মুক্তির রজনীতে জাগো হে মুমিন

প্রকাশ : ২১ এপ্রিল ২০১৯, ২২:৩১ | অনলাইন সংস্করণ

  মাওলানা আবদুর রাজ্জাক

জাতীয় মসজিদ বাইতুল মোকাররমে নামাজ আদায়ের সুন্দর একটি দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

‘শবেবরাত’ কথাটি ফারসি। 'শব' অর্থ রাত, আর 'বরাত' অর্থ মুক্তি। অতএব 'শবেবরাত' এর অর্থ হল মুক্তির রাত। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এ রাতে বান্দাদের ডেকে বলতে থাকেন যারা পাপ থেকে মুক্তি পেতে চাও, মুক্তি প্রার্থনা করো! আমি মুক্তি দেব। রোগ গ্রস্থ যারা আছো মুক্তি চাও! আমি মুক্তি দেব।

মধ্য শাবানের এ রাতে আল্লাহ তায়ালা নিকটতম আসমানের এসে পাপী, অভাব-অনটনে আচ্ছন্ন, রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মুক্তির আহ্বান করেন। তাই এ রাতকে শবেবরাত বা মুক্তির রজনী বলা হয়। 

শবেবরাত অর্থ ‘ভাগ্য রজনী’ বলা ঠিক নয়। কারণ বাংলা ভাষায় বরাত অর্থ ভাগ্য কিন্তু ফার্সিতে বরাত অর্থ মুক্তি। তবে হাদিসের ভাষ্যমতে এ রাতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আগামী এক বছরের জন্য হায়াত, মউত, রিজিক, সম্পদ ইত্যাদির ফায়সালা করে থাকেন। এই অর্থে এ রাতকে ভাগ্য রজনী বলা যেতে পারে।

শবেবরাতের করণীয় হিসেবে হাদীসে এসেছে, ‘তোমরা শা'বানের মধ্য তারিখ রাতে জাগ্রত থাকো, আর দিনে রোজা রাখ।’ 
রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন আল্লাহ তায়ালা এ রাতে প্রথম আসমানে এসে বান্দাদেরকে ব্যাপকভাবে ক্ষমা করেন। যার পরিমাণ কালব নামক গোত্রের বকরির পশমের থেকেও বেশি। 

শবে বরাতে আমরা কী আমল করব? এ সম্পর্কে হাদিস ও ফিকহের কিতাবাদিতে মোট ৬ টি আমল পাওয়া যায়। 

(১.) নফল ইবাদত করা। তবে নফল নামাজের ক্ষেত্রে বিশেষ কোন পদ্ধতি হাদিসে উল্লেখ নেই।

(২.) পরের দিন নফল রোজা রাখা।

(৩.) এ রাতে দোয়া করা। সমস্ত রোগ-শোক, অভাব-অনটন থেকে মুক্তি চাওয়া। বিশেষভাবে গুনাহ থেকে মুক্তি চাওয়া। 

(৪.) দুনিয়া থেকে চলে গেছে এমন নর-নারী ও শহীদদের জন্য দোয়া করা। 

(৫.) এ রাতে জিয়ারতের জন্য কবরস্থানে যাওয়া। রাসূল সা. জান্নাতুল বাকীতে গিয়েছিলেন। তবে এক্ষেত্রে স্বদলবলে আড়ম্বরের সঙ্গে যাওয়ার কথা হাদিসে উল্লেখ নেই।

(৬.) এ রাত ইবাদতের রাত, যতই পবিত্র অবস্থায় ইবাদত করা যাবে ততই উত্তম হবে। তাই কিছু ফুক্বাহায়ে কিরাম এ রাতে গোসল করাকে মুস্তাহাব বলেছেন।

উক্ত ৬ টি আমল হাদিস ও ধর্মীয় কিতাবাদিতে পাওয়া যায়।

শবে বরাত এটি বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ রাত। এ রাতে গুনাহ করলে তা বড় গুনাহ হয়ে দাঁড়াবে। সব রকমের গুনাহ থেকে মুক্ত হয়ে যা কিছু চাইবো মহান মালিকের কাছেই চাইবো। সব চাওয়ার মাঝে গুনাহ থেকে মুক্তি হল বড় চাওয়া। আর তা থেকে মুক্তি পাওয়াই হল বড় পাওয়া।  গুনাহ থেকে মুক্তি পেতে হলে, আল্লাহর নিকট খাঁটি ভাবে তওবা করতে হবে। আবার তওবা ইস্তেগফার শুধু মুখে মুখে করলাম, এতে তওবা হবে না। সম্ভব হবে না পাপ থেকে মুক্তি লাভ। 
কবি বলেন-
‘হাতে তসবিহ মুখে তওবা মনে গুনাহের স্পৃহা, বান্দার এমন তাওবা দেখে গুনাহও হাসতে থাকে।’

যে তাওবা গুনাহ থেকে মুক্তি দেয়, নাজাত দেয় জাহান্নাম থেকে, সে তওবা এবং ইস্তেগফারের চারটি শর্ত আছে।
গুনাহ মুক্তির প্রধান পদ্ধতি হলো আল্লাহর কাছে খাঁটিভাবে তওবা করা।

তওবা এবং ইস্তেগফারের চারটি শর্ত।

এক. অতীতের সব গুনাহ সম্পর্কে অনুতপ্ত হওয়া।

দুই. যে গুনাহের তওবা করা হচ্ছে সেই গুনাহ তখনই ত্যাগ করা।

তিন. আগামীতে উক্ত গুনাহ না করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া।

চার. গুনাহ যদি বান্দার হকসংশ্লিষ্ট হয়, তাহলে তার হক আদায় করে দেয়া বা ক্ষমা চেয়ে নেয়া।

উল্লিখিত চারটি শর্তের সঙ্গে যখন নয়নযুগল হতে অশ্রু ঝরাতে পারবে তখনই তওবা কবুলের নিশ্চিত আশা বান্দা করতে পারবে।
কবি বলেন- 
‘ঢের জমেছে পাপের বোঝা 
বহাও চোখের অশ্রু ধারা 
মোছন হয় না পাপের কালি
অনুতাপের কান্না ছাড়া।’

অতএব মুক্তির এই পবিত্র রজনীতে সকল পাপাচার থেকে মুক্ত হতে হবে। বেরিয়ে আসতে হবে সকল নির্লজ্জতা ও বেহায়াপনার পচা বাগাড়ম্বর হতে। যদি বরাতের রাতে নিজেকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করতে না পারি, তাহলে জীবন চলার পথে বহু নিশীথের প্রহর দেখবে ও গুনবে কিন্তু ভাগ্যের অমানিশা দূর হবে না।

হে পাঠক! বরাতের রাতে আপনাদের প্রতি হৃদয়ের তপ্ত আহ্বান, আসুন, এ রাতে কালিমা আচ্ছন্ন হৃদয় আয়নাকে জিকরুল্লাহর স্বচ্ছ পানি দিয়ে পরিচ্ছন্ন করি।  হৃদয় গহীনে জমে থাকা সকল পাপাচারের খড়কুটোকে তাওবার স্রোতে ভাসিয়ে দেয়।   কোরআনের আলোক রশ্মিতে মনমন্দিরকে প্রজ্জ্বলিত করতে কুল মাখলুকের স্রষ্টা আল্লাহর চরণে কপাল ঠেকিয়ে মনের আকুতি জানাই এ রাতে।  পরওয়ারদিগারের অসীম করুণালাভে ধন্য  হতে নিজেকে আল্লাহর রঙে রাঙিয়ে নেই।  

লেখক: মুহাদ্দিস ও গবেষক, শিক্ষাসচিব, নূরপুর মুহিউস্ সুন্নাহ মাদ্রাসা, ফেনী।