তি হবে ভালোবাসা, দোয়া, ধৈর্য, আদর্শ, নিয়মিত শিক্ষা এবং প্রয়োজন হলে সীমিত ও সংশোধনমূলক শাসন।

অভিভাবকের প্রতিটি আচরণ সন্তানের ভবিষ্যৎ নির্মাণে গভীর প্রভাব ফেলে। তাই এমন কোনো আচরণ করা উচিত নয়, যা তার শারীরিক, মানসিক বা আত্মিক ক্ষতির কারণ হয়। মহান আল্লাহর কাছে আন্তরিক দোয়া, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ এবং ভারসাম্যপূর্ণ তারবিয়াতের মাধ্যমে আমরা আমাদের সন্তানদের আল্লাহভীরু, সচ্চরিত্র, দায়িত্বশীল এবং আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারি। এটাই একজন মুসলিম পিতা-মাতার সফলতা এবং আল্লাহর কাছে উত্তম জবাবদিহিতার পথ।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .